মঙ্গলবার, ১৯ মে, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ১৮ মে ২০২৬, ২৩:০৪

‘ক্রীড়াকণ্ঠে’র মুখোমুখি ষোলঘর আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. রেজাউল করিম

ক্রীড়াচর্চা শরীরকে সচল রেখে মনকে বিকশিত করে

সেলিম রেজা
ক্রীড়াচর্চা শরীরকে সচল রেখে মনকে বিকশিত করে

মো. রেজাউল করিম। চাঁদপুর শহরের পানি উন্নয়ন বোর্ড এলাকায় অবস্থিত ষোলঘর আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় অগ্রণী একজন মানুষ। একজন ক্রীড়া-বোদ্ধাও বটে। চাঁদপুর কণ্ঠের পাক্ষিক আয়োজন ‘ক্রীড়াকণ্ঠে’র মুখোমুখি হলে তিনি ক্রীড়া বিষয়ে সবিস্তারে তাঁর ভাবনা তুলে ধরেন, যেটি নিঃসন্দেহে অনেক মূল্যবান। কিছু প্রশ্নের জবাবে তিনি তাঁর বক্তব্য তুলে ধরেছেন সুচিন্তিতভাবে।

ক্রীড়াকণ্ঠ : শিক্ষার পাশাপাশি ক্রীড়াকে আপনি প্রতিষ্ঠান প্রধান হিসেবে কতোটা গুরুত্ব দেন? দিয়ে থাকলে কেন?

মো. রেজাউল করিম : শিক্ষার পাশাপাশি ক্রীড়াকে অত্যন্ত উচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। প্রাচীন প্রবাদ আছে ‘সুস্থ দেহে সুস্থ মন’, আর এই সুস্থ দেহ গঠনের মূল চাবিকাঠি হলো খেলাধুলা। আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় একে কেবল বিনোদন নয় বরং শিক্ষার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখা হয়। ক্রীড়াকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রধান কারণগুলো তুলে ধরা হলো : শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্যে। নিয়মিত খেলাধুলা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, রক্ত সঞ্চালন সচল রাখে এবং স্থূলতা রোধ করে। মানসিক প্রশান্তি, পড়াশোনার একঘেঁয়েমি, মানসিক চাপ দূর করতে ক্রীড়া দারুণ ভূমিকা রাখে। প্রতিটি খেলার নিজস্ব নিয়ম থাকে। এই নিয়ম মেনে চলার অভ্যাস থেকে শিক্ষার্থীদের মধ্যে শৃঙ্খলা ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ তৈরি হয়। খেলায় হার-জিত থাকবেই। পরাজয় মেনে নেওয়া এবং পুনরায় ঘুরে দাঁড়ানোর শিক্ষা একজন শিক্ষার্থী খেলার মাঠ থেকেই অর্জন করে। খেলার মাঠে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ও দলকে পরিচালনা করার অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতের নেতা হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করে। ডিজিটাল স্ক্রিন-আসক্তি থেকে দূরে থাকতে খেলার বিকল্প নেই। সুতরাং শিক্ষা মানুষকে জ্ঞান দেয়, আর ক্রীড়া সেই জ্ঞান প্রয়োগের জন্যে প্রয়োজনীয় শারীরিক ও মানসিক শক্তি জোগায়। তাই একজন শিক্ষার্থীর পূর্ণাঙ্গ বিকাশের জন্যে বইয়ের পাতার পাশাপাশি খেলার প্রয়োজনীয়তা আবশ্যক। একাডেমিক পড়াশোনা এবং খেলাধুলার মধ্যে সঠিক ভারসাম্য থাকলেই একজন শিক্ষার্থী প্রকৃত অর্থে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।

ক্রীড়াকণ্ঠ : আপনার বিদ্যালয়ের মাঠের কী অবস্থা? শিক্ষার্থীদের খেলাধুলার বড়ো আয়োজন হয় কি? বার্ষিক ক্রীড়া ছাড়া আন্তঃশ্রেণী ক্রিকেট ও ফুটবল হয় কি?

