মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১৬:৫৩

নতুন বছরের প্রথম দিনে নিজেকে লেখা চিঠি

রেহেনা আক্তার
নতুন বছরের প্রথম দিনে নিজেকে লেখা চিঠি

পহেলা বৈশাখ শুধু ক্যালেন্ডারের একটি নতুন পাতা নয়, বরং নিজের ভেতরের ধূলো ঝেড়ে ফেলার, নিজের মনকে আবার নতুন করে দেখা নেওয়ার এক অজুহাত। এই দিনটা এলে মনে হয় একটা বছর পেরিয়ে এসেছি কিন্তু নিজেকে কতটা বুঝতে পেরেছি? কতটা সত্যিকারের মানুষ হয়ে উঠতে পেরেছি? কতটা নিেেজর মধ্যে বিনয়, সহমর্মিতা এবং মানবিকতা বজায় রাখতে পেরেছি? বৈশাখের রোদ যেমন হঠাৎ করেই চোখে পড়ে, তেমনই এই দিনের প্রশ্নগুলোও চোখ এড়িয়ে যেতে দেয় না। তাই নতুন বছরের প্রথম দিনে আমি নীরবভাবে নিজেকেই স্মরণ করি-যেখানে শব্দ কম, অনুভূতি বেশি।

গত বছরের দিনগুলো হয়তো নিখুঁত ছিলো না। কোথাও ভুল করেছি। কোথাও চুপ থেকেছি। কোথাও আবার অপ্রয়োজনীয় কথা বলে ফেলেছি। অনেক কিছু চাইতে গিয়ে অনেক কিছু হারিয়েছি। তবুও এই দিনে দাঁড়িয়ে পিছনে তাকালে দেখি- সব ভুলের মাঝেও আমি ভেঙে পড়িনি। দাঁড়িয়ে ছিলাম, চেষ্টা করছিলাম, বেঁচে ছিলাম। হয়তো পথ ঠিক ছিলো না, হয়তো অনেক বাঁক ফেলেছি- তবু পথ ছেড়ে পালাইনি। এটুকুই তো বেঁচে থাকার সাহস। আর এই সাহসই আমাকে নতুন করে শুরু করার শক্তি দেয়।

পহেলা বৈশাখ আমাকে শেখায় হিসাব না রেখে আনন্দ করতে। নতুন জামা, লাল-সাদা রঙ, পান্তা-ইলিশ এসবের চেয়ে বড় বিষয় হলো একসাথে থাকা এবং একে অপরের পাশে থাকা। মানুষের দুঃখ-কষ্ট বুঝতে পারা, তাদের পাশে দাঁড়ানো, নেক ইচ্ছে নিয়ে ভালো করতে চাওয়া- এগুলোই জীবনের আসল আনন্দ। এই দিনে ধনী-গরিব, বড়-ছোটের ভেদাভেদ যেন ঝাপসা হয়ে যায়। সবাই নতুন বছরের শুভেচ্ছা দেয় অথচ সবাই জানে সবার জীবনের গল্প একরকম নয়। তবুও এই একদিন সবাই চেষ্টা করে অভিনয় নয়, সত্যিই একটু ভালো থাকতে। শুধু নিজের জন্য নয়,অন্যের জন্যেও। এই চেষ্টাটুকুই হয়তো আমাদের মানুষ করে রাখে।

নতুন বছরের কাছে আমার চাওয়া খুব বেশি কিছু নয়। আমি চাই মানুষ হয়ে থাকার জায়গাটা যেন হারিয়ে না যায়। কথায় কম, কাজে বেশি সত্য থাকতে চাই। কাউকে কষ্ট দিলে সেটা অজান্তে হোক, ইচ্ছাকৃত যেন না হয়। নিজের স্বপ্নগুলোকে অবহেলা করতে চাই না। আবার অন্যের স্বপ্ন ভাঙার সিঁড়ি হিসেবেও নিজেকে ব্যবহার করতে চাই না। শান্তি চাই, স্থিরতা চাই, আর নিজের মতো করে বাঁচার সাহস চাই। আর চাই যেখানে কারো দুঃখ বা কষ্ট আছে সেখানে আমার নেক ইচ্ছে পৌঁছাক। যদি পারি, কারো একটুখানি হাসির কারণ হতে।

