বৃহস্পতিবার, ০৩ এপ্রিল, ২০২৫  |   ২৭ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   হাইমচরে মাটি বোঝাই বাল্কহেডসহ আটক ৯
  •   কচুয়ায় কৃষিজমির মাটি বিক্রি করার দায়ে ড্রেজার, ভেকু ও ট্রাক্টর বিকল
  •   কচুয়ায় খেলতে গিয়ে আগুনে ঝলসে গেছে শিশু সামিয়া
  •   কচুয়ায় ধর্ষণের অভিযোগে যুবক শ্রীঘরে
  •   ১ হাজার ২৯৫ কেজি নিষিদ্ধ পলিথিন জব্দ করেছে কোস্ট গার্ড

প্রকাশ : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০০:০০

মিজানুর রহমান রানার মুক্তিযুদ্ধের ধারাবাহিক উপন্যাস

এই জনমে

অনলাইন ডেস্ক
এই জনমে

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

পূর্ব কথা : অনন্যা চৌধুরী ভাবেন, প্রকৃত সম্রাট আওরঙ্গজেব যা বলেছিলো, আজকের নকল পাকবাহিনীর অফিসার আওরঙ্গজেব তার উল্টোটাই আমার সাথে করেছে। তারা আমার সাথে যা করেছে তা শুধু আমার একার লজ্জা নয়। পুরো পাকবাহিনীর জন্যে লজ্জাকর!

তিন.

গলিটা সোজা দুনিয়ার নরকে যেন গিয়ে পৌঁছেছে। আর দুনিয়ার সেই নরকটা ঠিক শ্যামতলা পাক আর্মি ক্যাম্পের ওই কোণে বসিয়ে রাখা হয়েছে। যেখানে দিন শেষে রাত হয়, আর রাতগুলো হয় বহুরূপী রাত। এই রাতের মৃদু আলো আর অন্ধকারের মাঝে যে পসরা জমে তা নেহাত কোটি কোটি টাকার কোনো মোহ নয়। এই রাত শুধু পাক আর্মি সৈনিক ও তাদের অফিসারদের যুদ্ধে চাঙ্গা রাখতে চিত্তবিনোদন বা মনোরঞ্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ।

আর এই মনোরঞ্জনের এক উপাদানের নাম রূপালি। এই মেয়েটির নাম কবে রূপালি হয়েছে তা সে নিজেও জানে না। সে শুধু জানে একদিন কোনো এক সন্ধ্যা রাতে যখন ঝড় বইছিল সেই ঝড়ের মাঝে হাজির হয়েছিল পাক আর্মিবাহিনী। তাদের বাড়ির মানুষজনকে মেরে তাকে তুলে নিয়ে এসেছিলো এই মানুষরূপী পিচাশগুলো। অনিচ্ছায় আর ঘৃণায় তার আগমন এই নরকের ছোট্ট ঘরে। সেই ঘরে তাকে প্রতিরাতে নাচতে হতো। গলায় মেকি হার, কানে দুল, ঠোঁটে লাল লিপস্টিক। পায়ে ঘুঙ্গুর। মৃত্যু সঙ্গীতের তালে তালে শরীর দুলাতো হতো সাপের মতো। সেই দোলানো শরীরের বাঁকগুলো দেখতে ভ্রমরের মতো আমদানি হতো পাক আর্মি অফিসারদের। রূপালিকে মাত্র ১৬ বছর বয়সেই ধরে আনা হয়েছিলো। এরপর তাকে প্রথম তুলে দেয়া হয়েছিলো মক্ষীরাণী সাধুুবালার কাছে নাচণ্ডগান ও অফিসারদের মনোরঞ্জন শেখানোর জন্যে। তারপর জীবনের কত রাত, কতদিন চলে গেছে নরকের অনলে জ্বলে জ্বলে।

তার শরীরে ঠিক যখন যৌবন আসে, ওই সময়ই পাক আর্মির দল তুলে নিয়ে আসে তাকে। তারপর রূপালির কোমর দোলানো নাচের মোহনীয় পসরায় সামিল হতে থাকে কত ভ্রমর।

এভাবেই দিনগুলো কাটাতে হয় তাকে এই নরকের ভাঙ্গা ঘরে। প্রতিদিন নাচ, নাচের তালে ভ্রমর আর ভ্রমরের বিকৃত জৈবিক সাধ-আহ্লাদ পূরণ।