মো. রেজাউল করিম : আমার বিদ্যালয়ের মাঠের অবস্থা সন্তোষজনক নয়। বিদ্যালয়ের উন্নয়ন কাজ চলমান। মাঝে মাঝে বড়ো আয়োজন করা হয়। সকল শিক্ষক ও শিক্ষার্থী খেলা উপভোগ করেন। বার্ষিক ক্রীড়া ছাড়া আন্তঃশ্রেণী ক্রিকেট ও ফুটবল খেলার আয়োজন করা হয়।

ক্রীড়াকণ্ঠ : জেলা শিক্ষা অফিসারের নির্দেশনা মোতাবেক আপনারা ক্লাবভিত্তিক, হাউজভিত্তিক ক্রীড়াচর্চায় শিক্ষার্থীদের ব্যাপৃত রাখেন কিনা?

মো. রেজাউল করিম : জেলা শিক্ষা অফিসারের নির্দেশনা মোতাবেক আমাদের বিদ্যালয়ে কাজী নজরুল ইসলাম, বেগম রোকেয়া ও জসিম উদ্দিন হাউজভিত্তিক বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

ক্রীড়াকণ্ঠ : আপনার বিদ্যালয়ে ক্রীড়া শিক্ষক আছে কিনা? তার নাম কী? তিনি বিপিএডের সনদে চাকুরি পেয়েছেন, না শিক্ষাজীবনে ভালো খেলোয়াড় হবার গুণে চাকুরি পেয়েছেন? কীভাবে চাকুরি পেয়েছেন, সেটা জানার বিষয় নয়, তিনি ক্রীড়া শিক্ষক হিসেবে কতোটুকু দায়িত্ব পালন করছেন, সেটা জানার বিষয়। জানাবেন কি?

মো. রেজাউল করিম : বিদ্যালয়ে ক্রীড়া শিক্ষক আছে। নাম মোসাম্মৎ নুরজাহান আক্তার। তিনি মোহাম্মদপুর সরকারি শারীরিক শিক্ষা কলেজ, ঢাকা থেকে বিপিএড সম্পন্ন করে শিক্ষকতা পেশায় নিযুক্ত হয়েছেন এবং তিনি একজন ভালো খেলোয়াড়ও বটে।একজন ক্রীড়া শিক্ষক তখনই সার্থক হন যখন তিনি কেবল মাঠের খেলা নয়, বরং একজন শিক্ষার্থীর জীবন গঠনে ভূমিকা রাখেন। শিক্ষার্থীর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ, নিয়মানুবর্তিতা, শৃঙ্খলা, নিয়ম মেনে চলা এবং সুশৃঙ্খলার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সঠিক সময়ে কাজ করা, জীবনযাপনে অভ্যস্ত করে তোলা, নেতৃত্বের মনোভাব, জয়-পরাজয় মেনে নেওয়ার মানসিকতা তৈরি করা এবং সবার সাথে মিলেমিশে কাজ করার বা নেতৃত্ব দেওয়ার গুণাবলি খেলার মাধ্যমে অর্জন করানোর ক্ষেত্রে কম-বেশি অবদান রাখেন।

ক্রীড়াকণ্ঠ : আপনার বিদ্যালয়ে ইনডোর গেমসের ব্যবস্থা আছে কি? এ গেমসে মেয়েরা বেশি আগ্রহী, না ছেলেরা?

