প্রকাশ : ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০২:২৯
আমনের মাঠে ইঁদুরের থাবা, কৃষকের সোনালি স্বপ্নে দুশ্চিন্তার ছায়া
ফসলের ভাগ নিতে মাঠে ইঁদুর, বিপাকে ফরিদগঞ্জের কৃষক।। ৪৬ পদের বিপরীতে কৃষি বিভাগে কর্মরত মাত্র ১৮ জন

সবুজে মোড়ানো মাঠ, বাতাসে দুলছে আমন ধানের গাছ। ধানগাছে শীষ আসার অপেক্ষায় বুক বেঁধেছিলেন কৃষক। সেচ, সার, শ্রম আর পরিচর্যায় গড়ে তোলা সেই স্বপ্নের ফসল ঘরে তোলার দিন গুনছিলেন তারা। কিন্তু মাঠের সবুজের আড়ালে এখন দুশ্চিন্তার কালো ছায়া। রাতের আঁধারে হানা দিচ্ছে ইঁদুর; ধারালো দাঁতে কেটে ফেলছে ধানগাছের গোড়া। কৃষকের চোখের সামনে নষ্ট হচ্ছে সম্ভাবনাময় ফসল, আর দুলতে থাকা সোনালি স্বপ্নে ভর করছে অনিশ্চয়তা।
ফরিদগঞ্জ উপজেলায় চলতি মৌসুমে আমন ধানের খেতে ইঁদুরের উপদ্রব কৃষকদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে। বাড়তি খরচ করে সেচ দেওয়া, জমি তৈরি, চারা রোপণ ও পরিচর্যার পর যখন ভালো ফলনের আশায় বুক বাঁধার কথা, তখনই ইঁদুরের আক্রমণে সেই আশায় পড়ছে ভাটা। জমির মালিকের সঙ্গে ফসল ভাগাভাগি করার হিসেবেও যেন তৃতীয় পক্ষ হিসেবে ভাগ বসাচ্ছে ইঁদুর। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের কণ্ঠে তাই আক্ষেপ, চোখেমুখে উদ্বেগ। তাদের দাবি, ইঁদুর দমনে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে পাশে দাঁড়াক কৃষি বিভাগ।
কৃষিভিত্তিক জনপদে শঙ্কার মেঘ
ডাকাতিয়া নদীর পাড়ের কৃষিপ্রধান জনপদ ফরিদগঞ্জ। এ উপজেলার মানুষের জীবন-জীবিকার বড় অংশ জুড়ে রয়েছে কৃষি। প্রায় ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ পরিবার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত। ফলে মাঠের ফসল ভালো হওয়া মানে শুধু কৃষকের মুখে হাসি ফোটা নয়, অনেক পরিবারের সারা বছরের খাদ্য ও জীবিকার নিশ্চয়তা।
এবারের আমন মৌসুমেও সেই প্রত্যাশা নিয়ে মাঠে নেমেছিলেন কৃষকেরা। কেউ নিজের জমিতে, কেউবা অন্যের জমি বর্গা নিয়ে চাষ করেছেন। অনেকেই বাড়তি খরচ করে সেচ দিয়েছেন, পরিচর্যায় রেখেছেন বাড়তি মনোযোগ। ধানগাছের বেড়ে ওঠা দেখে তাদের মনে জেগেছিল ভালো ফলনের স্বপ্ন। কিন্তু কিছু এলাকায় পোকামাকড়ের আক্রমণের পাশাপাশি ইঁদুরের উপদ্রব বেড়ে যাওয়ায় সেই স্বপ্ন এখন শঙ্কার মুখে।
কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে ফরিদগঞ্জ উপজেলায় ৮ হাজার ৫০ হেক্টর জমিতে আমন ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিআর-২২, বিআর-২৩, ব্রি ধান-৮৭, ব্রি ধান-৪৯, ব্রি ধান-৫১ ও হাইব্রিড জাতের ধান। বিস্তীর্ণ এই আবাদি জমির কোনো কোনো অংশে ইঁদুরের আক্রমণ কৃষকদের দুশ্চিন্তা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
কী বলছেন কৃষকেরা?
