সোমবার, ০২ মার্চ, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ
  •   ১৬-২৫ মার্চ নদীতে বালুবাহী বাল্কহেড চলাচল বন্ধ থাকবে : নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়

প্রকাশ : ০২ মার্চ ২০২৬, ১০:১৫

হৃদয়বতী

মিজানুর রহমান রানা
হৃদয়বতী

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

ঊনিশ.

তাসফিয়ার এ অবস্থা দেখে অঝোরে কাঁদছেন মা মেরি মরিয়ম। গত ক’দিন থেকেই মেয়ের কাশের সাথে রক্ত বমি হচ্ছে। আজও সেই একই অবস্থা। ওর বাবা নাদের সাহেবকে বিষয়টি জানানো হলো। ঢাকায় প্রখ্যাত সব চিকিৎসককে দেখানো হলো, পরীক্ষা-নিরীক্ষা হলো কিন্তু এই রোগের কোনো কারণই চিকিৎসকরা খুঁজে পেলেন না। অবশেষে তাকে ভারতের ভ্যালোরে নিয়ে যাওয়া হলো। কিন্তু একই অবস্থা। তারাও এই রোগের কোনো কারণ খুঁজে পেলেন না। দীর্ঘদিন চিকিৎসা চললো কিন্তু রোগ নিরাময় হলো না।

প্রায় দু বছর পর একদিন চেঙ্গিসের সাথে কথা বললেন নাদের সাহেব। চেঙ্গিস জানালো তার এ শিষ্যর কাছে জানতে পেরেছেন সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার শাহজাদপুরের মাজারে একজন খাদেম আছেন। তাঁর উসিলায় অনেক মানুষ বিভিন্ন রোগের বিষয়ে আরোগ্য লাভ করেছেন। তাসফিয়াকেও সেখানে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে।

অগত্যা একদিন চেঙ্গিসকে সাথে নিয়ে তাসফিয়াসহ নাদের সাহেব সেখানে গেলেন। দীর্ঘ প্রায় আড়াই ঘণ্টা লাইন দিয়ে মাজারের খাদেমের সাক্ষাৎ পেলেন।

খাদেমকে দেখেই নাদের সাহেবের কেমন যেনো চেনা চেনা মনে হলো। তারপরও তিনি শান্ত থাকলেন। তাসফিয়ার রোগের বিষয়ে খাদেমকে বিস্তারিত জানালেন।

খাদেম সাহেব একটি লেবু কাটলেন। তারপর একভাগ লেবুতে সুরা ফাতিহা পড়ে ফুঁক দিয়ে বললেন, ‘নিন, এই লেবুটি রোগীকে খাওয়াবেন। তারপর আল্লাহকে স্মরণ করবেন। তিনিই সকল রোগের শেফা দানকারী, তাঁর নাম আযিযুল হাকীম। তিনি সকল চিকিৎসকের বাদশাহ। তাঁর কাছেই চাইবেন। একমাত্র তিনিই পারেন এই মুসিবত থেকে রক্ষা করতে।’

এই প্রথম জীবনে নাদের এমন কিছু শুনলো, যা তার হৃদয়ে ও ব্রেনের নিউরণে আঘাত হানলো। তাঁর মনে হলো সারাটি জীবন তো সে মানুষের মুখাপেক্ষী হয়ে থেকেছে। মানুষকে নিয়েই তার জীবন কেটেছে। মানুষের কাছেই সব চেয়েছে, আল্লাহকে কোনোদিন তালাশ করেনি।

তাহলে? তার জীবনটাও প্রায় অর্ধেকের বেশি কেটে গেছে, কিন্তু পৃথিবীর বাদশাহকে সে খুঁজে ফেরেনি, তাঁর কাছে চাইতে শেখেনি।

বিষয়টা তার মনে গভীর রেখাপাত করলো। চেঙ্গিস তাড়া দিলো নাদের সাহেবকে, ‘বস চলেন। সময় হয়েছে।’

‘কিন্তু হাদিয়া?’ নাদের প্রশ্ন করলো।

‘খাদেম সাহেব কারও কাছ থেকে হাদিয়া নেন না।’ চেঙ্গিস উত্তর দিলো।

‘তিনি তাহলে চলেন কীভাবে?’

হাসলেন খাদেম সাহেব। তিনি উত্তর দিলেন, ‘যার জন্য আল্লাহ আছেন, তাঁর আর পৃথিবীর মানুষের কাছে চাইবার প্রয়োজন হয় না।’

এবার নাদের সাহেব খাদেমের মুখের দিকে ভালোভাবে তাকালেন। খাদেমের মুখটি এবার তার কাছে স্পষ্ট হলো। মুখ থেকে বেরিয়ে এলো, ‘ইমতিয়াজ তুমি?’

