প্রকাশ : ০৪ জুলাই ২০২৬, ০৮:৫৪
ধারাবাহিক উপন্যাস-৪৭
নিকুঞ্জ নিকেতন

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
এরই মধ্যে রাজীব আর সাথে আরও দুজন লোক এসে আদালতে হাজির। বাদী পক্ষের উকিলের জেরায় আমাদের অবস্থা বেগতিক ছিল অবশেষে রাজীবকে দেখে প্রাণ ফিরে পাই।
‘মামলার অভিযোগকারী আপনার পরিচয়টা দিন।’
‘আমি আজহারুল গণি ভূঁইয়া টিপু। আমার একটি রিয়েল এস্টেট ফার্ম আছে এ.জে বিল্ডার্স নামে।’
‘তাহলে নিকুঞ্জ নিকেতনের সাথে আপনার সম্পর্ক কী আর কেনই বা আপনি সেখানে বসবাসরত লোকগুলোর নামে অভিযোগ করেছেন? বিস্তারিত আদালতে উপস্থাপন করুন।’
‘মাননীয় আদালত আমরা বিল্ডার্সরা জায়গার মালিকের সাথে চুক্তিবদ্ধ হলে তবেই সে জায়গার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করি। নিকুঞ্জ নিকেতন শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত একটি জায়গা এবং জমির মালিকানা নিয়ে কোনোপ্রকার জটিলতা না থাকায় জমির মালিকের সাথে চুক্তিবদ্ধ হই।’
‘মাননীয় আদালত আমি বাদীকে কিছু প্রশ্ন করতে চাই?’
‘প্রসিড।’
‘নিকুঞ্জ নিকেতনের মালিককে আপনি কী বলতে পারেন?’
‘রাজীব বাবু।’
‘রাজীব বাবুর সাথে আপনি কবে কখন চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন।’
‘আমরা বিগত চার মাস আগে কাগজপত্র দেখে চুক্তিপত্র করি।’
‘রাজীব দাসের নামে জায়গার কাগজপত্র কীভাবে আপনি পেলেন উনার কী কোনো দলিল আছে এই জায়গার?’
‘উনি তো উত্তরাধিকার সূত্রে মালিক।’
‘মাননীয় আদালত বাদী পক্ষের উকিল সাহেব যথার্থ বলেছেন উনি উত্তরাধিকার সূত্রে মালিক কিন্তু উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পত্তি তিনি ট্রান্সফার বা খারিজ করিয়েছেন কী না?’
‘মৃত ব্যক্তির নামে কখনো জায়গা থাকে না সেটা এমনিতেই উত্তরাধিকারের অধীনে চলে আসে।’
‘মাননীয় আদালত এখানে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া মালিক একজন আমেরিকা প্রবাসীই নন তিনি সেখানকার নাগরিকও তাই ট্রান্সফার বা খারিজের বিষয়টা চলে আসে।’
