প্রকাশ : ১১ মার্চ ২০২৪, ০০:০০
মিজানুর রহমান রানার মুক্তিযুদ্ধের ধারাবাহিক উপন্যাস
এই জনমে

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
পূর্ব কথা :
‘আমরা যুদ্ধে যোগ দিবো। মরতে যদি হয় তাহলে যুদ্ধ করেই মরবো।’
‘এই কথাটা তো আগে ভেবে দেখেনি! আসলে মরতে যদিই হয় তাহলে তো দেশের জন্যে যুদ্ধ করেই মরা উচিত। পালিয়ে আর ক’দিন বাঁচবো?’ রূপালি যেনো অন্ধকারের মাঝে একটা আশার আলো পেয়ে গেলো।
পাঁচ.
নদীটার অপর পাড়ে বহুকষ্টে সাঁতরে গিয়ে নিজেদের টেনে টেনে তুললো ওরা। ইমতিয়াজের হাত থেকে এখনও রক্ত ঝরছে। ওরা প্রথমে বুঝতে পারেনি বিষয়টা কী? যখন বুঝতে পেরেছে এটা পাক আর্মিদের কাজ; তখন কালবিলম্ব না করেই নদীতে ঝাঁপ দিয়েছে সবাই।
নদীর ঢেউ তাদের থামিয়ে রাখতে পারেনি অদম্য মনোবলের কাছে। এক এক করে সবাই অপর পাড়ে এসে বিধ্বস্ত অবস্থায় বসে আছে। তুষার ও ইরফান পাহাড়ী লতার রস রাইফেলের গুলির জায়গায় মেখে দিয়ে ইমতিয়াজের হাত বেঁধে দিয়েছে। গুলিটা এক পাশ দিয়ে ঢুকে অপর পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেছে।
‘এখন আমরা কী করবো?’ অধরা প্রশ্ন করলো ইরফানকে।
‘কারা ওখানে?’ পাশের ক্ষেতে কাজরত এক চাষী অধরার কণ্ঠস্বর শুনে প্রশ্ন করলো।
‘আমরা মুক্তিযোদ্ধা।’ কিছুই না ভেবে উত্তর দিলো ইমতিয়াজ।
সবাই অবাক হলো। অবাক হয়ে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে ইমতিয়াজের দিকে তাকিয়ে রইলো তারা। এ কী বলছে ইমতিয়াজ!
এবার ইমতিয়াজ উঠে বসলো। বললো, ‘হ্যাঁ। আমরা মুক্তিযোদ্ধা। পাক-আর্মিরা সত্যিই আমাদেরকে বুঝিয়ে দিলো এবার আমাদের কী করতে হবে। তারা একটি গুলি ছুঁড়ে দিয়ে আমাদের বিবেকবোধকে জাগ্রত করে দিয়েছে। আমরা পড়েছিলাম বিবেকের তলানীতে, আর তারা আমাদের সেই তলানীর বিবেককে জাগ্রত করে দিয়েছে আচমকা আঘাত করে। আসলেই আমাদের মাতৃভূমি এই হায়েনাদের আঁচড়ে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে, আর আমরা সেটা উপলব্ধি করতেই পারছি না। এটা আমাদের ব্যর্থতা, চরম ব্যর্থতা।’
পিস্তলের গুলির মতো বুকের জমিনে আঘাত করা কথাগুলো ভাবছে ইরফান।
‘হ্যাঁ। ইমতিয়াজের কথাই ঠিক। আমাদেরও কিছু করার আছে। আমরা তো এ মাতৃকার সন্তান। এই মাতৃভূমির আলো-বাতাসে আমাদের বেড়ে ওঠা। এই মাতৃকার সেই ঋণ শোধ করতেই হবে।’ সবার দিকে তাকিয়ে এবার বললো সে।
‘সত্যিই তাই?’ বললো তুষার আহমেদ। ‘আমরা কীভাবে যুদ্ধ করবো? আমাদেরতো প্রশিক্ষণ, অস্ত্র নেই। তাহলে?’
‘ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়।’ জবাব দিলো অধরা। ‘দেশের জন্য কিছু করার দৃঢ় সংকল্প করলে, আল্লাহ তা অবশ্যই পূরণ করবেন। আমিও আছি তোমাদের সাথে, তোমাদের সেবা করবো বলে।’
তিরণা কী বলবে ভেবে পাচ্ছে না। খুব ভয় লাগছে তার। তবুও সে বললো, ‘তোমরা চাইলে আমিও তোমাদের সাথে থাকতে পারি।’
ইমতিয়াজ এবার নিজের হাতের যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠলো। তারপর সে বললো, এই যন্ত্রণাই আমাকে আসল পথে ঠেলে দেবে। হে যন্ত্রণা, তুমি আমাকে বলে দাও আমি কোন্ পথে যাবো?’
