প্রকাশ : ২৯ জুন ২০২৪, ০০:০০
দিগভ্রান্তির বিভ্রান্তি

‘ঘুম তুই আয় আমার নির্নিমেষ নয়নে, আঁধারে হৃদয় যে আমার শুকিয়ে কাঠ তার কারণে’ গুনগুন করে গান গেয়ে মায়ের মতো করে ভুলিয়ে ভালিয়ে একটু ঘুমানোর কী যে নিরলস প্রচেষ্টা করে যাচ্ছি! প্রচণ্ড গোলাগুলিতে আমার এতো সাধের শেষ ঘুমটা ভেঙ্গে গেল। গোলাবারুদের শব্দে কান ফেটে চৌচির। গতকাল রাতে কমান্ডার সকালে আক্রমণের পরিকল্পনার কথা সবাইকে বুঝিয়ে একটু ঘুমাতে গেলেন। আর কী হয়ে গেলো! এজন্যেই বলি ভালোবাসা আর যুদ্ধে একটু আগ বাড়িয়ে কাজ করতে হয় নতুবা প্রতিপক্ষ সবকিছু এক নিমিষেই কেড়ে নিবে। এপাশ ওপাশ থেকে শুধু বুলেটের আওয়াজ হচ্ছে। অনেকেই আচমকা শব্দে জেগে উঠে আবার বুলেটের আঘাতে জর্জরিত হয়ে চিরনিদ্রায় ঘুমিয়ে পড়ছে।
আমি জেগে উঠতে পারছিলাম না। শরীরটা এক আসমান ভার নিয়ে পরে আছে। তবুও সহ্য করা যায়। কিন্তু হৃদয় ভাঙার ভার কী করে সহ্য করি! ক্লান্ত শরীরটা উপরে তোলার চেষ্টা করতেই একজন এসে আমার উপর পড়লো। সারা শরীরে রক্ত! উহ! কী বীভৎস হয়ে আছে মুখটা! গুলিটা একেবারে নাক বরাবর লেগেছে। অনেক কষ্টে সরানোর চেষ্টা করলাম। তাকে পাশে রাখতেই বুকের উপর দু হাত দিয়ে চেপে রাখা একটা পুরোনো সাদাকালো ছবি দেখলাম। আমি একটু উৎসুক হয়ে ছবিটা দেখার ছলে চোখ পরিষ্কার করে দেখি কী অসম্ভব একজন সুন্দরী মেয়ের ছবি। কী জীবন্ত হয়ে আছে। মনে হয় যেন প্রিয়তমার বুকে মাথা রেখে গভীর ঘুমে রয়েছে। রাতে বুকে নিয়েই ঘুমিয়ে ছিল। ভেবেছে হয়ত আর যদি বেঁচেই না থাকে তবে কী হবে। সেই তো মরেই গেলো! এখন মরে গেলেও শান্তি। শেষবার যে তাকে বুকে নিয়েই মরতে পারলো।
হঠাৎ অনিন্দিতার আমার হাতে হাত রেখে বিদায়ী বাক্যটার কথা মনে পড়লো, ‘প্রিয়! জানি না ফিরবে কিনা। তবে জেনে রেখো ভালো আমি তোমাকে বেসেছিলাম’ কথাটা শোনার পর যেই আমি এতোদিন নিজের জীবনকে ভালোবাসতে পারিনি, দেশের জন্যে জীবন দিতে যাচ্ছিলাম, সে আমি বাঁচার প্রতি আকুলতা অনুভব করছিলাম। থেকে যেতে চাইছিলাম। পরক্ষণে আমার মনে পড়লো, অনিন্দিতা তো আমার না। সে তো গত রাতেই অন্যের বুকে মাথা রেখে গভীর ঘুমে ছিল। আজ আমাকে শুধু বিদায় বলতেই এসেছে। কিন্তু এ সত্যি কথাটা বলার কীইবা প্রয়োজন ছিলো! এমন একটা কথা যে-কোনো পুরুষ মানুষকেই রুখে দিতে সক্ষম। এমন কথায় পুরুষ ধ্বংস করতে পারে সব, আবার গড়তেও পারে সব।
