বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ২২ জুলাই ২০২৬, ০৮:৫২

থিয়েটার ফর পিস (TfP)-এর বিদ্যায়তনিক পাঠ ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা

মোস্তফা কামাল যাত্রা
থিয়েটার ফর পিস (TfP)-এর বিদ্যায়তনিক পাঠ ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা

থিয়েটার হলো সকল শিল্প মাধ্যমের আধার। যার মধ্যে শিল্পের প্রতিটি শৈলীর সংশ্লেষণ ঘটানো যায় বা ঘটানোর সুযোগ থাকে যৌক্তিক কার্যকারণ সমেত। মানব ইতিহাসের পরিবর্ধনের সমান্তরালে থিয়েটার চর্চিত হয়েছে এবং হয়ে চলেছে বহুমাত্রিকতায়। যার সর্বাধুনিক দার্শনিক প্রয়োগ হচ্ছে থিয়েটারের মাধ্যমে ‘শান্তি (Peace)’ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা। ‘থিওরী অব রোল’ ধারণার উপর ভিত্তি করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর অশান্ত পরিস্থিতি মোকাবেলায় মানুষের মনোবিপর্যয় রোধে `সাইকোড্রামা’ অভিধায় এই নাট্য অভিযাত্রার সূচনা করেন মনোবিশ্লেষক গুস্তাফ ফ্রয়েডের প্রিয় ছাত্র জেকব লিভি মরিনো।

মানসিক প্রশান্তি আনয়নের কৌশল হিসেবে শিল্পকলার বিভিন্ন মাধ্যমের একক ও সমন্বিত ব্যাবহারের মধ্য দিয়ে ‘শান্তি (Peace)’ প্রতিষ্ঠায় এই প্রয়োগ প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়ে থাকে। তাই এখানে থেরাপিউটিক থিয়েটার একটি `আম্ব্রেলা’ টার্ম হিসেবে পরিগণিত। মূলত মানসিক অবস্থা পুনর্গঠনের জন্যে আলোচ্য প্রক্রিয়ায় থিয়েটারের মনস্তাত্ত্বিক অনুশীলন হয়ে থাকে। ফলে ‘শান্তি (Peace)’ নিশ্চিতকরণে থিয়েটারের মনোবিশ্লেষক চরিত্র এই প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে বা প্রাধান্য পায়। সাইকোড্রামা শিরোনামে এই মনোবিশ্লেষক নাট্যধারা বিগত ১ শতাব্দী ধরে নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষার পথ পরিক্রমায় বর্তমানে 'এক্সপ্রেসিভ আর্টস' হিসেবে বিশ্বব্যাপী অনুশীলিত হচ্ছে। বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এই ধারার সাইকোএনালিটিক থিয়েটারের চর্চা আরম্ভ করেছিলো স্বেচ্ছাসেবী উন্নয়ন সংস্থা 'ইউনাইট্ থিয়েটার ফর সোশাল অ্যাকশন্ (UTSA/উৎস)' নামের প্রতিষ্ঠান। ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে ইস্যু বা লক্ষ্য জনগোষ্ঠীকেন্দ্রিক ‘থিয়েটার ইউনিট’ পরিচালনার মাধ্যমে এই প্রতিবিধানমূলক নাট্য প্রক্রিয়ার অনুশীলন সূচিত হয়েছিলো। অর্থাৎ ‘ইউনিট থিয়েটার কনসেপ্ট’-এ বিগত ২ যুগেরও অধিক সময়কাল যাবত উৎস (UTSA)-এর তত্ত্বাবধানে মনোবিশ্লেষক নাট্যের প্রশান্তি উদ্দীপক নাট্যশৈলী হিসেবে সাইকোড্রামা, সোসিওড্রামা, লিভিং নিউজপেপার থিয়েটার, প্লেবেক থিয়েটার, ড্রামা থেরাপি, থিয়েটার থেরাপি হিসেবে চর্চিত হচ্ছে। যাকে ‘আম্ব্রেলা’ টার্ম হিসেবে ‘থেরাপিউটিক থিয়েটার’ অভিধা দেওয়া হয়েছে। যার সর্বাধুনিক অভিধা হলো ‘এক্সপ্রেসিভ সাইকোথেরাপি’।

অশান্ত মন ও মননকে প্রশান্ত করে মানুষের সৃজনশীলতা ও স্বতঃস্ফূর্ততাকে জাগিয়ে তুলতে এই প্রক্রিয়ায় বিশেষায়িত কর্মকৌশল হিসেবে উক্ত নাট্যবিজ্ঞান অনুশীলিত হয়। অভিব্যক্তি প্রকাশের কৌশল হিসেবে বর্ণিত ‘থেরাপিউটিক থিয়েটার’ তথা ‘এক্সপ্রেসিভ সাইকোথেরাপি‘ অধিবেশনে অংশগ্রহণকারীদের মনোবিশ্লেষণে প্রযুক্ত নাট্যযজ্ঞ বিবিধ প্রক্রিয়ায় চর্চিত হয়ে থাকে।

মনোবৈকল্য দূর করে মানুষের মধ্যে মানবিকতার উন্মেষ ঘটিয়ে মানবিকরণের সংস্কৃতি হিসেবেও মনোবিশ্লেষক নাট্যক্রিয়া ব্যবহার হয়ে থাকে। ফলে দ্বন্দ্ব-সংঘাত কমে আসে। গড়ে ওঠে মানবিক সমাজ। আর সমাজের নিয়ামক শক্তি হিসেবে মানুষের ব্যক্তিক ও সামাজিক ইতিবাচক মনস্তত্ত্ব গড়ে তুলতেও এই নাট্যক্রিয়া রাখে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