হর্নি দুর্গাপুর গ্রামের কৃষক ছলেমানের চোখেমুখে এখন উৎকণ্ঠা। নিজের ২০ শতাংশ জমির পাশাপাশি আরও ১০ শতাংশ জমি বর্গা নিয়ে আমন আবাদ করেছেন তিনি। জমিতে ধানের ডগা বেরিয়েছে, ভালো ফলনের আশায় বাড়তি খরচ করে সেচও দিয়েছেন। কিন্তু গত কয়েক দিন ধরে ইঁদুরের আক্রমণে তার সেই আশায় ভাটা পড়েছে। ছলেমান বলেন, “ধানের ডগা বেরিয়েছে, বাড়তি খরচ করে খেতে পানি দিচ্ছি। কিন্তু গত কয়েক দিন ধরে ইঁদুরের আক্রমণ দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের কীটনাশক প্রয়োগ করেও কাজ হচ্ছে না। বিষয়টি নিয়ে ভীষণ দুশ্চিন্তায় আছি।”
একই দুশ্চিন্তা ইসলামপুর গ্রামের কৃষক ইউসুফ মিয়ারও। অন্যের ২০ শতাংশ জমি বর্গা নিয়ে আমন চাষ করেছেন তিনি। জমির মালিকের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী উৎপাদিত ধান দু ভাগে ভাগ হওয়ার কথা। ইউসুফ মিয়ার কণ্ঠে আক্ষেপ, “জমির মালিক আর আমি দু ভাগে ফসল ভাগ করে নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এখন মাঝখানে ইঁদুর তৃতীয় ভাগ বসিয়েছে। ইঁদুরের আক্রমণে অনেক ক্ষতি হচ্ছে। ইঁদুর দমনে কৃষি বিভাগ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে আমাদের পাশে দাঁড়াক।”
কমলকান্দি গ্রামের কৃষক হারুনুর রশিদের দুশ্চিন্তার কারণও একই। তিনি জানান, ধানগাছ থেকে শীষ বের হওয়ার সময়ই ইঁদুর গাছ কেটে ফেলে দিচ্ছে। প্রতিকূলতার মধ্যেও ভালো ফলনের আশায় জমিতে নিবিড় পরিচর্যা চালিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু ইঁদুরের আক্রমণ তার সেই পরিশ্রমের ফল নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। হারুনুর রশিদ বলেন, “এ বছর ভালো ফলনের জন্য অনেক কষ্ট করে জমিতে ধানের পরিচর্যা করছি। কিন্তু ইঁদুরের আক্রমণে আমাদের স্বপ্ন ভেস্তে যেতে বসেছে। ইঁদুর দমনের দাবিতে কৃষি কর্মকর্তাদেরও তেমন দেখা মিলছে না।”
ইঁদুরের আক্রমণ ঠেকাতে কৃষকেরা বিভিন্ন উপায়ে চেষ্টা চালাচ্ছেন। কেউ কীটনাশক প্রয়োগ করছেন, কেউ আবার বাঁশের তৈরি ডোঙা ফাঁদ পেতে ইঁদুর নিধনের চেষ্টা করছেন। তবে তাদের অভিযোগ, এসব উদ্যোগে প্রত্যাশিত ফল মিলছে না। ফলে জমিতে ফসলের ক্ষতি ঠেকানো এবং অবশিষ্ট ধানগাছ রক্ষা করাই এখন তাদের বড় চ্যালেঞ্জ।
কৃষি বিভাগে জনবলসংকট
কৃষকের এই উদ্বেগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কৃষি বিভাগের তীব্র জনবল সংকট। উপজেলা কৃষি বিভাগে অনুমোদিত জনবল ৪৬ জন থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ১৮ জন। অর্থাৎ প্রয়োজনীয় জনবলের অর্ধেকেরও কম কর্মী নিয়ে চলছে কৃষিসেবা কার্যক্রম।
এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কল্লোল কিশোর সরকার জানান, জনবল সংকটের কারণে কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী সেবা দিতে তারা হিমশিম খাচ্ছেন। তবে গত কয়েক দিনের তুলনায় ইঁদুরের উপদ্রব অনেকটা কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে এবং এখনো কিছু এলাকায় এর উপস্থিতি রয়েছে।
ইঁদুর বাড়ার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, “আগে এ সময়ে মাঠে পর্যাপ্ত বৃষ্টির পানি থাকত। জমিতে পানি থাকলে ইঁদুরের আনাগোনা তুলনামূলক কম হয়। এবার বৃষ্টি না হওয়ায় অনেক জমিতে পানি নেই, ফলে ইঁদুরের উপদ্রব বেড়েছে।” তিনি আরও জানান, ইঁদুর দমনে বিষটোপ প্রয়োগসহ বিভিন্ন পদ্ধতি নিয়ে কৃষি বিভাগের কর্মীরা মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন। কৃষকেরা সম্মিলিতভাবে উদ্যোগ নিলে এর উপদ্রব আরও কমানো সম্ভব হবে। ভালো ফলন নিশ্চিত করতে কৃষকদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতাও দেওয়া হচ্ছে।
আমন মৌসুমের এই সময়ে ফরিদগঞ্জের কৃষকদের কাছে প্রতিটি ধানগাছই সম্ভাব্য খাদ্য, আয় ও পরিবারের নিরাপত্তার প্রতীক। একটি গাছ কেটে পড়া মানে শুধু জমির ক্ষতি নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে কৃষকের শ্রম, বিনিয়োগ ও বুকভরা প্রত্যাশা। তাই ইঁদুরের আক্রমণ তাদের কাছে নিছক মাঠের সমস্যা নয়, এটি ফসল ঘরে তোলার নিশ্চয়তা নিয়েও বড় উদ্বেগ।
একদিকে ইঁদুরের উপদ্রব, অন্যদিকে কৃষি বিভাগের সীমিত জনবল—দুয়ের চাপে মাঠপর্যায়ে কৃষিসেবা কতটা কার্যকরভাবে পৌঁছাবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। কৃষকেরা চান, ক্ষতিগ্রস্ত জমি পরিদর্শন, ইঁদুর দমনে কার্যকর পরামর্শ এবং সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট বিভাগ তাদের পাশে দাঁড়াক। ফরিদগঞ্জের মাঠে এখনো সবুজ ধানের গাছ দুলছে, কৃষকেরাও হাল ছাড়েননি। তাদের আশা, সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া গেলে ক্ষতি কমিয়ে ফসল ঘরে তোলা সম্ভব হবে। কিন্তু সেই আশাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে মাঠের সমস্যার দ্রুত সমাধানের পাশাপাশি কৃষকের দোরগোড়ায় কৃষিসেবা পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। কারণ, আমনের মাঠে ইঁদুরের থাবা যতটা ভয় ধরাচ্ছে, তার চেয়ে বড় ভয়—সারা মৌসুমের পরিশ্রম শেষে কৃষকের ঘরে কাঙ্ক্ষিত ধান উঠবে তো?
ডিসিকে /এমজেডএইচ








