বৃহস্পতিবার, ০৩ এপ্রিল, ২০২৫  |   ২৭ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   হাইমচরে মাটি বোঝাই বাল্কহেডসহ আটক ৯
  •   কচুয়ায় কৃষিজমির মাটি বিক্রি করার দায়ে ড্রেজার, ভেকু ও ট্রাক্টর বিকল
  •   কচুয়ায় খেলতে গিয়ে আগুনে ঝলসে গেছে শিশু সামিয়া
  •   কচুয়ায় ধর্ষণের অভিযোগে যুবক শ্রীঘরে
  •   ১ হাজার ২৯৫ কেজি নিষিদ্ধ পলিথিন জব্দ করেছে কোস্ট গার্ড

প্রকাশ : ১১ মার্চ ২০২৪, ০০:০০

খণ্ডে খণ্ডে অখণ্ড জীবন

পীযূষ কান্তি বড়ুয়া
খণ্ডে খণ্ডে অখণ্ড জীবন

॥ একাদশ পর্ব ॥

গোল পাহাড়ের মোড়ে যে ক্লিনিকটাতে কয়েক মাস কাজ করেছি সে কয়েক মাসে তেমন গুরুত্বপূর্ণ কোনো ঘটনা না ঘটলেও একটা ঘটনা এখনও মনে আছে। কম বয়স্ক একজন এইড নার্স ছিলো ক্লিনিকে। এইড নার্সগুলো এসএসসি পাস নেয়া হয় কিন্তু তাদের নার্সিং ডিপ্লোমা করা থাকে না। তাদেরকে কয়েক মাস শিক্ষানবিশ হিসেবে নিয়ে তারপর একটা বেতন ধরে দেয়া হয়। এরকম একজন এইড নার্সের নাম ছিল মিনু। গ্রামে তার বাড়ি। ঐ ক্লিনিকে প্রায় বছর তিনেকের মতো মিনুর চাকুরির বয়স। সব স্টাফের সাথে তার জানাশোনা হয়ে গেছে। ক্লিনিকের ফার্মেসিতে কাজ করে আজিজ নামের একজন যুবক। দেখতে-শুনতে ভালো। তার সাথে মিনুর প্রেম হয়ে গেছে, এ কথা আমাদের কারও জানা ছিলো না। একদিন হঠাৎ করে শুনি, মিনুর শরীরে খিঁচুনি উঠে সে অজ্ঞান হয়ে গেছে। তার মুখ দিয়ে ফেনা বের হয়ে যায় যায় অবস্থা। সবাই তটস্থ হয়ে গেলো মিনুর এই অবস্থা দেখে। নাকে অক্সিজেন দেওয়া হয়েছে। কিছুক্ষণ পরে মিনুর খিঁচুনি বন্ধ হয়ে গেলো। এ সময় ক্লিনিকের ডিরেক্টর ডাঃ মর্তুজা ভাই এলেন। তিনি এসে তার অভিজ্ঞ চোখে ধরে ফেললেন ঘটনা কী। তিনি আমাকে এক পর্যায়ে একটা কুড়ি সিসি সিরিঞ্জে সবার অলক্ষ্যে বললেন ভরতে, যাতে মকশো করতে করতে মিনুর সামনে সিরিঞ্জটি নাড়াচাড়া করি। এতে মিনুর মনে ভীতি তৈরি হলো এবং যেই এই ইঞ্জেকশন তার গায়ে ফুটাতে যাবো, অমনি মিনু শোয়া থেকে উঠে বসে গেছে বিছানায়। চিৎকার করে সে বলে উঠলো, স্যার না না স্যার। ইঞ্জেকশন দিয়েন না। আমি ভালো আছি, ঠিক আছি। আমার কিছু হয় নাই। সবাইকে রুম থেকে বের করে দিয়ে আমি আর মর্তুজা ভাই এবং সাথে ডিপ্লোমা সিস্টারকে নিয়ে মিনুকে জিজ্ঞেস করলাম, তাহলে এই নাটক করলে কেন? মিনু জবাবে বললো, স্যার, আজিজ ভাই বিদেশে চলে যাচ্ছে আগামী মাসে। যাওয়ার আগে ওনাকে একটু বলেন যাতে আমার আব্বার সাথে কথা বলে যায়। বুঝতে আর বাকি রইলো না, ফার্মাসিস্ট আজিজ আর মিনুর প্রণয়োপাখ্যানে একটা ক্লাইম্যাক্স এসে উপস্থিত আর একারণেই তার হিস্টিরিয়া বা কনভার্সন ডিজঅর্ডার দেখা দিয়েছে। মিনুর রোগ ডায়াগনোজড হওয়ার পরে আমারও মনে পড়তে লাগলো মাঝে মাঝে মিনু ক্লিনিকের ফার্মেসী হতে রোগীদের ঔষধ আনতে গেলে অনাকাঙ্ক্ষিত দেরি হতো। এটা যে দেরি নয়, প্রণয় অভিসার ছিলো তা এবার বোধগম্য হলো।