‘আমরা সঠিক পথেই এগুবো।’ দৃঢ় কণ্ঠে বললো ইরফান। ‘হ্যাঁ, আমরা সঠিক পথে এগুবো। আমাদের আর পেছনে ফেরার সুযোগ নেই। এই অসম যুদ্ধে আমাদের সামিল হতেই হবে।’
চাষী এবার কাজ ফেলে কাছে এলো। সবার কথা শুনছিল সে, এক এক করে সবাইকে জরিপ করে তারপর ইরফানের দিকে তাকিয়ে বললো, ‘আমার নাম আবদুল গণি। ওই দূরের বাড়িটা আমার। পাক-বাহিনী আমাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে। আমার ২০ বছর বয়সী মেয়ে ঈষাণবালাকে ধরে নিয়ে গেছে। সে চলচ্চিত্রে অভিনয় করতো। ঢাকার অবস্থা খারাপ দেখে বাড়ি এসেছিল। কিন্তু পাকবাহিনীর নজরে পড়ায় ওরা জোর করে ধরে নিয়ে গেছে। যাবার সময় আমার স্ত্রীকে হত্যা করেছে। আমি সেই সময় ক্ষেতে ছিলাম বলে বেঁচে গেছি। এখন আমার আর দুনিয়াতে কেউ নাই। যদি তোমরা চাও, আমি তোমাদের সাথে যেতে পারি। আমাকে কি সেই সুযোগ দিবে?’
গণি প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ইরফানের দিকে। কী উত্তর দেবে এই নির্দয়তার, সে ভেবে পাচ্ছে না।
মুখ খুললো অধরা। তারপর বললো, ‘চাচা, যুদ্ধটা আমাদের একার নয়। এখন এই যুদ্ধটা প্রতিটা বাঙালির। যার বাড়িঘর, স্ত্রী-কন্যা ওদের হাতে আক্রান্ত হয়েছে আর যার হয়নি, সবাইকেই এখন প্রতিরোধ করতে হবে, প্রতিশোধ নিতে হবে। এই বাংলাকে ওদের অধীনতা থেকে মুক্তি দিতে হবে। আমাদেরকে স্বাধীন হতে হবে। আমরা সবাই এখন এই বাংলার সন্তান। বাংলাকে শত্রুমুক্ত করতে হবে। আসুন, আমরা বুকের রক্ত দিয়ে সালামণ্ডরফিক-জব্বার ও বরকতের বাংলাকে শত্রুমুক্ত করি।’
তুষার ও ইমতিয়াজ অধরার কথা শুনে মোহিত হয়ে গেলো। তারপর গণি মিয়ার কাঁধে হাত রেখে বললো, ‘আপনার মেয়ে ঈষাণবালা আমাদের বোন। আজ আমাদের বোনের সম্ভ্রমের জন্যে আমরা যুদ্ধ শুরু করবো। জীবন থাকতে আমরা আমাদের বোনের সম্ভ্রমহানি হতে দিতে পারি না।’
এখানকার মুক্তিকামী সবার হাত এক হলো। ওরা প্রতিজ্ঞা করলো, হয় স্বাধীনতা, না হয় মৃত্যু--দুটোর যে কোনো একটা অর্জন করতে হবে। এর পূর্বে থামবে না ওরা।
যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছ ঈষাণবালা। তাকে ধরে আনার পর আজ ১৫ দিন গত হয়েছে। এর মধ্যে পৃথিবীর যত নারকীয় যন্ত্রণা তার উপর দিয়ে বয়ে গেছে। এখানের সবাই নির্দয়, নির্মম। তার মতো আরো বহু নারীকে ধরে আনা হয়েছে। তাদের উপরও নির্দয়তার স্টিম রোলার চালিয়েছে ওরা। এই নির্দয়-নির্মমতার কথা ভাবলেই গা শিউরে উঠে।
যেদিন তাকে ধরে আনা হয়েছিলো সেদিন পাক আর্মি অফিসারসহ কমপক্ষে সাত আটজন তাকে ভোগ করেছে। তারপর তারা তাকে তুলে দিয়েছিলো এই দেশের দালালদের হাতে। দালালদের সেকি পৈশাচিক উত্তেজনা।
ঈশাণবালার রূপ ছিলো দুধে-আলতায় মেশানো। চলচ্চিত্রে নায়ক আমিরের সাথে বহু ছায়াছবিতে কাজ করেছে সে। তার অভিনয়গুলোতে মুগ্ধ হতো সবাই। কিন্তু আজ এই পঙ্কিলতায় ডুবে আছে সে। জানে না তার জীবনে আর আর কোনোদিন বসন্ত আসবে কিনা। সে ভাবে, হয়তো এই বর্বরদের নির্যাতন সয়ে সয়েই তাকে জীবন সাঙ্গ করতে হবে। তাদের ভোগ-বিলাসের পাত্রী হয়ে হয়ে কোনো একদিন জীবনের পাট চুকাতে হবে।
তার ভাবনায় ছেদ পড়ে। নির্যাতন সেলে প্রবেশ করে আওরঙ্গজেব। অন্যান্য নারীদের দিকে চোখ বুলাতে বুলাতে ধীরে ধীরে তার নজর পড়ে ঈশাণবালার দিকে।
আওরঙ্গজেবের মুখে শয়তানের হাসি। ঈশাণবালার কানের কাছাকাছি এসে ফিসফিসিয়ে বলে, আজ তোমাকে মুক্তি দেবো? হ্যাঁ, তোমাকে মুক্তি দিতেই এসেছি।
কিছু বুঝার আগেই ঈশাণবালার হাত দুটি ধরে হিড় হিড় করে তাকে টানতে টানতে অন্য কামরায় নিয়ে যায় আওরঙ্গজেব। তারপর সেই কামরায় বিছানার ওপর ঈশাণবালাকে ফেলে দেয় আওরঙ্গজেব।
ঈশাণবালা নির্বিকার। সে জানে এই শয়তানটা দোজখের কীট। কীটের মতো দংশন করবে তাকে। তারপর নানা যন্ত্রণা দিয়ে ফেলে রেখে চলে যাবে।
কিন্তু না। আজ তা ঘটলো না। ঈশাণবালার কানে কানে যা বললো, তাতে বিস্মিত হলো সে।
‘তোমাকে ছেড়ে দিলাম, যাও তুমি মুক্ত’।
বিস্মিত স্বরে প্রশ্ন করলো ঈশাণবালা, কেন? কেন আমাকে ছেড়ে দিবেন?
