বৃহস্পতিবার, ০৩ এপ্রিল, ২০২৫  |   ২৭ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   হাইমচরে মাটি বোঝাই বাল্কহেডসহ আটক ৯
  •   কচুয়ায় কৃষিজমির মাটি বিক্রি করার দায়ে ড্রেজার, ভেকু ও ট্রাক্টর বিকল
  •   কচুয়ায় খেলতে গিয়ে আগুনে ঝলসে গেছে শিশু সামিয়া
  •   কচুয়ায় ধর্ষণের অভিযোগে যুবক শ্রীঘরে
  •   ১ হাজার ২৯৫ কেজি নিষিদ্ধ পলিথিন জব্দ করেছে কোস্ট গার্ড

প্রকাশ : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০০:০০

মিজানুর রহমান রানার মুক্তিযুদ্ধের ধারাবাহিক উপন্যাস

এই জনমে

অনলাইন ডেস্ক

পূর্বকথা :

ঠিক এই সময়ে খবর এলো, পাকবাহিনী ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে কানাইঘাটে তাদের ক্যাম্পের দিকে। সচকিত হয়ে উঠলেন জহিরুল হক খান। নির্দেশ দিলেন, ‘তোমরা প্রস্তুত হও।’

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

চার.

গত দুমাস যাবত এক অন্ধকারের কোটরে বন্দী হিসেবে দিন কাটছে এক সময়ের পর্দা কাঁপানো নায়ক আমিরের। তার একটাই কারণ তিনি তার গাড়ি বিক্রির টাকা মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করেছেন। স্ত্রী সুজানার জন্যে শখ করে ২৫ হাজার টাকায় কেনা গাড়িটি দিয়ে দিয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের।

হাত দুটো বাঁধা। দেয়ালে হেলান দিয়ে ভাবছেন তিনি সুজানার কথা। সুজানা অন্য ধর্মের মানুষ ছিলো। সেও তার ছায়াছবির নায়িকা ছিলো। কিন্তু শিল্পকর্মে একে অপরের পাশাপাশি থাকতে থাকতে একটা মায়ায় পড়ে গিয়েছিলো দুজন। সে কী মায়া! সুজনা কখনোই তাকে প্রকাশ করে বলেনি। আমির বুঝতে পারছিলো। কিন্তু বাধা ছিলো দুজন দুই ধর্মের অনুসারী। একদিন আমিরই কথা বললো। সুজানা অন্ধকারে গোলাপি হাসি দিয়ে বলেছিলো, ভালোবাসার দেয়াল কোনো কিছু আটকাতে পারে না, যদি হয় তা প্রবল। তুমি যদি কাউকে ভালোবাসো তাহলে অনেক দেয়াল টপকাতে হবে। তুমি যদি কোনোকিছু পেতে চাও কষ্ট করতে হবে। বিসর্জন দিতে হবে। তবে তোমার কাছে আমি এসে বুঝতে পেরেছি কিছু কিছু বিসর্জন, কিছু কিছু কষ্ট আমাকেও পেতে হবে। সুজানা তার ধর্ম বিসর্জন দিয়ে আমিরকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলো।

সুজানার কথা ভাবতে ভাবতে আমির আরো ভাবে, ওরা কি তাকে মেরে ফেলবে? নাকি সুজানার জন্যে, দেশের জন্যে তিনি উঠে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবেন। ভাবেন, যদি সুযোগ পাই। তাহলে সময় নষ্ট করবো না। এদের অত্যাচার-অবিচারের মোক্ষম জবাব দিতে হবে। এরা পরদেশী হয়ে, এদেশের মানুষের বুকে যেভাবে ছোবল মারছে, বেয়নেটের খোঁচায় অত্যাচারে জর্জরিত করছে তা মুখ বুঁজে সহ্য করা যাবে না। হয় জিতবো, না হয় মরবো। তবে মরতে হলে মরার মতোই মরতে হবে। একটা তেলাপোকা হয়ে অনেক দিন বেঁচে থাকার চাইতে সিংহের মতো অল্প কিছুদিন বেঁচে থাকাও গর্বের।

