বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:০৪

চাঁদপুর ও নারায়ণগঞ্জে ৩ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছি

অনলাইন ডেস্ক
চাঁদপুর ও নারায়ণগঞ্জে ৩ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছি

উদ্যোক্তা সেলিম খান ইয়র্ক গ্রুপ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। চাঁদপুরের সন্তান সেলিম খান ১৯৮১ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে ফ্লোরিডার ওয়েস্ট পাম বিচে কলেজ অব পাম বিচেসে বিজনেস বিষয়ে পড়াশোনা করেন। সেখানে পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন চাকরি ও ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৯২ সালে দেশে ফিরে উদ্যোক্তা হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সেই ভাবনা থেকেই ১৯৯৭ সালে গড়ে তোলেন ‘ইয়র্ক ফ্যাশন লিমিটেড’। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে চাঁদপুর ও নারায়ণগঞ্জে প্রায় ৩ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। এর মধ্যে চাঁদপুরেই প্রায় ১ হাজার ৪শ’ জন কাজ করছেন। শ্রমিকদের মজুরি বাবদ বছরে ব্যয় হয় প্রায় ৬০ কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠানটির তৈরি পোশাক যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়। এর মাধ্যমে বছরে প্রায় ৩শ’ কোটি টাকার রপ্তানি আয় হয়।

২৯ বছরের পথচলায় ইয়র্ক গ্রুপ চাঁদপুরের বাবুরহাট ও নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর বিসিক শিল্পনগরীতে গড়ে তুলেছে দুটি গার্মেন্টস হাউসসহ নিটিং, ডাইং, প্রিন্ট ও এমব্রয়ডারি কারখানা। ব্যবসার পাশাপাশি তিনি বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর সদস্য। চাঁদপুর জেলা বিসিক শিল্পনগরী শিল্প মালিক সমিতি ও জেলা ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমিউনিটি পুলিশিং সমন্বয় কমিটির সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন। শ্রমিক ও কর্মকর্তাদের ভালোবাসাকেই তিনি নিজের অন্যতম বড় অর্জন বলে মনে করেন।

সম্প্রতি সফল এ উদ্যোক্তা দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠের ‘সুচিন্তা’ বিভাগের মুখোমুখি হন। এ সময় উদ্যোক্তা জীবনের নানা দিক ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেছেন।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আলআমিন হোসাইন।

আপনার জন্ম, বেড়ে ওঠা এবং প্রাথমিক জীবন সম্পর্কে জানতে চাই।

সেলিম খান : আমাদের আদি বাড়ি নোয়াখালী, তবে আমার জন্ম চাঁদপুরে। শহরের লন্ডনঘাটে আমার বেড়ে ওঠা। আমার ভাইবোনদেরও বেশির ভাগের জন্ম চাঁদপুরেই। আমার বাবা ও চাচারা এখানে ব্যবসা করতেন। পুরাণবাজার ও নতুনবাজারে আমাদের বাড়ি ছিল। আমি ৫নং কদমতলা স্কুলে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছি। পরে মুক্তিযুদ্ধের সময় নোয়াখালীতে দাদার বাড়িতে চলে যাই। আর ১৯৭৪ সালে চলে যাই ঢাকায়।

১৯৯৭ সালে ‘ইয়র্ক ফ্যাশন লি.’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আপনার এই ব্যবসায়িক যাত্রা শুরু হয়েছিল। সেই শুরু থেকে আজকের বৃহৎ ‘ইয়র্ক গ্রুপ’ হয়ে ওঠার পেছনের গল্প জানতে চাই।

সেলিম খান : ১৯৮১ সালে আমি উচ্চশিক্ষার জন্যে যুক্তরাষ্ট্রে যাই। সেখানে পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন চাকরি ও ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হই। ১৯৯২ সালে দেশে এসেই বিভিন্ন কারখানা থেকে পণ্য কিনে রপ্তানির কাজ শুরু করি। তখন দেখলাম, অনেক কারখানা সময়মতো পণ্য তৈরি বা শিপমেন্ট দিতে পারে না। এমনকি ক্রেতার শতভাগ পণ্য বিমানে পাঠানোর খরচ ক্রেতাকেই বহন করতে হয়েছে। তখন মনে হলো, নিজের একটি কারখানা থাকা দরকার। সেই ভাবনা থেকেই ১৯৯৭ সালে মিরপুরে ভাড়া করা একটি ফ্লোরে মাত্র ৩৫টি মেশিন দিয়ে শুরু করি।

আপনার উদ্যোক্তা জীবনের শুরুতে কী কী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিলেন?

