প্রকাশ : ০৪ জুলাই ২০২৬, ০৮:৫৬
আমার স্বপ্ন, আমার ভালোবাসা

দিনগুলো তখন অদ্ভুত এক টানাপোড়েনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিল। ভালোবাসা আর বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আমি যেন নিজেকেই নতুন করে চিনতে শিখছিলাম। তাকে ভালোবাসি এই সত্যটা যতটা সহজ, তাকে পাওয়ার পথটা ততটাই জটিল। এক সন্ধ্যায়, জানালার পাশে বসে আছি এমন সময় ওর ফোন এলো হালকা বাতাসে তার কণ্ঠটা ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে এলো, কিছুক্ষণ কথা বলার পর ও বললো, তোমাকে বিয়ে করতে আমার কোনো আপত্তি নেই তবে একটা শর্ত আছে।
আমি হেসে বলেছিলাম, শর্ত? আমার জন্য? সে বলেছিল, খুব শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে, আমি পরিবারের অমতে বিয়ে করবো না। যদি সারা জীবন অবিবাহিত থাকতে হয়, তবুও না। তোমাকে আমার পরিবারকে রাজি করিয়েই আমাকে নিতে হবে।
সেদিন কথাটা শুনে বুকের ভেতর কেমন একটা নরম ঝড় বয়ে গিয়েছিল। মনে হয়েছিল, এই মেয়েটা শুধু ভালোবাসে না, সে ভালোবাসাকে সম্মান করতেও জানে। আমিও নানা হিসাব কষে তাকে বলে আমি রাজি হয়েছিলাম। কিন্তু সেই রাজি হওয়া যে এত বড় এক পরীক্ষা সামনে আমাকে দাঁড়াতে, তা বুঝিনি।
তার বাড়িটা আমার প্রতিদিনের চলার পথেই ছিল। কতদিন যে হেঁটে হেঁটে সেই বাড়ির সামনে দিয়ে গেছি, তার কোনো হিসেব নেই। বিকেলের আলো যখন একটু নরম হয়ে আসে, আমি ধীরে পা ফেলতাম, যেন সময়টাকে একটু থামিয়ে রাখা যায়। মাঝে মাঝে ফোন দিতাম। সে জানালার পর্দার আড়াল থেকে উঁকি দিত। আমি তাকে পুরোপুরি দেখতে পেতাম না, কিন্তু বুঝতে পারতাম সে আছে, আমার জন্যই দাঁড়িয়ে আছে।
এই অদেখা দেখা, এই না বলা কথাগুলোই যেন আমাদের ভালোবাসার সবচেয়ে গভীর ভাষা হয়ে উঠেছিল। কিন্তু বাস্তবতা ছিল কঠিন। আমি জানতাম শুধু চোখে চোখ রেখে, লুকিয়ে কথা বলে এই সম্পর্ককে গন্তব্যে পৌঁছানো যাবে না। তাই একদিন সাহস করে প্রস্তাব পাঠালাম। দূর সম্পর্কের মামা আর খালাকে দিয়ে তাদের বাড়িতে বিয়ের কথা বলানো হলো। সেদিনটা আমার জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ দিনগুলোর একটি।
আমি অপেক্ষা করছিলাম একটা ভালো খবরের জন্য। কিন্তু সন্ধ্যা নামার আগেই সবকিছু ভেঙে গেলো। ওর মা নাকি বলেছিলেন, ওকে তো আমি আমার ছেলের মতো জানি কিভাবে তার সাথে আমার মেয়ের বিয়ে দেবো?