জীবনে অনেক খাকি পুরুষের বাহুতলে মিলিত হয়েছে রূপালি। সবারই চোখ একই কথা বলে। সবারই হাত একইভাবে চলে। আর চলে নরকের কীটগুলোর চাহিদা পূরণ--একের পর এক।

রূপালির মাঝে মাঝে অসুখ হয়, কিন্তু সেই অসুখেও তাকে নাচতে হয়। এখানে কান্নার কোনো সুযোগ নেই। আর কান্না শোনার মতো কোনো মানুষও নেই। শুধু আছে শয়তানের হাসি শোনার মতো মানুষ। সে ভাবে, এই পৃথিবীতে বেশিরভাগ মানুষই শয়তানের কথায় চলে, শয়তানের প্ররোচনায় চলে নারকীয় উল্লাস আর অশ্লীলতা। কিন্তু মানুষের বিবেকবোধ যখন মরে যায় তখন সে নিজেই একটা শয়তান হয়ে যায়। তারপর সেই শয়তানটা অন্য শয়তানকে রাক্ষসের মতো নিজের দলে টেনে নেয়।

এখানে সব রাক্ষস আছে, তারা নরম মাংসের স্বাদ পেতে চায়। টাকা তাদের কাছে তুচ্ছ একটি বিষয়, শুধু চাই সম্ভোগ-ভোগ আর বিলাসিতা। নর্দমা এদের কাছেই, তবুও এরা নর্দমা থেকেই ফুলের সুবাস নিতে চায়! অথচ ফুল নর্দমার কাছে বিলীন হয়ে যায়।

সন্ধ্যা। আজ রূপালি মনে মনে ভাবে, এভাবে কতদিন কেটে গেলো। আর কতদিন বা সে এভাবে নরকের মাঝে কাটিয়ে দেবে।

দেশ আজ পাক হানাদার বাহিনীর থাবায় জর্জরিত। ঠিক তার দেহের মতোই। প্রতিরাতে হানাদার বাহিনী তার শরীর থেকে যেমন খুবলে খুবলে মাংস টেনে খেয়ে রক্ত ঝরায়, ঠিক দেশটাকেও খুবলে খাচ্ছে। দেশের মানুষের শরীর থেকে রক্ত ঝরাচ্ছে।

ভাবতে ভাবতেই রূপালির হঠাৎ করে মনে পড়ে তার এক চাচাতো ভাইয়ের কথা। নাম জহিরুল হক খান। সে আর্মিতে চাকুরি করতো। কিন্তু রূপালির অপহরণের পর তার বিষয়ে আর জানা হয়নি। সে ভাবে, দেশের এই সঙ্কটময় মুহূর্তে নিশ্চয়ই তিনি দেশের পক্ষেই লড়াই করছেন। যদি তার সাথে যোগাযোগ করা যেতো, তাহলে হয়তো নিজের ইচ্ছাটার প্রতিফলন ঘটানো যেতো। না হলে এভাবে নরকের ছোট্ট ঘরে কাটাতে কাটাতে একদিন হয়তো এই হানাদারের দল তাকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মারবে তিলে তিলে। তার চেয়ে বরং দেশের জন্যে মৃত্যুকে বেছে নিলে কেমন হয়?

মন্দ নয়। ভাবে সে। তবে সে যেহেতু মানুষ, তাকে তাই এই নরকের তলা থেকে অন্যজগতে পাড়ি দিয়ে দেখতে হবে দুনিয়াটায় আর কী কী অপেক্ষা করছে তার জন্যে।

সে মনে মনে স্থির করে ফেলে। হ্যাঁ, আজই হবে তার নরকের শেষ রাত। এই রাতেই সে নরক জীবনের অবসান ঘটাবে আর বেরিয়ে পড়বে অন্ধকার ছেড়ে দুর্দান্ত এক মহান আলোর সীমানায়।

