প্রকাশ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৪৫
শৈশবের ফেলে আসা দিনগুলো

দুপুরের সোনাঝরা রোদে আম কুড়ানোর সেই দিনগুলো আজও চোখের পাতায় ভাসে। পাকা আমের মিষ্টি গন্ধ আর মায়ের হাতের বকাঝকা মিলে শৈশবটা ছিল এক অদ্ভুত মায়াবী ক্যানভাস। আমাদের বাড়ির পেছনেই ছিল বিশাল এক ঝোপঝাড়ওয়ালা বাগান, যার প্রতিটি কোণায় লুকিয়ে থাকত রূপকথার একেকটি রোমাঞ্চকর রহস্য। দুপুরবেলা যখন চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে আসত, তখন ঘরের কোণ থেকে লুকিয়ে পালিয়ে যাওয়া ছিল আমাদের নিত্যদিনের নিয়ম।
ঝুম বৃষ্টির দিনে কাগজের নৌকা ভাসানোর আনন্দ ছিল সবকিছুর ঊর্ধ্বে। ছাতা ছাড়াই ভিজে ভিজে পুকুরঘাটে গিয়ে কদম ফুল কুড়ানো এবং ব্যাঙের ডাক শোনার সেই উল্লাস আজও মনে দোলা দেয়। কাঁচা আম লবণের সঙ্গে মেখে খাওয়ার সেই টক-মিষ্টি স্বাদ জিভে জল এনে দেয়। দুপুরের ভাতের থালা ফেলে সারাদিন মাঠে ঘুড়ি ওড়ানো, গোল্লাছুট খেলা আর ধুলোবালি মেখে বাড়ি ফেরার অপরাধে সন্ধ্যার সময় মায়ের বকুনি খাওয়া—সব মিলিয়ে এক স্বর্গীয় সুখের অনুভূতি।
বিকেলের নরম আলোয় ধুলোবালি মেখে বাড়ি ফেরার সেই সোনালি দিনগুলো যেন রূপকথার পাতা থেকে খসে পড়া কোনো মায়াবী অধ্যায়। সময়ের স্রোতে জীবন আজ ইট-কাঠের কংক্রিটের খাঁচায় বন্দি হলেও, মনের গভীরে আজও কড়া নাড়ে ফেলে আসা সেই দিনগুলোর মিষ্টি সুবাস। গাঁয়ের মেঠোপথ, দুপুরের চাতাল কিংবা বিকেলের মাঠে গোল্লাছুট খেলার সেই নিখাদ আনন্দ আজও হৃদয়ের কোনো এক কোণে অমলিন হয়ে আছে। তখন জীবনের হিসাব-নিকাশ ছিল বড় সহজ; একমুঠো মুড়ি আর গুড়, কিংবা গাছের পাকা আমে লুকিয়ে কামড় বসাতেই পরম তৃপ্তি খুঁজে পাওয়া যেত।
জীবন নদীর স্রোতে ভেসে আমরা আজ কত দূরে চলে এসেছি। শৈশবের সেই খেলার সাথি বন্ধুরা আজ ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে, অনেকের সঙ্গেই আর যোগাযোগটুকুও নেই। কিন্তু যখনই কোনো শ্রাবণের মেঘলা দিনে পুরনো কোনো গান কানে বাজে, কিংবা গরম চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকি, মনটা নিমেষেই অতীতে ফিরে যায়। অতীত কেবল সময় নয়, অতীত হলো এক নিখাদ আশ্রয়, যা মানুষকে কঠিন বাস্তবতার মাঝেও একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে শেখায়। ঘড়ির কাঁটা পেছনের দিকে ঘোরানো অসম্ভব, কিন্তু হৃদয়ের মণিকোঠায় যত্ন করে জমিয়ে রাখা সেই সোনালি স্মৃতিগুলোই এই ক্লান্তিকর জীবনের একমাত্র জাদুকরী মরূদ্যান।
স্মৃতির ক্যানভাসে সবচেয়ে বেশি উজ্জ্বল হয়ে ভাসে বর্ষাকালের সেই চঞ্চল দুপুরগুলো। টিনের চালে বৃষ্টির ঝমঝম শব্দ আর বারান্দার কোণে জমে থাকা ঘোলা জলে রঙিন কাগজের নৌকা ভাসানোর প্রতিযোগিতা—আজকের এই যান্ত্রিক শহরে যা রূপকথার মতো মনে হয়। মায়ের শাসন এড়িয়ে দুপুরবেলা দল বেঁধে চুরি করে আম কুড়ানোর উত্তেজনা আর সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে হোমওয়ার্কের টেবিলে ঘুমিয়ে পড়ার ক্লান্তি—সব মিলিয়ে সে এক স্বর্গীয় সুখ ছিল। শীতের সকালে লেপের ওম ছেড়ে কুয়াশা ভেদ করে মাঠে গিয়ে কাঁচা রোদে পিঠ সেঁকা, কিংবা দাদির মুখে রূপকথার রাজা-রানির গল্প শোনার সেই মায়াবী আমেজ বর্তমানের কোনো আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়াতেই আর মেলে না।
বড় হওয়ার ইঁদুরদৌড়ে আজ হয়তো আমরা অনেক দূরে চলে এসেছি, শহুরে কংক্রিটের চার দেয়ালের খাঁচায় বন্দি হয়ে গেছে মন। কিন্তু মুঠোফোন আর ল্যাপটপের আলো ছাড়িয়ে হঠাৎ যখন কোনো বৃষ্টির ফোঁটা জানালার কাচে এসে পড়ে, অবচেতন মনেই মনটা ছুটে যায় সেই সোনালি অতীতে। যেখানে কোনো হিসাব-নিকাশ ছিল না, ছিল না কোনো জটিলতা; কেবল বুকভরা মুক্ত হাসি আর অফুরন্ত প্রাণশক্তি। শৈশব মানে কেবল বয়সের একটা সময় নয়, শৈশব হলো এক নিখাদ ভালো লাগার চিরন্তন ঠিকানা।








