প্রকাশ : ১৬ জুন ২০২৬, ০০:২১
সাহসী হোন-আত্মবিশ্বাসের সাথে বার্ধক্য বরণ করুন

প্রতি বছর ১৫ জুন বিশ্ব প্রবীণ নির্যাতন সচেতনতা দিবস আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্যের মুখোমুখি দঁাড় করায়-বার্ধক্য কোনো দুর্বলতা নয়, জীবনের একটি স্বাভাবিক ও মর্যাদাপূর্ণ অধ্যায়। অথচ বিশ্বের বহু দেশের মতো বাংলাদেশেও অনেক প্রবীণ অবহেলা, বৈষম্য ও নির্যাতনের শিকার হন। এই বাস্তবতা যেমন উদ্বেগজনক, তেমনি এটি আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও তুলে ধরে—প্রবীণদের জন্যে এমন একটি সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে তারা নিরাপদ, সম্মানিত এবং আত্মবিশ্বাসী জীবনযাপন করতে পারেন।
আমরা সবাই জানি, জন্মের পর শৈশব, কৈশোর, যৌবন পেরিয়ে একদিন বার্ধক্য আসে। এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং জীবনের স্বাভাবিক পরিণতি। কিন্তু আমাদের সমাজে বার্ধক্যকে অনেক সময় ভয়, নির্ভরশীলতা কিংবা অসহায়ত্বের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। ফলে অনেক মানুষ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন। বাস্তবে বার্ধক্যকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই, প্রয়োজন শুধু প্রস্তুতি, সচেতনতা এবং আত্মবিশ্বাস।
বাংলাদেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নয়ন, গড় আয়ু বৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনের ফলে আগামী বছরগুলোতে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা আরও বাড়বে। এই পরিবর্তনকে সমস্যা হিসেবে নয়, বরং সামাজিক বাস্তবতা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। কারণ আজ যারা তরুণ, তারাই আগামী দিনের প্রবীণ।
দুঃখজনকভাবে অনেক প্রবীণ আজ শারীরিক নির্যাতনের চেয়ে বেশি ভোগেন মানসিক অবহেলা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতায়। পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তঁাদের মতামত উপেক্ষা করা হয়, তঁাদের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না, কখনও কখনও তঁাদের বোঝা হিসেবেও বিবেচনা করা হয়। অনেক প্রবীণ একাকীত্ব, হতাশা এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটান। অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা, চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ এবং সামাজিক সম্পর্কের সংকোচন তঁাদের জীবনকে আরও কঠিন করে তোলে।
তবে এই চিত্রের পরিবর্তন সম্ভব। পরিবর্তনের প্রথম ধাপ হলো আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। প্রবীণদের করুণা নয়, মর্যাদা দিতে হবে। তঁাদের দুর্বল নয়, অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার হিসেবে দেখতে হবে। পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র—সবার দায়িত্ব প্রবীণদের সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
একই সঙ্গে প্রবীণদেরও নিজেদের জন্যে প্রস্তুত হতে হবে। শারীরিক সুস্থতা রক্ষা, আর্থিক পরিকল্পনা, সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখা এবং মানসিকভাবে সক্রিয় থাকা একটি সুন্দর বার্ধক্যের ভিত্তি। অবসরের পর জীবন থেমে যায় না, বরং এটি হতে পারে নতুন অভিজ্ঞতা, নতুন সম্পর্ক এবং নতুন অবদানের সময়। সমাজসেবা, স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড কিংবা পরিবারের নতুন প্রজন্মকে পথ দেখানোর মাধ্যমে প্রবীণরা সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন।
বিশ্ব প্রবীণ নির্যাতন সচেতনতা দিবস আমাদের শুধু নির্যাতনের বিরুদ্ধে কথা বলতে শেখায় না, এটি আমাদের শেখায় প্রবীণদের মর্যাদা ও অধিকারকে স্বীকৃতি দিতে। নির্যাতনমুক্ত বার্ধক্য নিশ্চিত করতে হলে পরিবারে ভালোবাসা, সমাজে সচেতনতা এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কার্যকর নীতি ও সেবার সমন্বয় প্রয়োজন। প্রবীণবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা, আইনি সুরক্ষা এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ আজ সময়ের দাবি।
সবচেয়ে বড়ো কথা, বার্ধক্যকে ভয় নয়, গ্রহণ করতে শিখতে হবে। জীবনের প্রতিটি বয়সের যেমন সৌন্দর্য আছে, তেমনি বার্ধক্যেরও রয়েছে নিজস্ব মর্যাদা, প্রজ্ঞা এবং গভীরতা। বয়স বাড়া মানেই জীবন থেকে দূরে সরে যাওয়া নয়, বরং জীবনকে নতুনভাবে উপলব্ধি করার সুযোগ।
এই বিশ্ব প্রবীণ নির্যাতন সচেতনতা দিবসে আসুন আমরা প্রতিজ্ঞা করি—প্রবীণদের প্রতি সম্মান দেখাবো, তঁাদের অধিকার রক্ষা করবো এবং তঁাদের অভিজ্ঞতাকে মূল্যায়ন করবো। একই সঙ্গে নিজেদের ভবিষ্যতের জন্যেও প্রস্তুত হবো। কারণ একটি সভ্য সমাজের পরিচয় তার প্রবীণদের প্রতি আচরণে প্রতিফলিত হয়।
তাই আসুন, আমরা সবাই বলি—সাহসী হোন, আত্মবিশ্বাসের সাথে বার্ধক্য বরণ করুন। বার্ধক্য জীবনের শেষ অধ্যায় নয়, এটি প্রজ্ঞা, মর্যাদা এবং মানবিকতার এক অনন্য সময়।





