প্রকাশ : ৩০ জুলাই ২০২৬, ১১:৪৬
হাজীগঞ্জে যানজটমুক্তির সাফল্য ধরে রাখতে দরকার ধারাবাহিক উদ্যোগ

হাজীগঞ্জ বাজার শুধু একটি উপজেলা সদর বা বাণিজ্যকেন্দ্র নয়; এটি চাঁদপুর-কুমিল্লা আঞ্চলিক মহাসড়কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল। প্রতিদিন হাজারো মানুষ ও অসংখ্য যানবাহন এই সড়ক ব্যবহার করে। অথচ দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ দখল, ফুটপাতে হকার, সড়কের ওপর মালামাল রাখা এবং অপরিকল্পিত যানবাহন পার্কিংয়ের কারণে হাজীগঞ্জ বাজার পরিণত হয়েছিলো এক অসহনীয় যানজটের নগরীতে। পাঁচ মিনিটের পথ পাড়ি দিতে যেখানে ৩০ থেকে ৪০ মিনিট সময় লেগে যেতো, সেখানে উন্নয়ন ও জনসেবার সব দাবিই যেন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছিলো।
অতি সম্প্রতি অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. লুৎফুর রহমানের নেতৃত্বে চার দিনের টানা অভিযানে মহাসড়কের দুপাশ দখলমুক্ত হওয়ায় হাজীগঞ্জের চিত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। যানজট কমেছে, স্বস্তি ফিরেছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। তবে প্রশ্ন হলো-এই স্বস্তি কি দীর্ঘস্থায়ী হবে, নাকি অতীতের মতো কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস পর আবারও দখলদারদের কাছে হার মানবে প্রশাসন?
বাস্তবতা হলো, হাজীগঞ্জ বাজারে এ ধরনের সফল উদ্যোগ এর আগেও নেওয়া হয়েছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টে গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে চাঁদপুরের তৎকালীন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মোহসীন উদ্দিন কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে হাজীগঞ্জ বাজারকে দীর্ঘদিনের যানজট থেকে মুক্ত করেছিলেন। তাঁর নির্দেশনায় বর্তমান ইউএনও ও পৌর প্রশাসক মো. ইবনে আল জায়েদ হোসেনের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে বাজারে শৃঙ্খলা ফিরেছিলো এবং কয়েক মাস ধরে মানুষ নির্বিঘ্নে চলাচলের সুযোগ পেয়েছিলো। কিন্তু তাঁর বদলির পর সেই ধারাবাহিকতা আর বজায় থাকেনি। পরবর্তীতে প্রশাসনিক তৎপরতা শিথিল হওয়া এবং রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের বিভিন্ন চাপের সুযোগে ফুটপাত ও মহাসড়ক আবারও দখল হয়ে যায়। ফলে হাজীগঞ্জ ফিরে যায় তার পুরোনো বিশৃঙ্খল অবস্থায়।
এই অভিজ্ঞতা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়-কেবল উচ্ছেদ অভিযান সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়; সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো ধারাবাহিক তদারকি এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ। একদিনের অভিযান বা চার দিনের বিশেষ কর্মসূচি সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু নিয়মিত নজরদারি না থাকলে অবৈধ দখলদাররা আবারও ফিরে আসবে। অতীতের ঘটনাই তার প্রমাণ।
হাজীগঞ্জের যানজট শুধু স্থানীয় মানুষের সমস্যা নয়; এটি বৃহত্তর অঞ্চলের অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার সঙ্গেও জড়িত। তাই এই সমস্যার সমাধানে পুলিশ, জেলা প্রশাসন, পৌরসভা, সড়ক বিভাগ, ব্যবসায়ী সমিতি এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব-সবার সমন্বিত ভূমিকা অপরিহার্য। বিশেষ করে কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যেন অবৈধ দখলদারদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিতে না পারে, সে বিষয়েও কঠোর অবস্থান নিতে হবে।
আমরা আশা করি, বর্তমান পুলিশের প্রশংসনীয় উদ্যোগ অতীতের মতো ক্ষণস্থায়ী হবে না। সাবেক জেলা প্রশাসক মোহসীন উদ্দিনের সময় যে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো, সেই অভিজ্ঞতাকে সামনে রেখে এবার আরও কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কারণ জনগণ সাময়িক অভিযান নয়, স্থায়ী সমাধান চায়।
হাজীগঞ্জ বাজারে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা শুধু একটি প্রশাসনিক সাফল্য নয়; এটি আইনের শাসন, জনস্বার্থের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং উন্নত নাগরিক ব্যবস্থাপনারও প্রতীক। এই সাফল্য ধরে রাখার দায়িত্ব এখন সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের। অন্যথায় কয়েক দিনের স্বস্তি আবারও দীর্ঘদিনের দুর্ভোগে পরিণত হতে বেশি সময় লাগবে না।