মো. রেজাউল করিম : ইনডোর গেমসের ব্যবস্থা আছে, তবে ভবন বা কক্ষের স্বল্পতার কারণে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। নতুন ভবনের কাজ চলমান, আশা করি খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে ইনডোর গেমসের চর্চা গতিশীল হবে। ইনডোর গেমসের প্রতি আগ্রহের বিষয়টি লিঙ্গের চেয়ে বরং ব্যক্তিগত রুচি, পরিবেশ এবং গেমের ধরনের ওপর বেশি নির্ভর করে। ছেলেরা সাধারণত প্রতিযোগিতামূলক এবং স্ট্র্যাটেজিক ইনডোর গেমস বেশি পছন্দ করে। অন্যদিকে, মেয়েরা প্রায়ই সহযোগিতামূলক, সৃজনশীল বা সামাজিক যোগাযোগমূলক গেমস পছন্দ করে। অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক কাঠামোর কারণে মেয়েরা ঘরের বাইরের চেয়ে ভেতরে সময় বেশি কাটায়, যা তাদের ইনডোর গেমসের প্রতি আগ্রহী করে তোলে। ইনডোর গেমসে শারীরিক শক্তির চেয়ে বুদ্ধি ও ধৈর্যের প্রয়োজন বেশি হয়, যা ছেলে-মেয়ে উভয়ের জন্যেই সমান আকর্ষণীয়। তবে সুনির্দিষ্ট কোনো পক্ষকে ‘বেশি আগ্রহী’ বলা কঠিন।

ক্রীড়াকণ্ঠ : ক্রীড়াচর্চায় ঘাটতির ক্ষেত্রে মোবাইল আসক্তিকে আপনি কতোটা দায়ী করেন?

মো. রেজাউল করিম : ক্রীড়া চর্চায় ঘাটতির পেছনে মোবাইল-আসক্তি বর্তমানে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচিত। সোশ্যাল মিডিয়া, গেমিং বা ওটিটি প্ল্যাটফর্মে স্ক্রিন টাইম বেড়ে যাওয়ায় মানুষ মাঠের খেলার জন্যে পর্যাপ্ত সময় পায় না। যে সময়টুকু শারীরিক পরিশ্রম বা খেলাধুলায় ব্যয় হতে পারতো, তা মোবাইলের পেছনে খরচ হচ্ছে। মোবাইলে গেমস খেলে বা ভিডিও দেখে মস্তিষ্ক খুব সহজেই ডোপামিন নিঃসরণ করে। ফলে মাঠের খেলায় যে শারীরিক কষ্ট ও ধৈর্য প্রয়োজন, তা অনেকের কাছে এখন কম আকর্ষণীয় মনে হয়। দীর্ঘ সময় এক জায়গায় বসে বা শুয়ে মোবাইল ব্যবহারের ফলে মানুষের মধ্যে অলস জীবনযাপনের প্রবণতা তৈরি হয়। এটি মানুষকে শারীরিকভাবে দুর্বল করে তোলে এবং ব্যায়াম বা খেলার উদ্যম কমিয়ে দেয়। মাঠের ফুটবলের চেয়ে মোবাইলে ফুটবল গেম খেলা সহজ ও আরামদায়ক হওয়ায় তরুণ প্রজন্মের বড়ো একটি অংশ মাঠ থেকে বিমুখ হয়ে পড়ছে। মোবাইল-আসক্তি মানুষের মনোযোগ ও কর্মক্ষমতাকে চার দেয়ালের মাঝে আটকে ফেলছে, যা সরাসরি মাঠের ক্রীড়া চর্চায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

ক্রীড়াকণ্ঠ : শিক্ষার পাশাপাশি ক্রীড়াসহ সকল সহপাঠক্রমিক কার্যক্রম জোরদার করলে কি মোবাইল-আসক্তি দূর করা সম্ভব? এ সকল কার্যক্রম চালুতে আপনি প্রতিষ্ঠান প্রধান হিসেবে কোনো প্রতিবন্ধকতা অনুভব করেন কি? সেটা কি আর্থিক, উপকরণগত না অন্য কিছু?

