রবিবার, ২৬ এপ্রিল, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ২৬ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৪৭

চাঁদপুর থেকে শোবিজের মঞ্চে

দেশসেরা অভিনেতা চাঁদপুরের শান্ত চন্দ্র সূত্রধর

উজ্জ্বল হোসাইন
দেশসেরা অভিনেতা চাঁদপুরের শান্ত চন্দ্র সূত্রধর

বাংলাদেশের বিনোদন অঙ্গনে নতুন এক সম্ভাবনার নাম হয়ে উঠেছেন চাঁদপুরের কৃতী সন্তান শান্ত চন্দ্র সূত্রধর। নিজের অভিনীত প্রথম চলচ্চিত্রেই অসাধারণ অভিনয় দক্ষতার স্বীকৃতি হিসেবে দেশের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার অর্জন করে তিনি এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। বাংলাদেশের অস্কার নামে পরিচিত এই পুরস্কারের ২০২৫ সালের আসরে শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে তার নাম ঘোষণা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শোবিজ অঙ্গনে নতুন এক তারকার আবির্ভাবের ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শান্ত চন্দ্র সূত্রধরের এই অর্জন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয় বরং এটি চাঁদপুরসহ সারাদেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার প্রতীক। ‘উড়াল’ চলচ্চিত্রে তার অভিনয় যে দর্শক ও সমালোচক—উভয় মহলে গভীরভাবে দাগ কেটেছে তা এই পুরস্কার অর্জনের মধ্য দিয়ে আরও একবার প্রমাণিত হলো। ‘উড়াল’ চলচ্চিত্রটি মুক্তির পর থেকেই দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। গল্পের গভীরতা, নির্মাণশৈলী এবং অভিনয়ের সাবলীলতায় এটি দ্রুতই আলোচনায় উঠে আসে। তবে সিনেমাটির অন্যতম বড় শক্তি ছিল শান্ত চন্দ্র সূত্রধরের অভিনয়।

সমালোচক পুরস্কার-২০২৫ এর পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনিচিত্র বিভাগে সেরা অভিনেতা হিসেবে তিনি যৌথভাবে নির্বাচিত হন সহ-অভিনেতা মাহাফুজ মুন্নার সঙ্গে। চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের মতে, শান্তর অভিনয়ে ছিল চরিত্রের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাওয়ার বিরল ক্ষমতা। তার সংলাপ বলার ধরন, অভিব্যক্তি এবং শরীরী ভাষা এতটাই স্বতঃস্ফূর্ত ছিল যে দর্শক সহজেই চরিত্রটির সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পেরেছেন। বিশেষ করে আবেগঘন দৃশ্যগুলোতে তার অভিনয় ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী ও প্রভাবশালী। অনেকেই মনে করছেন প্রথম সিনেমাতেই এমন পরিণত অভিনয় খুব কম অভিনেতার পক্ষেই সম্ভব হয়।

শুক্রবার (২৪ এপ্রিল ২০২৬) সন্ধ্যায় রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র-এর হল অব ফেমে অনুষ্ঠিত হয় এই জমকালো পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। বর্ণিল আলোকসজ্জা, সঙ্গীত, নৃত্য এবং তারকাদের উপস্থিতিতে পুরো আয়োজনটি যেন এক উৎসবে পরিণত হয়। অনুষ্ঠানে দেশের চলচ্চিত্র, নাটক, সংগীত ও ডিজিটাল মাধ্যমের তারকারা একত্রিত হন। ২৭তম এই আয়োজনটি ছিল আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও বেশি বৈচিত্র্যময় ও আধুনিক। প্রখ্যাত নির্মাতা গিয়াসউদ্দিন সেলিম শান্ত চন্দ্র সূত্রধরের হাতে শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কার তুলে দেন। এ সময় তার পাশে ছিলেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী রিচি সোলায়মান। পুরো মুহূর্তটি ছিল আবেগঘন ও গর্বের, যা উপস্থিত দর্শক এবং টেলিভিশন দর্শকদের মন ছুঁয়ে যায়। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন জনপ্রিয় অভিনেতা আফরান নিশো এবং অভিনেত্রী মেহজাবীন চৌধুরী। তাদের প্রাণবন্ত উপস্থাপনা অনুষ্ঠানটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।

এবারের মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার-এ চলচ্চিত্র, টেলিভিশন নাটক, ওয়েব সিরিজ এবং ওটিটি প্ল্যাটফর্মের বিভিন্ন কাজকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। তারকা জরিপ, সমালোচক ক্যাটাগরি এবং আজীবন সম্মাননাসহ নানা শাখায় পুরস্কার প্রদান করা হয়। ডিজিটাল যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ওয়েব কনটেন্ট এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মের কাজগুলোকে গুরুত্ব দেওয়ায় অনুষ্ঠানটির গ্রহণযোগ্যতা আরও বেড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

