শুক্রবার, ০৪ এপ্রিল, ২০২৫  |   ২৭ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   হাইমচরে মাটি বোঝাই বাল্কহেডসহ আটক ৯
  •   কচুয়ায় কৃষিজমির মাটি বিক্রি করার দায়ে ড্রেজার, ভেকু ও ট্রাক্টর বিকল
  •   কচুয়ায় খেলতে গিয়ে আগুনে ঝলসে গেছে শিশু সামিয়া
  •   কচুয়ায় ধর্ষণের অভিযোগে যুবক শ্রীঘরে
  •   ১ হাজার ২৯৫ কেজি নিষিদ্ধ পলিথিন জব্দ করেছে কোস্ট গার্ড

প্রকাশ : ০২ এপ্রিল ২০২৪, ০০:০০

সচেতন পদক্ষেপ শিক্ষাকে ফলপ্রসূ করবেই

অধ্যাপক ড. মোঃ নাছিম আখতার
সচেতন পদক্ষেপ শিক্ষাকে ফলপ্রসূ করবেই

ভাস্কর্যটি ফিনল্যান্ডের একটি রাস্তায়। ডুবন্ত মানুষের হাতে একটি বই। ক্যাপশনে লেখা—‘তুমি যদি ডুবে যেতে থাকো, তবু পড়ো’। ক্যাপশনের মধ্যেই পড়ার অপরিসীম গুরুত্ব প্রকাশ পেয়েছে। জীবনের যে পর্যায়েই থাকি না কেন, পড়ার সঙ্গে কখনো সম্পর্ক ছিন্ন করা উচিত নয়। আমাদের দেশে একটি নির্দিষ্ট বয়সের পরে তো বটেই, তরুণ বয়সেও নিবিড় পর্যবেক্ষণ, প্রক্রিয়া ও দর্শনের অভাবে আমরা পড়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলি, যা আমাদের জীবনে সামনের দিকে অগ্রসর হওয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা।

বিপুল জনসংখ্যার দেশ আমাদের এই মাতৃভূমি। এখানে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছে এমন শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৪৬ লাখ। জানলে অবাক হবেন, পৃথিবীর ৭৫টি দেশের জনসংখ্যা আমাদের দেশের উচ্চশিক্ষা গ্রহণকারী শিক্ষার্থীর সংখ্যার চেয়ে কম। এমন বিশালসংখ্যক জনগোষ্ঠীকে যখন আমরা মানবসম্পদে রূপান্তরিত করতে যাচ্ছি, তখন এর নিবিড় তদারকি ও পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত জরুরি। তাই এই বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীর শিক্ষায় পদার্পণ, শিক্ষাগ্রহণ ও তাদের পাঠাভ্যাসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবকিছুই আমাদের জাতীয় শিক্ষার মানোন্নয়নে সহায়ক। আমরা একটু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে একটি বিষয় অনুধাবন করব যে, যারা মানসম্মত কাজ পেয়ে বহির্বিশ্বে গমন করছেন, তারা সবাই মেধাবী, শিক্ষিত ও কাজে পারদর্শী। আমাদের মনে রাখতে হবে, দয়া করে বা করুণা করে কোনো দেশ আমাদের নেবে না। তাদের নাগরিকেরা উচ্চমাত্রার যে কাজ করতে অক্ষম, সেই কাজগুলো করার জন্যই কেবল আমাদের নাগরিকদের ভিসা দিতে প্রস্তুত। এমতাবস্থায় উচ্চশিক্ষায় সম্পৃক্ত জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে উচ্চশিক্ষার প্রক্রিয়াটি যাতে সুচারুরূপে সম্পন্ন হয়, সে বিষয়টির প্রতি আমাদের সজাগ দৃষ্টি দিতে হবে।

