প্রকাশ : ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৩১
‘ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি

বর্তমান বিশ্ব দ্রুত ডিজিটাল প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে, যেখানে তথ্যপ্রযুক্তি ছাড়া কার্যকর শিক্ষা কল্পনাও করা যায় না। শিক্ষাক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নয় এবং সে কারণে ‘ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি একটি যুগোপযোগী ও দূরদর্শী পদক্ষেপ ষ এর মূল লক্ষ্য হলো প্রতিটি শিক্ষককে (প্রথম পর্যায়ে প্রাথমিক শিক্ষকদের জন্যে) একটি করে ট্যাব প্রদান করা, যাতে তঁারা আধুনিক ডিজিটাল উপকরণ ব্যবহার করে পাঠদান করতে পারেন। যদি এই কর্মসূচি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হয়, তবে দেশের শিক্ষার গুণগত মান বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাদান শিক্ষার্থীদের চিন্তাশক্তি, সৃজনশীলতা ও বাস্তবমুখী দক্ষতা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, যা একটি আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের জন্যে অপরিহার্য। প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় অনেক ক্ষেত্রে পাঠদান সীমাবদ্ধ থাকে পাঠ্যবই ও মুখস্থনির্ভর ব্যাখ্যার মধ্যে। কিন্তু একটি ট্যাব থাকলে শিক্ষক সহজেই ভিডিও, অ্যানিমেশন, ডিজিটাল স্লাইড, ইন্টারঅ্যাকটিভ কনটেন্ট ও অনলাইন রিসোর্স ব্যবহার করে পাঠকে জীবন্ত করে তুলতে পারেন। বিজ্ঞানের জটিল বিষয়, গণিতের কঠিন সূত্র কিংবা ইতিহাসের ঘটনাবলি চিত্র ও ভিডিওর মাধ্যমে উপস্থাপন করলে শিক্ষার্থীরা বিষয়গুলো দ্রুত ও গভীরভাবে বুঝতে পারে। এর ফলে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ বৃদ্ধি পায় এবং শেখার প্রতি আগ্রহ জন্মায়। একই সঙ্গে শিক্ষকও একঘেঁয়ে পাঠদান থেকে বেরিয়ে এসে সৃজনশীলভাবে ক্লাস পরিচালনা করতে পারেন। এর ফলে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক আরও ইতিবাচক ও কার্যকর হয়, যা শিক্ষার মানোন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
তথ্যপ্রযুক্তির অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশে ইন্টারনেট ও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লেও শহর ও গ্রামের মধ্যে ডিজিটাল বৈষম্য এখনো প্রকট। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৬ সালের এপ্রিলের তথ্যমতে, দেশের অর্ধেকের বেশি মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করলেও শহর ও গ্রামের মধ্যে বড়ো ধরনের ব্যবধান রয়েছে। জরিপে দেখা গেছে, শহর এলাকায় ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ৭৫ দশমিক ৭ শতাংশ হলেও গ্রামে তা মাত্র ৪৩ দশমিক ৬ শতাংশ। অর্থাৎ, শহর এবং গ্রামের মধ্যে প্রযুক্তি ব্যবহারের ব্যবধান ৩২ দশমিক ১ শতাংশ পয়েন্ট। গ্রাম ও শহরের ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড়ো বাধা কম্পিউটার ও ল্যাপটপের সীমিত ব্যবহারের সুযোগ। জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, গ্রামের মাত্র ৩ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবারের কম্পিউটারের সুবিধা রয়েছে, যা শহরের তুলনায় (২১.