এই কথাটা শুনে আমার ভেতরে কেমন যেন নিস্তব্ধতা নেমে এলো। আমি বুঝতে পারলাম আমি যে জায়গাটায় দাঁড়িয়ে আছি, সেটা শুধু ভালোবাসার জায়গা না, এটা সম্পর্কের জটিলতার জায়গা। আমার মামা-খালাম্মা লজ্জা পেয়ে ফিরে এসেছিলেন। তারা এসে বললেন, ওখানে তোমার বিয়ে হবে না।
আমি চুপ করে ছিলাম। কিছুক্ষণ পর শুধু বলেছিলাম, আমি বিয়ে করলে তাকেই করবো। এই কথাটার মধ্যে কোনো উচ্চারণ ছিল না, ছিল শুধু একগুঁয়ে এক দৃঢ়তা। সেদিনের পর থেকে আমার চারপাশের অনেক কিছু বদলে গেলো। খালাম্মা, যাদের বাসায় আমি এতদিন ছিলাম, তারাও ধীরে ধীরে দূরে সরে গেলেন। তারা হয়তো ভেবেছিলেন আমি একটা অসম্ভব পথে হাঁটছি। কিন্তু আমি জানতাম এই পথই আমার। আমি পারবো এবং আমাকে পারতেই হবে। দিনের পর দিন কেটে যাচ্ছিল। আমি বাইরে থেকে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করতাম, কিন্তু ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়ছিলাম।
টিউশন, চাকুরি যে কোনটাতে বসি, কিন্তু মন বসে না। ইভেন্টের কাজ হাতে নেই, কিন্তু আগের মতো উৎসাহ পাই না। সবকিছু যেন রঙ হারিয়ে ফেলেছে। একদিন রাতে আর সহ্য করতে না পেরে তাকে ফোন করলাম। বললাম, আমি পারছি না তোমার বাবা-মাকে রাজি করাতে পারছি না আমি কি করবো? ও কিছুক্ষণ চুপ করে ছিল।
তারপর খুব ধীরে বললো, আমি যেটা বলেছি, সেটাই করতে হবে। অন্য কোনো পথ নেই। তার কণ্ঠে কোনো অভিযোগ ছিল না, কোনো দুর্বলতাও নাÑছিল শুধু এক অদ্ভুত দৃঢ়তা। আমি ফোনটা কানে ধরে বসে ছিলাম, কিন্তু মনে হচ্ছিল আমি যেন নিজের ভেতরের একটা আয়নায় তাকিয়ে আছি। আমি কি সত্যিই তাকে পাওয়ার জন্য যথেষ্ট চেষ্টা করছি?
নাকি আমি শুধু সহজ একটা পথ খুঁজছি? সেদিন রাতটা আমি একা কাটালাম। জানালার বাইরে চাঁদ ছিল, কিন্তু সেই আলো আমার ভেতরের অন্ধকার দূর করতে পারছিল না। আমি ভাবতে লাগলাম ভালোবাসা কি শুধু একসাথে থাকার নাম? নাকি এটা একটা দায়িত্ব, একটা লড়াই? আমি বুঝতে পারলাম সে আমাকে শুধু ভালোবাসেনি, সে আমাকে যোগ্য হতে বলেছে। তার পরিবারকে রাজি করানো মানে শুধু অনুমতি নেওয়া না এটা নিজেকে প্রমাণ করার একটা সুযোগ।
পরের দিন থেকেই আমি নিজেকে বদলাতে শুরু করলাম। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম আমি তার পরিবারের কাছে নতুনভাবে নিজেকে তুলে ধরবো। আমি তাদের দেখাবো আমি শুধু একজন ভালোবাসার মানুষ না, আমি একজন দায়িত্বশীল মানুষ। আমি সমাজের কাজে আরও মন দিলাম, নিজের অবস্থানকে শক্ত করলাম। আমি চাইছিলাম তারা আমাকে নতুন চোখে দেখুক। এই পথটা দীর্ঘ ছিল, কঠিন ছিল। অনেক সময় মনে হতো সব ছেড়ে দিই।
কিন্তু যখনই তার কথা মনে পড়তো, তার সেই জানালার আড়াল থেকে তাকানো চোখ, তার সেই দৃঢ় কণ্ঠ পরিবারের সম্মতি লাগবে, তখন আবার শক্তি পেতাম। একদিন বিকেলে আবার তার বাড়ির সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম।
হঠাৎ দেখলাম সে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের দুজনের দুজনের চোখে চোখ পড়লো। সে একটু হেসে ফেললো। সেই হাসিটা ছিল না কোনো উচ্ছ্বাসের, না কোনো দুঃখের সেটা ছিল এক ধরনের বিশ্বাসের হাসি। মনে হলো সে জানে, আমি পারবো। আমি থামিনি, কিছু বলিনি শুধু হেঁটে চলে গেলাম। কিন্তু সেই মুহূর্তটাই আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিলো। আমি বুঝলাম ভালোবাসা মানে শুধু একসাথে থাকা না। ভালোবাসা মানে অপেক্ষা করা, নিজেকে প্রমাণ করা, আর সবচেয়ে বড় কথা একজন মানুষের বিশ্বাসকে ধরে রাখা। আমি এখনো জানি না, শেষ পর্যন্ত কী হবে। কিন্তু আমি জানি আমি থামবো না। কারণ এই পথের শেষে শুধু একজন মানুষ না আছে আমার স্বপ্ন, আমার সম্মান, আমার ভালোবাসা। আর আমি, আমি এবার হার মানতে রাজি নই।