মো. রেজাউল করিম : শিক্ষার পাশাপাশি ক্রীড়া ও সহপাঠক্রমিক কার্যক্রম (ঈড়-পঁৎৎরপঁষধৎ ধপঃরারঃরবং) জোরদার করা হলে মোবাইল-আসক্তি অবশ্যই দূর করা সম্ভব। মোবাইল আসক্তির মূল কারণ হলো : ‘ডোপামিন’ নামক হরমোন, যা গেম খেললে মস্তিষ্কে দ্রুত আনন্দ দেয়। খেলাধুলা বা সৃজনশীল কাজের মাধ্যমে শরীর ও মন যখন প্রাকৃতিক উপায়ে ডোপামিন উৎপন্ন করে, তখন কৃত্রিম ও ক্ষতিকর ডিজিটাল বিনোদনের প্রতি আকর্ষণ কমে যায়।

অলস সময়ের সঠিক ব্যবহার : বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা তখনই মোবাইলের প্রতি ঝুঁকে পড়ে যখন তাদের হাতে করার মতো আকর্ষণীয় কিছু থাকে না। বিতর্ক, গান, ছবি আঁকা বা স্কাউটিংয়ের মতো কার্যক্রমে লিপ্ত থাকলে মস্তিষ্ক গঠনমূলক কাজে ব্যস্ত থাকে, ফলে মোবাইলে লেগে থাকার সুযোগ পায় না।

মোবাইল আসক্তি মানুষকে একাকী করে তোলে। অন্যদিকে, দলীয় খেলাধুলা বা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের মাধ্যমে মানুষের সাথে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হয়। এটি আত্মবিশ্বাস বাড়ায় এবং ভার্চুয়াল জগতের একাকীত্ব থেকে মুক্তি দেয়।

শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি : মাঠে খেলাধুলা করলে শরীরে যে শারীরিক ক্লান্তি আসে, তা দিনশেষে গভীর ঘুমের সহায়ক হয়। পক্ষান্তরে, মোবাইলের নীল আলো ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়। শারীরিক পরিশ্রমের পর বিশ্রাম নেওয়ার প্রাকৃতিক তাগিদ মোবাইল ব্যবহারের আসক্তিকে কমিয়ে আনে।

নেতৃত্বের গুণাবলি ও শৃঙ্খলা : সহপাঠক্রমিক কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিয়মানুবর্তিতা ও শৃঙ্খলা শেখায়। যখন একজন শিক্ষার্থী কোনো লক্ষ্য অর্জনে (যেমন : ম্যাচ জেতা বা কোনো প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া) মনোনিবেশ করে, তখন তার কাছে মোবাইল ব্যবহারের চেয়ে নিজের দক্ষতা প্রমাণ করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

শুধুমাত্র শাসনের মাধ্যমে মোবাইল-আসক্তি দূর করা কঠিন। তবে বিকল্প হিসেবে যদি মাঠের খেলা, ক্লাব কার্যক্রম এবং সৃজনশীল প্রতিযোগিতাকে আকর্ষণীয় করে তোলা যায়, তবে শিক্ষার্থীরা নিজ থেকেই স্ক্রিন টাইম কমিয়ে আনবে। অর্থাৎ, বিকল্প বিনোদনই হলো আসক্তি মুক্তির সেরা দাওয়াই।

একজন প্রতিষ্ঠান প্রধানের জায়গা থেকে চিন্তা করলে, ইনডোর গেম কার্যক্রম চালুর ক্ষেত্রে আমি আর্থিক এবং উপকরণগতÑউভয় ধরণের প্রতিবন্ধকতাই অনুভব করি। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে আর্থিক সীমাবদ্ধতাই মূল বাধা হয়ে দাঁড়ায়, যা পরবর্তীকালে উপকরণ ও পরিকাঠামোগত সংকট তৈরি করে।

আর্থিক প্রতিবন্ধকতাই হলো প্রধান চ্যালেঞ্জ।

যে কোনো কার্যক্রমের ভিত্তি হলো বাজেট। ইনডোর গেমসের ক্ষেত্রে বড়ো বিনিয়োগের প্রয়োজন হয়। শহর অঞ্চলে একটি প্রতিষ্ঠানের ভেতরে বড়ো কক্ষ বা হল রুম তৈরি করা অত্যন্ত ব্যয়সাপেক্ষ। অনেক সময় জায়গার অভাবে টেবিল টেনিস বা ব্যাডমিন্টনের মতো গেম সেটআপ করা সম্ভব হয় না।