একবার কোরবানি ঈদে এক সপ্তাহের টানা ডিউটি করলাম ও আর নিজাম রোডে অবস্থিত ক্লিনিকে। সাতদিনে সাত হাজার, এই চুক্তিতে এবং আউটডোর রোগীর পঞ্চাশ ভাগ ফি আমার। ওটিতে অ্যাসিস্ট করলে তার চার্জ আমার। এই প্যাকেজটি আর্থিকভাবে স্বাস্থ্যবান ছিলো বিধায় প্রস্তাবটি লুফে নিয়েছিলাম। কিন্তু সেটি যে পুরোপুরি স্বাধীনতা বিরোধীদের ক্লিনিক ছিলো তা যাওয়ার পর টের পেয়েছি। দুহাজার এক সালে সে সময় জাতীয় সংসদের নির্বাচন চলছে। রাতে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষিত হচ্ছিলো। আমিও টিভির সামনে বসেছি, ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের লোকজনও টিভির সামনে ছিলো। একটা আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী পিছিয়ে আছে জামায়াতের প্রার্থীর চেয়ে। তাদের উল্লাস দেখে কে! আমি আওয়ামী লীগের প্রার্থী এগিয়ে থাকলে উল্লাস করার মতো মনোবল পাচ্ছিলাম না। আশেপাশে সবাই জামায়াত আর শিবির। আমি পরেরদিন লোভনীয় চুক্তির ডিউটিকে টা টা বাই বাই জানিয়ে এসে পড়ি। ঘরে এসে আমার যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ার অবস্থা ছিলো।

পলি ক্লিনিকে ডিউটি যখন করতাম তখন সেখানে রেজাউল করিম নামে একজন কার্ডিওলজিস্ট চেম্বার করতেন। একবার এক রোগীকে ব্রিফ করার জন্যে তিনি ডিউটি ডাক্তারকে ডেকে পাঠান। মেহেদী ভাই আর আমি ছিলাম ডিউটিতে। মেহেদী ভাই সিনিয়র হলেও তিনি না গিয়ে আমাকে ঠেলে দেন সামনে। আমি গিয়ে বুঝলাম আমাকে টিয়া বিষয়ে জ্ঞান দিতে হবে রোগীকে। টিয়া কী, কেন হয়, কাদের হয় ইত্যাদি বিষয়ে প্রায় আধাঘন্টা বুঝিয়ে আমি তারপর ছাড়া পাই। টিয়া কোন পাখি নয়, টিয়া হলো ট্রান্সিয়েন্ট ইশকেমিক অ্যাটাক। এটা চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে স্বাভাবিক হয়ে যায়। টিয়ার পুরো কারণ এখনও সেই অর্থে জানা যায়নি, তবে ধারণা করা গেছে। একবার একটা রোগী রাত দুপুরে ভরপেট মেজবানির গরু মাংস খেয়ে আর আকণ্ঠ মদ্যপান করে ক্লিনিকে আসে বুকে ব্যথা নিয়ে। আমরা তাকে তড়িঘড়ি করে চিকিৎসা দিয়ে ভয়ে ভয়ে থাকি কখন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ হয়ে যায়। কিন্তু সারারাত আমাদের ব্যতিব্যস্ত রেখে রোগীটি সকালে হেঁটে বাড়ি চলে যায়।

