প্রকাশ : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০:২১
শিক্ষা ও গবেষণায় আরো বেশি বিনিয়োগ চাই

বিশ্ব অর্থনীতি দ্রুত বদলাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, রোবোটিকস ও অটোমেশন বা স্বয়ংক্রিয়করণের কারণে বিশ্বের উৎপাদন ব্যবস্থা আমূল পরিবর্তন হচ্ছে এবং এ পরিবর্তন দ্রুতই হচ্ছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার শ্রমঘন শিল্পে আগামী দুই দশকে প্রায় ৩০-৪০ শতাংশ কাজ স্বয়ংক্রিয়করণের ঝুঁকিতে রয়েছে। তৈরি পোশাক শিল্পও এর বাইরে নয়। এরই মধ্যে ভিয়েতনাম, চীন ও তুরস্কে স্বয়ংক্রিয় সেলাই মেশিন, রোবোটিক কাটিং সিস্টেম চালু হয়েছে। বাংলাদেশে এখনো বড় পরিসরে সে প্রস্তুতি নেই।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বাংলাদেশ বর্তমানে এক নতুন পথে দাঁড়িয়ে। সরকার বদল মানেই শুধু মন্ত্রিসভা বদল নয়, এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ পথরেখা নতুন করে আঁকার সুযোগ। একজন বিজ্ঞানমনস্ক নাগরিক হিসেবে আমার প্রত্যাশা খুব সাধারণ হলেও তা গভীর; নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হওয়া উচিত শিক্ষা, বিজ্ঞান ও গবেষণায়। কারণ আজকের পৃথিবীতে রাষ্ট্রের শক্তি আর কেবল জমি, জনসংখ্যা বা পোশাক রফতানির পরিসংখ্যানে মাপা হয় না; মাপা হয় তার জ্ঞানভিত্তিক সক্ষমতায়।
বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান কাঠামো মূলত কম দক্ষ শ্রমনির্ভর। তৈরি পোশাক খাত আমাদের মোট রফতানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশেরও বেশি জোগান দেয়। ২০২৩ সালে বাংলাদেশ প্রায় ৪৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের পোশাক রফতানি করেছে, এটি নিঃসন্দেহে বড় অর্জন। একই সঙ্গে প্রতি বছর কয়েক লাখ শ্রমিক মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর কিংবা দক্ষিণ কোরিয়ায় কাজ করতে যান। কিন্তু বাস্তবতা হলো এ অভিবাসী শ্রমিকদের বড় একটি অংশ কম দক্ষ বা অল্প দক্ষ। বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, কম দক্ষ শ্রমিকের গড় আয় যেখানে মাসিক কয়েকশ ডলার, সেখানে দক্ষ বা উচ্চদক্ষ কর্মীর আয় তার ৫-১০ গুণ পর্যন্ত হতে পারে। অর্থাৎ একই জনশক্তিকে যদি আমরা দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে পারি, তাহলে প্রবাসী আয় থেকেই রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিতে কয়েক গুণ বেশি রাজস্ব আসতে পারে।
এখানেই রাষ্ট্রের কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গির প্রশ্ন আসে। আমরা কি কেবল পোশাক কারখানার শ্রমিক বা নির্মাণশ্রমিক রফতানি করেই আগামী ২০-৩০ বছর টিকে থাকতে পারব? বিশ্ব অর্থনীতি দ্রুত বদলাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, রোবোটিকস ও অটোমেশন বা স্বয়ংক্রিয়করণের কারণে বিশ্বের উৎপাদন ব্যবস্থা আমূল পরিবর্তন হচ্ছে এবং এ পরিবর্তন দ্রুতই হচ্ছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার শ্রমঘন শিল্পে আগামী দুই দশকে প্রায় ৩০-৪০ শতাংশ কাজ স্বয়ংক্রিয়করণের ঝুঁকিতে রয়েছে। তৈরি পোশাক শিল্পও এর বাইরে নয়। এরই মধ্যে ভিয়েতনাম, চীন ও তুরস্কে স্বয়ংক্রিয় সেলাই মেশিন, রোবোটিক কাটিং সিস্টেম চালু হয়েছে। বাংলাদেশে এখনো বড় পরিসরে সে প্রস্তুতি নেই। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আজ যে খাত আমাদের অর্থনীতির মেরুদণ্ড, আগামী দশকে সেটিই হয়তো সবচেয়ে বড় ঝুঁকির মুখে পড়বে।
এ পরিবর্তনকে ভয় না পেয়ে প্রস্তুতির সুযোগ হিসেবে দেখা দরকার। কিন্তু প্রস্তুতি মানে শুধু নতুন বিশ্ববিদ্যালয় ভবন বানানো নয়। গত এক দশকে বাংলাদেশে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। উচ্চশিক্ষায় আসন বেড়েছে, কিন্তু প্রশ্ন হলো গুণগত মান কতটা বেড়েছে? আন্তর্জাতিক সূচকে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো খুব কমই প্রথম ৫০০ বা এমনকি প্রথম এক হাজারের মধ্যে জায়গা পায়। গবেষণায় বিনিয়োগের পরিমাণ জিডিপির তুলনায় অত্যন্ত কম। ইউনেস্কোর তথ্যানুযায়ী, উন্নত দেশগুলো যেখানে জিডিপির ২-৩ শতাংশ গবেষণা ও উন্নয়নে ব্যয় করে, সেখানে বাংলাদেশে এ হার দশমিক ৩ শতাংশেরও কম। অর্থাৎ আমরা ভবিষ্যতের প্রযুক্তি, নতুন শিল্প কিংবা দেশীয় সমস্যার বৈজ্ঞানিক সমাধানে কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ করছি না।