ইনডোর গেমসের সরঞ্জামগুলো নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করতে হয়, যার জন্যে আলাদা তহবিলের প্রয়োজন।

অর্থ থাকলেও অনেক সময় সঠিক উপকরণের অভাবে মানসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করা যায় না।

মানসম্মত সরঞ্জামের অভাবও রয়েছে। স্থানীয় বাজারে অনেক সময় পেশাদার মানের স্পোর্টস গিয়ার পাওয়া যায় না, যা শিক্ষার্থীদের প্রকৃত দক্ষতা অর্জনে বাধা দেয়।

অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে একটি কক্ষকে একাধিক কাজে (ক্লাসরুম বা সেমিনার হল) ব্যবহার করতে হয়। ফলে স্থায়ীভাবে কোনো গেমের সরঞ্জাম সেটআপ করে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

আর্থিক ও উপকরণ ছাড়াও কিছু পরোক্ষ বাধা থাকেÑপ্রশিক্ষকের অভাব : শুধু সরঞ্জাম থাকলেই হয় না, শিক্ষার্থীদের নিয়ম শেখানোর জন্যে দক্ষ গাইড বা ফিজিক্যাল ইনস্ট্রাক্টরের প্রয়োজন হয়, যা নিয়োগ করা অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্যে বাড়তি বোঝা। অনেক সময় অভিভাবক এবং কর্তৃপক্ষ পড়াশোনার চাপে সহপাঠক্রমিক কাজকে ‘সময় অপচয়’ মনে করেন, যা বাজেট বরাদ্দে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

আমি মনে করি, প্রতিবন্ধকতাটি মূলত সমন্বিত। তবে অর্থায়ন ঠিক থাকলে উপকরণ বা জায়গার সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। একটি ছোট প্রতিষ্ঠান যেখানে জায়গা কম, সেখানে বড়ো বাজেটের ইনডোর সেটআপের চেয়ে দাবার মতো বুদ্ধিভিত্তিক গেম দিয়ে শুরু করা বুদ্ধিমানের কাজ। একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ইনডোর গেমসের জন্যে আলাদা বাজেট রাখা কি বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত?

ক্রীড়াকণ্ঠ : ‘সুস্থ দেহে সুস্থ মন’ এ প্রবাদের যথার্থতায় ক্রীড়ার ভূমিকা কী?

মো. রেজাউল করিম : ‘সুস্থ দেহে সুস্থ মন’Ñএই প্রবাদটি শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের গভীর আন্তঃসম্পর্ককে প্রকাশ করে। আমাদের মন এবং শরীর আলাদা কোনো সত্তা নয়, বরং একটি অপরটির ওপর নির্ভরশীল। এই সমীকরণটি বজায় রাখতে ক্রীড়া বা খেলাধুলা অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।

এর যথার্থতায় ক্রীড়ার ভূমিকা অনস্বীকার্যÑ

১. শারীরিক সুস্থতা ও মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা

খেলাধুলা করলে শরীরে রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি পায় এবং মস্তিষ্কে অক্সিজেনের সরবরাহ বাড়ে। যখন শরীর কর্মক্ষম থাকে, তখন শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী হয়। একটি রোগমুক্ত শরীর মনকে প্রফুল্ল রাখতে সাহায্য করে, কারণ শারীরিক অসুস্থতা অনেক সময় মানসিক অবসাদের জন্ম দেয়।

২. হরমোনের প্রভাব ও মানসিক প্রশান্তি

শারীরিক ব্যায়াম বা ক্রীড়ার সময় মস্তিষ্ক থেকে এন্ডোরফিন, ডোপামিন এবং সেরোটোনিন নামক হরমোন নিঃসৃত হয়। এগুলোকে ‘হ্যাপি হরমোন’ বলা হয়, যা সরাসরি মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা এবং বিষণ্নতা কমিয়ে মনের সজীবতা বজায় রাখে। ৩. মাঠের খেলায় হার-জিত থাকে। জয় যেমন আনন্দ দেয়, পরাজয় তেমনি ধৈর্য ও ঘুরে দাঁড়ানোর শিক্ষা দেয়। এই শৃঙ্খলা এবং হার না মানার মানসিকতা একজন ব্যক্তির আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়। আত্মবিশ্বাসী মানুষ মানসিকভাবে সবসময় সুস্থ ও স্থিতিশীল থাকে।

