মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৫০

চাঁদপুরের ফুটবলের সুদিন ফেরাতে ক্রীড়াঙ্গনের নেতৃত্বে কাজ করার প্রত্যাশা কাজী মাইনুল হক জীবনের

তাইয়্যেব
চাঁদপুরের ফুটবলের সুদিন ফেরাতে ক্রীড়াঙ্গনের নেতৃত্বে কাজ করার প্রত্যাশা কাজী মাইনুল হক জীবনের

মরহুম কাজী এফ এম নুরুন্নবী ও মরহুমা কাজী আজিজুন নাহার দম্পতির চার ছেলে ও চার মেয়ের মধ্যে অন্যতম রোটারিয়ান কাজী মাইনুল হক জীবন। ভাইবোনদের মধ্যে তিনি পঞ্চম। তিনি জমজ দুই ভাইয়ের একজন, তাঁর জমজ ভাইয়ের নাম পরান। চাঁদপুর পৌরসভার নাজিরপাড়ায় জন্ম ও বেড়ে ওঠা তাঁর। শৈশব ও কৈশোর পেরিয়ে জীবনের পরিণত পর্যায়ে এসেও ফুটবলের প্রতি তাঁর ভালোবাসা অটুট রয়েছে।

চাঁদপুর হাসান আলী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাক্-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষাজীবন শুরু করেন তিনি। এরপর চাঁদপুর গভর্নমেন্ট টেকনিক্যাল হাই স্কুল থেকে ১৯৮৪ সালে মাধ্যমিক (এসএসসি) এবং চাঁদপুর সরকারি কলেজ থেকে ১৯৮৬ সালে উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) পাস করেন। একই কলেজ থেকে ১৯৮৯ সালে স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করেন।

শৈশবের ভালোবাসা থেকে ফুটবলার হয়ে ওঠা

শৈশব থেকেই ফুটবলের প্রতি ছিল তাঁর অগাধ ভালোবাসা। ১৯৮০ সালের শুরুর দিকে খালি পায়ে ফুটবল খেলার মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাঁর ফুটবলজীবন। পঞ্চম ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকেই বিভিন্ন টুর্নামেন্টে খেলার আগ্রহ তৈরি হয়। স্কুলের হয়ে বিভিন্ন স্থানে খেলেছেন। আন্তঃস্কুল ও আন্তঃকলেজ প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার পাশাপাশি চাঁদপুরে লিগ খেলেছেন। ধীরে ধীরে ভালো খেলোয়াড় হিসেবে পরিচিতি অর্জন করেন তিনি। চাঁদপুর সদরের বাইরেও বিভিন্ন ইউনিয়ন ও উপজেলায় টুর্নামেন্ট খেলতে ছুটে যেতেন। ভালো খেলার কারণে বিভিন্ন স্থান থেকে তাঁকে হায়ার করে নিয়ে যাওয়া হতো।

চাঁদপুরের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ফুটবল খেলেছেন কাজী মাইনুল হক জীবন। বরিশালের মুলাদী, কুমিল্লা, শরীয়তপুর ও ফেনীসহ বিভিন্ন স্থানে লিগ ও টুর্নামেন্টে অংশ নিয়েছেন। আন্তঃকলেজ প্রতিযোগিতায় ফেনী স্টেডিয়ামেও খেলেছেন। বিষ্ণুদী ক্লাবের হয়ে খেলার পাশাপাশি গণি স্কুলের সাথে ইউথ স্পোর্টিং ক্লাবের হয়েও খেলেছেন। চাঁদপুর মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে নাজিরপাড়া ক্রীড়া চক্রের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি খেলাধুলার সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছেন।

১৯৮৪ সালে এসএসসি পাসের পর ঢাকায় গিয়ে গুণবাগিচা দিপালী সংঘ ক্লাবের হয়ে ফাইনাল ফুটবল খেলেছেন। ঢাকার বিভিন্ন ক্লাবের সঙ্গে তাঁর খেলার অভিজ্ঞতা রয়েছে। একটি টুর্নামেন্টে মাতুয়াইল ক্লাবের বিপক্ষে সেমিফাইনালে উঠে পরাজিত হওয়ার আক্ষেপ আজও স্মরণ করেন তিনি। ওই প্রতিযোগিতায় সেরা খেলোয়াড়ও হয়েছিলেন। ফায়ার সার্ভিসের হয়েও ফাইনাল লিগে খেলেছেন শান্তিনগরের বিপক্ষে।

