প্রকাশ : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০২:১২
চাঁদপুর-৩ আসনে জামায়াত প্রার্থীর নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চাঁদপুর-৩ (চাঁদপুর সদর-হাইমচর) আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট মনোনীত প্রার্থী অ্যাডভোকেট মো. শাহজাহান মিয়া তাঁর নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছেন। সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) সন্ধ্যায় চাঁদপুর প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে তিনি যে ইশতেহার ঘোষণা করেন, সেটি হচ্ছে : বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
|আরো খবর
আসসালামুয়ালাইকুম।
আশা করি আপনারা সবাই ভালো আছেন। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আপনারা সৎ, যোগ্য ও নির্ভরযোগ্য প্রার্থীকে নির্বাচিত করবেন বলে আমি বিশ্বাস করি।
চাঁদপুর একটি সম্ভাবনাময় জেলা। পদ্মা মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদী পরিবেষ্টিত চাঁদপুর সদর-হাইমচর এলাকা নিয়ে চাঁদপুর-৩ নির্বাচনী এলাকা। এই নদী একদিকে আমাদের দুঃখ। অন্যদিকে আশীর্বাদ। দুঃখ এ জন্যে যে, নদী ভাঙ্গনের ফলে চাঁদপুর শহর থেকে শুরু করে উত্তরে মতলব উত্তর ও হাইমচর পর্যন্ত ভাঙ্গনের ফলে বহু পরিবার নিঃস্ব হয়েছে, বহু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। বিভিন্ন সয়য়ে ব্লক ফেলে নদী ভাঙ্গনরোধের চেষ্টা হলেও যারা এই কাজের সঙ্গে যারা জড়িত ছিলো তারা লাভবান হতে গিয়ে ক্ষতি হয়েছে সাধারণ মানুষের। অন্যদিকে বালু সিন্ডিকেটের কারণে নদী ভাঙ্গন আরো ত্বরান্বিত হয়েছে। এসব কারণে এই নদী আমাদের দুঃখ। অন্যদিকে আশীর্বাদ এ জন্যে যে, বৃটিশ আমল থেকে এই নদীই চাঁদপুরকে বাণিজ্যিক নদী বন্দর হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। আপনারা জানেন, আমাদের এই নির্বাচনী এলাকার মানুষের চাওয়া পাওয়াগুলো খুব বেশি না। তারা চায় নিরাপত্তা, সম্মানজনক জীবন জীবিকা। তারা চায় মত প্রকাশের স্বাধীনতা, নিরাপদে ঘরে ফেরার নিশ্চয়তা। তারা চায় সন্তানকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা। তারা চায় অনাচার, অবিচার, সামাজিক বৈষম্য, দুর্নীতি ও সন্ত্রাসমুক্ত স্বাভাবিক জীবনের নিশ্চয়তা। আমি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে, আপনাদের সন্তান, আপনাদের ভাই হিসেবে সাধারণ মানুষের সেই চাওয়াগুলো পূর্ণতা দিতে অঙ্গীকারাবদ্ধ। আমি বিশ্বাস করি, যতোটুকু কাজ আপনাদের দিতে পারবো, আপনাদের জন্যে যতোটুকু সেব্য নিশ্চিত করতে পারবো, আপনারা আমাকে ভোটে নির্বাচিত করলে একজন সেবক হিসেবে তা করার জন্যে আমি আমার সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করবো। আমি জানি, এই এলাকার মানুষের সমস্যা কী, কীভাবে একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে তা সমাধানের জন্যে উদ্যোগী হতে হবে--সেই অভিজ্ঞতাও আলহামদুলিল্লাহ আছে। এই প্রত্যাশা সামনে রেখে আমি আমার নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করছি।
*ইশতেহার* : ১. চাঁদপুরকে একটি পর্যটন নগরী গড়ে তোলার জন্যে আমি আমার তরফ থেকে সব ধরনের উদ্যোগ নেবো ইনশাআল্লাহ। এটি করা গেলে চাঁদপুরে নতুন করে বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। শুধু দেশ নয়, বিদেশে চাঁদপুরের উজ্জ্বল ভাবমূর্তি ও চাঁদপুরে পর্যটকদের আগমনের জন্যে একটি সুপ্রশন্ত পথ উন্মুক্ত হবে। অর্থনৈতিকভাবে উন্নত হবে জেলা এবং জেলার মানুষ। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে মেরিন ড্রাইভের আদলে তিন নদীর মিলনস্থল থেকে মতলব-মুন্সীগঞ্জের সাথে সংযোগ সড়ক নির্মাণ করে রাজধানীর সাথে দূরত্ব কমিয়ে আনার জন্যে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে। ২. সমাজে শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখতে
নৈতিকতাসম্পন্ন নাগরিক গড়ে তোলার জন্যে আরও একাধিক বিদ্যালয় গড়ে তোলা। ৩. চাঁদপুর শহরে পৌর ঈদগাহ ছোট হওয়ায় ঈদের নামাজ ও কেউ মারা গেলে তার জানাজার জন্যে স্থান সংকুলান হয় না। তাই শহরের আশেপাশে একটি বড়ো ঈদগাহ করার জন্যে উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। ৪. চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় পূর্ণাঙ্গ রূপ এবং চাঁদপুর মেডিকেল কলেজ পূর্ণাঙ্গভাবে স্থাপনের জন্যে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। যাতে করে শুধু চাঁদপুর নয়, দেশের অন্যপ্রান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার সুযোগ পাবে। ৫.
