সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৯:০১

বাংলা সনেটের প্রবর্তক মাইকেল মধুসূদন দত্ত

এস ডি সুব্রত
বাংলা সনেটের প্রবর্তক মাইকেল মধুসূদন দত্ত

মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাঙালি কবি ও নাট্যকার এবং প্রহসন রচয়িতা। তিনি বাংলা নবজাগরণ সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাঙালি কবি ও নাট্যকার এবং অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব । ১৮২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি যশোর জেলার সাগরদাঁড়ি গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত হিন্দু কায়স্থ পরিবারে মধুসূদনের জন্ম। তাঁর পিতা রাজনারায়ণ দত্ত এবং মাতা জাহ্নবী দেবী । পিতা রাজনারায়ণ দত্ত ছিলেন কলকাতার সদর দেওয়ানি আদালতের খ্যাতনামা উকিল। মধুসূদনের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় তাঁর মা জাহ্নবী দেবীর কাছে। জাহ্নবী দেবী তাঁকে রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণ প্রভৃতির সঙ্গে সুপরিচিত করে তোলেন। সাগরদাঁড়ির পাশের গ্রামের শেখপুরা মসজিদের ইমাম মুফতি লুৎফুল হকের কাছে প্রাথমিক শিক্ষা শুরু করেন। বিদ্বান ইমামের নিকট তিনি বাংলা, ফারসি, আরবী পড়েছেন। তের বছর বয়সে মধুসূদন কলকাতায় যান। স্থানীয় একটি স্কুলে কিছুদিন পড়াশুনা করেন। পরে তিনি হিন্দু কলেজে বর্তমান প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। তিনি খুবই মেধাবী ছাত্র ছিলেন। ১৮৪৩ সালে মধুসূদন রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন বন্দোপাধ্যায়ের নিকট খ্রিস্টধর্ম গ্রহণের ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। ‘ওল্ড মিশন চার্চ’ নামে এক অ্যাংলিক্যান চার্চে গিয়ে তিনি খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণ করেন। তাঁকে দীক্ষিত করেছিলেন পাদ্রী ডিলট্রি। তিনিই তাঁর নাম ‘মাইকেল’ রাখেন। তাঁর পিতা তাঁকে ত্যাজ্য পুত্র করেন। তবে শিবপুরের বিশপ কলেজে পড়াশোনা করেন। চার বছর তাঁর পিতা লেখাপড়ার খরচ বহন করেন। কলেজ লেখাপড়া শেষ করে কলকাতায় চাকুরির চেষ্টা করেন, চাকুরি না পেয়ে মধুসূদন মাদ্রাজে চলে যান। একটি ইংরেজি স্কুলে চাকুরি করেন। বিভিন্ন পত্রিকায় তার ইংরেজি কবিতা প্রকাশিত হয়। হিন্দু ক্রনিকল নামে একটি পত্রিকাও সম্পাদনা করেন। মাত্র পঁচিশ বছর বয়সে তাঁর প্রথম ইংরেজি কাব্য ‘দ্য ক্যাপটিভ লেডি’ রচনা করেন। কবি ও দক্ষ ইংরেজি লেখক হিসেবে খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। মাদ্রাজে আসার কিছুদিন পর মধুসূদন রেবেকা ম্যাকটিভিস নামে এক ইংরেজ যুবতীকে বিবাহ করেন। তবে কয়েক বছর পর তাঁদের মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। এরপর তিনি এক ফরাসী অধ্যাপকের মেয়ে হেনেরিয়েটা সোফিয়াকে বিয়ে করেন। তাঁর এই দ্বিতীয় স্ত্রী মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তাঁর সঙ্গেই ছিলেন। ১৮৬২ সালে মধুসূদন ব্যারিস্টারি পড়ার জন্যে বিলেতে গেলেন। তিনি বিলেতে খরচ চালানো অসম্ভব বুঝে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে চলে যান। বিদেশে আর্থিক সঙ্কটকালে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তাঁকে অর্থ পাঠিয়ে সাহায্য করেন। ১৮৬৬ সালে ব্যারিস্টারি পাস করে তিনি নিজ দেশে ফিরে এসে আইন ব্যবসা শুরু করেন। বাংলা ভাষায় প্রথম সনেট রচনার কৃতিত্ব মাইকেল মধুসূদন দত্তের, সনেটের বাংলায় চতুর্দশপদী নাম মহাকবি মাইকেল মধুসূদনই দিয়েছিলেন।

বাংলা সনেটের সার্থক স্রষ্টা কবি মধুসূদন দত্ত ১৮৬৫ সালে ফ্রান্সের ভার্সাই নগরীতে অবস্থানকালেই ইতালির কবি পেত্রার্কের সনেট থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে প্রথম বাংলা সনেট রচনা করতে সক্ষম হন। ১৮৬৬ সালে কবির চতুর্দশপদী কবিতাগুলো গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। এই কবিতায় কবিচিত্তের ব্যাকুলতা, স্বদেশ প্রেম ও আবেগ ধ্বণিত হয়েছে। ‘বউ কথা কও’ শিরোনামে কবি যে সনেট লিখেন, তার কিছু অংশ ---

‘কি দুখে, হে পাখি, তুমি শাখার উপরে

বসি, বউ কথা কও, কও এ কাননে?

মানিনী ভামিনী কি হে, ভামের গুমত্তে,

পাখারূপ-ঘোমটায় ঢেকেছে বদনে?

তেঁই সাধ তাতে তুমি মিনতি বচনে?

তেঁই হে এ কথাগুলি কহিছ কাতরে?

