প্রকাশ : ১৭ আগস্ট ২০২৬, ০৪:৪১
“যাকে মৃত ঘোষণা করা হয়েছিল, তিনিই আজ রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী টেবিলে”

২২ ডিসেম্বরের মৃত্যুঘোষণা থেকে নয়াপল্টনের ৭৮৭ দিন—সংগ্রাম, সংগঠন ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার এক বিরল উপাখ্যান
|আরো খবর
বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনেক নেতা এসেছেন, আন্দোলন করেছেন, ক্ষমতার কাছাকাছি গেছেন, আবার সময়ের স্রোতে হারিয়েও গেছেন। কিন্তু কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের জীবন কেবল পদ-পদবির তালিকা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। তাদের জীবন হয়ে ওঠে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সময়ের দলিল।
রুহুল কবির রিজভী আহমেদ সেই ধরনেরই একজন রাজনৈতিক চরিত্র। ছাত্ররাজনীতি থেকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু, রাজপথের গুলিবিদ্ধ শরীর থেকে দীর্ঘ কারাবন্দিত্ব, নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে টানা ৭৮৭ দিনের অবস্থান থেকে জাতীয় নির্বাচন পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী কাঠামোর অংশ হওয়া—তার রাজনৈতিক পথচলায় রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রাম ও দায়িত্ব পালনের ধারাবাহিকতা।
তার রাজনৈতিক জীবনের মূল্যায়ন তাই শুধু তিনি কোন পদে ছিলেন, তার হিসাব দিয়ে করা যায় না। বরং দেখতে হয়—প্রতিকূল রাজনৈতিক সময়ে তিনি কতটা সংগঠিত ছিলেন, কতটা ধারাবাহিকভাবে দলীয় অবস্থান তুলে ধরেছেন এবং দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে কী ভূমিকা রেখেছেন।
শৈশব-কৈশোরের জনপদ থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মতিহার
রুহুল কবির রিজভীর জন্ম ঢাকার হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে। তার পৈতৃক শিকড় কুড়িগ্রামে। শৈশব ও শিক্ষাজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি বগুড়া ও কুড়িগ্রামে পড়াশোনা করেন। পরবর্তীতে রাজশাহী কলেজ ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাজীবন তার রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিভিন্ন জীবনীমূলক প্রতিবেদনে তার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা এবং ইতিহাসে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি তিনি আইন বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।
আইন বিষয়ে তার আগ্রহ পরবর্তী জীবনেও অব্যাহত ছিল। তিনি আইন পেশার সঙ্গে যুক্ত হন এবং পরবর্তীতে এলএলএম সম্পন্ন করেন। এমনকি ২০২৩ সালে কারাবন্দি অবস্থায়ও আদালতের অনুমতি নিয়ে এলএলএম পরীক্ষায় অংশ নেন।
শিক্ষা, আইন, সাংবাদিকতা ও রাজনীতির অভিজ্ঞতার সমন্বয় তার রাজনৈতিক বক্তব্য ও গণমাধ্যমে দলীয় অবস্থান ব্যাখ্যার ধরনকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে。
বামপন্থী ছাত্ররাজনীতি থেকে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতৃত্বে
রুহুল কবির রিজভীর রাজনৈতিক জীবনের সূচনা হয়েছিল ‘বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়ন’-এর মাধ্যমে। বিভিন্ন জীবনীমূলক প্রতিবেদনে তাকে রাজশাহী সরকারি কলেজ শাখার সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তীতে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখায় গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করেন এবং ধীরে ধীরে কেন্দ্রীয় ছাত্ররাজনীতির নেতৃত্বে উঠে আসেন।
এই পর্যায়টি ছিল বাংলাদেশের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের উত্তাল সময়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় তখন রাজনৈতিক আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। সেই পরিবেশেই রিজভীর নেতৃত্বের রাজনৈতিক ভিত শক্ত হয়。
রাকসুর শেষ নির্বাচনের ভিপি: ১৯৮৯-এর ঐতিহাসিক অধ্যায়
রুহুল কবির রিজভীর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছাত্রনেতৃত্বের স্বীকৃতিগুলোর একটি আসে ১৯৮৯ সালের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ—রাকসু নির্বাচনে।
১৯৮৯–৯০ মেয়াদের রাকসুর সর্বশেষ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের প্রার্থী হিসেবে রুহুল কবির রিজভী আহমেদ সহসভাপতি—ভিপি নির্বাচিত হন। এরপর দীর্ঘ সময় রাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। বিভিন্ন সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে তাকে রাকসুর সর্বশেষ নির্বাচিত ভিপি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই পদটি শুধু একটি ছাত্রসংসদীয় পদ ছিল না; এটি ছিল তৎকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতায় একজন তরুণ নেতার গ্রহণযোগ্যতার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ。
