প্রকাশ : ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৫৬
৩০০ থেকে ৫০০ একর জমিতে রপ্তানিমুখী শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার সম্ভাবনা যাচাই; ইপিজেড ও সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের স্থান পরিদর্শন করল বেপজার প্রতিনিধি দল
বদলে যেতে পারে দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতির চিত্র
চাঁদপুরে ইপিজেড হলে সরাসরি ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ মানুষের হবে কর্মসংস্থান

চাঁদপুরে রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) প্রতিষ্ঠিত হলে পাল্টে যেতে পারে জেলার অর্থনৈতিক চিত্র। সৃষ্টি হতে পারে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান, বাড়তে পারে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ এবং গড়ে উঠতে পারে নতুন শিল্পকারখানা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। একই সঙ্গে চাঁদপুরসহ আশপাশের শরীয়তপুর, লক্ষ্মীপুর ও ফেনী অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
|আরো খবর
সম্ভাব্য এই উন্নয়নযজ্ঞকে সামনে রেখে চাঁদপুরে ইপিজেড ও সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের উপযোগিতা যাচাইয়ে জেলার তিনটি স্থান পরিদর্শন করেছে বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা)-এর একটি প্রতিনিধি দল।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) দুপুরে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা ও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বেপজার নির্বাহী পরিচালক মো. আবদুর রহমান ভূঁইয়ার নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলটি চাঁদপুর সদর উপজেলার লক্ষ্মীপুর মডেল ইউনিয়নে প্রস্তাবিত ইপিজেডের সম্ভাব্য স্থান পরিদর্শন করে। একই দিন সদর উপজেলার ইব্রাহিমপুর ইউনিয়ন ও হাইমচর উপজেলায় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের সম্ভাব্য স্থানও ঘুরে দেখে দলটি। এ সময় প্রকল্পগুলোর সম্ভাব্যতা, জমির উপযোগিতা এবং বাস্তবায়নের বিভিন্ন দিক সরেজমিনে যাচাই করা হয়।
পরিদর্শনকালে উপস্থিত ছিলেন কুমিল্লা ইপিজেডের সহকারী প্রকৌশলী মো. সফিকুল ইসলাম, চাঁদপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম এন জামিউল হিকমা, সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রত্যয় হাশেম, নারায়ণগঞ্জের আদমজী ইপিজেডের সহকারী পরিচালক মো. বোরহান উদ্দিনসহ বেপজার বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা।
৩০০ একর জমিতে ৫০ হাজার, ৫০০ একরে এক লাখ কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা :
চাঁদপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম এন জামিউল হিকমার সঙ্গে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি জানান, প্রস্তাবিত ইপিজেডের জন্য ৫০০ একর জমি অধিগ্রহণ করা সম্ভব হলে প্রায় এক লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। আর ৫০০ একর জমি পাওয়া সম্ভব না হলে ৩০০ একর জমিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা গেলেও ন্যূনতম ৫০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা রয়েছে।
তিনি বলেন, "প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে চাঁদপুরে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের নতুন দুয়ার খুলবে। রপ্তানিমুখী শিল্পকারখানা গড়ে উঠলে স্থানীয় অর্থনীতিতে গতি আসবে এবং চাঁদপুরসহ আশপাশের জেলার তরুণ-তরুণীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে। এর পাশাপাশি পরিবহন, পণ্য সরবরাহ, আবাসন, খাদ্য, খুচরা ব্যবসা ও অন্যান্য সেবামূলক খাতেও নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সৃষ্টি হবে।"
ইউএনও আরও জানান, প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণ। এ জন্য পরিকল্পিত উদ্যোগ, সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বয় এবং জমির মালিকদের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। চাঁদপুর-শরীয়তপুর যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে সেতু নির্মাণের কাজও শুরু হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। তিনি মনে করেন, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন এবং শিল্পাঞ্চল প্রতিষ্ঠা একসঙ্গে এগুলে এ অঞ্চলে বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্ভাবনা আরও বাড়বে।
বেপজার নির্বাহী পরিচালক যা বললেন :