অপার সম্ভাবনাময় আমাদের এই জাতি। তবে সম্ভাবনার বিকাশ ঘটাতে আমাদের সমস্যা সমাধানে আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় আনতে হবে। সমাধানের জন্য যে মডেল অনুসরণ করতে হবে, সেটি হচ্ছে কীভাবে পাঠাভ্যাস গড়ে তোলা যায়। এখন দেখি শিক্ষার্থীরা খাতায় লিখছে অনেক মন্থর গতিতে। হাতের লেখার ক্ষেত্রে তারা আগের মতো প্রত্যয়ী নয়। আমার মতে, এর কারণ মুঠোফোনে বিরামহীন খুদে বার্তা প্রেরণ ও শব্দের ব্যবহার। আমরা হাতে লেখা প্রায় ভুলেই যাচ্ছি। আমার দাপ্তরিক প্রয়োজনে কোনো এক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষককে বললাম, ‘আমাকে হাতে লেখা ১০০ নম্বরের একটি প্রশ্ন দিন’। তিনি বললেন, ‘আমি টাইপ করা প্রশ্ন দিতে পারি, কিন্তু হাতে লেখা দিতে পারব না। আমি হাতে লেখা ভুলে গেছি।’ এটা আমাদের শিক্ষার জন্য অশনিসংকেত। আমি ভাবলাম, উনি শিক্ষার্থীদের বোঝাতে হোয়াইট বোর্ডে কীভাবে লিখবেন? আর শ্রেণিকক্ষে যদি ক্লাস আকর্ষণীয় না হয়, তাহলে শিক্ষার্থীদের মনে প্রবেশ করাটা দুরূহ।

কম্পিউটার যখন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে, তখনো বিশ্বের কোনো দেশে হাতের লেখাকে অপরিহার্য বিবেচনা করা হচ্ছে, এমনটি বিশ্বাস করা কঠিন। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, ফ্রান্সে এখনো চাকরিতে নিয়োগের জন্য চূড়ান্ত নির্বাচন সম্পন্ন হয়ে থাকে হাতের লেখা বিচার-বিশ্লেষণ করে। প্রাথমিক নির্বাচনের জন্য পরীক্ষা যে প্রক্রিয়ায়ই গ্রহণ করা হোক না কেন, চূড়ান্ত বাছাইয়ের সময় চাকরিপ্রার্থীদের স্বহস্তে লিখতে বলা হয়। আর সেই হস্তলিপি বিশ্লেষণ করেই নিয়োগ কর্তৃপক্ষ প্রকৃত যোগ্য প্রার্থী বা প্রার্থীদের খুঁজে বের করেন। হাতের লেখাই বলে দেয় প্রার্থীর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য তথা ব্যক্তিত্বের স্বরূপ। প্রযুক্তির প্রভাবে কলম ব্যবহার কমে যাওয়ার কারণে উদ্বেগে আছে বেশ কিছু দেশের কর্তাব্যক্তিরা। যুক্তরাষ্ট্রের নানা রাজ্যে হাতের লেখায় উৎসাহিত করার জন্য নানা প্রোগ্রাম চালু করা হয়েছে।

একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিলাম বর্ষ শেষের সেন্ট্রাল ভাইভা নিতে। পরীক্ষায় ৫৩ জন শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিল। যে বিষয়ের ফাইনাল ভাইভা নিচ্ছিলাম, সেই বিষয়ের ওপর একজন বিখ্যাত লেখকের লেখা খুবই মানসম্মত একটি বই আছে। ভাইভা বোর্ডে ঐ বই তাদের কাছে আছে কি না, জিজ্ঞাসা করতেই তিন জন শিক্ষার্থী উত্তর দিল, তারা বাজার থেকে বই কিনেছে। আর ২০ জনের কাছে পিডিএফ কপি আছে বলে জানতে পারলাম। বাকিরা উত্তর দিল, তারা লেকচার স্লাইড পড়েছে, কিন্তু কোনো বই পড়েনি। এমন অবস্থা মোটেও কাম্য নয়। প্রকৃতপক্ষে উচ্চশিক্ষা মানুষকে পড়ার অভ্যাস তৈরিতে অভ্যস্ত করে। যে কোনো বই পড়ে তার মূল বিষয় অনুধাবন করার ক্ষমতাই হলো উচ্চশিক্ষার মাহাত্ম্য। আমেরিকা, ফ্রান্সসহ পশ্চিমা বিশ্ব অনেক আগেই তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের অতি উচ্চসীমায় উপনীত হয়েছে। এর ফলে তাদের সমাজে তারা যে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে, সেগুলো বিবেচনায় আমরা আমাদের দেশের জন্য ভবিষ্যৎ করণীয় ঠিক করতে পারি।