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মতিহার চত্বর থেকেই তার জাতীয় পর্যায়ের নেতৃত্বের ভিত্তি আরও দৃঢ় হয়。
২২ ডিসেম্বর: যে দিন তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়েছিল
রুহুল কবির রিজভীর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে আলোচিত ও বেদনাবিধুর অধ্যায়গুলোর একটি ১৯৮৪ সালের ২২ ডিসেম্বর।
এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি গুলিবিদ্ধ হন। পরে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়েছিল বলে তিনি নিজেই বিভিন্ন অনুষ্ঠানে স্মৃতিচারণ করেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, পরদিন ভয়েস অব আমেরিকার সংবাদে জানা যায় যে তিনি মারা যাননি; বরং গুরুতর আহত অবস্থায় মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছেন。
সেই গুলির ক্ষত তার শরীরে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। তার স্ত্রীও পরবর্তীতে জানিয়েছেন, গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর দেশে-বিদেশে চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের মধ্য দিয়ে তাকে যেতে হয়েছে এবং দীর্ঘদিন ধরে তার খাদ্যগ্রহণেও বিশেষ বিধিনিষেধ রয়েছে。
এই ঘটনা তার রাজনৈতিক জীবনে একটি প্রতীকী বাঁক তৈরি করে। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরও তিনি রাজনীতি থেকে সরে যাননি। বরং পরবর্তী সময়ের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তার উপস্থিতি আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে。
ছাত্রনেতা থেকে জাতীয় সংগঠক
রাকসুর ভিপি হওয়ার পর রিজভীর রাজনৈতিক পরিচয় আর শুধু বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক থাকেনি। তিনি জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে আসেন এবং পরবর্তীতে বিএনপির জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করেন。
দীর্ঘ সময় ধরে তিনি বিএনপির মুখপাত্র হিসেবে গণমাধ্যমের সামনে দলীয় বক্তব্য তুলে ধরেছেন। রাজনৈতিক সংকট, আন্দোলন, মামলা, গ্রেপ্তার কিংবা নির্বাচন—প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনায় সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে দলের অবস্থান ব্যাখ্যা করা তার রাজনৈতিক পরিচয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়。
এ কারণেই বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সাংবাদিকতার পরিসরে ‘নয়াপল্টনের সংবাদ সম্মেলন’ এবং রুহুল কবির রিজভীর নাম অনেক সময় প্রায় সমার্থক হয়ে উঠেছিল。
লাঠি ভর করে মিছিলে রুহুল কবির রিজভী — সংগৃহীত
মামলার পর মামলা, গ্রেপ্তারের পর গ্রেপ্তার
বিএনপির দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলনের সময় রুহুল কবির রিজভীও মামলা ও গ্রেপ্তারের মুখোমুখি হয়েছেন। বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে বিপুলসংখ্যক রাজনৈতিক মামলার কথা উঠে এসেছে। ২০২৩ সালের বিভিন্ন প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা প্রায় ১৮০ থেকে ২০০-এর কাছাকাছি বলে উল্লেখ করা হয়。
২০২২ সালের ডিসেম্বরে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে পুলিশের অভিযানের সময় তাকেও আটক করা হয়। পরে তাকে বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয় এবং কয়েক মাস কারাবন্দি থাকতে হয়。
কারাবন্দিত্বের মধ্যেও তার রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক ভূমিকা নিয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত ছিল。
নয়াপল্টনের ৭৮৭ দিন: রাজনীতির এক ব্যতিক্রমী অধ্যায়
রুহুল কবির রিজভীর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি হলো বিএনপির নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে টানা ৭৮৭ দিনের অবস্থান。
২০১৮ সালের ৩০ জানুয়ারি তিনি বাসা ছেড়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অবস্থান শুরু করেন। ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়া কারাবন্দি হওয়ার পর তার এই অবস্থান আরও রাজনৈতিক তাৎপর্য পায়। অবশেষে ২০২০ সালের ২৬ মার্চ, খালেদা জিয়ার মুক্তির পর তিনি দলীয় কার্যালয় থেকে বাসায় ফিরে যান。