এই দেশ আমাদের। এই দেশের মাটির গন্ধে আমরা মায়ের ঘ্রাণ খুঁজে পাই। আমার দেশ, আমার মা আর আমার মাটি। আমরা রক্ষা করবোই। পরবর্তী প্রজন্মের জন্যে আমাদের জীবনের শেষ রক্তবিন্দুটিও দান করে যাবো।

মনে পড়ে গেলো তার। তিনি সুজানাকে বলেছিলেন, ‘সবার আগে প্রয়োজন দেশ, যদি বেঁচে থাকি তাহলে গাড়ি আবার কেনা যাবে। আর যদি দেশটাকেই রক্ষা করতে না পারি তাহলে আমি গাড়িতে চলে কোথায় যাবো? এই দেশ আমার জন্মভূমি। আমার দেশের এক কণা মাটিতেও ওই বর্বরদের স্থান হবে না।’

আমিরের পরিবার ছিলো খুবই ধনী। সে ছিলো ঘরের সন্তান। শখের বশে অভিনয়ে নামা। যখন সে শুটিংয়ে যেতো, তখন ব্যক্তিগত গাড়িতে করেই যেতো। সেটা ছিলো ষাটের দশকের শুরুর কথা। শুটিং স্পটে কম মানুষই তখন ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে যাতায়াত করতো।

আমিরের বিয়ের পর তার মা একবার তাকে বলেছিলেন, বউমাকে কী উপহার দিয়েছ? আমির শুধু তখন হেসেছিলো। তারপর স্ত্রীর জন্যে একটি গাড়ি উপহার এনেছিলো। তখন গাড়িটির দাম ছিল ২৫ হাজার টাকা। কিন্তু সেই গাড়িটিও আমির দান করে দিয়েছিলো। আর সেটাই তার জীবনের গতিপথ পরিবর্তন করে দিয়েছিলো। বিষয়টি জেনে গিয়েছিল পাক আর্মির লোকেরা। একদিন রাতেই তার বাড়িতে হানা দিয়ে তাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে আসে এই অন্ধকারের ছায়াতলে। সেই থেকে আজ দু’মাস, এভাবেই কেটে গেছে তার।

এখানে দিন কিবা রাত কিছুই বুঝা যায় না। মাঝে মাঝে এসে একজন সিপাহী খাবার দিয়ে যায়। মনে চাইলে আমির তা গ্রহণ করে, আর মনে না চাইলে তেমনিই পড়ে থাকে। খাবার দাবার নিয়ে আমিরের তেমন একটা চিন্তা নেই। সে জানে ধরা যখন একবার পড়েছে, তখন পাক আর্মিরা তাকে অবশ্যই মারবে। তবে মারার আগে তার কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য বের করে নেবে।

গত দুমাস তার উপর সে কারণে প্রচুর নির্যাতন চালিয়েছে ওরা। বর্বর নির্যাতন। হাত পায়ের গোড়ালি থেকে মাথা পর্যন্ত পিটিয়েছে। কিন্তু আমির মুখ থেকে একটা শব্দও বের করেনি। ছায়াছবিতে আমির এসব দেখেছে. অভিনয় করেছে; এখন তার বাস্তব জীবনেও তাই হচ্ছে।

আমির ভাবছে যেভাবেই হোক পালাতে হবে। এরপর এই নির্যাতনের জবাব দেওয়া যাবে। এই কুকুরদেরকে শায়েস্তা করতেই হবে। কিছুটা নিজের জন্যে আর বাকিটা দেশের জন্যে। জীবনটা তো দিতেই হবে, তাহলে বন্দী অবস্থায় কেন? বীরের মতো যুদ্ধ করতে করতে জীবন দেওয়াটাই একজন সত্যিকার মানুষের কাজ। তবে তাই হোক।

ধীরে ধীরে অনেক কষ্ট ও যন্ত্রণা সয়ে হাতের বাঁধন আলগা করলো আমির। ভাগ্য ভালো পায়ের বাঁধন খুলে দিয়েছিল তারা।