নিজেকে একজন ক্রীড়াপ্রেমী হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন কাজী মাইনুল হক জীবন। বর্তমানে মাঠে নিয়মিত খেলতে না পারলেও ক্রীড়াঙ্গনের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা রয়েছে। তিনি নাজিরপাড়া ক্রীড়া চক্রের সভাপতি এবং সোনালী অতীত ক্লাবের কোষাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা, প্রিয় দল ও অনুপ্রেরণা

বাংলাদেশের আবাহনী ক্রীড়া চক্রের সমর্থক তিনি। বিশ্বকাপ ফুটবলে ব্রাজিল তাঁর প্রিয় দল। ছোটবেলা থেকেই ফুটবল দেখা ও খেলার প্রতি আগ্রহ তাঁকে এ পথে নিয়ে এসেছে। ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা থেকেই বিভিন্ন টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়া এবং নিজেকে একজন খেলোয়াড় হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছেন।

নিজের ফুটবলজীবনের প্রথম কোচদের স্মরণ করে তিনি বলেন, নাজিরপাড়ার কৃতী সন্তান মফিজুল ইসলাম চৌধুরী ও জাহিদ ভাই তাঁর ফুটবলজীবনের প্রথম কোচ। তাঁদের হাত ধরেই ফুটবল খেলার জগতে তাঁর পথচলা শুরু হয়। তাঁদের সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণা তাঁকে খেলাধুলার অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিয়েছিল।

পরিবার থেকেও ফুটবল খেলার জন্য উৎসাহ ও সমর্থন পেয়েছেন তিনি। তবে তাঁকে সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা করেছেন তাঁর বোনের জামাই আনোয়ার হোসেন মানিক, যিনি জাতীয় দলের সাবেক ফুটবলার। ভালো খেলোয়াড় হওয়ার জন্য তিনি সব সময় উৎসাহ দিতেন এবং অনুপ্রেরণা জোগাতেন।

খেলোয়াড়ি জীবনে স্ট্রাইকার পজিশনে খেলতেন কাজী মাইনুল হক জীবন। চাঁদপুর স্টেডিয়ামে আবাহনী ক্রীড়া চক্রের বিপরীতে ইউথ স্পোর্টিং ক্লাবের হয়ে একটি ম্যাচে সেরা খেলোয়াড় হিসেবে পুরস্কৃত হয়েছিলেন। মাঠের সেই স্মৃতি আজও তাঁর কাছে বিশেষভাবে স্মরণীয়।

ভয়াবহ ইনজুরি ও জীবনের কঠিন সময়

চাঁদপুর স্টেডিয়াম মাঠে ফুটবল অনুশীলন করতে গিয়ে ভয়াবহ ইনজুরির শিকার হয়েছিলেন তিনি। ১৯৮৭ সালের দিকে ডিগ্রিতে পড়ার সময় অনুশীলন চলাকালে ইউসুফ বকাউল নামের এক খেলোয়াড়ের ট্যাকেলের কারণে তাঁর পা ভেঙে যায়। সেই দুর্ঘটনা তাঁর ফুটবলজীবনে বড় ধাক্কা হয়ে আসে।

সে সময় চাঁদপুর জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক মুনির আহমেদ তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। চিকিৎসকের কাছে নেওয়া থেকে শুরু করে পায়ের অপারেশন এবং পরবর্তী সময়ে সুস্থতার খোঁজখবর নেওয়া পর্যন্ত তিনি সার্বিক সহযোগিতা করেন। মুনির আহমেদের অবদানের কথা স্মরণ করে কাজী মাইনুল হক জীবন বলেন, জেলা ক্রীড়াঙ্গনে তাঁর অবদান অনেক। তাঁর হাত ধরে মেধাবী ও জাতীয় মানের খেলোয়াড় তৈরি হয়েছিল। খেলোয়াড়দের প্রতি তাঁর আন্তরিকতা ও সহযোগিতা স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