এভাবে দিন যেতে যেতে একদিন আমার রাশিয়া যাওয়ার দিন ঘনিয়ে আসে। যাওয়ার দিন পনেরো আগে রাইডার নামে মিনিবাসে চড়ে আমি নিউমার্কেট এলাকা থেকে চকবাজার যাচ্ছিলাম। কোনো কারণ ছাড়াই রাইডারের গা ঘেঁষে শহর এলাকার বাস দ্রুতগতিতে যাওয়ার সময় জানালায় রাখা ডান হাতের বাহুতে ঘষা লাগে এবং শার্টের হাতা ছিঁড়ে আমার বাহুর ত্বক ছুলে যায়। মনের মধ্যে খচখচ শুরু হয়। আদৌ আমার বিদেশ গমন সুনিরাপদ হবে কি? যাই হোক, সপ্তাহখানেক আগে থেকে আমার ব্যাগ গোছাতে শুরু করি। পাঠ্যবই, বিনোদনের পাঠযোগ্য বই নিয়ে লাগেজ বোঝাই করে ফেলি। বোনেরা কাপড়-চোপড় দেয়, ভাগ্নে-ভাগ্নিরা শ্যাম্পু-সাবান, গেঞ্জি-তোয়ালে উপহার দেয়। প্রথম বিদেশযাত্রা বিধায় অনেক খুঁটিনাটি বিষয় জানা ছিলো না। কে জানি বলেছিলো হাতের ব্যাগে যা নিতে পারা যায় সব অ্যালাউড। অবশেষে হাতের ব্যাগে ঠেসে যা ভরিয়েছি, তার ওজনই তো কুড়িকেজির কম নয়। কিন্তু তখন এটা জানা ছিলো না, এই ভারী ব্যাগটা আমার কোলেই রাখতে হবে। ইতোমধ্যেই কারেন্ট বুক সেন্টার এবং অমর বইঘর হতে রাশান বর্ণমালা ও ভাষা শিক্ষার দুটো বই সংগ্রহ করে প্রাথমিক কাজটি এগিয়ে রাখি। ট্রেনে করে ঢাকা গিয়ে অতঃপর সেখান থেকেই বিমানে চড়ে বসি। সম্ভবত সন্ধ্যায় বিমানের উড্ডয়ন ছিলো। উজবেকিস্তানে বিরতি নিয়ে তারপর আবার মস্কোর উদ্দেশ্যে যাত্রা। আটাশ ডিসেম্বরে দুহাজার দুই সালে আমার রাশিয়া যাত্রা শুরু হয়। রবীন্দ্রনাথ রাশিয়ার চিঠি লিখলেও আমার পক্ষে এমন কোনো চিঠি লেখার প্রয়োজন পড়েনি। বিমানে দেওয়া খাবারের মধ্যে বাঙালি অনেকেই অ্যালকোহল নিয়ে নিজেকে জাহির করার চেষ্টা করে যেতে দেখলাম। কিন্তু তাদের সেই জাহির প্রবণতার অসারতা টের পেলাম যখন তারা কারণে অকারণে বিমানবালাকে ডেকে নিজেদের কাছে আনতে চাইছিলো। ডিসেম্বর হলো শীতের মধ্য লগন। কাজেই বরফাচ্ছাদিত উজবেকিস্তান আমাদের স্বাগত জানাতে প্রতীক্ষায় ছিলো। রাতের শেষের দিকে উজবেকিস্তানে থামার কারণে নামগুণে যতটুকু রোমাঞ্চ জেগেছিলো মনে, ঠাণ্ডার তীব্রতায় তা উবে গেলো অনিশ্চয়তায়। প্রিয়ার মুখের তিলের বিনিময়ে ওমর খৈয়াম উজবেকিস্তানের সমরখন্দ আর বুখারা বিলিয়ে দিতে চাইলেও আমার পক্ষে সেই ঠান্ডায় গভীর রাতে নেমে শহর দুটো দেখার উপায় ছিলো না। বিমান বন্দরে দেখতে দেখতেই দুঘন্টা রাতে কেটে গেলো এবং অন্য একটা বিমানে আমাদের নিয়ে রওয়ানা দিলো মস্কোর উদ্দেশ্যে। সকালে মস্কোতে নামতেই টের পেলাম শীত কাকে বলে, কত প্রকার ও কী কী। আগে থেকেই বলা থাকাতে মস্কো গণমৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবাস গেলো আমাদের