একজন সিপাহী অন্ধকার ঘরে প্রবেশ করে টর্চের আলো ফেললো। আমিরের খুব কাছাকাছি এসে খাবার রাখলো। তারপর টর্চের আলো বন্ধ করে যাবার উপক্রম হতেই টুপ করে উঠে দাঁড়ালো আমির। কিছুটা আওয়াজ পেয়ে অন্ধকারে পেছন ফেরার পূর্বেই আমির তাকে কৌশলে ধরাশায়ী করে ফেললো।

সিপাহীটার মনে হলো যেনো কোনো পাহাড় তার বুকের ওপর চেপে বসেছে। আর ঠিক এই সময়ই আমিরের দুটি শক্ত হাত তার গলায় সাপের মতো ধীরে ধীরে পেঁচিয়ে ধরলো। ক্রমে ক্রমে মৃত্যুদূতের সাথে সাক্ষাৎ হলো তার।

সিপাহীটা নিস্তেজ হয়ে যেতেই উঠে দাঁড়ালো আমির। তারপর সিপাহীটার হাতের টর্চটা তুলে নিল। খোলা দরজা দিয়ে বেরিয়ে জঙ্গলে প্রবেশ করলো। এই জঙ্গল খুব অন্ধকার। আর অন্ধকারের পথে স্রষ্টাকে ডাকে সে। সে মনে মনে ভাবে, একমাত্র স্রষ্টাই তাকে এই বিপদের হাত থেকে বাঁচাতে পারে।

জীবনের অনেক অন্তিম মুহূর্তে সে স্রষ্টাকে ডেকে এক সময় পেয়েছে। না। এক সময় বলা ভুল হবে। সব সময়ই তাকে পেয়েছে।

মনে পড়ে, একবার শুটিংয়ে ব্যস্ত ছিলো সে। চাঁটগায়ের পাহাড়ে। সেই সময় তার নায়িকা ছিলো ঈষাণ বালা। সে সময়ের নামকরা নায়িকা। তার সিনেমা ভারতীয় উপমহাদেশে হিট হতো। আমির আর ঈষাণবালা ছিলো মোক্ষম জুটি। এই দুজনের সিনেমা মানেই দর্শক বিনোদন।

পাহাড়ের ওপরে শুটিং ছিলো। টলিতে চলতে চলতে শুটিং। নায়িকা ঈষাণবালার কোমর ধরে নাচ চলছিল। হঠাৎ করেই টলি থেকে পড়ে যায় আমির। চারদিকে চিৎকার-চেঁচামেচি, এরপর মাথায় প্রচণ্ড আঘাতে জ্ঞান হারায়। এক অন্ধকার রাজ্যে কমপক্ষে পনোরো দিন পড়ে থাকে আমির। জ্ঞান ফেরার পর শুনেছিল পনেরো দিন হাসপাতালে জ্ঞানহীন ছিলো সে। জ্ঞান ফেরার পর অনুভব করলো তার ডান পা’টায় প্রচণ্ড ব্যথা। তার স্ত্রী বলেছিল টলি থেকে পড়ে গিয়ে পা ভেঙ্গেছে তার। সেই সময় জ্ঞান ফেরার পর এই অন্ধকার থেকে মুক্তির জন্য স্রষ্টাকে ডাকে সে। গভীর ভাবে ডাকে। স্রষ্টা তার ডাক শুনেছিল। কী আশ্চর্য! ক’দিন পরই হাঁটতে পারছিল সে। আবারও শুটিংয়ে ফিরতে পারছিল।

আচ্ছা, স্রষ্টাকে পাওয়া যাবে কীভাবে? কোন্ পথে গেলে? এসব বিষয় এখনও পরিপূর্ণ জানে না সে। তবে জানে, নির্দিষ্ট কিছু নিয়মকানুন আছে, সেগুলো মানলেই স্রষ্টার কাছাকাছি যাওয়া যাবে।

