প্রকাশ : ০৩ জুন ২০২৬, ১৯:৫২
নক্ষত্রদের দেশে একজন নিরাশ্রয় মা!
আমাদের সময়ের নিঃসঙ্গতা, অবহেলা ও মানবিক বিপর্যয়ের এক নির্মম প্রতিচ্ছবি

গভীর রাতে মিরপুরের ১১ নম্বরের একটি বহুতল ফ্ল্যাটে যখন শহরের কোলাহল ধীরে ধীরে নিস্তব্ধতায় ডুবে যাচ্ছিল, তখন হয়তো আকাশের বুক থেকে নিঃশব্দে একটি তারা খসে পড়েছিল। কেউ তা দেখেনি। দেখার অবসরও যেন কারও ছিল না।
|আরো খবর
বৃদ্ধা নুরজাহান বেগম তখন নিজের ছোট্ট ঘরে শুয়ে জীবনের শেষ সময় পার করছিলেন। বয়সের ভারে ক্লান্ত শরীর, দুর্বল ফুসফুস, নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল তাঁর। হয়তো তিনি ক্ষীণ স্বরে পাশের ঘরে থাকা মেয়েকে ডাকতে চেয়েছিলেন—“মাগো, একটু পানি দিবি?” হয়তো বুকের ভেতর জমে থাকা কষ্টের ভারে শেষবারের মতো কাউকে পাশে চেয়েছিলেন।
কিন্তু সেই ডাক ঘরের দেয়াল পেরোতে পারেনি।
মেয়ে হয়তো স্কুলের খাতা দেখছিলেন। কিংবা শহুরে জীবনের অবিরাম ক্লান্তিতে ডুবে ছিলেন নিজের নিরুপায় ব্যস্ততায়। দুই ছেলে আলাদা থাকেন। প্রতিষ্ঠিত মানুষ। একজন সরকারের যুগ্মসচিব, অন্যজন দেশের শীর্ষ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। সমাজ তাঁদের সফলতার গল্প জানে। কিন্তু সেই রাতে তাঁদের মায়ের নিঃসঙ্গতার গল্প জানত না কেউ।
পরদিন যখন মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ল, ততক্ষণে বৃদ্ধা মায়ের নিথর দেহে পচন ধরেছে।
এই দৃশ্য কেবল একটি পরিবারের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এটি আমাদের সময়ের এক ভয়াবহ সামাজিক দলিল।
একজন মা, যিনি হয়তো নিজের জীবনের সমস্ত স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে সন্তানদের মানুষ করেছিলেন, শেষ বয়সে এসে সামান্য সঙ্গটুকুও পেলেন না।
যে হাত একদিন সন্তানের জ্বরের রাতে কপালে ঠান্ডা পানি ছুঁইয়ে দিয়েছে, সেই হাত মৃত্যুর আগে শূন্যে ঝুলে রইল—ধরার মতো কেউ ছিল না।
এই শহর কি সত্যিই এত ব্যস্ত হয়ে গেছে?
নাকি আমরা ধীরে ধীরে এমন এক সভ্যতায় প্রবেশ করছি, যেখানে মানুষ সফল হচ্ছে, কিন্তু মানবিকতা হারিয়ে ফেলছে?
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, টেলিভিশন, সংবাদপত্র—সবখানেই তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—মানবিকতার জায়গাটি কোথায়?
আইন মানুষকে শাস্তি দিতে পারে, কিন্তু মানুষকে মানুষ বানাতে পারে না।
যে মা নিজের রক্ত জল করে সন্তানদের বড় করলেন, তাঁর শেষ বয়সের নিরাপত্তা যদি রাষ্ট্রীয় আইনের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হয়, তবে সেটি শুধু একটি পারিবারিক ব্যর্থতা নয়; এটি আমাদের সামাজিক ও নৈতিক পরাজয়ের প্রতীক।
আমরা এক অদ্ভুত সময়ে বাস করছি।
আজকের শহুরে জীবনে সেই আশ্রয় ভেঙে গেছে
এই আধুনিকতা আমাদের অনেক কিছু দিয়েছে—প্রযুক্তি দিয়েছে, আরাম দিয়েছে, গতি দিয়েছে। কিন্তু বিনিময়ে কেড়ে নিয়েছে অপেক্ষা করার ক্ষমতা।
এই নিষ্ঠুরতা কি হঠাৎ তৈরি হয়েছে?
না। এটি দীর্ঘদিনের সামাজিক পরিবর্তনের ফল।
বৃদ্ধ বয়সের সবচেয়ে বড় কষ্ট হলো অপ্রয়োজনীয় হয়ে যাওয়ার অনুভূতি।
একজন বৃদ্ধ মা যখন বুঝতে পারেন, তাঁর উপস্থিতি কারও জীবনে খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়—সেই মুহূর্তেই তাঁর ভেতরে এক ধরনের নীরব মৃত্যু শুরু হয়।
আমরা সন্তানদের সেরা স্কুলে পাঠাচ্ছি, বিদেশি ডিগ্রি এনে দিচ্ছি, প্রতিযোগিতায় জিততে শেখাচ্ছি; কিন্তু মানুষ হয়ে ওঠার শিক্ষা কতটা দিচ্ছি?
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একজন সমাজকর্মী লিখেছেন, “যে সমাজে উচ্চশিক্ষিত সন্তানদের মায়ের মরদেহ ঘরে পড়ে থাকে...”
আমরা এখন এমন এক সমাজে বাস করছি, যেখানে মানুষ নিজের সাফল্যের গল্প বলতে ভালোবাসে, কিন্তু নিজের বৃদ্ধ মা-বাবার নিঃসঙ্গতার গল্প শুনতে চায় না।
একদিন যে মা সন্তানের সামান্য জ্বরেও সারারাত জেগে থাকতেন, আজ সেই মায়ের মৃত্যুর খবর অনেক সময় ব্যস্ত সময়সূচির ভিড়ে চাপা পড়ে যায়।
আজ আপনি যদি আপনার বৃদ্ধ মায়ের নিঃসঙ্গতা দেখতে না পান, কাল হয়তো আপনার সন্তানও আপনার নীরব কান্না শুনতে পাবে না।
নুরজাহান বেগম হয়তো আজ সমস্ত অবহেলা, নিঃসঙ্গতা ও অপমানের ঊর্ধ্বে কোনো শান্ত নক্ষত্রলোকে পাড়ি জমিয়েছেন।
কিন্তু তিনি আমাদের সমাজের বুকে একটি গভীর প্রশ্ন রেখে গেছেন—
আমরা কি সত্যিই আধুনিক হচ্ছি, নাকি শুধু আরও অনুভূতিহীন হয়ে উঠছি?
আর রাতের আকাশে যখন কোনো তারা খসে পড়ে, তখন হয়তো পৃথিবীর কোথাও আরেকজন নিরাশ্রয় মা নিঃশব্দে হারিয়ে যান—নিজেরই সন্তানের ব্যস্ত পৃথিবীর ভেতরে।
ডিসিকে /এমজেডএইচ
প্রতিবেদক: অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন
বিশেষ প্রতিনিধি,সিনিয়র সাব-এডিটর, ও কলামিস্ট, দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠ।
তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, চাঁদপুর জেলা বিএনপি।