নতুন বছর শুধু দিন নয়, এক রূপকথার মতো অনুভব। সবুজ ধানের গাছ, ঘরে ঝরে থাকা ফুল, পাখির চিলেকোঠা সবকিছু মনে করিয়ে দেয়- জীবন ছোট হলেও সুন্দর হতে পারে। পহেলা বৈশাখ আমার জন্য এক নতুন সূচনা। যেখানে পুরোনো দুঃখগুলোকে আঁকড়ে ধরে রাখার দরকার নেই বরং তাদের থেকে শিখে এগোবার সাহস আছে। এদিন নিজের ভেতরের ভয়গুলোকে শান্ত করার চেষ্টা করি। কিছু কথার উত্তর যেদিন পাইনি সেগুলোকে শান্তভাবে রেখে দিই। কিছু ভুল, যেগুলো হয়তো আর কেউ মনে রাখবে না- সেগুলোও যেন হালকা হয়ে যায়। নতুন বছরের প্রথম দিনটা তাই শুধু উৎসব নয় এটি এক ধরনের মনকে শুদ্ধ করার সময় আর এক ধরনের নীরব প্রতিজ্ঞা।

নতুন বছর তাই আমার কাছে উৎসবের চেয়েও বেশি-

এটা এক ধরনের প্রতিজ্ঞা। নতুন বছর শুরু হোক ঢাকঢোল পিটিয়ে নয় বরং নীরবে নিজেকে ঠিক করার অঙ্গীকার দিয়ে। যদি বছর শেষে নিজেকে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে বলতে পারিÑ‘চেষ্টা করেছিলাম ভালো মানুষ হতে”Ñতাহলেই এই দিনের সার্থকতা।

নতুন বছর আসুক, পুরোনো ভুলগুলোকে শিক্ষা বানিয়ে। মনে করিয়ে দিক-শুরুটা সবসময় নতুন করে করা যায়, যদি মনটা সৎ থাকে। আর এই নতুন সূচনার মাঝে আমি চাই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোকে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে। প্রতিটা হাসি, প্রতিটা চোখের মায়া, প্রতিটা নিঃশ্বাসকে গুরুত্ব দিতে। জীবন তো একটিমাত্র চলার পথ-যেখানে প্রতিটি দিন নতুন করে বাঁচার সুযোগ দেয়। এক নিঃশ্বাসের ভরসায় দাঁড়িয়ে থাকা জীবনটা খুবই ক্ষণস্থায়ী! এই ক্ষণস্থায়ী জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত এমন এক অনিশ্চয়তার উপর দাঁড়িয়ে আছে যেখানে পরের নিঃশ্বাসটাও নিশ্চিত নয়। তবে চাইলেই এই ক্ষণস্থায়ী জীবনটাকে অর্থবহ করে তুলতে পারি। কারণ এই ক্ষণস্থায়ী জীবনে যদি কিছু সত্যিই স্থায়ী হয়ে থাকে, তা হলো মানুষের প্রতি ভালোবাসা, সহমর্মিতা আর সৎকর্ম। তাই এই অল্প সময়টুকু অহংকারে ডুবে না থেকে এমনভাবে বাঁচতে চাইÑযাতে শেষ নিঃশ্বাসের আগে অন্তত মনে হয়, কাউকে কষ্ট না দিয়ে বরং কারো জীবনে সামান্য হলেও আলো হয়ে থাকতে পেরেছি। কারণ দম ফুরিয়ে গেলে সবকিছুই থেমে যাবে কিন্তু রেখে যাওয়া আচরণ, ভালোবাসা আর স্মৃতিগুলোই তখন নিজের হয়ে কথা বলবে।

পহেলা বৈশাখ আমার কাছে শুধু নতুন বছরের সূচনা নয়Ñএটা নিজেকে নতুন করে খুঁজে পাওয়ার এক সুযোগ। যেখানে কোনো জাঁকজমক নয় বরং ভেতরের পরিবর্তনটাই সবচেয়ে বড় উৎসব। আমি চাই, এই নতুন বছর আমাকে আরও একটু মানুষ হতে শেখাক, আরও একটু বিনয়ী, আরও একটু সহমর্মী। যেন সময়ের স্রোতে হারিয়ে না গিয়ে নিজের মানবিকতাটুকু আঁকড়ে ধরে রাখতে পারি। কারণ দিনশেষে আমি কী পেলাম, তার চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায়Ñআমি কেমন মানুষ হয়ে বাঁচলাম।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়