বুধবার, ০৬ মে, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ০৬ মে ২০২৬, ০৯:০৪

তবলার তালে তিন দশকের বেশি পথচলা সিজারের

কবির হোসেন মিজি
তবলার তালে তিন দশকের বেশি পথচলা সিজারের

চাঁদপুরের সংস্কৃতি অঙ্গনে এমন অনেক মানুষ আছেন, যাঁরা আলোচনার আড়ালে থেকে শিল্পের মূল কাজটুকু করে যান নীরবে, নিষ্ঠায়, ভালোবাসায়। তেমনই একজন নিবেদিতপ্রাণ তবলশিল্পী সৈকত মজুমদার, যিনি সবার কাছে ‘সিজার’ নামেই বেশি পরিচিত।

জানা যায় তিন দশকে সংস্কৃতির ভুবনে পথচলা সৈকত মজুমদার সিজার পড়াশোনা শুরুর আগেই তাঁর তবলার হাতে খড়ি। মাত্র চার বছর বয়স থেকেই শুরু হয় তালিম। সংগীতে তাঁর প্রথম পাঠ ছিলো তাঁর ছোট মাসি রুমা সরকারের কাছে, যেখানে তিনি সা রে গা মা শেখেন। এরপর ভর্তি হন সংগীত নিকেতনে, সেখানে নিয়মিত গানের পাশাপাশি তবলার ক্লাস করতে থাকেন। পরবর্তীতে দেশের খ্যাতনামা ওস্তাদ টোটন চক্রবর্তী, সুবীর ঘোষ ও দীপক চক্রবর্তীর কাছে তবলায় তালিম নেন।

শুধু তবলা নয়, ছোটবেলায় রুমা সরকার ও কণ্ঠশিল্পী মৃণাল সরকারের হাত ধরে তিনি গান ও অভিনয় নিয়েও বিভিন্ন প্রতিযোগিতা ও অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছেন। সেই সময় থেকেই মঞ্চের সঙ্গে তাঁর আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হয়।

প্রায় ৩৫ বছর ধরে নিয়মিত তবলা চর্চা করে আসছেন সৈকত মজুমদার। তিনি দিল্লি ঘরানার তবলা বাজাতে বিশেষভাবে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। একক ও দলগত দুই ধরনের পরিবেশনাই তাঁর ভালো লাগে, তবে একক বাদনে তিনি নিজেকে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য ও স্বাধীন মনে করেন।

তাঁর জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন হলো জাতীয় শিশু পুরস্কার প্রতিযোগিতায় আঞ্চলিক পর্যায়ে প্রথম হয়ে অভিনয় ও তবলা দুটোতেই জাতীয় পর্যায়ে অংশগ্রহণ করা।

শিল্পী হিসেবে তাঁর কাছে সবচেয়ে বড়ো প্রাপ্তি কী? এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি খুব সহজভাবে বলেন, গান গাইলে বা তবলা বাজালে দর্শকরা যখন বলে ‘পরিবেশনাটা খুব সুন্দর হয়েছে’--এই কথাটাই আমার সবচেয়ে বড়ো পুরস্কার।

তবলা চর্চা সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি খুবই বাস্তব আর শৃঙ্খলাপূর্ণ। তিনি বলেন, আমরা বাঙালিরা যেমন প্রতিদিন অন্তত একবার ভাত খাই, ঠিক তেমনি একজন তবলাবাদককে প্রতিদিন অন্তত একবার হলেও তবলা নিয়ে বসতে হবে। তবলা বাজানো মন থেকে ভালোবাসতে না পারলে এগোনো যায় না।

মঞ্চে বসে পরিবেশনার সময় তিনি নিজের সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টা করেন সবসময়। তাঁর বিশ্বাস, একজন শিল্পীর গানকে সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলার পেছনে তবলাবাদকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যদিও সেই ভূমিকা অনেক সময় দর্শকের চোখে ধরা পড়ে না।

এখনো টেলিভিশনে বা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বড়ো বড়ে ওস্তাদদের তবলা বাজানো দেখলে তিনি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকেন। মনে মনে ভাবেন, কবে তাঁদের মতো আরও পরিপূর্ণ, আরও গভীরভাবে তবলা বাজাতে পারবেন।

চাঁদপুর শহরের পুরাণ আদালত পাড়ায় জন্ম ও বেড়ে ওঠা সৈকত মজুমদারের পরিবারটি যেনো একেবারেই সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের ভেতর গড়ে ওঠা। পরিবারের মোট ৯ জন সদস্যই কোনো না কোনোভাবে সংস্কৃতি অঙ্গনের সঙ্গে যুক্ত। ছোটবেলা থেকেই ঘরের ভেতর গান, তবলা, অভিনয় আর সুরের চর্চা দেখে বড়ো হওয়া সৈকতের মধ্যে খুব স্বাভাবিকভাবেই সংগীতের প্রতি গভীর টান তৈরি হয়।

পেশাগত জীবনেও তিনি দীর্ঘদিন ধরে সংগীতের সেবায় যুক্ত। ২০০৪ সালে তিনি জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে তালযন্ত্র সহকারী হিসেবে সম্মানী ভিত্তিতে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, চাঁদপুরে তালযন্ত্র (তবলা) সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

জীবন নিয়ে তাঁর চাওয়া খুব সোজা, তিনা বলেন, আমি যতোদিন বেঁচে থাকবো, ততোদিন এই সঙ্গীত অঙ্গনের সাথেই নিজেকে জড়িয়ে রাখতে চাই।

আলো ঝলমলে মঞ্চের পেছনে যে মানুষগুলো নীরবে শিল্পকে শক্ত করে ধরে রাখেন, সৈকত মজুমদার তাঁদেরই একজন। চাঁদপুরের সাংস্কৃতিক ভুবনে তাঁর মতো নিষ্ঠাবান শিল্পীর অবদান নিঃসন্দেহে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করার মতো।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়