সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ০১:৩৮

কদর কমেছে, তবুও বৈশাখ রাঙাতে ব্যস্ত পালপাড়ার কুমারেরা

মাটির পুতুলে জেগে থাকে বাংলার শেকড়, টিকে থাকার লড়াইয়ে ফরিদগঞ্জের মৃৎশিল্পীরা

শামীম হাসান
মাটির পুতুলে জেগে থাকে বাংলার শেকড়, টিকে থাকার লড়াইয়ে ফরিদগঞ্জের মৃৎশিল্পীরা
ক্যাপশন :ফরিদগঞ্জে শেষ সময়ে মাটির তৈরি পণ্যে নিপুণ তুলির আঁচড়ে রঙিন করে নতুন রূপ দিচ্ছেন মৃৎশিল্পীরা।

বাংলার মাটির গন্ধে মিশে আছে হাজার বছরের ইতিহাস, সংস্কৃতি আর মানুষের জীবনযাত্রার অনন্য ছাপ। সেই মাটিকেই আপন করে নিয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে উঠেছে মৃৎশিল্প, যা একসময় ছিলো গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সময়ের পরিবর্তনে অনেক কিছু বদলে গেলেও বৈশাখ এলে এখনো যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পায় এই প্রাচীন শিল্প।

ফরিদগঞ্জ উপজেলার পাইকপাড়া, শোল্লা ও মানুরী গ্রামের মৃৎশিল্পীরা ঠিক এমনই এক সময় পার করছেন। বাংলা নববর্ষকে সামনে রেখে তাঁদের কর্মব্যস্ততা এখন তুঙ্গে। সকাল থেকে গভীর রাত ঘরের উঠানজুড়ে চলছে মাটি কাটা, পুতুল গড়া, রোদে শুকানো, আগুনে পোড়ানো আর শেষে নিপুণ তুলির আঁচড়ে রঙিন করে তোলা। প্রতিটি পণ্যে যেন লেগে থাকে বৈশাখের আগমনী বার্তা।

পাইকপাড়া গ্রামের পালপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই কাজের মধ্যে ডুবে আছে। কেউ গড়ছেন মাটির পুতুল, কেউ বানাচ্ছেন হাতি-ঘোড়া, আবার কেউ তৈরি করছেন হাঁড়ি-পাতিল। ছোট ছোট শিশুদের খেলনার পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে ঘরের ব্যবহার্য নানা সামগ্রী। মাটির নির্জীব ঢেলার মধ্যেই যেন শিল্পীরা প্রাণের ছোঁয়া এনে দিচ্ছেন।

মৃৎশিল্পী নয়ন পাল, জবা পাল, সেটু পাল ও অর্পিতা পাল জানান, বছরের পুরোটা সময়ই তারা এই কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকেন। তবে নববর্ষের আগে ব্যস্ততা বেড়ে যায় কয়েক গুণ। তাদের ভাষায়, এই সময়টাতে বিক্রি একটু ভালো হলে সারা বছরের লোকসান কিছুটা হলেও পুষিয়ে নেয়া যায়।

একই এলাকার মিন্টু পাল, ঝন্টু পাল ও বিকাশ পাল বলেন, এই পেশা শুধু জীবিকা নয়, এটি তাদের পৈত্রিক ঐতিহ্য। পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে পাওয়া এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতেই তারা এখনো লড়াই করে যাচ্ছেন। তবে বাস্তবতা কঠিন—অর্থনৈতিক সংকট আর বাজারের প্রতিযোগিতায় অনেকেই ইতোমধ্যে এ পেশা ছেড়ে অন্য কাজে চলে গেছেন।

শোল্লা এলাকার মৃৎশিল্পী মিঠু পালের কণ্ঠে শোনা যায় হতাশার সুর। তিনি বলেন, এখন বাজার দখল করে নিয়েছে প্লাস্টিকের পণ্য। মানুষ সহজ আর সস্তা জিনিসের দিকে ঝুঁকছে। অথচ প্লাস্টিকের ক্ষতি অনেক। আমাদের মাটির জিনিস স্বাস্থ্যসম্মত, পরিবেশবান্ধব—কিন্তু সেগুলোর মূল্যায়ন কমে যাচ্ছে।

এই সংকটের বাস্তব চিত্র আরও স্পষ্ট হয় বাপন পালের কথায়। একসময় নিজেও মৃৎশিল্পের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও এখন আর নেই সেই পেশায়। তিনি বলেন, কষ্টের তুলনায় আয় খুবই কম। সংসার চালানো কঠিন হয়ে যায়। তাই বাধ্য হয়ে অন্য পেশায় চলে এসেছি। এইভাবে যদি চলতে থাকে, তাহলে খুব শিগগিরই মৃৎশিল্প হারিয়ে যাবে

তবে আশার আলো একেবারেই নিভে যায়নি। উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান জানান, মৃৎশিল্পের সঙ্গে জড়িত কয়েকটি পরিবারকে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় প্রশিক্ষণ ও অনুদান দেয়া হয়েছে। ধীরে ধীরে আরও পরিবারকে এই সহায়তার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

ফরিদগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেটু কুমার বড়ুয়া বলেন, মৃৎশিল্পীদের জন্য আলাদা কোনো প্রণোদনা বর্তমানে নেই। তবে ভবিষ্যতে সরকার যদি এ বিষয়ে উদ্যোগ নেয়, তাহলে অবশ্যই তাদের সহায়তা দেয়া সম্ভব হবে।

বাংলা নববর্ষকে ঘিরে মাটির পণ্যের চাহিদা যতই বাড়ুক না কেন, তা মূলত একটি মৌসুমি স্বস্তি। বছরের বাকি সময়টায় সংগ্রামই যেন তাদের নিত্যসঙ্গী। তবুও তারা হার মানতে নারাজ। কারণ, এই শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাদের শেকড়, তাদের পরিচয়, তাদের অস্তিত্ব।

মাটির পুতুলে যে বৈশাখের গন্ধ, তা শুধু একটি উৎসবের নয়, এটি বাংলার হাজার বছরের ঐতিহ্যের বহিঃপ্রকাশ। সেই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ, সচেতনতা এবং যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা। অন্যথায় সময়ের স্রোতে হারিয়ে যেতে পারে আমাদের অমূল্য এই সাংস্কৃতিক সম্পদ। তাই প্রশ্ন রয়ে যায়, আমরা কি পারবো আমাদের মাটির শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে? নাকি প্লাস্টিকের ঝলমলে দুনিয়ায় হারিয়ে ফেলবো আমাদের শেকড়ের গন্ধ!

ডিসিকে/ এমজেডএইচ

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়