আনতে। বিমানবন্দরে আমাদের বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হলো যতক্ষণ না পর্যন্ত নিতে যাওয়া গাড়ির লোকজন আমাদের দিকে হাত তাকিয়ে হাত নেড়েছেন। ইমিগ্রেশনে যা কিছু জিজ্ঞেস করল সবটাই রাশান ভাষায়। আমি ইংরেজিতে জবাব দিলেও তারা কখনও নিজেদের ভাষা ছেড়ে ইংরেজিতে আমাদের সাথে কথা বলেনি। কিছুক্ষণ লাগেজের জন্যে দাঁড়িয়ে থেকে তারপর চলে এলাম আমাদের জন্যে নির্ধারিত হোস্টেলে। হোস্টেলগুলো আসলে মাটিতে গেঁথে তৈরি করা বিল্ডিং বলে মনে হলো না। ভাগ ভাগ করে তৈরি করে জোড় দিয়ে বানানো। বিমান বন্দর থেকে হোস্টেলে শহরে আসতে গিয়ে প্রায় দু'ঘন্টা লাগলো। বুঝা গেলো, বেশ দূরেই আছে বিমান বন্দর। যতই হোস্টেলের কাছাকাছি আসছি ততই কেবল বরফ আর তুষার। সাদা আর সাদা চারদিকে। হোস্টেলের তত্ত্বাবধায়ক তাকে বলে আনাতোলি। আমি মনে করেছিলাম এটা তার নাম। আসলে আনাতোলি হলো হোস্টেল সুপার। ঠাণ্ডা মোকাবেলায় হোস্টেলের রুমে রুমে লোহার বড় নলের মধ্য দিয়ে গ্রাউন্ড ফ্লোরের নিচে অবস্থিত গরম পানির চুল্লি হতে নিয়মিত গরম পানির প্রবাহ বজায় রাখা হতো। এতে বাইরে ঋণাত্মক তাপমাত্রা হলেও রুমের ভেতরে আরামদায়ক আবহাওয়া বজায় থাকতো। স্নানঘরে উষ্ণ জলের ধারা সরবরাহ করা হতো। হোস্টেলের স্নানাগারে একসাথে অনেকেই স্নান করতে পারতো। রুমে রুমে পায়রার পালকের বালিশ সরবরাহ করা হতো। বালিশগুলো নরম কিন্তু বেশি উঁচু হতো না। কিচেনে রান্না করে খেতে হতো যার যার খাবার। আমাদের সাথে পড়তে গিয়েছিলো ভারতের হায়দ্রাবাদের ইমরান। তার খাবারের তালিকায় থাকতো কেবল বিরিয়ানি। শর্টকাট উপায়, সহজ পথ। আমরা আলু কিনে সেদ্ধ করতে গেলে মনে হতো এর চেয়ে জাফলং এর পাথর গলানোও সহজ কাজ। একবার শিমের বিচি খেতে মন চাইলো, যাকে বকে খাইস্যা। কিন্তু শিমের বিচি পাবো কোথায়? দোকানে পেলাম টিনের ক্যানজাত কিডনি বিন। তাপ দিয়ে গলাতে গিয়ে শিমের বিচির ডাল হয়ে গেলো। তবুও দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানো হলো। জানুয়ারিতে কলা খেতাম তখন একটার দাম পঁয়ত্রিশ রুবল। অর্থাৎ সত্তর টাকা। তাও তাকে নরম করতে যথেষ্ট সময় লাগতো। চট্টগ্রামের ছেলে তাই যখন শুনলাম ভেদেন খা নামে এক জায়গায় লটিয়া মাছ পাওয়া যায় তখন আর স্থির থাকতে পারলাম না। নিজের হোস্টেল থেকে প্রায় দশটা মেট্রোস্টেশন পার হয়ে গেলাম ভেদেন খা, যেখানে একটা জাদুঘর আছে। এই জাদুঘরে আছে ইউরি গ্যাগারিনের ছবি এবং আরও কিছু স্মৃতি। ইউরি গ্যাগারিন হলেন রুশ নভোচারী যিনি প্রথম মহাকাশে যান। এই ভেদেন খা-তে বাঙালিরা ইলেকট্রনিক জিনিসের ব্যবসা