প্রকৃতপক্ষে এই প্রয়োগ প্রক্রিয়ায় থিয়েটারের মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠায় আলোচ্য মনোবিশ্লেষক নাট্যবিজ্ঞান তথা নাট্যক্রিয়ার বহুমাত্রিক প্রয়োগ হয়ে থাকে। যাকে আমি ‘থিয়েটার ফর পিস’ তথা 'Theatre for Peace(TfP)' হিসেবে অভিহিত করছি।

উক্ত মনোবিশ্লেষক ও নিরাময়ী নাট্যক্রিয়ার অনুশীলক সংস্থা উৎস (UTSA)-এর সর্বশেষ কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা (Strategic Plan)-এ তাই 'Theatre for Peace(TfP)' কে শ্লোগান হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। আসন্ন কর্ম বছরগুলোতে প্রতিষ্ঠান হিসেবে উৎস (UTSA) এই শ্লোগান বা প্রতিপাদ্যকে এগিয়ে নিতে কাজ করে যেতে অঙ্গীকারাবদ্ধ।

উৎস (UTSA) প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে কেবলমাত্র বর্ণিত প্রয়োগ প্রক্রিয়া অনুশীলনের মাধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলো না; পাশাপাশি এই ধারার মনস্তাত্ত্বিক নাট্য বিজ্ঞানের বিদ্যায়তনিক পাঠ সম্পন্ন করতে ২০০৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন মনোবিশ্লেষক নাট্যবিজ্ঞানীদের বাংলাদেশে আমন্ত্রণ জানিয়ে ধারাবাহিকভাবে আয়োজন করে চলেছে ‘ন্যাশনাল থেরাপিউটিক থিয়েটার ওয়ার্কশপ (NTTW)’।

NTTW শিরোনামে বিগত ২ দশকে আয়োজিত উল্লেখিত কর্মশালাগুলোতে মনোনাট্যের বিভিন্ন নিরাময়ী নাট্যশৈলীর উপর হাতে কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের মনোবিজ্ঞান, নাট্যকলা, চিত্রকলা ও সংগীত বিভাগে কর্মরত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীগণ সেসব কর্মশালায় অংশগ্রহণ করেছেন এবং বিষয়টির বিদ্যায়তনিক পাঠের গুরুত্ব অনুধাবন করে বেশকিছু সংশ্লিষ্ট বিভাগ তাদের বিদ্যায়তনিক পাঠক্রমগুলোতে বিভিন্ন শিরোনামে কোর্স হিসেবে পাঠক্রম অন্তর্ভুক্ত করেছে।

যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো : ক্লিনিক্যাল সাইকোলজী বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; নাট্যকলা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়; থিয়েটার এন্ড পারফর্মেন্স স্টাডিজ বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়। এছাড়া গত বছর থেকে কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি আরম্ভ করেছে একটি ত্রৈমাসিক সার্টিফিকেট কোর্স। তবে এই বিশেষায়িত কোর্সটির টাইটেল করা হয়েছে 'এক্সপ্রেসিভ সাইকোথেরাপি'।

কেনো কী কারণে 'এক্সপ্রেসিভ সাইকোথেরাপি' তা জানার জন্যে কোর্স সংক্রান্ত FB পেইজে (Expressive Psychotherapy) অনুসন্ধান করার জন্যে সকলের প্রতি অনুরোধ রইলো। যেখানে থেরাপিউটিক থিয়েটার একটি বড় পাঠ্য কম্পোনেন্ট। মনোবিশ্লেষণমূলক নাট্যক্রিয়ার বিভিন্ন প্রয়োগ প্রক্রিয়া এই কোর্সের আওতায় পঠিত হয়ে থাকে।

করোনার মতো মহামারী তথা দুর্যোগের পর মানুষের মধ্যে সৃষ্ট মনোসংকট উত্তরণে থিয়েটারের এই মানবিক ও প্রতিবিধানমূলক ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রয়োজন একাডেমিকভাবে প্রশিক্ষিত থিয়েটার প্যাথলজিস্ট ও থিয়েটার থেরাপিস্ট। তাই এই ধারার নাট্যযজ্ঞের বিদ্যায়তনিক পাঠ সময়ের চাহিদা তথা কালীক প্রয়োজন।

সর্বোপরি সৃজনশীল কলা বিদ্যার শিক্ষার্থীদের জন্যে নতুন কর্মক্ষেত্র সৃষ্টিতে এই ধারার নাট্য প্রয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রশিক্ষিত জনবল গড়ে তুলতে ‘থিয়েটার ফর পিস (TfP)’-এর বিদ্যায়তনিক পাঠ ও পাঠক্রম থাকাটা অত্যাবশ্যক। যাতে করে ‘থিয়েটার ফর পিস (TfP)’-এর পদ্ধতিগত অনুশীলন ও প্রয়োগে প্রশিক্ষিত জনবল গড়ে তোলা সম্ভব হয়।

মোদ্দা কথা, মনোবিজ্ঞানসহ শিল্প-সংস্কৃতি সংশ্লিষ্ট সকল বিদ্যায়তনিক শিক্ষাক্রমে 'থিয়েটার ফর পিস (TfP)'কে পাঠক্রমভুক্ত করা জরুরি। এই প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পঠিত সৃজনশীল কলা বিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞান বিষয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাবিদ, মনোবিদ ও নীতি নির্ধারকদের মনোযোগ আকর্ষণ করছি। যাতে করে আমার প্রাসঙ্গিক ভাবনাটি একটি যৌক্তিক পরিণতি পায়।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়