সূপর্নার সাথে বাদী পক্ষের উকিল পেরে উঠছিল না কারণ খুঁটিনাটি বিষয়গুলো সে খুব ভালোভাবে উপস্থাপন করে তুলে ধরছে। জমির মালিক নিজেও যেন চকিত হয়ে যায় আবার বিল্ডার্স বেচারা বেশ বেকায়দায় পড়েছে বুঝা যায়। তারপর তাদের বিষয়ে থাকা বিভিন্ন নথিপত্র পেশ হয়, তথ্য-উপাত্ত এটা সেটা আরও কত কী। এদিকে রাজীব যে এই কাজটা করেছে সেটাতে আমাদের কারো কোনো ধারণা ছিল না। সে চাইলেই আমাদের সাথে বসতে পারত আর জায়গার মালিক যেহেতু তার শতভাগ অধিকার আছে এই সম্পত্তির উপর এটায় কোনো ভুল নেই। রাজীব বললে আমরা এমনিতেই নিজ নিজ ব্যবস্থা করে নিতাম। কোর্টের দারস্থ হওয়াটা আমাদের কারো জন্য সুফল বয়ে আনবে বলে মনে হয় না। শত তর্ক-বিতর্কের মাঝে আমাদের সেদিনকার আদালত মূলতবি করা হয় এবং পরবর্তী শোনানী দেওয়া হয় দুদিন পর। আদালত প্রাঙ্গন থেকে বের হয়ে জানতে পারি সুপর্ণা দত্ত অনিমেষের ছেলের বউ। বিষয়টা আমাদের জানা ছিল না যদিও তবু একজন ভালো মানের উকিল হতে পেরেছে এটা বুঝতে পারলাম। অনিমেষের মুখে প্রায়ই ছেলেমেয়েদের বিষয়ে কথা আসলে সে সুপর্ণার কথা বলত তখন নামটা ম্যানশন করত না বলে জানতে পারিনি। আমরা রাজীবের সাথে কথা বলতে চেয়েছিলাম আর চেষ্টা করছিলাম মামলার মাধ্যমে নয় সমঝোতার মাধ্যমে যেন বিষয়টা শেষ হয়। নরেন্দ্রদার ছেলে তার নিজ সম্পত্তির জন্য আমাদের বিপক্ষে মামলা করে সম্পত্তি নিতে হবে এটা বোকামি ছাড়া আর কিছুই না। আমরা পরবর্তীতে অনেক চেষ্টা করেও রাজীবের সাথে দেখা করতে পারিনি। অবশেষে আমাদের পরবর্তী শোনানির দিন চলে আসে আর আদালতে তর্ক বিতর্ক চলার এক পর্যায়ে আমাদের কাঠগড়ায় আসতে বলে, আমরা চারজন চলে আসি।
‘অনিমেষ ঘোষ, সারোয়ার আলম, পিটার গমস এবং আশরাফুল ইসলাম আপনারা নিকুঞ্জ নিকেতনে আছেন, থাকছেন। এটার বিষয়ে বিস্তারিত বলুন।’
আমরা এক এক করে বিগত দিনের সবকিছু আদালতের সামনে উপস্থাপন করলাম এবং নিকুঞ্জ নিকেতনে আমাদের আগমন কীভাবে হয় সেটার বিষয়ে বিস্তারিত উপস্থাপন করেছি। জজ সাহেব মন দিয়ে সবকিছু শুনছিলেন তারপরÑ
‘আপনাদের সবকিছুই শুনলাম আর জানলাম কিন্তু একটা বিষয় কী জানা আছে আপনাদের, নিকুঞ্জ নিকেতন একটি মালিকানা সম্পত্তি এবং এটার উত্তরাধিকার আছে যার করণে এটার শতভাগ মালিক রাজীব দাস। আপনাদের সেখানে থাকাটা অবৈধ এটা বুঝতে আর সমস্যা হওয়ার কথা না।’
‘মাননীয় আদালত আপনার কথায় আপনি সঠিক, এই সম্পদের মালিক রাজীব এটাও সত্যি, আবার নরেন্দ্রদা নিজ সম্পত্তিতে আমাদের ঠাঁই দিয়েছেন এটাও সঠিক। আমরা সকলে যার যার অবস্থানে সঠিক তাহলে ভুলটা কোথায়?’