এই সময়টিতে নয়াপল্টনের কার্যালয়ই হয়ে ওঠে তার কার্যত বাসস্থান। ঈদসহ বিভিন্ন সময়ও তিনি সেখানে অবস্থান করেন। নিয়মিত সংবাদ সম্মেলন করেন, দলীয় কর্মসূচি নিয়ে কথা বলেন এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে বিএনপির বক্তব্য গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরেন。
নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী — সংগৃহীত
একটি রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে টানা ৭৮৭ দিন অবস্থান—বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে নিঃসন্দেহে একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা。
একটি ছোট কক্ষ থেকে প্রতিদিনের রাজনৈতিক বার্তা
নয়াপল্টনের সেই সময়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক ছিল—রিজভীর political উপস্থিতি।
রাজনৈতিক অস্থিরতা, মামলা ও গ্রেপ্তারের মধ্যেও তিনি নিয়মিত গণমাধ্যমের সামনে উপস্থিত হতেন। কখনো দিনে একাধিক সংবাদ সম্মেলনও করেছেন বলে সমসাময়িক প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে。
ফলে তার জন্য সংবাদ সম্মেলনের টেবিল শুধু গণমাধ্যমকে তথ্য দেওয়ার জায়গা ছিল না; সেটিই হয়ে উঠেছিল দলীয় রাজনৈতিক অবস্থান প্রকাশের অন্যতম প্রধান মঞ্চ。
২০১৬ থেকে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের আরও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়
২০১৬ সালে বিএনপির পুনর্গঠিত কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে রুহুল কবির রিজভী সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে দায়িত্বে থাকেন। পরবর্তী বছরগুলোতে তিনি দলের অন্যতম প্রধান মুখপাত্র ও সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় নেতাদের একজন হিসেবে পরিচিতি ধরে রাখেন। ২০১৬ সালের কেন্দ্রীয় পদায়নের সংবাদেও তার সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছিল。
দীর্ঘ সময় ধরে একই সঙ্গে সাংগঠনিক দায়িত্ব ও গণমাধ্যমে দলীয় অবস্থান তুলে ধরার কারণে বিএনপির কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে তার একটি স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি হয়。
২০২৬: আন্দোলনের মুখপাত্র থেকে জাতীয় নির্বাচন পরিচালনার কেন্দ্রে
রিজভীর রাজনৈতিক জীবনের নতুন একটি অধ্যায় শুরু হয় ২০২৬ সালে。
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনার জন্য বিএনপি ৪১ সদস্যের নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করে। ওই কমিটির চেয়ারম্যান করা হয় দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানকে এবং সদস্যসচিব করা হয় সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকে。
এই দায়িত্ব তার রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়。
দীর্ঘদিন যিনি মূলত আন্দোলন, সংগঠন ও দলীয় বক্তব্যের সামনের সারিতে ছিলেন, এবার তাকে জাতীয় নির্বাচনের মতো বৃহৎ political ও সাংগঠনিক কার্যক্রমের সমন্বয়ের দায়িত্ব নিতে হয়。
প্রার্থী না হয়ে বৃহত্তর সাংগঠনিক দায়িত্ব
নির্বাচনী রাজনীতিতে ব্যক্তিগত প্রার্থী হওয়ার চেয়ে সামগ্রিক সংগঠন ও নির্বাচনী কর্মকাণ্ডের সমন্বয়ও যে গুরুত্বপূর্ণ—রিজভীর ২০২৬ সালের ভূমিকা সেই বাস্তবতাকে সামনে আনে。
তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে এটি একটি উল্লেখযোগ্য বৈপরীত্য—একদিকে তিনি দীর্ঘদিনের মাঠের আন্দোলনের পরীক্ষিত নেতা, অন্যদিকে জাতীয় নির্বাচনের সাংগঠনিক ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনকারী কেন্দ্রীয় নেতা。
রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী কাঠামোয় নতুন পরিচয়
২০২৬ সালে রিজভীর রাজনৈতিক জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে。
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সরকারি ওয়েবসাইটে তাকে “রাজনৈতিক উপদেষ্টা এবং উপদেষ্টা, শিল্প মন্ত্রণালয় (মন্ত্রী পদমর্যাদা)” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সরকারি তথ্যটি ৩০ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত হালনাগাদ ছিল。
অর্থাৎ দীর্ঘদিন বিরোধী রাজনীতির অন্যতম সক্রিয় মুখ হিসেবে পরিচিত রিজভী এখন রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী কাঠামোরও অংশ。
শিল্প মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব তার রাজনৈতিক জীবনের আরেকটি নতুন অধ্যায় খুলে দিয়েছে。
প্রতিবাদ থেকে দায়িত্বে—রাজনীতির দীর্ঘ রূপান্তর
রিজভীর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় সম্ভবত এখানেই。