চাঁদপুর-কক্সবাজার রুটে যাত্রীদের এবং ভ্রমণ পিপাসুদের সুবিধার জন্যে সরাসরি চাঁদপুর-কক্সবাজার রেল যোগাযোগ বাস্তবায়ন করা হবে। ৬. ইলিশের বাড়ি চাঁদপুরের ঐতিহ্য রক্ষায় ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং দেশে-বিদেশে রপ্তানিযোগ্য হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হবে। ৭. চাঁদপুরে একটি স্টেডিয়াম রয়েছে, কিন্তু ফুটবল খেলার জন্যে কোনো প্রশস্ত মাঠ নেই। শহরের আশেপাশে একটি খেলার মাঠ তৈরি এবং পুরাণবাজারের খেলার মাঠ সংস্কার ও নতুন একটি মাঠ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে। ৮. হাইমচরকে পৌরসভা রূপান্তরের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে এবং একই সাথে যে জলাবদ্ধতা রয়েছে তা নিরসন করা হবে। ৯. মসজিদভিত্তিক প্রকল্প গ্রহণ করা হবে-- ইমাম, মুয়াজ্জিনদের আর্থ সামাজিক সুযোগ সুবিধা, প্রতি মসজিদে উন্নতমানের খাটিয়া এবং মৃত ব্যক্তির দাফন কাফনের আধুনিক সরঞ্জামাদি সরবরাহ করা হবে। ১০. মননশীল, সৃজনশীল এবং মানবিক নাগরিক তৈরির লক্ষ্যে প্রতি ইউনিয়ন পর্যায়ে একটি করে পাঠাগার তৈরি করা হবে। ১১. কিশোর গ্যাং ও মাদকমুক্ত সমাজ গঠনের লক্ষ্যে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। মাদকের ছোবল থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের স্থানীয় দপ্তর ও প্রশাসনের সহায়তায় প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে। ১২. যে সময়ে এবং যে পরিকল্পনায় চাঁদপুর শহর গড়ে তোলা হয়েছিল সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেখা যাচ্ছে, শহরটি সবার বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠছে। এখানে যানজটে মানুষের জীবন নাকাল। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্যে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রথম শ্রেণীর পৌরসভা হিসেবে চাঁদপুর পৌরসভায় পরিকল্পিত নগরায়ন, রাস্তাঘাটগুলো প্রশস্তকরণ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে উন্নত বিশ্বের আদলে নিয়ে আসার জন্যে উদ্যোগ নেওয়া হবে। সেই সঙ্গে শহরের ওপর চাপ কমানোর লক্ষ্যে শহরকে বিকেন্দ্রীকরণের জন্যে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে। এর জন্যে শহরে বিকল্প বাইপাস সড়ক নির্মাণ করা হবে।
সুশাসন, জবাবদিহিতা নিশ্চিকরণ এবং দুর্নীতি, চাঁদাবাজি বন্ধে যথোপযুক্ত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। যাতে সর্বস্তরের মানুষের মাঝে স্বস্তি আসে এবং ব্যবসায়ীরা নির্বিঘ্নে তাদের ব্যবসা বাণিজ্য পরিচালনা করতে পারেন। ১৪. নদীবেষ্টিত এলাকাকে পরিকল্পিতভাবে বাঁধ নির্মাণ করে ভাঙ্গনের কবল থেকে রক্ষা করার জন্যে যথোপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
১৫. আমার নির্বাচনী