মাটিতে চিৎ হয়ে শুয়ে রইলাম। মাথাটা সামান্য উপরে উঠাতে চেষ্টা করতেই একটা বুলেট বাম চোখের পাশ দিয়ে চলে গেলো। স্বর্গের দিকে রওনা হওয়ার মতো অবস্থা হয়ে গেলো। রাইফেলটাকে দু হাতে শক্ত করে চেপে হামাগুড়ি দিয়ে একটা গাছের পিছনে লুকালাম। কোন বীরত্বই দেখাতে পারছিলাম না। গাছের দুপাশ দিয়ে এলোপাথাড়ি বুলেটের শোঁ শোঁ আওয়াজ যাচ্ছে। বের হয়ে গুলি করতে গেলে রাইফেল উঁচিয়ে ধরার আগেই বুক ঝাঁঝরা হয়ে যাবে। এভাবে জীবন দেয়াকে অর্থবহ মনে হয় না। এ আত্মত্যাগ দেশের জন্যে হবে না। প্রতিপক্ষের রক্ত নিংড়ে নিতে পারলেই তো হবে আসল যুদ্ধ। এই নিজেকে বাঁচিয়ে রাখাটা স্বার্থপরতা মনে হয় না। বেঁচে গিয়েই তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পরে দু-চারটাকে দোজখে পাঠিয়ে দেব। তারপর আর এ জীবনের আর কোন মূল্য রবে না। বুকটাকে পেতে দিব যেভাবে পেতে দিয়েছিলাম অনিন্দিতার জন্যে। কিন্তু আনিন্দিতা ভালোবাসাহীন পরিত্যক্ত বুকের জায়গাটাতে মাথা রাখেনি। রাইফেলের বুলেট আমাকে এড়িয়ে যাবে না, ঠিকই বুকে এসে জায়গা করে নিবে।
অনিন্দিতা মনে আছে তোমার? ফজরের নামাজের সময় বাড়ির বারান্দায় ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে আমাকে একটুখানি দেখার জন্যে? আমি আগেই উঠে যেতাম। তোমার বারান্দার রাস্তাটা আমার সহসা শেষ হত না। পিছন থেকে কে যেন টেনে ধরত। আমিও হাত পা ছেড়ে দিতাম। চাইতাম আরও কিছুটা টেনে ধরুক। পথটা আমার এ জীবনে শেষ না হোক। এ পথেই আমার মরণের উদ্যান রচিত হোক। আমি তোমাকে দেখেই আকাশ বিদীর্ণ করে মহাকাশে স্থবির হতে চাইতাম। প্রতিদিন গুনে গুনে তিনবার সকাল হোক এই প্রার্থনা করে যেতাম। আচ্ছা তুমি কী আমার জন্যেই দাঁড়িয়ে থাকতে? দাঁড়াতেই যদি তবে কেন হৃদয়ের কথা হৃদয়েই রেখে দিলে। যদি বলে দিতে তাহলে আরও কিছুটা দিন বেঁচে থাকার সংগ্রাম করতাম। মহাকালের একাল থেকে ও কাল পর্যন্ত নিজেকে বিস্তৃত করে দিতাম তোমার জন্য। তুমি তো আমাকে দ্বিধার মধ্যেই রাখলে। এ দ্বিধা কাম্য না। এরূপ দ্বিধা মনের ভেতরটা দ্বিখণ্ডিত করে ফেলে। এভাবে হয়ত বাঁচা যায় অর্ধমৃত হয়ে, কিন্তু একেবারে মরে গিয়ে এমনভাবে বেঁচে থাকার দুর্দশা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায় না।
যে পথে আমি কখনোই পা ফেলিনি, সে পথটাকে নিজের থেকেও আপন করে নিয়েছিলাম। যে পত ধরে তুমি আসা-যাওয়া করতে, আমি সে পথের একেকটা ঘাস পর্যন্ত চিনি। সূর্যের উত্তাপ কিংবা ঝড়ের চোখরাঙানি আমাকে দমাতে পারেনি। পথের দুপাশে কড়ই গাছ সারিবদ্ধ হয়ে তোমাকে ছায়া দিত। যে এই গাছগুলো লাগিয়েছিল, খবর নিয়ে তাদের বাড়ি মিষ্টি নিয়ে গিয়েছিলাম। তাকে কৃতজ্ঞভরা ধন্যবাদ দেয়ার অভিপ্রায় ছিল কিন্তু শুনলাম এই মহান ব্যক্তিটি অনেকদিন আগে মারা গিয়েছে। তুমি জানো না, সারা প্রহর জেগে শিউলি ফুল কুড়িয়ে, সকালে এসে তোমার চলার পথে সেগুলো বিছিয়ে রাখতাম। যখন তুমি হাঁটতে হাঁটতে একটু ঝুঁকে দু-তিনটে ফুল নিতে আর ভুবনরাঙানো হাসিতে চারদিক মাতিয়ে তুলতে, আমি যেন তখনই তোমাকে পেয়ে যেতাম। আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি এমন করে তোমাকে কেউ কখনো পাবে না। এই হাসিটাই যেন আমাকে জড়িয়ে ধরে বলে ‘আমি ভালোবাসি তোমাকে’।
