সোমবার, ০৩ আগস্ট, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ০৩ আগস্ট ২০২৬, ১০:১৭

খণ্ডে খণ্ডে অখণ্ড জীবন

পীযূষ কান্তি বড়ুয়া
খণ্ডে খণ্ডে অখণ্ড জীবন

(পঞ্চান্নতম পর্ব)

*আমার দেখা বিশ্বকাপ ফুটবল-৩*

দুহাজার চৌদ্দ সালের বিশ্বকাপ ফুটবল যেন ধসিয়ে দিয়ে গেছে সকল গৌরব, সকল সৌন্দর্য। ঊনিশ শ’ পঞ্চাশ সালে নিজেদের মারাকানায় সেলেসাওরা উরুগুয়ের কাছে হারিয়েছিলো ফুটবলের গৌরব। সবাই আশায় বুক বেঁধেছিলো—সেই হৃত গৌরব এবার বুঝি পুনরুদ্ধার হবে। কিন্তু এর চেয়েও যে খারাপ কিছু অপেক্ষায় ছিলো তা কে জানত? সেমিফাইনালে তুরুপের তাস নেইমার ইনজুরড। বিশ্বস্ত থিয়াগো সিলভা ডাবল হলুদ কার্ডের খড়গে বাদ। জার্মানি আগের বার হারের বদলা নেওয়ার এক মোক্ষম সুযোগ পেয়ে গেলো। প্রথমার্ধেই তারা ব্রাজিলের জালে আটকে দিল পাঁচ গোল। আর খেলাশেষে সাত-এক গোলে তারা বিজয়ী। জার্মানির বিজয়ের চেয়েও বড় হয়ে দেখা দিলো ব্রাজিলের সাত গোলে হেরে যাওয়া। এর রেশ রয়ে যাবে আজীবন। বিশ্বকাপের ইতিহাসে ঘটে যাওয়া অঘটনের একটি হিসেবে এটি বিবেচিত। চৌদ্দর বিশ্বকাপকে আরও মনে করিয়ে দেবে উরুগুয়ের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় লুই সুয়ারেজের প্রতিপক্ষকে খেলার মাঠে কামড়ে দেওয়ার ঘটনা। ইতালি ও উরুগুয়ের ম্যাচে ইতালিয়ান ডিফেন্ডার জর্জো কিয়েল্লিনির কাঁধে কামড় দিয়ে নিষিদ্ধ হন লুইস সুয়ারেজ। সত্যিই, খেলার আবেগ যে কী বিচিত্র!

দুহাজার আঠারোর বিশ্বকাপ আমার হৃদয়ে অমলিন রবে সেই প্রিয়দর্শিনীর জন্যে। সে যে সুহাসিনী শুচিস্মিতা! আমি ক্রোয়েশিয়ার নারী প্রেসিডেন্ট কোলিন্ডা গ্র্যাবার কিতারোভিচের কথা বলছি। ইকোনমি ক্লাসে উড়ে এসে খেলার মাঠে তিনি নিজে উপস্থিত থেকে খেলোয়াড়দের উজ্জীবিত করে তুললেন। মুখে লেগে রইলো সাহসের হাসি, গায়ে তাঁর ক্রোয়েশিয়ার লাল-সাদায় চমৎকার নজরকাড়া জার্সি। দল হেরে কান্নায় ভেঙে পড়লে তিনি বৃষ্টিতে ভিজে মাঠে নেমে খেলোয়াড়দের আলিঙ্গন করে সান্ত্বনা দেন। আহা! নেতা তো এমনই হবেন। নিজ নেতৃত্বগুণে তিনি দুহাজার সতেরো সালে জনপ্রিয় ফোর্বস ম্যাগাজিনের তালিকায় বিশ্বের ঊনচল্লিশতম শীর্ষ ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে নির্বাচিত হন। দুহাজার আঠারো সালে বিশ্বকাপ ফুটবলের বদৌলতে তিনি গুগল সার্চ ইঞ্জিনে বাংলাদেশে সর্বোচ্চ সংখ্যক অনুসন্ধানের ব্যক্তি ছিলেন। এই বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়া রানার্সআপ হলেও তাদের তারকা খেলোয়াড় লুকা মদ্রিচ সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়ে গোল্ডেন ফুটবল জয় করেন।