করতো। যাই হোক, বাঙালি পরিচালিত বাঙালিদের জন্যে হোটেলে বসে মন পুরিয়ে লটিয়া মাছ দিয়ে মস্কোতে বসে ভাত খেলাম এক বঙ্গ সন্তান। এটাও সে অর্থে কম বীরত্বের কোন কাজ ছিলো না ঐ সময়। যেদিন প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম সেদিনই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে ভ্যাক্সিন নিতে হলো। নিউমোনিয়ার ভ্যাক্সিন। সকালে ভ্যাক্সিন দিতে গিয়ে চোখে পড়লো পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের তৎপরতা। মনে মনে স্রষ্টাকে অজস্র কৃতজ্ঞতা জানালাম। প্রতিদিন রাস্তার বরফ সরাতে এদের যে পরিমাণ আর্থিক ব্যয় হয় এবং যে জনবল লাগে তা যদি বাংলাদেশে করতে হতো তবে অনেক আগেই আমরা দুনিয়াতে নাই হয়ে যেতাম। বছরের নয়মাস যারা নেগেটিভ তাপমাত্রায় থাকে, রুশরা শ্রম আর মেধার গুণে যে বিশ্বের এক পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছে তার জন্যে তাদের হাজার বার স্যালুট দিলেও কম হয়ে যায়। ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে তাপমাত্রা মাইনাস কুড়ি-বাইশ থেকে উঠেই না। যেদিন তাপমাত্রা মাইনাস পঁয়ত্রিশ সেদিন সব স্কুল-কলেজ অটো বন্ধ থাকে। আমি থাকাকালীন বেশ কয়েকদিন এরকম ঘটনা ঘটেছিলো। মাইনাস আটাশ তাপমাত্রায় অনেকদিন রাশান ভাষা শেখার ক্লাসে যেতে হয়েছিলো। যেদিন তাপমাত্রা জিরো ডিগ্রিতে উঠতো সেদিন রুমে গরম লাগতো। তখন ঘাম ছুটে যেতো। বুঝা যেতো, আজ তাপমাত্রা জিরোতে উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ভবন বা প্রশাসনিক ভবনকে বলতো ক্রেস্ত। ক্রেস্তে যেতে হতো দাপ্তরিক কাজে। তারা আমাদের পাসপোর্ট জমা রেখে একটা কাগজ দিয়েছিলো যেটা নিয়ে পথেঘাটে চলতে হতো। এটাকে বলে স্প্রাবকা। রুশভাষা শেখার ক্লাসে স্যারের কিছুটা মনোযোগ পেয়েছিলাম। রাশানরা উৎসবপ্রবণ জাতি। তারা বিভিন্ন উছিলায় প্রাজনিক পালন করে। প্রাজনিক মানে হলো উৎসব। তারা একে অপরকে পাদ্রোগ দিতেও পছন্দ করে। পাদ্রোগ মানে হলো উপহার। পেরেস্ত্রয়কার পরে গিয়েছিলাম, তাই ঘুষের ছড়াছড়ি দেখতে পেয়েছিলাম। পাদ্রোগের নামে ঘুষের ছড়াছড়ি চলতো প্রকাশ্য দিবালোকেও। তাদের ভাষায় কায়দা ছিলো বেশি। তারা কথায় কথায় কায়দা করে ইজবিনিয়েতে পাজালুস্তা বলতে অভ্যস্ত। অর্থাৎ এক্সিউজ মি ধরনের কায়দামার্কা সহবত। তাদের পুরুষের নামের শেষে আ-কার লাগালে তা স্ত্রী-বাচক নাম হয়ে যায়। যেমন : ইভানভণ্ডইভানভা, বেলানভণ্ডবেলানোভা ইত্যাদি। রাশিয়ার মানুষের সবচেয়ে সুখের দিন আসে গরমকালে, মে মাসে। যদিও তাদের এসময় গরমকাল, আসলে ঐসময়ে যে