রূপালির জানা হয়েছে, যে মানুষটি তার খবর পাক আর্মিদেরকে দিয়েছে সে সমাজের একটা কীট। ওই কীটগুলোকে মানুষ মান্যগণ্য করতো, তোয়াজ করতো। কিন্তু তাদের অন্তরের খবর সবাই রাখে না। তেমনি রূপালিও ওই কীটটাকে ভালো মানুষ মনে করে ভালোবেসেছিলো। মায়ায় জড়িয়েছিলো। তারপর তার সাথেই একদিন অজানায় পাড়ি জমিয়েছিল। তারপর ওই লোকটাই প্রথম তার সর্বনাশটা করেছিলো। তখন সে বুঝেছিলো, লোকটা আসলেই তাকে ভালোবাসেনি, ভালোবেসেছিলো তার দেহটাকে। রূপালি তার সম্ভ্রম হারায়। তারপর তাকে তার বাবা-মা খুঁজে পেয়ে আবার বাড়িতে নিয়ে আসে। তারপরও রক্ষা হয়নি তার। সেই লোকটাই তার খবর পাক আর্মিদেরকে দিয়ে দেয়।

হঠাৎ চিন্তায় বাধা পড়ে যায়। সচকিত হয়ে উঠে সে। একজন পাক আর্মি অফিসার। তবে এ ধরনের লোকদেরকে সে মানুষ মনে করে না। এরা এই দেশটাকে রক্তাক্ত করতে এসেছে। এই দেশের স্বাধীনতাকে দমন করতে এসেছে। খুব সাধু-সন্যাস ভাব নিয়ে এরা বিচরণ করে। কিন্তু রাতের আঁধারে এদের চেহারা পাল্টে যায়।

সে রাতে নাচ শেষে অতিথি হয় সেই পাক আর্মি অফিসার। তার নাম রওনক হাসান। এই অফিসার লোকটি মদের বোতল এক হাতে রেখে অন্য হাতে ঘরের কপাট বন্ধ করে ধীরে ধীরে রূপালির কাছাকাছি এসে বসে। তারপর নেশাগ্রস্ত চোখে রূপালির দিকে তাকায়। এরপর বলে, কেয়া হুয়া? আচ্ছা হ্যায় না?

রূপালি মৃদু হাসে। তার চোখে একরাশ আশার আলো। পৃথিবীর অমানিশা ভেদ করে আজ রাতে চাঁদ উদয় হবে। আলোকিত হবে রূপালি আলোয়। সেই আলোয় দুনিয়াটাকে নীল জোছনা ভরিয়ে দেবে।

মানুষের জীবনে কল্পনাটা কখনও কখনও বাস্তব ফলপ্রসূ হয়ে উঠে, যদি সে দৃঢ়সঙ্কল্প হতে পারে। রূপালি আজ দৃঢ়সঙ্কল্প। অনেক কষ্ট সয়েছে সে। অনেক রূঢ় বাস্তবতা তার এই ষোলো বছরের জীবনে নদীর স্রোতের জলরাশির মতো বয়ে গেছে। আজ সে সেই স্রোতের নির্মল পানিতে গা ভাসাবে। ধুয়ে ফেলবে শরীরের যতো ময়লা-আবর্জনা।

এই জনমে সে-তো কখনই চায়নি তার জীবনটা কর্দমাক্ত হোক। সে-তো চেয়েছে আর দশটা মেয়ের মতোই বেড়ে উঠবে। স্কুলে যাবে। কলেজে পড়বে। জ্ঞান-বিজ্ঞানে জীবনের পথগুলোতে স্বপ্নের ছোঁয়া দিয়ে দেশের জন্যে কাজ করবে। অথচ সমাজের কীটগুলো তাকে নিয়ে এসেছে এই নরকের মাঝখানে, যেখানে প্রতিদিনই তাকে দেহ দিতে হয় অনায়াসে। দেহের প্রতি ক্ষুধা নিয়ে প্রতিদিনই বন্ধ এই ঘরে হাজির হয় কিছু কিছু দেহ-বুভুক্ষু হায়েনার দল। আজও এর ব্যতিক্রম হয়নি। রওনক হাসান ট্রাউজারের কপাট খোলে।

রূপালির মনে হলো, একটা জ্যান্ত সাপ তার ঘরে। এই সাপ তার বহু পরিচিত। সে কমনীয় হাতে সাপের লেজ ধরে। আদরের ছলে হঠাৎ করে ঘটিয়ে দেয় ঘটনাটা। কাৎ করে ওঠে রওনক হাসান নামের ওই সাপটা। কিন্তু তার আগেই রূপালি যা করার তা শেষ করে ফেলে।