শান্ত চন্দ্র সূত্রধরের এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি এবং কঠোর পরিশ্রম। তিনি ভারতের ঐতিহ্যবাহী রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নাটক, চলচ্চিত্র ও গণযোগাযোগ বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। ভারত সরকারের উচ্চতর শিক্ষাবৃত্তি পেয়ে তিনি সেখানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন প্রথম শ্রেণিতে। এই শিক্ষাজীবন তাকে অভিনয়ের তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক উভয় দিক থেকেই সমৃদ্ধ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তিনি বিভিন্ন নাট্যচর্চা, কর্মশালা এবং প্রযোজনায় অংশ নেন। পাশাপাশি অভিজ্ঞ প্রশিক্ষকদের কাছ থেকে অভিনয়ের সূক্ষ্ম দিকগুলো রপ্ত করেন, যা পরবর্তীতে তার অভিনয়ে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়।শান্তর অভিনয়যাত্রা শুরু হয় খুব অল্প বয়সে। চাঁদপুরের নাট্য সংগঠন ‘বর্ণচোরা নাট্যগোষ্ঠী’র মাধ্যমে তিনি প্রথম মঞ্চে পা রাখেন। সেখানেই তিনি অভিনয়ের প্রাথমিক শিক্ষালাভ করেন এবং ধীরে ধীরে নিজের দক্ষতা উন্নত করেন।

স্থানীয় নাট্যচর্চা থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায়ে পৌঁছানো—এই পথচলাটি মোটেই সহজ ছিল না। সীমিত সুযোগ-সুবিধা, প্রতিযোগিতা এবং নানা প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করেই তিনি আজকের অবস্থানে পৌঁছেছেন। তার অভিনীত বেশ কয়েকটি নাটক বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে প্রচারিত হয়েছে, যা তাকে ধীরে ধীরে দর্শকদের কাছে পরিচিত করে তোলে।

শান্ত চন্দ্র সূত্রধরের পরিবারও সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। তার বাবা লক্ষ্মণ চন্দ্র সূত্রধর চাঁদপুরের একজন সিনিয়র সাংবাদিক এবং চাঁদপুর প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। পরিবারের এই সাংস্কৃতিক পরিবেশ তার শিল্পীসত্তা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন অনেকে। ছোটবেলা থেকেই তিনি পরিবারের উৎসাহ ও সমর্থন পেয়েছেন, যা তাকে অভিনয়ের পথে এগিয়ে যেতে সাহস জুগিয়েছে।

পুরস্কার গ্রহণের পর নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে শান্ত চন্দ্র সূত্রধর বলেন, এই পুরস্কার আমাকে আরও ভালো কাজ করতে অনুপ্রাণিত করবে। ‘উড়াল’ টিমের সবার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। বিশেষ করে জুরি বোর্ড এবং দর্শকদের প্রতি আমার আন্তরিক ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা রইলো। তিনি আরও বলেন, দর্শকদের ভালোবাসা এবং সমর্থনই একজন শিল্পীর সবচেয়ে বড় শক্তি। এই সমর্থন নিয়েই তিনি সামনে এগিয়ে যেতে চান। শান্ত জানান, ইতোমধ্যে তিনি নতুন একটি সিনেমায় অভিনয়ের প্রস্তাব পেয়েছেন। যদিও এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি, তবে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে ভবিষ্যতে আরও ভালো ও বৈচিত্র্যময় চরিত্রে নিজেকে উপস্থাপন করতে চান।

চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের মতে, শান্ত চন্দ্র সূত্রধর এমন এক সময় অভিনয় জগতে প্রবেশ করেছেন, যখন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প নতুনভাবে জেগে উঠছে। নতুন গল্প, নতুন নির্মাতা এবং নতুন অভিনয়শৈলীর কারণে এই ইন্ডাস্ট্রিতে এখন সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে শান্তর মতো প্রতিভাবান অভিনেতার আবির্ভাব চলচ্চিত্রের ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে। অনেকেই মনে করছেন, তিনি যদি একই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারেন, তবে আগামী দিনে দেশের শীর্ষ অভিনেতাদের একজন হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন।

শান্ত চন্দ্র সূত্রধরের এই সাফল্য শুধু বিনোদন জগতেই নয়, বরং সমাজের বিভিন্ন স্তরের তরুণদের জন্য একটি বড় অনুপ্রেরণা। বিশেষ করে জেলা শহর থেকে উঠে এসে জাতীয় পর্যায়ে সাফল্য অর্জন করার এই গল্পটি অনেকের স্বপ্নকে নতুন করে জাগিয়ে তুলবে। তার এই অর্জন প্রমাণ করে যে প্রতিভা, পরিশ্রম এবং সঠিক দিকনির্দেশনা থাকলে যে কেউ নিজের লক্ষ্য অর্জন করতে পারে। চাঁদপুরের মাটি থেকে উঠে এসে দেশের শোবিজ অঙ্গনে নিজের জায়গা করে নেওয়া শান্ত চন্দ্র সূত্রধরের এই সাফল্য নিঃসন্দেহে গর্বের। মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার অর্জনের মাধ্যমে তিনি শুধু নিজের নয়, পুরো অঞ্চলের মুখ উজ্জ্বল করেছেন।

এখন দেখার বিষয়, এই সাফল্যের ধারাবাহিকতা তিনি কতটা ধরে রাখতে পারেন। তবে শুরুটা যেভাবে হয়েছে, তাতে করে ভবিষ্যতে তার কাছ থেকে আরও অনেক ভালো কাজের প্রত্যাশা করাই যায়।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়