প্রকাশ : ২৩ জুলাই ২০২৬, ১০:১৬
কুমিল্লায় ‘অন্তরে অচিন পাখি’ নিয়ে আবেগঘন পাঠক প্রতিক্রিয়া অনুষ্ঠান
স্ত্রী ফরিদা পারভীনের জীবনসংগ্রাম, সাধনা ও শিল্পীসত্তার অজানা অধ্যায় তুলে ধরলেন গাজী আবদুল হাকিম

বাংলা লোকসংগীতের ইতিহাসে যে কয়েকজন শিল্পী তাঁদের কণ্ঠ, সাধনা ও দর্শনের মাধ্যমে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে চলেছেন, তাঁদের মধ্যে লালনসম্রাজ্ঞী ফরিদা পারভীনের নাম উচ্চারিত হয় গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে। তাঁর দীর্ঘ সংগীতজীবনের অজানা গল্প, নিরন্তর সাধনা, ব্যক্তিগত সংগ্রাম, শিল্পীজীবনের উত্থান-পতন এবং লালনদর্শনের প্রতি আত্মনিবেদিত পথচলার দলিল হয়ে উঠেছে লেখক ফাহিম সব্যসাচীর জীবনালেখ্যগ্রন্থ ‘অন্তরে অচিন পাখি’।
এই গ্রন্থকে ঘিরে বুধবার (২২ জুলাই ২০২৬) রাত ৮টায় কুমিল্লার জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ইনস্টিটিউট, কুমিল্লা কেন্দ্র মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় এক আবেগঘন পাঠক প্রতিক্রিয়া ও আলোচনা সভা। মহর্ষি মনোমোহন ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে এবং জোড়া শালিকের সহযোগিতায় আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে সাহিত্য, সংগীত, সংস্কৃতি ও মানবিক মূল্যবোধের এক অনন্য সমন্বয় ঘটেছে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মহর্ষি মনোমোহন ফাউন্ডেশনের উপদেষ্টা মো. এরশাদ আলী। তিনি বলেন, একটি জীবনালেখ্য কেবল একজন মানুষের জীবনের বর্ণনা নয়; এটি একটি সময়, একটি সংস্কৃতি এবং একটি জাতির আত্মপরিচয়ের দলিল। তাঁর ভাষায়, ‘অন্তরে অচিন পাখি’ শুধু ফরিদা পারভীনের জীবনের গল্প নয়, বরং বাংলার লোকসংস্কৃতি, লালনের মানবতাবাদী দর্শন এবং সংগীতসাধনার এক মূল্যবান ইতিহাস।
অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল একুশে পদকপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা, বরেণ্য বংশীবাদক এবং ফরিদা পারভীনের জীবনসঙ্গী গাজী আবদুল হাকিমের আবেগঘন বক্তব্য। দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনের অসংখ্য স্মৃতি তুলে ধরে তিনি বলেন, মানুষ মঞ্চে যে ফরিদা পারভীনকে দেখেন, তাঁর পেছনে রয়েছে অসংখ্য ত্যাগ, অগণিত কষ্ট, নিরলস সাধনা এবং শিল্পের প্রতি এক অসীম আত্মনিবেদন।
তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, শিল্পীর সাফল্যের আলো মানুষ দেখে, কিন্তু সেই আলোর পেছনের অন্ধকার, সংগ্রাম আর নির্ঘুম রাতের গল্প খুব কম মানুষই জানেন। জীবনের নানা প্রতিকূলতা, পারিবারিক দায়িত্ব, শারীরিক অসুস্থতা কিংবা সামাজিক চ্যালেঞ্জ—কোনো কিছুই তাঁকে সংগীতচর্চা থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। বরং প্রতিটি বাধাকেই তিনি শিল্পীসত্তাকে আরও পরিণত করার শক্তিতে রূপান্তর করেছেন।
গাজী আবদুল হাকিম বলেন, ফরিদা পারভীনের কাছে লালনের গান কখনোই কেবল সুর বা বিনোদনের বিষয় ছিল না। তিনি লালনের দর্শনকে নিজের জীবনচর্চার অংশ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। মানুষের প্রতি ভালোবাসা, অসাম্প্রদায়িক চেতনা, আত্মশুদ্ধি, সহনশীলতা এবং মানবতার যে শিক্ষা লালন দিয়ে গেছেন, ফরিদা পারভীন তাঁর সংগীতের মাধ্যমে সেই দর্শনই মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে দিয়েছেন।
বক্তব্যের একপর্যায়ে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, একজন শিল্পীর প্রকৃত পরিচয় তাঁর জনপ্রিয়তায় নয়, তাঁর নিষ্ঠা, সততা এবং সাধনায়। ফরিদা পারভীন জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে সংগীতকে নিজের ইবাদত হিসেবে ধারণ করেছেন। অসংখ্য দেশ-বিদেশের মঞ্চে সম্মান অর্জন করলেও তিনি কখনো শিকড়কে ভুলে যাননি। বাংলার মাটি, মানুষের জীবন এবং লালনের দর্শনের সঙ্গে তাঁর আত্মিক সম্পর্ক ছিল অবিচ্ছেদ্য।
