প্রকাশ : ১২ আগস্ট ২০২৬, ১২:৪৪
চার দশকের সাংবাদিকতা, নেতৃত্ব ও সমাজসেবার এক অনন্য অভিযাত্রী কাজী শাহাদাত

চাঁদপুরের সাংবাদিকতা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সামাজিক অঙ্গনের এক সুপরিচিত নাম কাজী শাহাদাত। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে সংবাদপত্রের মাধ্যমে সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতা, নতুন প্রজন্মের সাংবাদিক তৈরিতে অবদান এবং সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে নিরলস ভূমিকার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি এবার অর্জন করলেন দৈনিক চাঁদপুর প্রবাহের ‘রজতজয়ন্তী আজীবন সম্মাননা’। এটি তাঁর জীবনের চতুর্থ আজীবন সম্মাননা, যা তাঁর কর্মময় জীবনের আরেকটি গৌরবোজ্জ্বল মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
|আরো খবর
শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬, দৈনিক চাঁদপুর প্রবাহের ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত বর্ণাঢ্য রজতজয়ন্তী উৎসবের মূল পর্বে চাঁদপুর প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে প্রধান অতিথি সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহম্মেদ মানিক তাঁর হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন জেলার বিশিষ্ট সাংবাদিক, সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, জনপ্রতিনিধি ও নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। মুহূর্তটি ছিল আবেগ, গর্ব এবং শ্রদ্ধায় ভরপুর।
দৈনিক চাঁদপুর প্রবাহের সম্মাননাপত্রে উল্লেখ করা হয়, চাঁদপুরের স্থানীয় সাংবাদিকতার বিকাশে কাজী শাহাদাতের অবদান অনন্য ও অবিস্মরণীয়। তিনি চাঁদপুরের প্রথম দৈনিক পত্রিকার প্রধান সম্পাদক হিসেবে আধুনিক সাংবাদিকতার ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর নেতৃত্বে অসংখ্য তরুণ সাংবাদিক সংবাদপত্রের জগতে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ পেয়েছেন। একজন অভিভাবক, প্রশিক্ষক ও দিকনির্দেশক হিসেবে তাঁর অবদান চাঁদপুরের সাংবাদিকতার ইতিহাসে স্থায়ীভাবে লিপিবদ্ধ থাকবে।
হাজীগঞ্জ উপজেলার বলাখাল গ্রামের সন্তান কাজী শাহাদাতের জন্ম ৫ এপ্রিল ১৯৬১। তাঁর পিতা মরহুম কাজী ছেফায়েত উল্লাহ ছিলেন বাংলাদেশ রেলওয়ের স্টেশন মাস্টার এবং মাতা জোবায়দা বেগম ছিলেন গৃহিণী। ছয় ভাই ও ছয় বোনের বড় পরিবারে বেড়ে ওঠা কাজী শাহাদাত ছোটবেলা থেকেই সাহিত্য ও সাংবাদিকতার প্রতি গভীর অনুরাগী ছিলেন।
১৯৮১ সালে কুমিল্লার সাপ্তাহিক রঙধনু পত্রিকায় বলাখাল সংবাদদাতা হিসেবে সাংবাদিকতার যাত্রা শুরু করেন। এরপর ধাপে ধাপে সাহিত্য মাসিক নির্ভীক, নির্ঝর, সাপ্তাহিক রক্তিম আভা, সাপ্তাহিক চাঁদপুর, সাপ্তাহিক চাঁদপুর কণ্ঠ-এ দায়িত্ব পালন করে ১৯৯৮ সালে দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠের প্রধান সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আজও তিনি নিষ্ঠা ও দক্ষতার সঙ্গে সেই দায়িত্ব পালন করে চলেছেন।
কেবল সংবাদপত্রেই সীমাবদ্ধ থাকেননি তিনি। জাতীয় পত্রিকায় জেলা প্রতিনিধি এবং কলাম লেখক হিসেবেও তিনি কাজ করেছেন। তাঁর লেখনীতে যেমন ছিল সমাজের সমস্যা ও সম্ভাবনার কথা, তেমনি ছিল উন্নয়ন, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও মানবিক মূল্যবোধের প্রতিফলন। তিনি একমাত্র ব্যক্তি যিনি চাঁদপুর কণ্ঠের বিতর্ক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে জেলায় ১২ বছরের অধিক সময় বিতর্কের প্রচার ও প্রসারে কাজ করেছেন।
আজীবন সম্মাননার ধারাবাহিকতা : দৈনিক চাঁদপুর প্রবাহের রজতজয়ন্তী আজীবন সম্মাননা তাঁর জীবনের চতুর্থ আজীবন স্বীকৃতি।
প্রথম আজীবন সম্মাননা পান ২০১০ সালে, জেলার বিতর্ক আন্দোলনে অসামান্য অবদানের জন্য। বাংলাদেশ ডিবেট ফেডারেশনের সভাপতি ডা. আব্দুন নূর তুষারের হাত থেকে তিনি সে সম্মাননা গ্রহণ করেন।
এরপর ২০২০ সালে চাঁদপুর প্রেস ক্লাবের সুবর্ণজয়ন্তী অনুষ্ঠানে সাংবাদিকতায় বিশেষ অবদানের জন্য জাতীয় প্রেস ক্লাবের তৎকালীন সভাপতি সাইফুল আলমের হাত থেকে দ্বিতীয় আজীবন সম্মাননা লাভ করেন।
২০২৩ সালে শাহরাস্তি প্রেস ক্লাব তাঁকে তৃতীয় আজীবন সম্মাননায় ভূষিত করে। আর ২০২৬ সালে দৈনিক চাঁদপুর প্রবাহের রজতজয়ন্তী উৎসবে চতুর্থবারের মতো এই বিরল সম্মান অর্জন করেন তিনি।