বেপজার নির্বাহী পরিচালক মো. আবদুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, "প্রধানমন্ত্রী চাঁদপুরে একটি ইপিজেড ও একটি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের আশ্বাস দিয়েছেন। সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সম্ভাব্য স্থানগুলো পরিদর্শন করে প্রকল্পের উপযোগিতা যাচাই করা হচ্ছে।"
তিনি জানান, চাঁদপুরে ইপিজেড প্রতিষ্ঠা করা হলে সেখানে সরাসরি প্রায় ৫০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। পাশাপাশি এই শিল্পাঞ্চলকে কেন্দ্র করে আশপাশের এলাকায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৭ থেকে ৮ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা রয়েছে।
কর্মসংস্থান ও শিল্পায়নে নতুন সম্ভাবনা :
চাঁদপুরে ইপিজেড প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নিলে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হতে পারেন স্থানীয় বেকার যুবক-যুবতী, শিক্ষিত তরুণ সমাজ, কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত জনশক্তি এবং স্বল্প আয়ের পরিবারগুলো। কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির মাধ্যমে অনেক পরিবারের আর্থিক সক্ষমতা বাড়তে পারে। চাকরির জন্য অন্য জেলায় কিংবা বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা কমানোরও সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ইপিজেডে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা শিল্পকারখানা স্থাপন করলে তৈরি পোশাক, বস্ত্র, ইলেকট্রিক ও ইলেকট্রনিক পণ্য, প্লাস্টিক ও প্যাকেজিং, কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণসহ বিভিন্ন খাতে শিল্প গড়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে কোন্ কোন্ শিল্প স্থাপন করা হবে, তা নির্ভর করবে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ, প্রকল্পের নীতিমালা, অবকাঠামো ও বাজার পরিস্থিতির ওপর।
শুধু কারখানার শ্রমিক বা কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগই নয়, একটি ইপিজেডকে ঘিরে পরিবহন শ্রমিক, ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানচালক, পণ্য সরবরাহকারী, নির্মাণশ্রমিক, ঠিকাদার, হোটেল-রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী, দোকানদার, বাড়িভাড়া প্রদানকারী এবং বিভিন্ন সেবাদানকারী মানুষেরও আয়-রোজগারের সুযোগ বাড়তে পারে। স্থানীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা পণ্য সরবরাহ ও সেবা খাতে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেতে পারেন।
এ ছাড়া শিল্পাঞ্চলের চাহিদা অনুযায়ী কারিগরি প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং নতুন পেশায় জনশক্তি তৈরির প্রয়োজন দেখা দেবে। স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলো পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে এলে চাঁদপুরের তরুণদের দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত করা সম্ভব হবে।
চাঁদপুরের সঙ্গে এগিয়ে যেতে পারে আশপাশের জেলাগুলোও :
ভৌগোলিক অবস্থান ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো গেলে প্রস্তাবিত ইপিজেড শুধু চাঁদপুরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর অর্থনৈতিক প্রভাব আশপাশের জেলাগুলোতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। শরীয়তপুর, লক্ষ্মীপুর ও ফেনীর ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা, শ্রমজীবী মানুষ এবং পণ্য পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এর সুফল পেতে পারেন।
শিল্পকারখানার জন্য কাঁচামাল সরবরাহ, উৎপাদিত পণ্য পরিবহন, গুদামজাতকরণ, যন্ত্রপাতি মেরামত, খাদ্য সরবরাহ ও অন্যান্য সহায়ক সেবা খাতে নতুন ব্যবসার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে স্থানীয় বাজারে অর্থের প্রবাহ বাড়বে এবং নতুন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে।
বিশেষ করে নদীবেষ্টিত চাঁদপুরের সঙ্গে সড়ক ও নৌযোগাযোগের সমন্বিত উন্নয়ন করা গেলে পণ্য পরিবহনে সুবিধা তৈরি হতে পারে। তবে এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস বা বিকল্প জ্বালানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং আধুনিক লজিস্টিকস সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি।
সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনা :
ইপিজেডের পাশাপাশি চাঁদপুর সদর উপজেলার ইব্রাহিমপুর ইউনিয়ন ও হাইমচর উপজেলায় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের সম্ভাব্য স্থান পরিদর্শনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে জাতীয় গ্রিডে নবায়নযোগ্য জ্বালানি যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি প্রকল্প নির্মাণ, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজে কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে।
শিল্পাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন ও নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ বিনিয়োগ আকর্ষণের অন্যতম শর্ত। সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং ইপিজেডের পরিকল্পনার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় করা গেলে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় তা ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে জমির উপযোগিতা, পরিবেশগত প্রভাব, বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থা এবং প্রকল্পের অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা যথাযথভাবে যাচাই করেই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
জমি অধিগ্রহণ, পরিবেশ সুরক্ষা ও পুনর্বাসন হবে গুরুত্বপূর্ণ :
বড় শিল্পাঞ্চল প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে জমি অধিগ্রহণ একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল বিষয়। তাই প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে জমির মালিকানা, কৃষিজমির ব্যবহার, স্থানীয় মানুষের বসতভিটা, জীবিকা এবং পরিবেশের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে প্রচলিত আইন অনুসরণ, ন্যায্য ক্ষতিপূরণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের স্বার্থ সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।
একই সঙ্গে শিল্পবর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জলাশয় ও খাল সংরক্ষণ, বায়ু ও পানিদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং পরিকল্পিত ড্রেনেজব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। শিল্পায়নের সুফল যেন পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ক্ষতির কারণ না হয়, সে বিষয়েও শুরু থেকেই কার্যকর পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন।
স্থানীয় জনগণকে উন্নয়নপ্রক্রিয়ার অংশীদার করা গেলে প্রকল্পটির সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে। পাশাপাশি স্থানীয়দের প্রশিক্ষণ দিয়ে নিয়োগের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়ার নীতিগত উদ্যোগ নেওয়া হলে এলাকার মানুষ সরাসরি উপকৃত হতে পারবেন।
সম্ভাবনা থেকে বাস্তবায়ন—এখন প্রয়োজন কার্যকর উদ্যোগ :
চাঁদপুরে ইপিজেড ও সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের সম্ভাব্য স্থান পরিদর্শনকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। তবে পরিদর্শন ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর জমি অধিগ্রহণ, কারিগরি ও অর্থনৈতিক সমীক্ষা, পরিবেশগত মূল্যায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন, বিনিয়োগকারী আকর্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদনসহ একাধিক ধাপ সম্পন্ন করতে হবে।
প্রস্তাবিত প্রকল্প দুটি বাস্তবায়িত হলে চাঁদপুরের অর্থনীতি কৃষি, মৎস্য ও ব্যবসানির্ভর কার্যক্রমের পাশাপাশি শিল্প ও রপ্তানিমুখী উৎপাদনের নতুন ক্ষেত্র পেতে পারে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্থানীয় উদ্যোক্তাদের বিকাশ, নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ এবং তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে এ অঞ্চলের আর্থসামাজিক উন্নয়নে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সম্ভাবনা রয়েছে।
এখন চাঁদপুরবাসীর প্রত্যাশা—সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কার্যক্রম দ্রুত ও যথাযথভাবে সম্পন্ন করে প্রকল্প দুটির বিষয়ে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। পরিকল্পিত শিল্পায়ন, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, পরিবেশ সুরক্ষা এবং স্থানীয় মানুষের স্বার্থ নিশ্চিত করা গেলে চাঁদপুরের প্রস্তাবিত ইপিজেড শুধু একটি শিল্পাঞ্চল নয়, বরং দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার নতুন সম্ভাবনাময় কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
ডিসিকে /এমজেডএইচ