১%) অনেক কম। ব্যক্তিগত পর্যায়েও গ্রামের মাত্র ৫ শতাংশ মানুষ কম্পিউটার ব্যবহার করার সুযোগ পান, যেখানে শহরের ২৫ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে এগিয়ে যাচ্ছেন। অর্থাৎ, প্রযুক্তির বিস্তার ঘটলেও তা সবার কাছে সমানভাবে পেঁৗছায়নি। এমন প্রেক্ষাপটে ‘ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি গ্রাম ও শহরের শিক্ষকদের ক্ষেত্রে বৈষম্য কমে আসবে শূন্যের কোঠায় ষ এছাড়াও, গ্রামাঞ্চল বা প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষকরা অনেক সময় আধুনিক প্রশিক্ষণ সুবিধা থেকে বঞ্চিত, ট্যাব সেই বৈষম্য কমাতে পারে। যখন শিক্ষক নিজেই আধুনিক জ্ঞান ও প্রযুক্তিতে দক্ষ হবেন, তখন তঁার পাঠদান আরও মানসম্মত হবে। এতে শিক্ষকের আত্মমর্যাদা ও পেশাগত সম্মান বৃদ্ধি পাবে, যা দীর্ঘমেয়াদে একটি শক্তিশালী ও দক্ষ শিক্ষকসমাজ গঠনে সহায়ক হবে। তাই কর্মসূচিটি শিক্ষা ব্যবস্থায় সমতা ও অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। বাংলাদেশের মতো দেশে শহর ও গ্রামের শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে এখনও স্পষ্ট বৈষম্য বিদ্যমান। শহরের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল বোর্ড, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম থাকলেও গ্রামাঞ্চলে তা প্রায় অনুপস্থিত। এখন যদি প্রত্যেক শিক্ষক একটি ট্যাব পান এবং সেখানে মানসম্মত ডিজিটাল শিক্ষাসামগ্রী সংযুক্ত থাকে, তবে গ্রামের শিক্ষার্থীরাও শহরের শিক্ষার্থীদের মতো একই মানের শিক্ষা লাভের সুযোগ পাবে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্যে অডিও-ভিজ্যুয়াল কনটেন্ট, বড় ফন্ট বা বিশেষ অ্যাপ ব্যবহার করে শেখার সুযোগ সৃষ্টি হবে। এভাবে প্রযুক্তির মাধ্যমে শিক্ষাকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক করা সম্ভব, যা একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের জন্যে অত্যন্ত জরুরি।
উল্লেখ্য, আফ্রিকার মতো উন্নয়নশীল ও প্রযুক্তিগতভাবে পিছিয়ে থাকা অঞ্চলে শিশুদের শিক্ষায় প্রযুক্তি পেঁৗছে দেওয়ার লক্ষ্যে ‘ওয়ান ল্যাপটপ পার চাইল্ড’ কর্মসূচি শিক্ষাক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। সেখানকার অনেক প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্কুল থাকলেও পর্যাপ্ত বই বা আধুনিক শিক্ষা উপকরণ ছিলো না। ওই প্রেক্ষাপটে ‘ওয়ান ল্যাপটপ পার চাইল্ড’ কর্মসূচির মূল লক্ষ্য ছিলো প্রতিটি শিশুর হাতে স্বল্পমূল্যের, টেকসই ও বিদ্যুৎ-সাশ্রয়ী ল্যাপটপ তুলে দেওয়া, যাতে তারা নিজেরাই শেখার সুযোগ পায়। এসব ল্যাপটপে ইন্টারনেট সুবিধা, শিক্ষামূলক সফটওয়্যার, ডিজিটাল বই, গণিত ও বিজ্ঞানের ইন্টারঅ্যাকটিভ অ্যাপ্লিকেশন সংযুক্ত ছিলো। বিদ্যুৎ সমস্যার কথা বিবেচনা করে অনেক ল্যাপটপে সৌরশক্তি ব্যবহারের সুবিধাও রাখা হয়। কর্মসূচিটির একটি বড়ো সাফল্য ছিলো শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মনির্ভরশীলতা ও কৌতূহল বৃদ্ধি। শিক্ষক না থাকলেও শিশুরা ল্যাপটপের মাধ্যমে পড়াশোনা করতে পারতো। তারা একে অপরের সঙ্গে জ্ঞান ভাগ করে নেওয়া, ছবি অঁাকা, গল্প লেখা ও প্রোগ্রামিং শেখার মতো সৃজনশীল কাজে যুক্ত হয়। এতে তাদের শেখার আগ্রহ বেড়েছিলো এবং স্কুলে উপস্থিতির হারও বৃদ্ধি পেয়েছিলো। কিছু সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও আফ্রিকায় ‘ওয়ান ল্যাপটপ পার চাইল্ড’ কর্মসূচি শিক্ষা ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ হিসেবে আজও বিবেচিত। এটি প্রমাণ করেছে যে, সঠিক পরিকল্পনা ও প্রযুক্তির মাধ্যমে দরিদ্র অঞ্চলেও মানসম্মত শিক্ষা পেঁৗছে দেওয়া সম্ভব। উল্লেখ্য, ওয়ান ল্যাপটপ পার চাইল্ড (ঙখচঈ) উদ্যোগটি ২০০৫ সালের জানুয়ারি মাসে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি (গওঞ)-এর মিডিয়া ল্যাব থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছিলো। নিকোলাস নিগ্রোপনতে এই অলাভজনক প্রকল্পটি চালু করেন, যার মূল লক্ষ্য ছিলো উন্নয়নশীল বিশ্বের শিশুদের জন্যে স্বল্পমূল্যের শিক্ষামূলক ল্যাপটপ তৈরি ও বিতরণ করা।
বাংলাদেশে ৬৫ হাজার ৫৬৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষক সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ ৮৪ হাজার ৯৮১ জন। তবে সামগ্রিকভাবে প্রাথমিক পর্যায়ের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকের মোট সংখ্যা ৭ লাখ ৭ হাজার ২১৬ জন। তাহলে এতো বিপুল সংখ্যক ট্যাব কোত্থেকে আসবে, বিদেশ থেকে নাকি দেশে উৎপাদিত হবে? বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল বা আইসিটি ডিভিশনের নিয়ন্ত্রণাধীন হাইটেক পার্কে এ ধরনের ল্যাপটপ বানানোর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে এবং এতে অনেক অর্থ সাশ্রয় হবে ষ কর্মসূচিটি সফল হলে এ ধরনের ল্যাপটপ আশেপাশের দেশেও রপ্তানি করা যেতে পারে ষ তবে বিদেশ থেকে আমদানি কিংবা দেশেই উৎপাদিত হোক না কেন, এটি নিয়ে যেন কেউ কোনো বাণিজ্য করার সুযোগ না পায়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে ষ প্রয়োজনীয় কন্টেন্ট, এনিমেশন, শুদ্ধ বাংলা ও ইংরেজিতে উচ্চারণ সহ উন্নত সফটওয়্যার তৈরির কাজ এখনই হাতে নেওয়া উচিত ষ সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার এবং আইটি এক্সপার্টদের বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি টেকনিক্যাল কমিটি তৈরি করা যেতে পারে ষ আমাদের মনে রাখতে হবে, ‘ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি কেবল একটি প্রযুক্তি বিতরণমূলক উদ্যোগ নয়, এটি একটি দৃষ্টিভঙ্গিগত পরিবর্তনের প্রতীক। তবে এই কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নের জন্যে কিছু শর্ত অপরিহার্য। প্রথমত, ট্যাব বিতরণের পাশাপাশি শিক্ষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ট্যাবের রক্ষণাবেক্ষণ, ইন্টারনেট সংযোগ এবং মানসম্মত কনটেন্ট সরবরাহের ব্যবস্থা থাকতে হবে। তৃতীয়ত, নিয়মিত মূল্যায়ন ও তদারকির মাধ্যমে দেখতে হবে ট্যাবগুলো সত্যিই শিক্ষাদানে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না। যদি এই বিষয়গুলো নিশ্চিত করা যায়, তবে এই কর্মসূচি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি টেকসই ও ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারবে। শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি পেলে জাতির মেধা, নৈতিকতা ও দক্ষতা উন্নত হবে, যা শেষ পর্যন্ত দেশকে উন্নয়ন ও অগ্রগতির পথে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে।
লেখক : অধ্যাপক ও আইটি গবেষক, আইআইটি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।