সেলিম খান : শুরুতে লাইসেন্সসহ নানা বিষয়ে দীর্ঘসূত্রতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। যে কাজ এক দিনে হওয়ার কথা, সেটি করতে তিন থেকে ছয় মাস পর্যন্ত সময় লেগেছে। এতে সময় ও অর্থ দুটোই বেশি ব্যয় হয়েছে। আমার মনে হয়, উদ্যোক্তাদের জন্য ওয়ান-স্টপ সার্ভিস থাকা দরকার। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে লাইসেন্স দিতে হবে। কর্মকর্তারা প্রয়োজনে একবার সরেজমিনে এসে কী কী সংশোধন দরকার তা জানিয়ে দেবেন। উদ্যোক্তা সেগুলো ঠিক করে দিলে লাইসেন্স দেওয়া উচিত। উদ্যোক্তারা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেন; তাঁদের বাধাগ্রস্ত না করে সহযোগিতা করা প্রয়োজন।

আপনাদের প্রতিষ্ঠানের তৈরি পোশাক শতভাগ রপ্তানি করা হয়। আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে এবং পণ্যের মান বজায় রাখতে আপনারা কোন কৌশলগুলো অনুসরণ করছেন?

সেলিম খান : আমাদের তৈরি পোশাক যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়। এর মাধ্যমে বছরে রপ্তানি আয় হয় প্রায় ৩শ’ কোটি টাকা। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা এখন অনেক বেশি। ১০ বছর আগের তুলনায় ক্রেতারা কম দামে পণ্য নিতে চান, অথচ শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে। আগে শ্রমিকের মজুরি যেখানে প্রায় ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা ছিল, এখন তা ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়েছে। বর্তমানে ইয়র্ক গ্রুপে প্রায় ৩ হাজার মানুষ নিরলসভাবে কাজ করছেন। তাদের মজুরি বাবদ বছরে ব্যয় হয় প্রায় ৬০ কোটি টাকা। তাই খরচ ও অপচয় কমানোর পাশাপাশি দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোই আমাদের লক্ষ্য।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে উচ্চশিক্ষা অর্জনের পর দেশে এসে ব্যবসায় নেতৃত্ব দেওয়া শুরু করেন। বিদেশের শিক্ষাজীবন ও করপোরেট সংস্কৃতির অভিজ্ঞতা আপনার বর্তমান ব্যবসায়িক পরিচালনা ও দূরদর্শিতাকে কীভাবে প্রভাবিত করেছে?

সেলিম খান : বিদেশে দেখেছি, প্রতিষ্ঠানের প্রত্যেকের দায়িত্ব নির্দিষ্ট থাকে এবং সবাই নিজের দায়িত্ব পালন করে। বাংলাদেশে সেই করপোরেট সংস্কৃতি পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা কঠিন। আমি নিজে দীর্ঘ সময় কাজ করি। আমি পরিশ্রম করতে ভালোবাসি। কাজকে আমি উপভোগ করি। আমি মনে করি, সফল হতে হলে পরিশ্রম করতে হবে। আমি সকাল ৮টার আগেই কারখানায় আসি এবং সন্ধ্যা ৭টার পর বের হই। কারখানার ফ্লোরে থাকি, কস্টিং, মেশিন—সবকিছু দেখি। সিসিটিভির মাধ্যমেও কারখানাগুলো পর্যবেক্ষণ করি।

বর্তমানে আপনাদের গ্রুপে ২টি গার্মেন্টস হাউস, ১টি নিটিং ও ডাইং কারখানা এবং নিজস্ব প্রিন্ট ও এমব্রয়ডারি কারখানা রয়েছে। পুরো উৎপাদন প্রক্রিয়াকে এক ছাতার নিচে আনার কারণে কি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্ষমতা বেড়েছে?