শুধু বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়ালেই হবে না; প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার। একটি জাতীয় গবেষণা তহবিল বা ‘ন্যাশনাল রিসার্চ ফ্যাসিলিটেটর’ গড়ে তোলা যেতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি লক্ষ্যকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে গবেষণার অগ্রাধিকার নির্ধারণ করবে। যেমন দীর্ঘমেয়াদে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বায়োটেকনোলজি বা স্মার্ট কৃষিতে বিনিয়োগ ভবিষ্যতের অর্থনীতির ভিত তৈরি করতে পারে। আর স্বল্পমেয়াদে দক্ষতা উন্নয়ন, কারিগরি প্রশিক্ষণ, অভিবাসী শ্রমিকদের স্কিল আপগ্রেডেশন এসব খাতে দ্রুত ফল পাওয়া সম্ভব।
বিশেষ করে জাপানের মতো দেশগুলোয় দক্ষ শ্রমিকের বড় চাহিদা তৈরি হচ্ছে। জাপানের জনসংখ্যা দ্রুত বার্ধক্যের দিকে যাচ্ছে; দেশটির শ্রমবাজারে নার্স, কেয়ারগিভার, ইঞ্জিনিয়ার ও টেকনিশিয়ানের ঘাটতি বাড়ছে। বাংলাদেশ যদি এখনই ভাষা শিক্ষা, প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ ও সার্টিফিকেশন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে, তাহলে এ বাজারে দক্ষ জনশক্তি পাঠানো সম্ভব। এতে একদিকে বৈদেশিক আয় বাড়বে, অন্যদিকে দেশে ফিরে আসা কর্মীরা নতুন দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা নিয়ে স্থানীয় শিল্পে অবদান রাখতে পারবেন।
গবেষণা ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো আমরা কীভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। অবকাঠামো উন্নয়ন, পরিবহন ব্যবস্থা, নগর পরিকল্পনা এ ধরনের বড় প্রকল্পে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করা হয়, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই এসব পরামর্শ বাস্তবসম্মত বা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। রাষ্ট্র যদি দেশীয় ও প্রবাসী বিজ্ঞানীদের একটি শক্তিশালী পরামর্শক নেটওয়ার্ক তৈরি করে, তাহলে নীতিনির্ধারণ আরো তথ্যভিত্তিক ও বিজ্ঞানসম্মত হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ঢাকার যানজট সমস্যা সমাধানে শুধু ফ্লাইওভার বা মেট্রোরেল যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন ডেটাভিত্তিক ট্রাফিক মডেলিং, স্মার্ট সিগন্যাল সিস্টেম, নগর পরিবহন গবেষণা। এসব ক্ষেত্রে দেশীয় গবেষকদের যুক্ত করলে অর্থের অপচয় কমবে এবং সমাধান হবে দীর্ঘস্থায়ী।
একটি দেশের উন্নয়ন কেবল অর্থনৈতিক সূচকে সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানসিকতা ও সংস্কৃতির প্রশ্নও। যদি সমাজে বিজ্ঞানমনস্কতা, সমালোচনামূলক চিন্তা ও গবেষণাভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের চর্চা না থাকে, তাহলে যত বাজেটই বরাদ্দ দেয়া হোক না কেন, কাক্সিক্ষত ফল আসবে না। শিক্ষা ব্যবস্থায় মুখস্থ নির্ভরতা কমিয়ে সমস্যা সমাধান, প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষা ও গবেষণাভিত্তিক শেখার ওপর জোর দিতে হবে। মাধ্যমিক স্তর থেকেই শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি, ডেটা ও বৈজ্ঞানিক চিন্তার সঙ্গে পরিচয় করানো জরুরি।
নতুন সরকার যদি সত্যিই একটি টেকসই ভবিষ্যৎ চায়, তাহলে তাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, বাংলাদেশ কি শুধু সস্তা শ্রমের দেশ হয়ে থাকবে, নাকি জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির দিকে অগ্রসর হবে? পরিসংখ্যান আমাদের স্পষ্ট বলে দিচ্ছে, জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে বিনিয়োগ করা দেশগুলো দীর্ঘমেয়াদে বেশি স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ হয়। দক্ষিণ কোরিয়া বা সিঙ্গাপুরের উদাহরণ আমাদের সামনে রয়েছে। তারা একসময় আমাদের মতোই শ্রমনির্ভর অর্থনীতির ওপর দাঁড়িয়ে ছিল, কিন্তু শিক্ষা ও গবেষণায় ধারাবাহিক বিনিয়োগের মাধ্যমে আজ প্রযুক্তিনির্ভর উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।
এ মুহূর্তে বাংলাদেশ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। পোশাক শিল্পের সাফল্য আমাদের গর্ব, কিন্তু সেটিই আমাদের ভবিষ্যৎ একমাত্র ভরসা হতে পারে না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্বয়ংক্রিয়করণের ঢেউ আসছে, এটি থামানো যাবে না। প্রশ্ন হলো আমরা কি সে ঢেউয়ের নিচে চাপা পড়ব, নাকি সে ঢেউয়ের ওপর ভর করে নতুন দিগন্তে পৌঁছব? উত্তর নির্ভর করছে আজকের নীতিনির্ধারণের ওপর। শিক্ষা, বিজ্ঞান ও গবেষণায় বিনিয়োগ কেবল ব্যয় নয়, এটি ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ বিনিয়োগ।