একসময় তিনি ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা। পরে রাকসুর ভিপি। তারপর ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। এরপর বিএনপির কেন্দ্রীয় সংগঠক ও মুখপাত্র। দীর্ঘ আন্দোলনে মামলা ও কারাবন্দিত্বের মুখোমুখি হয়েছেন। নয়াপল্টনে টানা ৭৮৭ দিন অবস্থান করেছেন。
আর ২০২৬ সালে এসে তিনি জাতীয় নির্বাচন পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব এবং রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণী কাঠামোর দায়িত্বে。
এই দীর্ঘ যাত্রাকে তাই এক কথায় বলা যায়—প্রতিবাদ থেকে দায়িত্বে, রাজপথ থেকে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী টেবিলে。
রিজভীর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় প্রতীক—অবিচল উপস্থিতি
রাজনীতিতে জনপ্রিয়তা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে। পদও পরিবর্তিত হয়। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিকভাবে দৃশ্যমান থাকা একটি ভিন্ন ধরনের সক্ষমতা。
রুহুল কবির রিজভীর ক্ষেত্রে সেই সক্ষমতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো—অবিচল উপস্থিতি。
১৯৮০-এর দশকের ছাত্ররাজনীতি থেকে শুরু করে ১৯৮৯ সালের রাকসু নির্বাচন, ১৯৮৪ সালের গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা, পরবর্তী জাতীয় রাজনীতি, দীর্ঘ মামলা-কারাবন্দিত্ব, নয়াপল্টনের ৭৮৭ দিন এবং ২০২৬ সালের নির্বাচনী ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব—প্রতিটি পর্যায়েই তিনি কোনো না কোনোভাবে রাজনৈতিকভাবে দৃশ্যমান থেকেছেন。
একজন রাজনৈতিক নেতার জীবনে সময়ের আশ্চর্য বাঁক
১৯৮৪ সালে যার জীবনের জন্য মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়েছিল, সেই মানুষই পরবর্তী চার দশক ধরে রাজনৈতিক অঙ্গনে সক্রিয় থেকেছেন。
১৯৮৯ সালে তিনি রাকসুর ভিপি হয়েছেন。
২০১৮ সালে শুরু করেছেন নয়াপল্টনে ৭৮৭ দিনের এক ব্যতিক্রমী অবস্থান。
২০২৬ সালে এসে জাতীয় নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছেন。
এরপর রাষ্ট্রের সরকারি নথিতে তার পরিচয় যুক্ত হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এবং শিল্প মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে。
এই ধারাবাহিকতার মধ্যেই রুহুল কবির রিজভীর রাজনৈতিক জীবনের অনন্য বৈশিষ্ট্যটি ধরা পড়ে。
গুলির ক্ষত থেকে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী টেবিলে
রুহুল কবির রিজভীর রাজনৈতিক জীবনকে যদি একটি দীর্ঘ চলচ্চিত্রের সঙ্গে তুলনা করা হয়, তাহলে এর দৃশ্যপট বারবার বদলেছে—কখনো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্তাল ক্যাম্পাস, কখনো রাজপথ, কখনো কারাগারের অন্ধকার, কখনো নয়াপল্টনের ছোট্ট কক্ষ, আবার কখনো জাতীয় নির্বাচন পরিচালনার বিশাল সাংগঠনিক কাঠামো。
১৯৮৪ সালের গুলিবিদ্ধ তরুণ, ১৯৮৯ সালের রাকসু ভিপি, দীর্ঘদিনের বিএনপি নেতা ও মুখপাত্র, ৭৮৭ দিনের নয়াপল্টনবাসী এবং ২০২৬ সালের রাষ্ট্রীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত রাজনৈতিক নেতা—এই প্রতিটি পরিচয় একই রাজনৈতিক জীবনের আলাদা আলাদা অধ্যায়。
তার গল্পের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হয়তো এখানেই—রাজনীতির প্রতিকূলতম সময়েও তিনি রাজনৈতিক মাঠ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেননি。
সময়ের সঙ্গে দায়িত্ব বদলেছে, রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলেছে, অবস্থান বদলেছে; কিন্তু তার দীর্ঘ রাজনৈতিক পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেছে সংগঠন, দলীয় রাজনীতি ও সক্রিয় উপস্থিতি。
সুতরাং রুহুল কবির রিজভীর চার দশকের রাজনৈতিক যাত্রাকে শুধু একজন নেতার ব্যক্তিগত ক্যারিয়ার হিসেবে দেখলে এর পূর্ণতা ধরা পড়বে না। এটি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বিরোধী রাজনীতির একটি দীর্ঘ অধ্যায়েরও প্রতিচ্ছবি—যেখানে গুলির ক্ষত থেকে শুরু হওয়া এক রাজনৈতিক যাত্রা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী টেবিলে এসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে。
প্রতিবেদক: অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন
সাবেক ছাত্র , রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৮৩–১৯৯০),সিনিয়র সাব-এডিটর, ও কলামিস্ট, দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠ।
তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, চাঁদপুর জেলা বিএনপি।