হঠাৎ ঝিরিঝিরি বৃষ্টি শুরু হলে বুলেটের বৃষ্টি কিছুটা কমে আসলো। একটু ডান দিকে ঘুরে দু-চার রাউন্ড গুলি ছুড়লাম। কিন্তু নিশানা ভেদ হলো না। আমার নিশানা কখনোই সঠিক হয় না। যেমন করে ভালোবাসার তীর ছুড়ে অনিন্দিতার হৃদয় ছুঁতে পারিনি, তেমনি আমার বুলেটের নিশানাও প্রতিপক্ষকে ভেদ করতে পারেনি। গুলির আওয়াজ পেয়ে আমাদের এক সৈনিক আমার কাছে ছুটে এল। তার কাঁধে এবং হাতে তিনটা গুলি লেগেছে। এই অবস্থায় যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। আমি আর রাইফেলের ভার বহন করতে পারছি না। বোধহয় শহিদ হয়ে যাব। এই নাও আমার রাইফেলটা। মৃত্যু না আসা পর্যন্ত ওদের একেকটাকে দোযখে পাঠাবে। এই বলে সে চুপচাপ শুয়ে গেল। এখন আমি এত ভার কীভাবে সইব। আমার যে বুকে নিদারুণ বেদনার ভার। আমি এখানে কেন এসেছি? আমি ভীরু আর কাপুরুষ। গাছের পিছনে লুকিয়ে বেদনার অঙ্ক কষে যাচ্ছি। একদিকে নিজেকে ক্রোধে ধিক্কার দিচ্ছি, অন্য দিকে ভালোবাসা আমাকে পিছন থেকে টেনে ধরছে। আমার বিবেক আর আমার সত্তা দিগভ্রান্তির বিভ্রান্তের চোরাবালিতে আটকে আছে।
বিবেকের প্রজ্জ্বলিত আগুনে পুড়ে যাচ্ছিলাম। অনিন্দিতা ভালোবাসার স্বীকারোক্তি আমাকে আর আমার পুরো সবটাকে কেমন যেনো স্বার্থপরতার আবরণে আঁকড়ে ধরেছিলো। ভালোবাসা মানুষকে স্বার্থপর বানিয়ে দেয় এ কথা তখন স্বীকার করতে আমার সামান্য দ্বিধা হয়নি। খুব করে চাইছিলাম, অনিন্দিতা বুকের কাছে এসে, মাথাটা আমার বেদনায় জর্জরিত বুকটাতে ঠেলে দিয়ে বলুক, ‘যেওনা প্রিয়! আমি যে তোমার হতেই ছুটে এসেছি। আমাকে ছেড়ে কোন ভুবনে যাচ্ছ?’ চাওয়াটা অপূর্ণই রয়ে গেলো। অনেক কষ্টে নিজের সাথে যুদ্ধে জয়ী হলাম। তাই আমি আজ এই গোলাগুলিতে অবস্থান করছি। মনে একটু আনন্দ হচ্ছে এই ভেবে যে তুমি আমাকেই ভালোবেসেছিলে। দু ফোঁটা অশ্রু বেয়ে আসলো গাল বেয়ে। হঠাৎ কোত্থেকে কয়েকটা বুলেট এসে আমার বুকটা ঝাঁঝরা করে দিলো। অশ্রু দু ফোঁটা না শুকাতেই আমার প্রাণটা শুকিয়ে গেলো। অনিন্দিতা, না তুমি আমায় ভালোবাসতে পারলে, না আমায় ভালোবাসতে দিলে। এখানেই আমার জীবন দেয়াটা অর্থহীন হয়ে গেল। তোমার ভালবাসা প্রতিপক্ষকে উড়িয়ে দেয়ার যে প্রতিজ্ঞা আমার রক্তে প্রবাহিত হয়েছিল তাও কেড়ে নিল। ভালো থেকো অনিন্দিতা।