‘জানি না। তবে আমার মন বলছে, জীবনে একটা হলোও ভালো কাজ করি।’
‘তাহলে এতোদিন হাজার হাজার মানুষের সাথে এতো খারাপ কাজ করলেন কেন?’
‘গোবরে পদ্মফুল ফোটে না? আমিও তাই। তবে বেঁচে ফিরতে হলে তোমার জন্যে একটা পরীক্ষা আছে।’
‘কী পরীক্ষা?’
‘জীবন অথবা মৃত্যুর’ রহস্যময় উত্তর দিলো আওরঙ্গজেব।
একটা গহীন অরণ্যে ঈশাণবালাকে নামিয়ে দিলো আওরঙ্গজেব। তারপর বললো, হাঁটতে শুরু করো।
ঈশাণবালা হাঁটছে। পেছন থেকে পিস্তল বের করলো আওরঙ্গজেব। তারপর বললো, ‘এই পিস্তলে মাত্র একটি গুলি আছে। আমি গুলি করবো। যদি সেই গুলিটা তোমার বুকটা ভেদ করে চলে যায়, তাহলে তুমি মরবে। আর যদি সেটা বের না হয়, তাহলে তুমি বাঁচবে।’
ঈশাণবালার এখন আর ভয় করে না। জীবন অথবা মৃত্যু মানুষ দিতে পারে না। এটা আল্লাহর হাতে। তাই তার যদি নসিবে মৃত্যু লেখা আছে তাহলে তাকে মরতেই হবে। আর যদি মৃত্যু লেখা না থাকলে তাহলে তাকে কেউ মারতে পারবে না। এই দৃঢ় বিশ্বাস থেকে সে পেছনে না তাকিয়ে আল্লাহর উপর ভরসা করে হাঁটতে শুরু করলো।
হঠাৎ করেই গুলি করলো আওরঙ্গজেব। গুলির আওয়াজে মাটিতে পড়ে গেলো ঈশাণবালা। মনে মনে মৃত্যুকে স্মরণ করতে লাগলো। কিন্তু একি! তার বুকে তো গুলিটা লাগেনি। তাহলে সে বেঁচে গিয়েছে?
কাছে এসে হাসলো আওরঙ্গজেব। বললো, ভাগ্য ভালো। গুলি বের হয়নি। যাও তুমি, মুক্ত এখন থেকে। আস্তে আস্তে চলে গেলো আওরঙ্গজেব।
আওরঙ্গজেব চলে যাবার পর মাটি থেকে কম্পিত শরীরে উঠে দাঁড়ালো ঈশাণবালা। তারপর টালমাটালভাবে হাঁটতে লাগলো অরণ্যের পথ ধরে।
‘ওই যে, সামনে একটি মেয়ে টালমাটাল অবস্থায় চলছে।’ কথা বললো অধরা।
‘হ্যাঁ, আমিও দেখেছি। মেয়েটা কে?’ বললো ইরফান।
‘সামনে এগোও দ্রুত। মেয়েটাকে ধরতে হবে। না হলে পাক-বাহিনীর খপ্পরে পড়বে।’ বললো তুষার।
‘গো গো। সামনে এগোও’। ইমতিয়াজ নির্দেশ দিলো।
ওরা দ্রুতই মেয়েটার সামনে চলে এলো, তারপর ইমতিয়াজ তাকে জিজ্ঞাসা করলো, এই কে তুমি? কোথায় যাচ্ছো?
আগন্তুকদের দেখে হতচকিতভাবে আড়ষ্ট কণ্ঠে মেয়েটা বললো, ‘আমার নাম ঈষাণবালা’।
‘হ্যাঁ, তোমাকেই তো খুঁজছি আমরা।’ একযোগে বললো সবাই। (চলবে)