শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:১৪

পদ্মা-মেঘনায় গবেষকদের বড় পরিকল্পনা

আবার কি সাধারণের পাতে উঠবে ইলিশ?

মো. মিজানুর রহমান
আবার কি সাধারণের পাতে উঠবে ইলিশ?

একসময় যা ছিলো বাঙালির প্রাত্যহিক খাবারের অনুষঙ্গ, সেই রুপালি ইলিশ এখন সাধারণ মানুষের জন্য রীতিমত বিলাসী পণ্য। তবে পদ্মা-মেঘনায় ইলিশের উৎপাদন বাড়িয়ে মাছটিকে ফের সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নিয়ে আসার বড় উদ্যোগ নিয়েছেন মৎস্য গবেষকরা। নদীর জলাশয়ের সর্বোচ্চ ব্যবহার, প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র সংরক্ষণ এবং পরিবেশগত সংকট মোকাবিলাকে কাজে লাগিয়ে উৎপাদন বাড়ানোর আশাবাদ ব্যক্ত করছেন তারা।

বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬) বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের নদী কেন্দ্র, চাঁদপুর-এর প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. তায়েফা আহমেদ জানান, দূষণ, নাব্যতাসংকট ও পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় উজানের দিকে ইলিশের বিচরণ কমেছে। বর্তমানে ইলিশের মজুত, বিচরণ ও উৎপাদন নিয়ে ‘পপুলেশন ডায়নামিকস অ্যান্ড স্টক অ্যাসেসমেন্ট অব টেনুয়ালোসা ইলিশা ইন বাংলাদেশ’ গবেষণাসহ ছয়টি প্রকল্প চলমান রয়েছে। ড. তায়েফা আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, “নদীর জলাশয়কে কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারলে ইলিশের আগের প্রাচুর্য আবারও চাঁদপুরে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।”

কমেছে ডিম ও জাটকার হার :

মৎস্য গবেষকদের তথ্যমতে, ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশে মোট ৫ লাখ ৬৫ হাজার মেট্রিক টন ইলিশের মধ্যে চাঁদপুরে উৎপাদন হয়েছিলো ৩৩ হাজার ৯৯২ মেট্রিক টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সারাদেশে উৎপাদন কমে ৫ লাখ মেট্রিক টনে নামলেও চাঁদপুরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছিলো ৩৫ হাজার ৪৭২ মেট্রিক টনে। তবে এরপরই দেখা দেয় উদ্বেগজনক চিত্র; ইলিশের ডিম ও রেণু পোনার উৎপাদন আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। ২০২৪ সালে সারাদেশে ৮ লাখ ৮৪ হাজার ৮০২ কেজি ডিম উৎপাদন হলেও ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৭ লাখ ৯১ হাজার ৫৬৪ কেজিতে। ফলে রেণু পোনা ও বেঁচে থাকা জাটকার সংখ্যাও আনুপাতিক হারে হ্রাস পেয়েছে। যার প্রভাবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চাঁদপুরে ইলিশের উৎপাদন কমে দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার ৬৫৪ মেট্রিক টনে।

হতাশায় জেলেরা, আকাশছোঁয়া বাজার দর :

উৎপাদন ও নদীতে মাছের উপস্থিতি কমে যাওয়ায় চরম হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন চাঁদপুরের জেলেরা। রাজরাজেশ্বরের জেলে বাচ্চু বেপারী ও খলিল জানান, নদীতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জাল টেনেও কাঙ্ক্ষিত ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে না। উপরন্তু তেলের দাম বৃদ্ধিতে জীবিকা নির্বাহ করাই তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।

নদীতে সরবরাহ কম থাকায় চাঁদপুরের বড়স্টেশন মাছঘাটে দাম উঠেছে আকাশচুম্বী। স্থানীয় ব্যবসায়ী মেজবাহ উদ্দিন ও সম্রাট বেপারী জানান, ১ কেজি ওজনের ইলিশ ২৪০০ থেকে ২৫০০ টাকা এবং ৫০০ থেকে ৮০০ গ্রামের ইলিশ ১৭ ৫০ থেকে ২২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত বছরের তুলনায় কেজিতে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। অসাধু উপায়ে প্রজনন ও জাটকা মৌসুমে নিধন এবং সাগরে ট্রলিং জালের ব্যবহারকে ইলিশের ঘাটতির প্রধান কারণ হিসেবে দায়ী করছেন আড়তদার ও পাইকাররা।

২২ দিনের কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও পুনর্বাসন :

চাঁদপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফকরুল ইসলাম জানান, ইলিশের দাম কমাতে উৎপাদন বৃদ্ধির বিকল্প নেই। ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষায় আগামী ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত মোট ২২ দিন পদ্মা-মেঘনায় ইলিশ ধরা, পরিবহন, মজুত ও কেনাবেচা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। মতলব উত্তরের ষাটনল থেকে হাইমচরের চরভৈরবী পর্যন্ত ৭০ কিলোমিটার নদীতে পরিচালনা করা হবে কঠোর অভিযান।

নিষেধাজ্ঞাকালীন চাঁদপুরের ৪২ হাজার ৭৯০ জন নিবন্ধিত জেলেকে ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় ২৫ কেজি করে চাল সহায়তা দেওয়া হবে। চাঁদপুর নৌ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আলমগীর হোসাইন জানান, নিষেধাজ্ঞা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী জেল-জরিমানাসহ কঠোর ব্যবস্থাগ্রহণ করা হবে।

গবেষকদের বৈজ্ঞানিক উদ্যোগ, ডুবোচর খনন এবং প্রজনন মৌসুমে প্রশাসনিক কঠোরতা ঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে আবারও ইলিশের চেনা প্রাচুর্য ফিরবে এবং মাছটি সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আসবে বলে প্রত্যাশা চাঁদপুরবাসীর।

ডিসিকে /এমজেডএইচ

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়