৪. ক্রীড়া চর্চা মানুষকে দলগতভাবে কাজ করতে শেখায়। যখন মানুষ অন্যদের সাথে মেলামেশা করে এবং সামাজিক বন্ধনে আবদ্ধ হয়, তখন তার একাকীত্ব বা নিঃসঙ্গতা দূর হয়। সামাজিক সুস্থতা মানসিক স্বাস্থ্যের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।

৫. দাবা, টেবিল টেনিস বা ফুটবলের মতো খেলাগুলোতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন হয়। এটি মানুষের মনোযোগ বৃদ্ধি করে। সুস্থ দেহে যখন এই তীক্ষ্ণ বুদ্ধির বিকাশ ঘটে, তখনই প্রবাদটি সার্থকতা পায়। ৬. শরীর যদি যন্ত্র হয়, তবে মন হলো তার চালক। যন্ত্র অকেজো থাকলে চালক যেমন অসহায় হয়ে পড়ে, ঠিক তেমনি শরীর অসুস্থ থাকলে মনের পক্ষে সৃজনশীল বা ইতিবাচক হওয়া অসম্ভব। ক্রীড়া চর্চা শরীরকে সচল রেখে মনকে বিকশিত হওয়ার উপযুক্ত ক্ষেত্র তৈরি করে দেয়। এজন্যেই বলা হয়, সুস্থ মন পেতে হলে সুস্থ দেহের বিকল্প নেই, আর সুস্থ দেহের জন্য ক্রীড়ার বিকল্প নেই।

ক্রীড়াকণ্ঠ : উপরের প্রশ্নমালার বাইরে আপনার অন্য কোনো বক্তব্য থাকলে বিবৃত করতে পান।

মো. রেজাউল করিম : ইনডোর গেম ও সহপাঠক্রমিক কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশ, নেতৃত্বগুণ, শৃঙ্খলা ও সামাজিক দক্ষতা উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ বিষয়ে আমার মতামত হলোÑ১. বিদ্যালয়ে নিয়মিত ইনডোর গেম যেমন দাবা, লুডু, ক্যারাম, টেবিল টেনিস ইত্যাদির আয়োজন করা। এতে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ, ধৈর্য ও কৌশলগত চিন্তাশক্তি বৃদ্ধি পাবে। ২. সহপাঠ্যক্রম কার্যক্রম যেমন বিতর্ক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, স্কাউটিং, কুইজ প্রতিযোগিতা ও বিজ্ঞান মেলার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়া। ৩. পড়ালেখার পাশাপাশি এসব কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ কমাতে সহায়তা করে এবং বিদ্যালয়ের প্রতি আগ্রহ বাড়ায়। ৪. নিয়মিত প্রতিযোগিতা ও পুরস্কারের ব্যবস্থা করলে শিক্ষার্থীরা আরও উৎসাহিত হবে। ৫. শিক্ষক ও অভিভাবকদের সক্রিয় সহযোগিতা থাকলে এসব কার্যক্রম আরও ফলপ্রসূ ও শিক্ষার্থী বান্ধব হবে।

সর্বোপরি, ইনডোর গেম ও সহপাঠ্যক্রম কার্যক্রম একজন শিক্ষার্থীকে শুধু ভালো শিক্ষার্থী নয়, বরং একজন দক্ষ, সৃজনশীল ও আত্মবিশ্বাসী মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা করে। এ কার্যক্রম ফলপ্রসূ করতে হলে আর্থিক সহযোগিতা প্রয়োজন।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়