দুহাজার বাইশের ফুটবল বিশ্বকাপ ছিলো মেসিময়। মেসির একক নৈপুণ্যে আর্জেন্টিনা তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জয় করে এবং মেসি গোল্ডেন বলের অধিকারী হন সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়ে। এ বিশ্বকাপের সবচেয়ে নজরকাড়া বিজ্ঞাপন ছিলো মাসকট লা’ইব। ভূতের মতো দেখতে কিন্তু ভয় জাগানিয়া নয়। আরব্য সংস্কৃতির এক অনন্য নিদর্শন লা’ইব। চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা প্রথম খেলাতেই হেরে যায় এশীয় শক্তিধর সৌদি আরবের কাছে। সবার মনে ধারণা ছিলো এবার বুঝি সকল সম্ভাবনা সত্ত্বেও আর্জেন্টিনা মুখ থুবড়ে পড়বে গ্রুপ পর্বে। কিন্তু নিয়তির নকশায় মেসি বরণের উৎসব লেখা ছিলো। তাই দিনশেষে মেসিই নায়ক। তাঁর হাতেই সোনার কাপ, তাঁর গলাতেই বিজয়ীর মেডেল।

দুহাজার বাইশকে ম্লান করে দিয়ে দুহাজার ছাব্বিশ হাজির হলো আটচল্লিশ দলের রণক্ষেত্র নিয়ে তিন দেশে বিস্তৃত হয়ে। নানা বিতর্ক আর বিসংবাদে ছাব্বিশ হয়ে উঠলো বেদনার, বিষাদের এবং বিস্ময়ের। এডিডাসের মডেল মেসিকে ঘিরে ফিফা প্রেসিডেন্টের অতি আবেগ এবারের টুর্নামেন্টকে নিরপেক্ষতায় অনেকের চোখে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। বিশেষ করে আর্জেন্টিনা বনাম মিশরের ম্যাচ এবং আলজেরিয়ার সাথে খেলায় মেসির করা ফাউলকে এড়িয়ে যাওয়ার ঘটনায়। আলজেরিয়ার ডিফেন্ডার ও অধিনায়ক আইসা মান্দিকে মেসি পেছন থেকে তাঁর পায়ের গোড়ালি ও থোড়ে আঘাত করেন। অনিচ্ছাকৃত হলেও আঘাতের বিবেচনায় এটা একটা মারাত্মক ফাউল, যার জন্যে একটা লাল কার্ড বৈধ ও অবধারিত। কিন্তু রেফারি তা গ্রাহ্য করেননি। অথচ একই ফাউল অন্য কেউ করলে তার কপালে জুটেছে লাল কার্ড। এ বিষয়টা নিয়ে বেশ আলোচনা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি বিতর্কিত হয়েছে মিশর-আর্জেন্টিনা ম্যাচ, যেখানে ডি-বক্সে সালার বিপরীতে ফাউল উপেক্ষা করা হয়েছে এবং মিশরের দুটো গোল অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। ফাইনালে স্পেনের বিরুদ্ধে হেরে গিয়ে খেলার পরে স্পেনের খেলোয়াড়ের ওপর চড়াও হয় আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়রা। এটা বিশ্বকাপের গৌরবে কলঙ্ক লেপে দিয়েছে।

যে ঘটনাটা বিষাদের জন্ম দিয়েছে তা হলো মেসির অশ্রুসিক্ত বিদায়। তাঁর শেষ বিশ্বকাপে তাঁকে যেতে হলো খালি হাতে, রিক্ত-নিঃস্ব হয়ে। পক্ষান্তরে কোচ আনচেলত্তির বিতর্কিত সিদ্ধান্তে বিশ্ববাসী এবার পুরো নেইমারকে দেখতে পায়নি। অথচ নেইমার পুরো ম্যাচ খেললে ফলাফল অন্য রকম হতে পারতো। এবারের বিশ্বকাপে বিদায় নেওয়া হলো বেশ ক’জন প্রতিষ্ঠিত তারকার। সিআর সেভেন খ্যাত পর্তুগালের রোনালদো, ক্রোয়েশিয়ার লুকা মদ্রিচ, ব্রাজিলের নেইমার, আর্জেন্টিনার মেসি--এদের কাউকে আর বিশ্বকাপের মাঠে দেখা যাবে না।