সম্মাননা ও পুরস্কারের দীর্ঘ তালিকা : আজীবন সম্মাননার বাইরেও কাজী শাহাদাতের অর্জনের তালিকা দীর্ঘ। সাংবাদিকতায় অবদানের জন্য তিনি ব্র্যাক মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড, বেগম রোকেয়া স্মৃতি পদক, বিভিন্ন সংবাদপত্র ও সামাজিক সংগঠনের সম্মাননা অর্জন করেছেন। সাহিত্যচর্চার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের হাত থেকে জাতীয় সাহিত্য পরিষদ পদক, সাহিত্য সংগঠক হিসেবে নাসিরউদ্দীন পদক, জেলা শিল্পকলা একাডেমির সম্মাননাসহ অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।
সম্প্রতি সাহিত্য একাডেমি, চাঁদপুরের ৪০ বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রতিষ্ঠাকালীন প্রধান সম্পাদক হিসেবে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম এবং জেলা প্রশাসক আহমেদ জিয়াউর রহমানের হাত থেকেও তিনি বিশেষ সম্মাননা গ্রহণ করেন।
সাংবাদিকতার পাশাপাশি সমাজসেবা :
কাজী শাহাদাত কেবল একজন সাংবাদিক নন; তিনি একজন সফল সংগঠক ও সমাজসেবকও। বিশ্বের বৃহত্তম মানবসেবামূলক সংগঠন রোটারি ইন্টারন্যাশনাল-এর সদস্য হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে মানবকল্যাণে কাজ করছেন। তিনি ২০১০-২০১১ রোটারি বর্ষে চাঁদপুর রোটারি ক্লাবের সভাপতি ছিলেন এবং পল হ্যারিস ফেলো (চঐঋ) সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। এছাড়া রোটারির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে জেলা পর্যায়ে একাধিক পুরস্কার লাভ করেছেন।
চাঁদপুর প্রেস ক্লাবের সভাপতি হিসেবে দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের ঐক্য, পেশাগত মানোন্নয়ন এবং সাংবাদিক কল্যাণে তাঁর ভূমিকা বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়েছে।
এছাড়া তিনি বিভিন্ন সাহিত্য, সাংস্কৃতিক, শিক্ষামূলক ও সামাজিক সংগঠনের সভাপতি, উপদেষ্টা কিংবা আহ্বায়ক হিসেবে কাজ করেছেন। নতুন প্রজন্মকে বই পড়া, সাহিত্যচর্চা ও মানবিক মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ করতে তাঁর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।
পরিবারেও সাফল্যের ছাপ : কাজী শাহাদাতের সহধর্মিণী মাহমুদা খানম রেলওয়ে কিন্ডারগার্টেন, চাঁদপুরের অধ্যক্ষ। তিনি আন্তর্জাতিক নারী সংগঠন ইনার হুইল-এর জেলা পর্যায়ে মর্যাদাপূর্ণ ‘ব্রেকিং দ্য ব্যারিয়ার্স অ্যাওয়ার্ড’ অর্জন করেছেন এবং চাঁদপুরের নারী নেতৃত্বের একটি সুপরিচিত মুখ।
তাঁদের বড় সন্তান কাজী আজিজুল হাকিম নাহিন রোটার্যাক্ট আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থেকে নেতৃত্বের গুণাবলি প্রদর্শন করেছেন। ফলে সমাজসেবা, নেতৃত্ব ও মানবিক মূল্যবোধের ধারাবাহিকতা পরিবারজুড়েই স্পষ্ট।
মানুষের ভালোবাসাই সবচেয়ে বড় অর্জন : দীর্ঘ কর্মজীবনে অসংখ্য সম্মাননা ও পদক অর্জন করলেও কাজী শাহাদাত সবসময় বলে আসেন, মানুষের ভালোবাসা ও বিশ্বাসই তাঁর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। সাংবাদিকতা তাঁর কাছে কেবল একটি পেশা নয়, এটি একটি দায়বদ্ধতা এবং সমাজ পরিবর্তনের শক্তিশালী মাধ্যম।
রজতজয়ন্তী আজীবন সম্মাননা অর্জনের পর তিনি মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করেন এবং দৈনিক চাঁদপুর প্রবাহ পরিবারের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, এই সম্মাননা তাঁর দায়িত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে এবং ভবিষ্যতেও সত্য, ন্যায় ও মানবকল্যাণের পথে অবিচল থাকার প্রেরণা জোগাবে।
এক আলোকিত পথপ্রদর্শক : চাঁদপুরের সাংবাদিকতার ইতিহাসে কাজী শাহাদাত একটি প্রতিষ্ঠিত নাম। তাঁর সততা, পেশাদারিত্ব, নেতৃত্ব, সাহিত্যচর্চা এবং সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ড তাঁকে শুধু একজন সম্পাদক নয়, বরং একজন শিক্ষক, অভিভাবক ও অনুপ্রেরণার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
দৈনিক চাঁদপুর প্রবাহের ‘রজতজয়ন্তী আজীবন সম্মাননা’ তাই শুধু একজন ব্যক্তির প্রাপ্তি নয়; এটি চাঁদপুরের সাংবাদিকতার দীর্ঘ ঐতিহ্য, নিষ্ঠা ও সৃজনশীলতারও এক মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি। তাঁর এই অর্জন আগামী দিনের সাংবাদিকদের জন্য অনুপ্রেরণার বাতিঘর হয়ে থাকবে এবং সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতার পথকে আরও সমৃদ্ধ করবে।
উজ্জ্বল হোসাইন : সাংবাদিক, লেখক ও গবেষক।