‘সারোয়ার সাহেব আইন আবেগে চলে না আইন চলে তথ্য উপাত্তে যা অনেকটাই আপনাদের বিপক্ষে।’
‘মান্যবর আমি পিটার গমস আপনার মতোই একজন চাকরিজীবি। শহরের একপ্রান্তে আমারও ছোট্ট একটা বাসা ছিল। আমি সে জায়গাটা বিক্রি করে দেই কেন সেটা কী জানেন? সেই সম্পদের চাইতে আমার মূল্যটা ছিল অতি নগণ্য। সন্তানের ভরনপোষণ করতে কোনো বাবাই কার্পন্য বোধ করে না। তার সর্বোচ্চটা দিয়ে হলেও সন্তানের ষোলো আনা পূর্ণ করে আর সেই বাবাই যখন চাকরি শেষ করে পেনশনে চলে যায় তখন সন্তানরা কেন অনায়াসে পর হয়ে ওঠে বলতে পারবেন? আবার আশরাফের মতো লোকেরা একমাত্র সন্তান হারিয়ে কেন হয়ে যায় অসহায়? এই যে আপনার সামনে বসে থাকা কিছু প্রবীণ লোক দেখছেন তাদের প্রত্যেকেরই জীবনের শেষ গল্পটা ভিন্নতর। এই সকল মানুষদের আশ্রয় দিয়ে গেছেন নরেন্দ্র নারায়ণ দাস। আমরা অনেক সৌভাগ্যবান যে নিকুঞ্জ নিকেতনে আমাদের ঠিকানা হয়েছিল আর সেজন্য শেষ জীবনটায় আত্মসম্মান নিয়ে বাঁচতে পারছি। এই দেশের প্রতিটি জেলায় আমাদের মতো বহু অভাগা আছে যাদের জন্য কোনো নিকুঞ্জ নিকেতন নেই, কোনো নরেন্দ্র নারায়ণ এসে মাথার ওপর ছাতা ধরে জীবনের খরতাপ থেকে রক্ষা করে না। একটা কথা বলি মান্যবর ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। আপনার বয়স দেখে মনে হচ্ছে চাকরির আর বেশি একটা বাকি নেই কী বলেন।’
‘জি আগামী জানুয়ারিতে চলে যাব।’
‘তাহলে জীবনের শেষ প্রান্তে যখন কোনো সমস্যায় জড়িয়ে আপনিও কভু অসহায়ত্বে ভোগেন এবং কোনো নিকুঞ্জ নিকেতন যদি আপনার আশ্রয়স্থল না হয় তাহলে আপনার জীবনটা কেমন কাটবে সেটা একবার ভাবুন। ঠিক আছে আমাদের নিকুঞ্জ নিকেতনের আশ্রয় লাগবে না। তাহলে আপনার আদালত কী পারবে শেষ বয়সে নিজের আত্মসম্মান নিয়ে প্রবীণদের বাঁচার পথ সুগম করে দিতে। নতুবা আশরাফের মতো যারা পুরোটাই আপনজন বিহীন তাদের ভরসার জায়গাটা স্থির করতে, পারবেন! আমি পিটার জীবনের সকল কিছু বিসর্জন দিয়েছিলাম সন্তানদের জন্য। কখনো তাদের কোনো শখ অসম্পূর্ণ রাখিনি, যখন যেটা খেতে চেয়েছে সেটাই দিয়েছি অথচ চাকরি শেষে যখন আমি নির্ভরশীল হই তখন আমারই সন্তানের সংসারে তাদের রান্নার পাতিলে বাবার জন্য আহারটুকু সীমিত হতে হতে শূন্য হয়ে যায়। আমি সহ্য করেছি তাই ব্যথাটা প্রবল আকারে আজও বুকের ভিতর অনুভব করি।’
‘আপনার কথায় বাস্তবতা হয়তো আছে কিন্তু তথ্য উপাত্ত সবকিছুই আপনাদের বিপক্ষে। তাই আপনাদের পক্ষে কোনো দলিলাদি পেশ করতে পারলে হয়তো কিছু বিবেচনা করতে পারব নতুবা...। আপনাদের যথাযথ নথিপত্র পেশ করার জন্য আরেকটু সময় দেওয়া হলো। পরবতী শুনানি পাঁচ কর্মদিবস পর ধার্য করা হইল।’
[চলবে..., পরের পর্ব আগামী সংখ্যায় প্রকাশিত হবে]