তিনি আরও বলেন, ফাহিম সব্যসাচী রচিত ‘অন্তরে অচিন পাখি’ গ্রন্থটি পড়লে পাঠক শুধু একজন কিংবদন্তি শিল্পীর জীবনই জানতে পারবেন না; তাঁরা জানতে পারবেন একজন নারীর সংগ্রাম, একজন সাধকের মতো শিল্পচর্চা এবং একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ধারণ করে এগিয়ে চলার ইতিহাস। তাঁর বিশ্বাস, বইটি নতুন প্রজন্মকে বাংলা লোকসংগীতের প্রতি আগ্রহী করে তুলবে এবং শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি দায়বদ্ধ হতে অনুপ্রাণিত করবে।
বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর সাতমোড়া আনন্দ আশ্রমের অধ্যক্ষ সাধ্বী শঙ্করী দত্ত। তিনি বলেন, মানুষের আত্মিক বিকাশে সংগীতের ভূমিকা অপরিসীম। ফরিদা পারভীনের কণ্ঠে লালনের গান মানুষকে ভেতরের মানুষকে খুঁজে পাওয়ার পথ দেখায়।
আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন অর্থনীতিবিদ, কবি ও কথাশিল্পী ড. আবুল বাসার এবং লেখক, আবৃত্তিশিল্পী ও যোগ প্রশিক্ষক কাজী মাহতাব সুমন। তাঁরা বলেন, লালনসম্রাজ্ঞী ফরিদা পারভীনের শিল্পীজীবন কেবল সংগীতের ইতিহাস নয়; এটি বাঙালির সংস্কৃতি, দর্শন ও মানবিক চেতনার এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ফাহিম সব্যসাচী তাঁর গবেষণাধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি, তথ্যসমৃদ্ধ উপস্থাপন এবং আন্তরিক লেখনীর মাধ্যমে শিল্পীর জীবনের বহু অজানা দিক পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন।
বক্তারা আরও বলেন, বর্তমান সময়ে যখন সাংস্কৃতিক চর্চা নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, তখন এমন জীবনালেখ্য শুধু একটি বই নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শিকড়ের সন্ধান দেওয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক উদ্যোগ। বাংলা লোকসংগীতের ঐতিহ্যকে নতুনভাবে জানার ক্ষেত্রে এ গ্রন্থ দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলেও তাঁরা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানের সাংস্কৃতিক পর্বে সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী শিউলী রায় ও শৈলী সূত্রধর স্বর্ণা। তাঁদের কণ্ঠে পরিবেশিত লালনসংগীত ও লোকগান উপস্থিত দর্শক-শ্রোতাদের আবেগাপ্লুত করে তোলে। পুরো মিলনায়তন জুড়ে সৃষ্টি হয় এক মুগ্ধকর, নান্দনিক এবং আত্মিক পরিবেশ। করতালিতে বারবার মুখরিত হয়ে ওঠে অনুষ্ঠানস্থল।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন রীতা সরকার এবং জোড়া শালিকের কর্ণধার হালিম আব্দুল্লাহ। তাঁদের সাবলীল উপস্থাপনায় আলোচনা, স্মৃতিচারণ, পাঠক প্রতিক্রিয়া এবং সাংস্কৃতিক পরিবেশনা মিলেমিশে এক প্রাণবন্ত সাহিত্য-সাংস্কৃতিক আসরে রূপ নেয়।
এ সময় কুমিল্লার বিশিষ্ট সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অধ্যাপক, শিক্ষক, আইনজীবী, চিকিৎসক, সাংবাদিক, সাহিত্যপ্রেমী, সংগীতানুরাগী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিপুলসংখ্যক মানুষ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। তাঁদের উপস্থিতিতে মিলনায়তন পরিণত হয় বাংলা সাহিত্য, লোকসংগীত ও সংস্কৃতিচর্চার এক মিলনমেলায়।
অনুষ্ঠান শেষে উপস্থিত দর্শক-শ্রোতারা অভিমত ব্যক্ত করেন, ‘অন্তরে অচিন পাখি’ শুধু একজন শিল্পীর জীবনী নয়; এটি বাংলার লোকঐতিহ্য, লালনদর্শন এবং এক নিবেদিতপ্রাণ শিল্পীর আত্মত্যাগ, সাধনা ও মানবিক চেতনার এক অনন্য দলিল। তাঁদের বিশ্বাস, এই গ্রন্থ আগামী প্রজন্মের কাছে ফরিদা পারভীনের জীবন ও কর্মকে নতুনভাবে পরিচিত করবে এবং বাংলা লোকসংগীতের ঐতিহ্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।