খেলোয়াড়ি জীবনে অসংখ্য পুরস্কার, সম্মাননা, মেডেল, কাপ ও সনদ পেয়েছেন কাজী মাইনুল হক জীবন। চাঁদপুরের বাইরে বিভিন্ন স্থানে খেলতে গিয়ে চ্যাম্পিয়ন কিংবা রানার্সআপ হওয়ার সুবাদেও পুরস্কৃত হয়েছেন। জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে খেলাধুলা করলেও জাতীয় দলে খেলার সুযোগ তাঁর হয়নি।

চাঁদপুরের ফুটবলের অতীত ও বর্তমান

চাঁদপুরের ফুটবলের অতীত ও বর্তমানের তুলনা করতে গিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করেন কাজী মাইনুল হক জীবন। তাঁর মতে, কয়েক বছর ধরে চাঁদপুরের ফুটবল অনেকটাই হারিয়ে গেছে। একসময় যেখানে একটি দল গঠন করতে একজন খেলোয়াড়ের বিপরীতে তিন-চারজন করে খেলোয়াড় পাওয়া যেত, সেখানে এখন ১১ জনের একটি দল গঠন করতেও হিমশিম খেতে হয়। পর্যাপ্ত খেলোয়াড় পাওয়া যায় না।

তিনি বলেন, আন্তঃস্কুল, আন্তঃকলেজ প্রতিযোগিতা, চাঁদপুর লিগ এবং ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে নিয়মিত টুর্নামেন্ট আয়োজন করা হলে নতুন নতুন ফুটবলার তৈরি হতো। কিন্তু গত কয়েক বছরে এসব প্রতিযোগিতা ও লিগ কার্যত বন্ধ থাকায় নতুন খেলোয়াড় উঠে আসার সুযোগ কমে গেছে। ফুটবল ক্যাম্প ও নিয়মিত অনুশীলনের ব্যবস্থাও নেই। ফলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে ফুটবল নিয়ে আগ্রহ তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

তিনি বলেন, চাঁদপুর স্টেডিয়াম ও চাঁদপুর সরকারি কলেজ মাঠ অনেক ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাক্ষী। এসব মাঠ থেকেই জাতীয় মানের খেলোয়াড় তৈরি হয়েছেন। আবুল ভাই, মোস্তফা হোসেন, মুকুল ভাই, মনোয়ার চৌধুরী ও আনোয়ার হোসেন মানিকের মতো খেলোয়াড়ের পাশাপাশি পরবর্তী সময়ে জাহাঙ্গীর পাটোয়ারীও উঠে এসেছেন। কিন্তু এরপর আর ভালো মানের ফুটবলার সেভাবে তৈরি হয়নি। টুর্নামেন্ট নেই, লিগ নেই, ফুটবল ক্যাম্প নেই। ধারাবাহিকভাবে এসব আয়োজন থাকলে নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়রা নিজেদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ পেতেন। পরবর্তী সময়ে ঢাকার বিভিন্ন ক্লাবে খেলার সুযোগ পাওয়ার পাশাপাশি জাতীয় দলে খেলার সম্ভাবনাও তৈরি হতো।

চাঁদপুরে ফুটবলের ঐতিহ্য ফেরানোর প্রত্যাশা

বর্তমান সময়ে ফুটবলের হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার জন্য উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। তাঁর মতে, বর্তমানে সরকার শিক্ষার্থীদের মাঠমুখী করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। অতীতের ক্রীড়া ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার এই উদ্যোগ আশাব্যঞ্জক। আজকে চাঁদপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অ্যাথলেটিকস আয়োজন ও উদ্বোধনের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন তিনি। ক্রীড়াঙ্গনের উন্নয়নে সরকারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

কাজী মাইনুল হক জীবনের বিশ্বাস, সরকার যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, তাতে ফুটবলের পুরোনো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার সুযোগ রয়েছে। তিনি বলেন, কোনো স্থানে ক্রিকেট ও ফুটবল খেলার আয়োজন করা হলে অনেক সময় ফুটবলের দর্শকই বেশি দেখা যায়। তাই ফুটবলের হারানো জনপ্রিয়তা ফিরিয়ে আনার মোক্ষম সময় এখনই।