এলাকার রাজরাজেস্বর, চরমেয়াশা এবং মাঝের চর এলাকাকেও পর্যটন এলাকার আওতায় আনা হবে। এর অংশ হিসেবে যতোটুকু উন্নয়ন দরকার তা করা হবে। ১৬. প্রথম শ্রেণীর পৌরসভা হিসেবে চাঁদপুর পৌরসভায় পরিকল্পিত নগরায়ন হিসেবে গড়ে তোলার জন্যে রাজঘাটগুলো প্রশস্তকরণ এবং বৰ্জ্য ব্যবস্থাপনাকে উন্নত বিশ্বের আদলে নিয়ে আসা। ১৭. দলমত নির্বিশেষে সকল ধর্মবর্ণের মানুষের জন্যে নিরাপদ ও বসবাস উপযোগী চাঁদপুর গড়ে তোলার জন্যে আমার তরফ থেকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে। ১৮. চাঁদপুর নদীতীরকে কেন্দ্র করে বন্ধ শিল্প
কলকারখানা খোলার ব্যবস্থার পাশাপাশি নতুন শিল্প কারখানা গড়ে তুলতে দেশী বিদেশী সংস্থাকে নিয়ে আসবো। এর মাধ্যম বেকারত্ব ঘুচবে। ১৯. ইলিশ ও নদী রক্ষায় বালু সিন্ডিকেটের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা বন্ধ করা হবে।
২০. পান সুপারির জন্যে
প্রসিদ্ধ হাইমচর আজ হারিয়ে যাওয়ার পথে। এই শিল্প জাতীয় অর্থনীতিতে যেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে সে ব্যবস্থা করা হবে। ২১. বয়স্ক ও শিশুদের জন্যে পার্ক নির্মাণ করা হবে। ২২. পৌর মেয়র এবং উপজেলা পরিষদের সাথে সমন্বয় করে সকল প্রকার উন্নয়ন কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে। ২৩. বয়স্ক ও বিধবা নারীদের জন্যে সরকারি বরাদ্দ শতভাগ বাস্তবায়ন করা হবে। ২৪. শিক্ষিত তরুণ প্রজন্মের জন্যে কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্যে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম, আইসিটি খাত থেকে প্রকল্প গ্রহণসহ অন্যান্য কার্যক্রম হাতে নেওয়া হবে। যাতে তাদের বেকার থাকতে না হয়। ২৫. আইনশৃঙ্খলা সহনীয় রাখতে আমার তরফ থেকে সার্বক্ষণিক তদারকি জোরদার করা হবে এবং গরিবের জন্যে সরকারি সেবার পাশাপাশি বেসরকারিভাবে আইনি সেবা দেওয়া হবে। ২৬. চাঁদাবাজ, দখলবাজদের রুখে দেওয়ার জন্যে 'পাহারাদার' অ্যাপস এবং রাষ্ট্রীয় সকল আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়ন্ত্রণের জন্যে 'আমার টাকা আমার হিসাব' বাস্তবায়ন করা হবে।
উপরোক্ত কাজগুলো বাস্তবায়ন করা হলে আমার নির্বাচনী এলাকার চাঁদপুর সদর-হাইমচরকে দেশের একটি মডেল এলাকা হিসেবে তুলে ধরা হবে।
ইশতেহারে যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলো, এগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়নে গুরুত্ব দেবো ইনশাআল্লাহ।
অঙ্গীকারে--অ্যাড. মো. শাহজাহান মিয়া,
সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী,
২৬২ চাঁদপুর-৩ (চাঁদপুর সদর-হাইমচর) আসন।
প্রতীক-দাঁড়িপাল্লা।
ইশতেহার ঘোষণা সংক্রান্ত সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন চাঁদপুর প্রেসক্লাব সভাপতি সোহেল রুশদী। পরিচালনা করেন শহর জামাতের আমীর অ্যাড. মো. শাহজাহান খান।
বক্তব্য রাখেন এনসিপি চাঁদপুর জেলা আহ্বায়ক মো. মাহবুবুল আলম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস চাঁদপুর জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ, সদর উপজেলা জামাতের আমীর আফসার উদ্দিন মিয়াজি প্রমুখ। সংবাদ সম্মেলনে
বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার প্রতিনিধিগণ, জামায়াতে ইসলামী ও ১১ দলীয় জোটের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে সংবাদ সম্মেলনের কার্যক্রম শুরু হয়।
বিসিকে/এমজেডএইচ