সেলিম খান : অবশ্যই। পুরো উৎপাদন প্রক্রিয়া নিজেদের মধ্যে রাখার কারণে খরচ কমে এবং সময়ও বাঁচে। আগে একটি শিপমেন্ট সম্পন্ন করতে পাঁচ থেকে ছয় মাস সময় লাগত। এখন ৯০ দিনের মধ্যে করা সম্ভব হয়। নিজস্ব প্রিন্ট ও এমব্রয়ডারি কারখানার কারণে খরচও কমেছে। বাইরে থেকে একটি প্রিন্ট করতে যেখানে প্রায় ৩ ডলার খরচ হতে পারে, নিজেদের কারখানায় তা ১ ডলারেরও কমে করা সম্ভব হয়।

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) ও বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)-এ সদস্য হিসেবে দেশের সামগ্রিক তৈরি পোশাক খাতের বর্তমান সংকট, সম্ভাবনা এবং ভবিষ্যৎ রূপরেখা নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?

সেলিম খান : বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ পোশাক খাতের জন্য অনেক কাজ করছে। তারা এ খাতের উদ্যোক্তাদের একত্র করে এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগে সহযোগিতা করে। তবে তাদেরও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ-গ্যাস না থাকলে শিল্প ধরে রাখা এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করা কঠিন। চাঁদপুরের কারখানায় এক মাসে বিদ্যুৎ সমস্যার কারণে ১৬ হাজার ৩শ’ লিটার ডিজেল ও নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুরের ফ্যাক্টরিতে এক মাসের ১৫ তারিখের মধ্যেই সাড়ে ৯শ’ লিটার ডিজেল ব্যবহার করতে হয়েছে। গ্যাসের সমস্যার কারণে এক মাসে আমাদের ডাইং সেকশন পাঁচ দিন বন্ধ রাখতে হয়েছে। গ্যাসের সংকটে স্পিনিং মিলগুলোও সমস্যায় পড়ে, ফলে সুতার দাম বেড়ে যায়। আমরা বিভিন্ন পর্যায়ে গ্যাসের বিষয়টি জানিয়েছি। কিন্তু বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানও যেখানে পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছে না, সেখানে শুধু আশ্বাস দিয়ে সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। শিল্প টিকিয়ে রাখতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

আপনি চাঁদপুর জেলা বিসিক শিল্পনগরী শিল্প মালিক সমিতির সভাপতির নেতৃত্ব দিয়েছেন। সেই আলোকে জানতে চাই, আপনার দৃষ্টিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি পর্যায়ের উদ্যোক্তাদের কী কী সমস্যা রয়েছে?

সেলিম খান : বাংলাদেশে ৮৪টি বিসিক শিল্পনগরী আছে। বিসিকের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের কার্যক্রমের সঙ্গেও যুক্ত থেকে এবং বিভিন্ন শিল্পনগরী সরেজমিনে ঘুরে দেখেছি। আমার অভিজ্ঞতায় এর মধ্যে মাত্র ১০ থেকে ১৫টি ভালোভাবে চলছে। অনেক জায়গায় বিদ্যুৎ, গ্যাস, রাস্তা, ড্রেনেজ ও নিরাপত্তার সমস্যা রয়েছে। চাঁদপুর বিসিকেও রাস্তা, ড্রেনেজ ও নিরাপত্তার সমস্যা রয়েছে। শিল্পনগরীর সীমানা ও নিরাপত্তাব্যবস্থাও যথেষ্ট নয়। এসব সমস্যা সমাধানে সরকারি সহযোগিতা প্রয়োজন। আমি ২০১৩ সালে গ্যাসের জন্য আবেদন করেছিলাম। ২০১৯ সালে গ্যাস সংযোগ পাই। এই দীর্ঘ অপেক্ষা উদ্যোক্তাদের জন্য বড় সমস্যা। নিয়ম মেনে যারা আবেদন করেন, তাঁদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সংযোগ দেওয়া উচিত।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি পর্যায়ের উদ্যোক্তাদের উন্নয়নে এই সংগঠনটি কী ধরনের ভূমিকা পালন করছে?