এসব ভাবনা মাথায় নিয়ে স্রষ্টাকে ডাকতে ডাকতে বেরিয়ে পড়লো সে।

সারারাত জঙ্গলের পথ ধরে হেঁটেছে আমির। হাঁটতে হাঁটতে ধীরে ধীরে অন্ধকার বিলীন হয়ে ভোরের হালকা আলো দেখলো সে। আরো কিছুদিন এগুতেই হঠাৎ নজরে পড়লো জঙ্গলের মাঝে একটা সাদা চাদর বিছিয়ে কেউ শুয়ে আছে। টর্চ ফেললো সেই জায়গাটায়। কেউ একজন উঠে বসার চেষ্টা করছে।

হায়! এ যে এক নারী। বয়স হবে প্রায় ৩০/৩২। টর্চের আলোয় ঘুম থেকে উঠে আমিরের দিকে ভয়ার্ত চোখে তাকালো সে।

‘আমাকে চিনতে পেরেছেন?’ আমির প্রশ্ন করলো।

‘আপনি চিত্রনায়ক আমির?’ নারী কিছুটা দ্বিধা-সংশয়ে উত্তর দিলো।

‘জি¦। আপনি কে? এখানে কেন?’ জানতে চাইলো আমির।

‘আমার ঘরবাড়ি ওরা পুড়িয়ে দিয়েছে। একজন স্কুল মাস্টার ছিলাম। পাক আর্মিদের ভয়ে এখন জঙ্গলে।’

‘তাহলে উঠুন, চলুন আমার সাথে। আমিও আপনার মতো নির্যাতিতদের একজন। আমরা আলোর মুখ দেখবোই। আমরা ওদের এই দেশছাড়া করবোই।’

আমিরের কথায় অনন্যা আশ্বস্ত হলো। আমিরের হাত ধরে এগিয়ে চললো জঙ্গলের শেষ প্রান্তে। জঙ্গল থেকে বের হতেই সামনে একটা রাস্তা দেখা গেল। ওই রাস্তায় অনেক দূরে অস্পষ্ট দেখা গেলো চুল উস্কুখুস্ক এক নারীকে।

নারীটি দূর থেকে এই দুজনকে দেখেই আবার জঙ্গলের দিকে পালাতে চাইলো। আমির খুব দ্রুত ছুটে গিয়ে তাকে ধরে ফেললো।

ভয়ার্ত চোখে নারীটি প্রশ্ন করলো, ‘কে আপনি?’

আমির তাকে বললো, ‘ভালো করে চেয়ে দেখুন আমাকে; তাহলেই চিনতে পারবেন।’

এবার নারী তার চেহারার দিকে তাকালো। তারপর তার চোখে খুশির ঝলক দেখা দিলো। সে উচ্ছ্বসিত হয়ে বললো, ‘আরে, চিত্রনায়ক আমির ভাই, আপনি?’

‘হ্যাঁ, আমি। আপনি কোথায় পালাচ্ছেন?’

‘আমার ভাগ্য।’ নারীটি বলতে লাগলো। ‘আমার ভাগ্য আমাকে পালাতে সহায়তা করছে। আমার নাম রূপালি। আমি পাক আর্মিদের নরক-ক্যাম্প থেকে পালিয়ে এসেছি।’

এবার অনন্যা ও আমির দুজনেই অতিকষ্টে হাসলো। আমির বললো, ‘ওহ, তাহলে আমরা তিনজনই একই পথের পথিক।’

‘মানে।’ প্রশ্ন করলো রূপালি।

‘আমরা ভাগোয়ানের দল। তবে, আমরা জিতবোই।’

‘কীভাবে?’ প্রশ্ন করলো রূপালি।

‘আমরা যুদ্ধে যোগ দিবো। মরতে যদি হয় তাহলে যুদ্ধ করেই মরবো।’

‘এই কথাটা তো আগে ভেবে দেখিনি! আসলে মরতে যদিই হয় তাহলে তো দেশের জন্যে যুদ্ধ করেই মরা উচিত। পালিয়ে আর ক’দিন বাঁচবো?’ রূপালি যেনো অন্ধকারের মাঝে একটা আশার আলো পেয়ে গেলো।

(চলবে)

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়