বড়ই কৌতুক, পাখি, জনমে এ মনে--

নর-নারী-রঙ্গ কি হে বিহঙ্গিনী করে?”

কবি যখন বিদেশে তখন তার হৃদয় দেশ ও জাতির জন্যে যে প্রেরণা অনুভব করেছিলেন, তা তিনি তাঁর বিখ্যাত ‘বঙ্গভাষা’ চতুর্দশপদী কবিতায় বিধৃত করেন। তিনি জীবনের শুরুতে ইংরেজি কবিতা, প্রবন্ধ লিখা শুরু করেন। পরবর্তীতে সকলের সুপরামর্শে, নিজের বিবেক ও চিন্তার প্রেরণার তাগিদে আপন ভাষা বাংলায় কবিতা লেখা শুরু করেন।

“হে বঙ্গ, ভান্ডারে তব বিবিধ রতন,

তা সবে, (অবোধ আমি!) অবহেলা করি,

পর-ধন-লোভে মত্ত, করিনু ভ্রমণ

পরদেশে, ভিক্ষাবৃত্তি কুক্ষণে আচরি।

কাটাইনু বহু দিন সুখ পরিহারি।.........

পালিলাম আজ্ঞা-সুখে; পাইলাম কালে

মাতৃভাষা-রূপে খনি, পূর্ণ মনিজালে।”

মধুসূদন দত্ত নাট্যকার হিসেবেই প্রথম বাংলা সাহিত্যাঙ্গনে পদার্পণ করেন। রামনারায়ণ তর্করত্নের নাটক অনুবাদ করতে গিয়ে বাংলা নাটকের অভাব পূরণের লক্ষ্যে তিনি নাটক লেখায় আগ্রহী হন। ১৮৫৯ সালে ‘শর্মিষ্ঠা’ নাটক রচনা করেন। এটাই প্রকৃত অর্থে বাংলা ভাষায় প্রথম রচিত মৌলিক নাটক। ১৮৬০ সালে তিনি রচনা করেন দুটি প্রহসন, যথা : ‘একেই কি বলে সভ্যতা’ এবং বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ এবং পূর্ণাঙ্গ ‘পদ্মাবতী’ নাটক। কৃষ্ণকুমারী নাটক (১৮৬১), মায়াকানন (১৮৭৪) রচনা করেন।

তাঁর কাব্যের মধ্যে তিলোত্তমা সম্ভব কাব্য (১৮৬০), মেঘনাদবধ কাব্য (১৮৬১), ব্রজজাঙ্গানা কাব্য (১৮৬১), বীরাঙ্গানা কাব্য (১৮৬২), চতুর্দশপদী কবিতাবলী (১৮৬৫) উল্লেখযোগ্য। অনুবাদ গ্রন্থের মধ্যে হেকটর বধ (১৮৬২)। ইংরেজি রচনাব মধ্যে কালেক্টেড পোয়েমস, দ্যা ক্যাপটিভ লেডি উল্লেখযোগ্য । অনুবাদ নাটকের মধ্যে শর্মিষ্ঠা, নীল দর্পণ অব দি ইন্ডিগো প্লান্টিং মিরর। মধুসূদন দত্তের সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি হচ্ছে অমিত্রাক্ষর ছন্দে রামায়ণ উপাখ্যান অবলম্বনে রচিত মেঘনাদবধ মহাকাব্যটি। উক্ত কাব্যে চরিত্র চিত্রিত হয়েছে : রাবণ, ইন্দ্রজিৎ, সীতা, সরমা, প্রমীলা প্রমুখ। তিনি তাঁর কাব্যকে অষ্টাধিক সর্গে বিভক্ত করেছেন এবং সংস্কৃতি অলঙ্কারশাস্ত্র অনুযায়ী এতে নগর, বন, উপবন, শৈল, সমুদ্র, প্রভাত, সন্ধ্যা, যুদ্ধ, মন্ত্রণা প্রভৃতির সমাবেশ ঘটিয়েছেন।

ছোটবেলা থেকে মধুসূদন অতি আদরে ধনীর ঘরে ধনাঢ্য অবস্থায় জীবন শুরু করেন। পিতার একমাত্র সন্তান, আদরে ধনে ধান্যে পালিত হয়েছিলেন। জীবনের যৌবনে ব্যারিস্টার হিসেবে প্রচুর অর্থ উপার্জন করেন। কিন্তু তিনি ছিলেন অতিখরচী, বেহিসেবী। অর্থ সম্পদ কখনো জমাতেন না। শুধু খরচ করতেন। শেষ জীবনে এসে অর্থকষ্টে জীবন কাটাতে হয় তাঁকে। জীবনের শেষে এসে নিজে ও তাঁর স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়েন। হাসপাতালের চিকিৎসা খরচ যোগাতে পারতেন না। বড়ো অর্থ কষ্টে জীবনের শেষ সময়গুলো কাটিয়েছেন। নানা সংগ্রাম কষ্টকর জীবন পাড়ি দিযে মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত ১৮৭৩ সালের ২৯ জুন মাত্র ৪৯ বছর বয়সে বোম্বাইয়ের এক হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর মাত্র চার দিন পূর্বে স্ত্রী হেনেরিয়েটা মারা যান।

অনেকে বলেন, মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত জন্মগ্রহণ না করলে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ হয়তো বিশ্বকবি হতে পারতেন না। বাঙলা আধুনিক কবিতার জনক মধুসূদন দত্ত। আধুনিক কবিতার তিনিই অগ্রদূত। বাংলা কাব্য ও নাট্য সাহিত্যে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে নিঃসন্দেহে ।

লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক, সুনামগঞ্জ।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়