সেলিম খান : আমরা উদ্যোক্তাদের সমস্যাগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। তবে শুধু সংগঠন দিয়ে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়; সরকারি সহযোগিতা প্রয়োজন। এছাড়া শিল্প প্লট হস্তান্তর বা বিক্রির ক্ষেত্রেও বড় সমস্যা রয়েছে। উৎসে কর, রেজিস্ট্রেশনসহ বিভিন্ন খরচ ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত হয়ে যায়। এতে উদ্যোক্তারা নিরুৎসাহিত হন। খরচ কমানো হলে নতুন উদ্যোক্তা আসবেন এবং কর্মসংস্থান বাড়বে। উদ্যোক্তা তৈরি করতে হলে শুধু শিল্প স্থাপনের সুযোগ দিলেই হবে না; প্রয়োজনীয় রাস্তা, যোগাযোগ ও অন্যান্য অবকাঠামোও নিশ্চিত করতে হবে। দেখেন, দেশে প্রতিবছর লাখ লাখ তরুণ পড়াশোনা শেষ করছেন। সবাই চাকরি পাবেন না। তাই ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটাতে হবে। চীনে দেখা যায়, একটি নির্দিষ্ট এলাকায় একই ধরনের শিল্পকে কেন্দ্র করে শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশেও বিসিক শিল্পনগরীগুলোতে এভাবে শিল্পের ক্লাস্টার করা যেতে পারে।

ব্যবসার পাশাপাশি আপনি জেলা ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমিউনিটি পুলিশিং সমন্বয় কমিটির সভাপতিরও দায়িত্ব পালন করেছিলেন। শিল্পাঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং শ্রমিক-মালিক সুসম্পর্ক বজায় রাখতে এই প্ল্যাটফর্মটি কীভাবে কাজ করছে?

সেলিম খান : আমি সাধারণত পদ-পদবি চাই না, একটু আড়ালে থাকতেই পছন্দ করি। তারপরও চাঁদপুর জেলা পুলিশ আমাকে সভাপতি করেছিল। এই প্ল্যাটফর্মের কার্যক্রম খুব বেশি বিস্তৃত নয়। আমি মনে করি, শৃঙ্খলা বজায় রাখতে শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক-মালিকের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। শ্রমিকদের আমি পরিবারের সদস্য মনে করি। তাদের জন্য আমার দরজা সব সময় খোলা থাকে। ব্যক্তিগত, আর্থিক বা চিকিৎসার সমস্যা নিয়ে কেউ এলে আমি যতটা সম্ভব সহযোগিতা করি।

ইয়র্ক গ্রুপ কি কোনো ধরনের সামাজিক কর্মকাণ্ড পরিচালন করে? কী কী কাজ করে?

সেলিম খান : আমাদের সামাজিক কর্মকাণ্ডের বড় অংশই শ্রমিকদের ঘিরে। এ ছাড়া মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল এবং দরিদ্র মানুষের জন্যও সহযোগিতা করি। শ্রমিকদের কেউ অসুস্থ হলে ঢাকায়, চাঁদপুরে বা নোয়াখালীতে চিকিৎসার ব্যবস্থা করি, যাতায়াতের খরচ দিই এবং চিকিৎসায় ছাড়ের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করি। এছাড়া আমাদের শ্রমিকদের জমি কেনার জন্য সুদমুক্ত ঋণও দিই। তাদের নিজেদের নামে জমি কিনতে উৎসাহিত করি, আর এতে আমি অনেক খুশি হই। গর্বের কথা হলো, আমাদের অনেক শ্রমিক ইতিমধ্যে জমি কিনেছেন। এছাড়া চাঁদপুরের কারখানায় প্রায় ১ হাজার ৪শ’ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। শ্রমিকদের যাতায়াতের জন্য বাসের ব্যবস্থা আছে। এতে শ্রমিকরা খুশি। হাজীগঞ্জ, বহরিয়াসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে শ্রমিকরা আসেন। এ বাবদ শ্রমিকপ্রতি প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫শ’ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। আমাদের কারখানায় গড় মজুরিও ঢাকার তুলনায় বেশি। আমাদের শ্রমিকরা অনেক বেশি পরিশ্রমী। শ্রমিকরা অধিকাংশই চাঁদপুরের। একটি বিশেষ ঘটনা বলতে চাই— চাঁদপুরে কারখানা শুরুর সময় যে মেয়েটির বয়স ছিল ১৪ বছর, এখন তার বয়স ২৪ বছর। বর্তমানে সে একটি লাইন পরিচালনা করছে।