কোমরে থাকা ছোট্ট একটা ছুরি সে বসিয়ে দেয় রওনকের বুক বরাবর। রক্তধারা বেরিয়ে আসে হু হু করে মেঘলা আকাশের বৃষ্টিফোঁটার মতো। তার হাত থেকে পড়ে যায় মদের বোতলটা। মাটিতে পড়ে হালকা আওয়াজ হয়ে ভেঙ্গে যায় বোতলটা। এরপর মদের গন্ধ ঘরময় ভেসে পড়ে।

হঠাৎ করে ঘটে যাওয়া অঘটনটা প্রথমে বুঝতে পারে না রওনক হাসান। যখন বুঝতে পারলো তখন তার আর কিছুই করার রইলো না। মোচড় কাটতে কাটতে সাপের নিস্তেজ দেহটা ধপাস করে পড়ে যায় মাটিতে। রক্তে ভেসে যায় ঘরের মাটি।

তারপর রূপালি নরকের দুয়ার খোলে। নরকের দুয়ারে মানুষরূপী বহু কীটপতঙ্গের বসবাস। সেই কীটপতঙ্গের চোখ ভেদ করে লুকিয়ে লুকিয়ে বহু কষ্টে এক সময় সে মূল রাস্তাটায় উঠে পড়ে।

তারপর শ্বাস নেয় বড় করে। সে দেখে এখানেও অজস্র সাপের চোখ ভীড় করে আছে। তবুও ভাবে, নরকের সাপগুলোর চেয়ে এই সাপগুলোর চোখ ভিন্ন, হয়তো এদের মাঝে কোনো দন্তহীন সাপ পেয়ে যাবে সে, তারপর তার জীবনের শেষ সময়গুলো অতিবাহিত করবে তার মতো করেই।

সকাল হয়। তার কাছে এসবের কোনো অর্থ নেই। সে পথ চলছে এলোমেলো...। নিঃসঙ্গ পথ, তবুও মনে হয় এই পথে আনন্দ আছে, এই পথই তার চাওয়া, এই পথেই সে পাড়ি দিবে বহুদূরে, যেপথে নরকের সাপগুলো তাকে জ্বালাতে পারবে না।

রূপালি এগুতে থাকে আর ভাবতে থাকে কীভাবে জহিরুল হক খানের সাথে দেখা করা যায়। সে তো তার ঠিকানা জানে না। কোথায় আছে সে? কী করছে? সেটা তো তার জানতে হবে। যেভাবেই হোক খুঁজে বের করতে হবে তাকে।

১৯৭১ সালে স্নাতক প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন জহিরুল হক খান। ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে যুদ্ধে যোগ দেন। প্রতিরোধযুদ্ধ শেষে ভারতে যান। এরপর সীমান্ত এলাকায় যুদ্ধে অংশ নেন জহিরুল হক খান। জুন মাসে তাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয় প্রথম বাংলাদেশ অফিসার্স ওয়ারকোর্সে। প্রশিক্ষণ শেষে তাকে ৪ নম্বর সেক্টরের আমলাসিদ সাবসেক্টরের অধিনায়কের দায়িত্ব দেয়া হয়। তারপর বেশ কয়েকটি যুদ্ধে তিনি অগ্রবর্তী দলে থেকে যুদ্ধ পরিচালনা করেন।

আজ ক্যাম্পে বসে চিন্তা করছেন অদূরে অবস্থানরত পাকিস্তানি বাহিনীকে কীভাবে যুদ্ধকৌশলে পরাস্ত করতে পারবেন। তার চারপাশে বসে আছে যোদ্ধারা। তারা শুধু তার ইশারার অপেক্ষায় আছেন। একটিমাত্র ইশারায় তারা ঝাঁপিয়ে পড়বেন পাকিস্তানি বাহিনীকে ঘায়েল করতে।

ঠিক এই সময়ে খবর এলো, পাকবাহিনী ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে কানাইঘাটে তাদের ক্যাম্পের দিকে। সচকিত হয়ে উঠলেন জহিরুল হক খান। নির্দেশ দিলেন, ‘তোমরা প্রস্তুত হও।’ (চলবে)

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়