নাদের সাহেবের কথা শুনে চেঙ্গিস অবাক হলো।

খাদেম মুচকি হাসলো, তারপর বললো, ‘আপনারা ইমতিয়াজ নামে যাকে চিনতেন তিনি আর নেই। আমার নাম দিল শাহ। এখানে আছি আজ ৫ বছর হয়ে গেছে। আল্লাহ আমাকে রহম করেছেন, ইসলামের খেদমতে নিয়োগ করেছেন। আমি ছিলাম অন্ধকার কূপে, তিনি আমাকে একরাতে তাঁর তিনজন খাস বান্দা পাঠিয়ে সঠিক জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করেছেন। আমাকে এক ভিন্ন মানুষে পরিণত করেছেন। আমিও সব ছেড়ে দিয়ে এখানে মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত আছি।’

প্রায় এক মাস পরের কথা। নাদের সাহেবের বাড়িতে বেড়াতে এসেছেন তুষার, রুবিনা, ইরফান ও অনন্যা। সাথে ছোট্ট নাতি তৃণা। ইরফান নাদের সাহেবের কাছে জানতে চাইলো, তাসফিয়ার অবস্থা কেমন?

‘ভালো আছি। রোগ ভালো হয়ে গেছে। তবে একটা বিষয় আমাকে খুব অবাক করেছে।’

প্রশ্ন করলো তুষার আহমেদ, ‘কী সেটা?’

‘আমরা তাসফিয়াকে কত ভালো ভালো চিকিৎসক দেখালাম, ভারতের ভ্যালোরে নিলাম, রোগ ভালো হলো না। কিন্তু মাজারের খাদেম দিলশাহ’র দেওয়া সামান্য একটু লেবু খাওয়ার পর সে সুস্থ।’

অনন্যা ও রুবিনা হাসলো। তারপর বললো, ‘তাহলে তো এই মহান মানুষটিকে একবার দেখে আসতে হয়।’

তাসফিয়াসহ সবাই মিলে আবারও সেই মাজারের খাদেমের কাছে উপস্থিত হলো। কিন্তু তাকে মাজারে পাওয়া গেলো না। প্রায় তিন চার ঘণ্টা অপেক্ষা করার পর তারা দেখলো, একজন মানুষ আসছেন। তাদের কাছে মনে হলো পৃথিবীর বুকে একজন অত্যন্ত সুন্দর মানুষই এদিকে আসছেন।

কাছে আসতেই চেহারা স্পষ্টতর হলো। তাসফিয়া অস্ফুট স্বরে উচ্চারণ করলো, ‘দিলশাহ।’

সবাই অবাক হলো। দিলশাহ তাদেরকে দেখেও না দেখার ভান করে তার কামরায় চলে গেলো। কিছুক্ষণ পর দিলশাহ’র একজন সাথী এসে তাঁদেরকে কামরায় যাওয়ার আহ্বান করলো।

‘আপনারা সবাই এসেছেন?’ দিলশাহ প্রশ্ন করলো।

অনন্যা তাঁর দিকে তাকিয়ে বললো, ‘আপনি তো ইমতিয়াজ। সেই ইমতিয়াজ, যিনি আমাকে অপহরণ করে নিয়ে গিয়েছিলেন?’

মৃদু হাসলেন দিলশাহ। তিনি উত্তর দিলেন, ‘সম্ভবত আজ আপনারাই আমাকে অপহরণ করতে এসেছেন।’

সবাই হেসে উঠলো। কিন্তু দিলশাহ সবাইকে উচ্চস্বরে হাসতে বারণ করলেন। তিনি বললেন, ‘পৃথিবীটা শুধুমাত্র হাসার জায়গা নয়। এখানে আসলে মানুষ কাঁদতে আসে। নীরবে নিভৃতে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে কাঁদতে হয়। যে বান্দা আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে বেশি বেশি কাঁদতে পারে সে আল্লাহর ততো বেশি প্রিয়পাত্র হতে পারে। আর সে পরকালে স্থায়ীভাবে আনন্দের সুবাতাস পেতে পারে।’

‘সুন্দর কথা’। তুষার আহমেদ মেনে নিলেন।

ইরফান বললেন, ‘মানুষের জীবন কখন যে কীভাবে পরিবর্তন হয় সেটা মানুষ নিজেই জানে না। তুমি ছিলে একজন অপরাধী ব্যক্তি, কীভাবে তুমি পাল্টিয়ে গেলে ইমতিয়াজ? আর শুনেছি তোমার দ্বারা হাজার হাজার মানুষ উপকৃত হচ্ছে।’

ইমতিয়াজ কোনো কথা বললো না। এবার মুখ খুললো নাদের। সে ইমতিয়াজকে বললো, ‘তোমার কাছে একটা প্রস্তাব নিয়ে এসেছি।’

‘জানি।’

‘কীভাবে?’

