প্রকাশ : ০৯ জুন ২০২৪, ০০:০০
ভূত-টুত কিচ্ছু না!

মারিয়াকে ঝাড়ু দিয়ে মারতে মারতে প্রায় বেহুঁশ করে ফেললো কাদের কবিরাজ। কাদের কবিরাজ বলতে লাগল, এ বড় সাংঘাতিক ভূত! যাইতে চাইতাছে নাহ। এই কইরে আমার বাক্সাডা লইয়া আয় তো।
তার এক চেলা এগিয়ে দিলো বাক্সটা। তারপর কিছু একটা ছিটিয়ে দিলো মারিয়ার মুখে। চারপাশে মানুষ আর মানুষ। সবুজ মিয়ার উঠান ভরে গেছে মানুষে। সবুজ মিয়ার এক ছেলে, এক মেয়ে। ছেলেটা ছোট আর মেয়ে মারিয়া সবেমাত্র ক্লাস সিক্সে উঠেছে। ছাত্রী হিসেবে খুবই মেধাবী। সকাল বেলা রান্নার কাজে মাকে সাহায্য করতে রান্না ঘরে যায়। রান্না ঘরের সামনে পানির কলসিটা হাত পড়ে যাওয়ার শব্দে মারিয়ার মা মরিয়ম বেগম দেখেন মারিয়া পড়ে আছে। মরিয়ম বেগম চিৎকার শুরু করলে মারিয়ার দাদি এসে বলে, হায় হায়! এরে তো ভূতে ধরছে।
তারপরেই মারিয়ার বাবা সবুজ মিয়া কাদের কবিরাজকে খবর দেন সবার কথায়। কাদের কবিরাজ বেশ নাম ডাক কামিয়েছে আশপাশের দুই-চার গ্রামে। অসুখে-বিসুখে মানুষ এখন তাকেই ডাকে।
কাদের কবিরাজ তার চেলা-চাতুর নিয়ে এসে হাজির। কবিরাজ একে একে নানা রকম কাজ করতে লাগল ধূপ-ধুনা দিল অনেকক্ষণ যাবৎ।
মারিয়ার হুঁশ না ফেরায় পানিতে বিড় বিড় করে কি সব পড়ে ফুঁ দিয়ে মারিয়ার মুখে মারলো। পানি মুখে পড়ার সাথে সাথেই মারিয়া চোখ মেলল। কিন্তু মারিয়া উঠতে পারছে না শোয়া থেকে। তা দেখেই কাদের কবিরাজ শুরু করলো ঝাড়ু দিয়ে মারা। মারিয়া কান্না শুরু করলো। মারিয়া শব্দ করে কান্না করতে পারছে না।
এদিকে পাশের বাড়ির রহিম মেম্বারের ছেলে শওকত এত মানুষের ভীড় দেখে এগিয়ে গেল। শওকত কবিরাজকে বলল, আরে এ আপনি কী করছেন? মেরে ফেলবেন নাকি ওকে?
উপস্থিত সবাই থ হয়ে তাকিয়ে রইলো তার দিকে। গ্রামের কেউই কাদের কবিরাজের কাজের উপর কথা বলে না।
শওকত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হওয়ায় বাড়িতে এসেছে কয়েকদিন ঘুরে যেতে।
কাদের কবিরাজ শওকতের কথা শুনে তার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলল, তোর এত্তবড় সাহস আমার কাজেরসময় কথা কস!
শওকত ভীড় ঠেলে এগিয়ে গিয়ে কবিরাজের সামনে দাঁড়িয়ে বলে আপনি কি পাগল নাকি ওকে এভাবে মারছেন কেন?
পাশ থেকে একজন বলে উঠলো, ওরে ভূতে ধরছে, ভূত তাড়াইতাছে।
শওকত : ভূত-টুত কিচ্ছু নাই। এইসব মিথ্যা। ওকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান বলে সবুজ মিয়ার দিকে তাকালো সে। সবুজ মিয়া মাথা নিচু করে বসে শুধু কাঁদছে।
এই অবস্থা দেখে শওকত কবিরাজকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে মারিয়াকে কোলে নিয়ে দৌড় দিলো।
পেছন থেকে মারিয়ার দাদি চিৎকার করে বলতেছে, ওই শওকইত্তা, আমার নাতিনের কই লইয়া যাস?
শওকত রাস্তায় সিদ্দিক ড্রাইভারকে দেখে তার ভ্যানে তুলে মারিয়াকে নিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দিকে রওয়ানা হলো। পিছন পিছন সাইকেল নিয়ে ছুটে আসছে সবুজ মিয়া।
শওকত তাকে নিয়ে হাসপাতালে গেল। ডাক্তার দেখালো, সবুজ মিয়া এসে দাঁড়িয়ে আছে। ডাক্তার মারিয়ার আঘাতের ঘায়ে মলম লাগিয়ে দিচ্ছে। ডাক্তার জিজ্ঞেস করলো এমন হয়েছে কিভাবে?
সবুজ মিয়া বললেন কবিরাজ...
এতটুকু শুনেই ডাক্তার বললেন, বুঝেছি, ভূতের ব্যাপার।
সবুজ মিয়া মাথা নাড়লেন।
ডাক্তার বললেন, এইসব ভূত-টুত কিছুই না। ওর শরীর দুর্বল। সময়মতো খাবার দিন পুষ্টিকর খাবার দিন। ওর এখন বাড়ন্ত বয়স এখন ওর পুষ্টিকর খাবার খাওয়া উচিত। আর এসব ভূতের ব্যাপার সবই গাল-গল্প। আপনারা এসব কুসংস্কার থেকে বেরিয়ে আসুন।
ডাক্তার ঘায়ের মলম ও কিছু ঔষধ লিখে দিলেন। হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে সবুজ মিয়া শওকতকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললেন।
সবুজ মিয়া : বাবা, তুই না থাকলে আইজকা আমার মাইয়াডা মনে হয় মইরাই যাইতো। তোর এই ঋণ আমি কেমনে শোধ করমু?
শওকত : না চাচা, কি কন আপনি? এডা তো আমার কর্তব্য। আমার সামনে একটা ভুল কাজ হইতাছে আর আমিকি দেইখা থাকমু? আপনের কিছুই করা লাগবো না। মারিয়ার দিকে খেয়াল রাইখেন।
শওকত আর সবুজ মিয়া সিদ্দিক ড্রাইভারের ভ্যানে করে বাড়ি চলে আসলেন।
এসে উঠানভর্তি মানুষের সামনে মারিয়াকে নিয়ে দাঁড়িয়ে বললেন, ওর শরীর দুর্বল। ডাক্তার কইছে ভালা-মন্দ খাওয়াইতে। আর এডি ‘ভূত-টুত কিচ্ছু না!’ গ্রামের সবার ভুল ভাঙলো। আর কবিরাজের পসার বন্ধ হলো। আর মারিয়া এখন নিয়মিত স্কুলে যায়। আর মারিয়ার মা তাকে সাধ্যমত পুষ্টিকর খাবার দেয়ার চেষ্টা করে।