প্রকাশ : ২৩ নভেম্বর ২০২৪, ১২:২৪
এটা কি সরকারি স্বাস্থ্যসেবার নামে প্রহসন?

‘ফরিদগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জনবল সংকট : ভোগান্তিতে সেবাপ্রার্থীরা’ শিরোনামে গতকাল চাঁদপুর কণ্ঠে যে সংবাদটি শীর্ষ সংবাদ (লীড নিউজ) হিসেবে ছাপা হয়েছে, সেটি পড়ে অনেক পাঠককে অসুস্থ হবার উপক্রম হয়েছে। সংবাদটিতে প্রতিবেদক প্রবীর চক্রবর্তী গতানুগতিক সূচনা না দিয়ে ব্যতিক্রম সূচনা দিয়েছেন, যে কারণে সংবাদটি পাঠক হৃদয়ে আত্যন্তিক প্রভাব ফেলেছে। এটি মনোযোগ দিয়ে পড়ে পাঠকমাত্রই বলতে বাধ্য হয়েছেন, তাহলে কি ফরিদগঞ্জ উপজেলায় সরকারি স্বাস্থ্যসেবার নামে চলছে প্রহসন?
প্রবীর চক্রবর্তী লিখেছেন, চিকিৎসকসহ বিপুলসংখ্যক জনবল সংকট নিয়ে চলছে ফরিদগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দৈন্দন্দিন কাজ। অথচ উপজেলার অপেক্ষাকৃত দরিদ্র শ্রেণির লোকজন প্রতিদিনই ভিড় করছে এই হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা নিতে। জানা গেছে, ষাটের দশকে স্থাপিত ফরিদগঞ্জ উপজেলার একমাত্র সরকারি এই হাসপাতালটি ২০২১ সালের ১৭ মে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রশাসনিক অনুমোদনে ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত হয়। হয়েছে অকাঠামোগত উন্নয়নও। কিন্তু বর্তমানে ছয় লক্ষাধিক লোকের চিকিৎসা সেবার জন্যে ৫০ শয্যার এই হাসপাতালটিতে চিকিৎসক, সেবিকা ও কর্মচারীসহ চারটি শ্রেণির জনবল কাঠামো অনুমোদন না হওয়ায় কার্যত চিকিৎসা সেবা আগের মতোই রয়েছে। ফলে একটি পৌরসভাসহ ১৬টি ইউনিয়নের ছয় লক্ষাধিক মানুষের চিকিৎসার অন্যতম ভরসাস্থল ফরিদগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিতে অতিরিক্ত চাপ পড়ছে বর্তমানে কর্মরত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের উপর।
হাসপাতাল সূত্র জানায় , বহির্বিভাগে প্রতিদিন ৭০০ থেকে ৮০০ রোগী চিকিৎসা নিতে আসে। এছাড়া নিয়মিত জরুরি বিভাগে প্রায় ১ শ' জন এবং আন্তঃবিভাগে ৭৫ থেকে ৮৫ জন রোগী চিকিৎসা নেন। এর পরেও রোগীর চাপ থাকায় মেঝেতে চিকিৎসা সেবা নিচ্ছেন রোগীরা।
বর্তমানে ৫০ শয্যার এই হাসপাতালে মোট চিকিৎসক সংখ্যা ৩৮জন থাকার কথা থাকলেও রয়েছে ২৪জন। এদের মধ্যে আবার বেশ কয়েকজন সাব সেন্টারের, যারা ডেপুটেশনে এসে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রয়েছেন। আবার এখানকার চিকিৎসক কয়েকজন প্রেষণে রয়েছেন অন্যত্র। ৫০ শয্যার হাসপাতালের জনবল কাঠামো অনুমোদন হলে বর্তমান প্রেক্ষাপটে চিকিৎসকসহ সকল শ্রেণির কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সংখ্যা হবে ১১৩ জন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের এক কর্মকর্তা বলেন, এখানে একজন চিকিৎসককে দৈনিক একশ' থেকে দেড়শ' রোগী দেখতে হয়। যেখানে একজনকে ৩০ থেকে ৪০ জনের বেশি রোগী দেখা উচিত নয়। এভাবে একটি হাসপাতালের চিকিৎসা সেবা কার্যক্রম চলতে পারে না।
উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. আসাদুজ্জামান জুয়েল বলেন, ৫০ শয্যার জনবল কাঠামো অনুমোদনের জন্যে ইতঃপূর্বে কয়েক দফা চিঠির পর সর্বশেষ গত ২০ জুন আমরা চিঠি দিয়েছি। আশা করছি, কর্তৃপক্ষ বৃহৎ এই উপজেলার জনগোষ্ঠীর কথা ভেবে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এছাড়া আমাদের হাসপাতালটিতে উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে নানা রোগে আক্রান্ত রোগীরা সেবা নিতে আসেন। সে হিসেবে খুব কম সংখ্যক জনবল দিয়ে বিশাল সংখ্যক মানুষের সেবা দিতে হয় আমাদের।
সত্যিই ফরিদগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উপরোল্লিখিত সংবাদচিত্র অত্যন্ত দুঃখজনক। সরকারের সক্ষমতার অভাবে ফরিদগঞ্জ সহ উপজেলা পর্যায় ও জেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালগুলোতে জনবল সংকট সহ অন্যান্য সমস্যা সমাধান করা যাচ্ছে না, এমনটি বলার কি কোনো সুযোগ আছে? নিশ্চয়ই নয়। তিক্ত সত্য হলেও বলতে হয়, ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে ভারতে পালিয়ে যাওয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটানা ১৫ বছরের অধিক দেশ শাসনের সময় এমন কিছু বিলাসী প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছেন (যেমন তার পিতার জন্মশতবার্ষিকী পালন, অসংখ্য ভাস্কর্য নির্মাণ, কর্ণফুলী নদীর নিচ দিয়ে টানেল নির্মাণ সহ আরো কিছু অনাবশ্যক প্রকল্প), যেগুলোতে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় না করে যদি সরকারি স্বাস্থ্য সেবার ঘাটতিসমূহ পূরণে ব্যয় করতেন, তাহলে দেশের একটি সরকারি হাসপাতালও সমস্যাক্রান্ত থাকতো না। এমন বাস্তবতায় বলবো, বর্তমান অন্তর্র্বতীকালীন সরকার ও ভবিষ্যতে নির্বাচনের মাধ্যমে যে রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসবে, তাদেরকে অনাবশ্যক বিলাসী প্রকল্পে ব্যয় না করে অনিবার্য স্বাস্থ্য সহ আরো কিছু খাতে চাহিদানুযায়ী ব্যয় করতে হবে। স্বাস্থ্যখাতকে অবহেলা করে বিলাসী/অনাবশ্যক প্রকল্পে অযথা ব্যয়ের প্রবণতা পরিহার না করলে আমরাও অনেকের মতো বলতে বাধ্য হবো, সরকার জনগণের সাথে স্বাস্থ্যসেবার নামে নিতান্তই প্রহসন করছে, এর চাইতে বেশি কিছু নয়।