ফাইনালের খেলায় সারা মাঠে স্পেন ছিলো লাল মশাল জ্বালিয়ে। আর্জেন্টিনাকে খুঁজেই পাওয়া যায়নি সারা মাঠে। তার ওপর একজন খেলোয়াড় লাল কার্ড খেয়ে দলকে আরও দুর্বল করে দিয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি সমালোচিত হয়েছেন কোচ স্ক্যালোনি, তাঁর অতি রক্ষণ-কৌশলের কারণে। ফলে আর্জেন্টিনার মাঝমাঠেই খেলা থমকে ছিলো। যদিও স্পেনের গোলকিপার গোল্ডেন গ্লাভসের মালিক হয়েছেন, তবে আগেরবার গোল্ডেন গ্লাভস বিজয়ী এমিলিয়ানো মার্তিনেজ না থাকলে ব্রাজিলের সেভেন আপ রেকর্ডে ভাগ বসাতো আর্জেন্টিনা। বিশ্বকাপ উন্মাদনায় ঘি ঢেলে দিয়ে আর্জেন্টিনা-স্পেন ফাইনাল ম্যাচটাকে বুকিদের হাতে ফিক্সড করার অজুহাতে আবারও অনুষ্ঠানের দাবি উঠেছে চারদিক থেকে। কিন্তু দাবি উঠলেই কি মানা যায়? দুহাজার ছাব্বিশের বিশ্বকাপে নতুন দুটি কার্ডের প্রচলন হয়েছে বলে ক্রীড়ামোদী বোদ্ধারা মনে করেন। হলুদ কার্ড, লাল কার্ডের পর একটা হলো ট্রাম্প কার্ড। আমেরিকার বালোগান লাল কার্ডের কারণে বত্রিশ দলের পর্বে নিষিদ্ধ হলে ট্রাম্পের নির্দেশে ফিফা তা স্থগিত করে। এটাই সেই তথাকথিত ট্রাম্প কার্ড। আরেকটা হলো আর্জেন্টিনার বিপক্ষ সাপোর্টারদের চোখে পেনাল্টি কার্ড। এটা এক ধরনের এক্সট্রিম ট্রল। তারা মনে করে, বাংলাদেশের ফ্যামিলি কার্ডের মতো আর্জেন্টিনার মেসিকেও ফিফা পেনাল্টি কার্ড দিয়ে রেখেছে। যে কোনো সময় তাঁর অনুকূলে পেনাল্টি দেওয়া হতে পারে।

ছাব্বিশের বিশ্বকাপ উন্মাদনায় বাংলাদেশে বেশ ক’টা নিরীহ প্রাণ ঝরে গেছে। হিসেবমতে প্রায় দশ থেকে বারোজন মারা গেছে। কেউ বিশ্বকাপ দেখতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে আর কেউ মানসিক উত্তেজনায় হার্ট অ্যাটাক হয়ে। কেউ মারা গেছেন প্রতিপক্ষের হাতে পিটুনি খেয়ে।

আমার বিশ্বকাপ ফুটবল উপভোগের ইতিহাস অবিমিশ্র আনন্দে ভরা নয়। নানারঙের বর্ণিলতা তাতে মিশে আছে। ব্রাজিলের খেলায় আমি বসে থাকতাম ক্যামেরাম্যানের কারসাজির জন্যে। সে চমৎকার করে গ্যালারি শো তুলে ধরতো। গত দুটো বিশ্বকাপে সেই সাম্বা শো আর দেখা যায় না। তাই আমার কাছে বিশ্বকাপও জৌলুস হারিয়ে ফেলছে দিনকে দিন। (চলবে)

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়