সুইডেন শিক্ষা খাতে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে বিশ্বের অগ্রসর দেশগুলোর মধ্যে প্রথম সারির। নর্ডিক দেশটিতে এমনকি নার্সারি শ্রেণিতেও রয়েছে ট্যাবলেটের মাধ্যমে পাঠদানের চল। তবে শিক্ষার অতি-ডিজিটাইজেশন শিশুদের মৌলিক দক্ষতা ও জ্ঞান বিকাশকে ব্যাহত করছে কি না, সেই প্রশ্ন তুলছেন দেশটির রাজনীতিক ও বিশেষজ্ঞরা। ‘প্রযুক্তিনির্ভর সুইডেনে শ্রেণিকক্ষে কম্পিউটার স্ক্রিন নিষিদ্ধ করছে, কেন?’ খবরের শিরোনামটি আমাদের নতুন করে ভাবনার খোরাক জোগাবে। এই পদক্ষেপ আরো সম্প্রসারিত করে ছয় বছরের কম বয়সি সব শিশুর জন্য ডিজিটাল পদ্ধতিতে শিক্ষাগ্রহণ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করার পরিকল্পনাও রয়েছে সুইডিশদের। সুইডেনের স্কুলবিষয়ক মন্ত্রী লট্টা এডহোম ২০২৩ সালের মার্চ মাসে বলেন, ‘সুইডেনের শিক্ষার্থীদের আরো বই দরকার। ছাপানো বই, ডিজিটাল কপি নয়। একই বছরের ফেব্রুয়ারি মাস থেকেই সুইডেনের শিক্ষকেরা শিশু শিক্ষার্থীদের ছাপানো বই পড়া, হাতের লেখা চর্চার প্রতি গুরুত্ব দিতে শুরু করেছেন। একই সঙ্গে শ্রেণিকক্ষে ট্যাবলেট কম সময় ব্যবহার করতেও উৎসাহ দিচ্ছেন। টাইপিংয়ের বদলে উৎসাহ দিচ্ছেন খাতাণ্ডকলমের অনুশীলনে।

কেন এই সিদ্ধান্ত? ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর দি ইভাল্যুয়েশন অব এডুকেশনাল অ্যাচিভমেন্ট বা আইইএ বৈশ্বিক শিক্ষার মান যাচাইয়ে নিয়মিত গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এর নাম প্রোগ্রেস ইন ইন্টারন্যাশনাল রিডিং লিটারেসি স্টাডি বা পিআইআরএলএস। সাম্প্রতিক সময়ে পিআইআরএলএসের গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, সুইডেনের শিশুদের পড়া বুঝতে পারার দক্ষতা উচ্চ থেকে মাঝারি পর্যায়ে নেমে গেছে। অথচ এই শতকের শুরুতে তাদের শিক্ষাকে মনে করা হতো ইউরোপীয় শিক্ষাঙ্গনের মানদ-। পিআইআরএলএস গবেষণা অনুসারে, ২০১৬ সালে সুইডেনের চতুর্থ গ্রেডের শিক্ষার্থীরা গড়ে ৫৫৫ পয়েন্ট স্কোর করেছিল, যা ২০২১ সালে নেমে এসেছে ৫৪৪ পয়েন্টে। সান্তিয়াগো দ্য কম্পোস্তেলা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইসাবেল ড্যান বলেন, শিক্ষানীতিতে কাগজে-কলমে লেখা ও ছাপানো বই পড়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার একটা চাহিদা আছে। যেমন—স্পেনের স্কুলগুলোতে কাগজে-কলমের শিক্ষা পদ্ধতিতে ফেরার দাবি উঠেছে। শিশুরা বলছে, এভাবে পড়াশোনা করাই সবচেয়ে ভালো। কিন্তু, তার মানে এই নয় যে, শ্রেণিকক্ষ থেকে সব ধরনের প্রযুক্তি আমাদের সরিয়ে ফেলতে হবে। উন্নত বিশ্বের অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানগুলো বিবেচনায় এনে শিক্ষার প্রতিটি ক্ষেত্রে সচেতন ও সজাগ পদক্ষেপ গ্রহণ করলে শিক্ষা ফলপ্রসূ হবেই হবে।

লেখক : উপাচার্য, চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়