‘প্রশ্ন থাকতে পারে কেন আমি চাঁদপুরে গার্মেন্টস দিলাম?’ এ বিষয়ে বলতে চাই— চাঁদপুরের প্রতি আমার আলাদা একটা টান রয়েছে। চাঁদপুরে কারখানা করার পেছনেও এই টান কাজ করেছে। অন্যরা ঢাকার বাইরে এসে কারখানা করে টিকিয়ে রাখতে পারেনি— তবুও আমি চাঁদপুরে প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ঝুঁকি নিয়েছি। ঢাকায় কিংবা গাজীপুর থেকে চট্টগ্রাম পোর্টে যেতে যেখানে কমপক্ষে ১৮ ঘণ্টার মতো সময় নষ্ট হতে পারে, চাঁদপুর থেকে চট্টগ্রাম পোর্টে যেতে আমার চার-পাঁচ ঘণ্টা লাগে। এ কারণেও চাঁদপুরে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। চাঁদপুরে শিল্প স্থাপনের পর স্থানীয় প্রশাসন বা সরকারের পক্ষ থেকে কেউ এসে আমাকে অভিনন্দন জানায়নি। কেউ জিজ্ঞেসও করেনি, আমার কী সহযোগিতা প্রয়োজন। অথচ আমি এখানে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছি, যেখানে ১ হাজার ৪শ’ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। অধিকাংশই কিন্তু চাঁদপুরের মানুষ। এতে করে দেশের পাশাপাশি চাঁদপুরের অর্থনীতির চাকা সচল হয়েছে। এতে করে কেউ এসে বলেনি, ‘আপনাকে ধন্যবাদ, আপনি এখানে একটি প্রতিষ্ঠান করেছেন।’ বরং অনেক সময় মনে হয়েছে, মানুষ শুধু আমার দোষ ধরার জন্যই আসে। আমি মনে করি, একজন উদ্যোক্তা যখন নিজের ঝুঁকি নিয়ে একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন এবং মানুষের কর্মসংস্থান করেন, তখন তাঁর কাজটিও মূল্যায়ন করা দরকার। চাঁদপুরের একটি প্রতিষ্ঠান থেকে শতভাগ পণ্য রপ্তানি হচ্ছে—এটি চাঁদপুরের জন্যও একটি অর্জন।

ইয়র্ক গ্রুপকে নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী? বৈশ্বিক বাজারে নতুন কোনো লক্ষ্য বা প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে কি?

সেলিম খান : আধুনিক ও দক্ষ মেশিন কিনে উৎপাদন বাড়াতে চাই। কিছু ক্ষেত্রে কম শ্রমিক দিয়ে বেশি উৎপাদন করতে হবে। ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হলে উৎপাদনশীলতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে হবে। চাঁদপুরে ভবিষ্যতে অ্যাকসেসরিজ উৎপাদনের পরিকল্পনাও আছে। এতে উৎপাদন খরচ কমবে এবং ক্রেতাদের সুবিধা হবে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে পোশাক খাত ও ব্যবসা খাতে নতুন যেসব তরুণ উদ্যোক্তা আসতে চান, তাদের জন্য আপনি কী কী পরামর্শ দেবেন।

সেলিম খান : তরুণদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই— প্রচুর পরিশ্রম করতে হবে, ধৈর্য ধরতে হবে এবং হতাশ হওয়া যাবে না। শুধু সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত অফিস করলেই হবে না। ব্যবসা সম্পর্কে নিজেকে জানতে হবে। তথ্য সংগ্রহ করতে হবে, কাজ বুঝতে হবে এবং অন্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করা যাবে না। নিজের ব্যবসা নিজে বুঝলে কেউ সহজে ঠকাতে পারবে না।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়