‘আল্লাহপাক গতরাতে আমাকে তাঁর এক প্রিয় বান্দার মাধ্যমে অবহিত করেছেন।’

‘কী সেটা?’

‘তাসফিয়াকে আমার স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’

নাদের সাহেব যেনো আকাশ থেকে পড়লেন। একি কথা। তিনি যা ভেবে এখানে এসেছেন, তাই বলছে ইমতিয়াজ। এটা কীভাবে সম্ভব। ভাবছেন তিনি।

চেঙ্গিস অবাক হলো। তারপর নাদেরকে প্রশ্ন করলো, ‘আমাদের বলার আগেই প্রশ্ন আউট হয়ে গেছে বস। তাহলে কথাটা আর আমাদের পক্ষ থেকে বলার সুযোগ রইলো না।’

তাসফিয়া হাসলো। তার হাসিতে বুঝা গেলো সে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী নারী। অনন্যা ও রুবিনা তার দিকে চেয়ে প্রশ্ন করলো, ‘তুমি তাহলে রাজি আছো?’

‘হ্যাঁ। যেদিন কক্সবাজারের ওই হোটেলটিতে লোকটাকে আমি দেখেছি, সেদিনই আমি ওকে আমার জীবনের একমাত্র পুরুষ হিসেবে ভেবে নিয়েছিলাম। কিন্তু লোকটা যখন তোমাকে অপহরণ করে নিয়ে গেলো, তখন তার প্রতি আমার চরণ ঘৃণা জন্মেছিলো।’

‘তাহলে এখন?’ প্রশ্ন করলো ইমতিয়াজ।

‘এখন আপনি তো ইমতিয়াজ নন। আপনি দিলশাহ। আপনার নামটাও আমার পছন্দ হয়েছে। আর আপনার পরিবর্তন আমাকে আরো বিমোহিত করেছে।’

‘একজন নারীর পেছনে পড়ে থাকার বিষয়ে আমাকে নিষেধ করা হয়েছে। তাই আমি তখন তোমার বোন অনন্যাকে মুক্তি দিয়েছিলাম। আর ভাবছিলাম বাকিটা সময় মহান আল্লাহর প্রেমে মশগুল থেকেই পরপরে চলে যাবো। তুমি কি আমার সাধনায় বিঘ্ন ঘটাতে চাও?’ ইমতিয়াজ প্রশ্ন করলো।

‘আপনাকে তো শুধুমাত্র নারীর পেছনে পড়ে থাকার বিষয়ে নিষেধ করা হয়েছে। কিন্তু একজন নারীকে বিয়ে করে সংসার জীবন যাপন করে মানুষের খেদমতে থাকার বিষয়ে তো নিষেধ করা হয়নি।’ উত্তর দিলো তাসফিয়া।

নাদের সাহেবসহ সবাই অবাক হলো। তাসফিয়া মোক্ষম স্থানে আঘাত হেনেছে।

এবার নড়ে বসলো ইমতিয়াজ। সে মৃদু হাসলো। তারপর নাদের সাহেবের দিকে তাকিয়ে রইলো।

চেঙ্গিস ভাবছে। তার জীবনে মুক্তিযুদ্ধ এসে কিছুটা পরিবর্তন ঘটিয়েছিলো। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের পরও সে তেমন একটা পরিবর্তন হয়নি। দল গঠন করে চুরি ছিনতাই চালিয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু এই লোকটা যাকে এখন সবাই দিলশাহ নামে চিনে, রাতারাতি কীভাবে পরিবর্তন হয়ে গেলো? সে তো আরও বড়ো পাপী ছিলো, আরও বড়ো অপরাধী ছিলো। তাহলে চেঙ্গিস কেন পরিবর্তন হতে পারেনি।

‘চেঙ্গিস।’ ইমতিয়াজের কণ্ঠ থেকে কথাটা শুনে চমকে উঠলো সে।

উত্তর দিলো, ‘বলুন। আমি শুনছি।’

‘তোমার হৃদয়ে যে আগুন জ্বলে উঠেছে, এরই নাম ঈমান। তুমি ধীরে ধীরে ঈমানের আলোয় আলোকিত হচ্ছো। তবে তা ধরে রাখতে হবে, স্রষ্টাকে তালাশ করো, তাঁর বান্দেগিতে মনোনিবেশ করো। একদিন তুমিও তাঁকে পেয়ে যাবে। কোনো মানুষ দীর্ঘদিন ধরে যাকে তালাশ করে একদিন খুঁজতে খুঁজতে তাকে পেয়ে যায়। তুমিও একদিন তাকে পাবে, তবে তালাশ অব্যাহত রাখো।’ (চলবে)

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়