শীত পড়ে তাতে আমাদের দেশে মানুষ পাতলা কম্বল ব্যবহার করতো। মে মাসে প্রকৃতি সজীব হয়, ফুলে ফুলে সেজে ওঠে কানন-কান্তার। তীব্র শীত থেকে বাঁচতেই মূলত তারা ভদকা,বিয়ার প্রভৃতি হার্ড ড্রিংক পান করে। রাশান রমণীরা দীর্ঘ উচ্চতার অধিকারি। তখন তাদের পছন্দের পরিধেয় ছিলো জিনস্ এবং টপস্। মুখের দিকে চোখা লম্বাটে জুতো তাদের অধিকাংশকেই দৈনন্দিন জীবনে পরিধান করতে দেখেছি। দুয়েকবার রাশান রোলেদকা খেলতে গিয়েছিলাম চিরঞ্জিতদার সাথে। চিরঞ্জিতদা হলো খুলনার ছেলে। ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডক্টরেট করতে গিয়েছিলো। তাদের ভাষায় এমফিলকে অ্যাসপিরান্তুরা এবং ডক্টরেটকে ডক্তরান্তুরা বলে। রোলেদকা খেলতেন চিরঞ্জিতদা আর আমাকে সাথে নিতেন ঘুরতে। আমার সাথে সে সময় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কোনো একটা বেসরকারি কলেজের অধ্যক্ষও গিয়েছিলেন মস্কোতে। তিনি রাশিয়া হয়ে অস্ট্রিয়া যাওয়ার চেষ্টায় ছিলেন।

বিদেশ-বিভূঁয়ে দেখলাম, দেশের চেয়ে রাজনৈতিক দলবাজি ওখানেই বেশি। দেশের মানুষ রাজনীতির নামে বিদেশেই বিভাজিত অধিক। বিদেশে একদল দালালি করে, কীভাবে ইউরোপের অন্য দেশে প্রতারণা করে লোক পাঠানো যায় এবং দেশি মানুষকে মুরগি বানানো যায়। মস্কোতে সবচেয়ে বেশি ভয়ঙ্কর ছিলো স্কিনহেড নামে একদল কিশোর গ্যাং যারা বাদামী চামড়ার বিদেশি পেলেই সংঘবদ্ধ হয়ে তাড়িয়ে বেড়াতো এবং হাতের কাছে পেলে পিটিয়ে মেরে ফেলতো। তারা কুমিল্লার কামাল নামে একজনকে মেরে ফেলেছিলো এবং ঘানার রাষ্ট্রদূতকেও মেরে ফেলেছিলো। কেউ কেউ বলতো, এদের সদর দপ্তর নাকি ইতালির তুলাতে অবস্থিত। স্কিনহেডের সদস্যরা মাথা কামানো ছিলো। তারা হিংস্র এবং ক্ষিপ্র ছিলো। একবার সকালে আমরা কয়েকজন বাঙালি বের হয়েছিলাম দলবেঁধে ঘুরতে। আমাদেরকে স্কিনহেডের দলে পেয়েছিলো। জীবনের মায়ায় ছুট লাগিয়েছিলাম যে যেদিকে পারি। সেদিনের পর থেকে স্কিনহেডের আতঙ্ক রক্তের মধ্যে ঢুকে গিয়েছিলো। রাশিয়ার অফিস আদালতে একটা ব্যাপার খেয়াল করলাম। অফিসগুলোতে সর্বোচ্চ পদে এবং নিরাপত্তা প্রহরীর পদে পুরুষ ব্যতীত অন্য পদগুলোতে নারী নিযুক্ত আছে। এর কারণ অনুসন্ধানে জানা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে রাশিয়ার পুরুষ অধিকাংশই মারা যায়। একারণে পুরুষের সংখ্যা কমে যাওয়ায় কেবল শীর্ষপদে এবং নিরাপত্তা প্রহরীর পদেই পুরুষ নিয়োগ দেওয়া হতো। অতিরিক্ত ঠাণ্ডা আর স্কিনহেডের ভয়ের আতঙ্ক আমাকে দেশে ফিরিয়ে আনে মায়ের কোলে। (চলবে)

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়