চাঁদপুরের ক্রীড়াপ্রেমী মানুষ ও ক্রীড়া সংগঠকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় জেলার ফুটবল আবারও প্রাণ ফিরে পাবে বলে আশাবাদী তিনি। তাঁর মতে, আন্তঃস্কুল, আন্তঃকলেজ, জেলা লিগ এবং ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে নিয়মিত প্রতিযোগিতা আয়োজন করা গেলে নতুন নতুন ফুটবলার তৈরি হবে। জেলা ক্রীড়া সংস্থার কার্যকর উদ্যোগ এবং সরকারের সহযোগিতা থাকলে ক্রীড়াচর্চার প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়বে। সারা বছর বিভিন্ন টুর্নামেন্ট চালু থাকলে খেলোয়াড় বাছাই করা এবং তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।

নতুন প্রজন্মের প্রতি তাঁর আহ্বান, পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলার প্রতি আগ্রহী হতে হবে। খেলাধুলা মানুষকে সুস্থ রাখার পাশাপাশি সমাজকে সুন্দর ও সুশৃঙ্খল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তরুণদের মাঠমুখী করা গেলে মাদক, কিশোর গ্যাং ও ইভটিজিংয়ের মতো সামাজিক সমস্যা থেকে তাদের দূরে রাখা সম্ভব হবে।

তিনি মনে করেন, চাঁদপুরে নতুন ফুটবলার তৈরি করতে প্রশিক্ষণ ক্যাম্প, টুর্নামেন্ট ও ফুটবল লিগের আয়োজন করতে হবে। উপজেলা পর্যায়ে প্রতিযোগিতা, জেলা প্রশাসক কাপ টুর্নামেন্ট এবং জেলা পর্যায়ে উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা গেলে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকেও প্রতিভাবান খেলোয়াড় উঠে আসবে। কোচিং ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের জাতীয় দলের মানের খেলোয়াড় হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ সৃষ্টি হবে।

অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা যেন খেলাধুলার পথে বাধা না হয়

যেসব তরুণ অর্থের অভাবে খেলাধুলা করতে পারেন না, তাঁদের বিষয়েও বিশেষভাবে ভাবেন কাজী মাইনুল হক জীবন। তিনি বলেন, ফুটবল খেলার জন্য বুট (বা পোশাক) ও অনুশীলন শেষে নাশতার ব্যবস্থা করাসহ বিভিন্ন খরচ রয়েছে। সচ্ছল পরিবারের সন্তানদের জন্য এসব ব্যয় বহন করা তুলনামূলক সহজ হলেও আর্থিকভাবে অসচ্ছল পরিবারের তরুণদের জন্য তা কঠিন হয়ে পড়ে।

চাঁদপুরের ক্রীড়াপ্রেমী মানুষ, সংগঠক ও অনুরাগীরা সমন্বিতভাবে এগিয়ে এলে এই সমস্যা সমাধান করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি। সবাই সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলে আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে কোনো প্রতিভাবান খেলোয়াড়ের ক্রীড়াচর্চা বন্ধ হয়ে যাবে না।

ফুটবল নিয়ে তাঁর ব্যক্তিগত কোনো অপূর্ণ স্বপ্ন নেই। তবে ভবিষ্যতে জেলা ক্রীড়া সংস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়ে কার্যকরী কমিটিতে দায়িত্ব পালনের ইচ্ছা রয়েছে। তিনি মনে করেন, এ ধরনের দায়িত্ব পেলে ক্রীড়াঙ্গনকে আরও গতিশীল করা, মানুষের হৃদয়ে ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা জাগিয়ে তোলা এবং চাঁদপুরের ফুটবলকে নতুন করে এগিয়ে নেওয়ার জন্য কাজ করতে পারবেন।

সরকারের প্রতি প্রত্যাশা ও ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়ন

সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে কাজী মাইনুল হক জীবন বলেন, জেলা, উপজেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে বিভিন্ন খেলাধুলার প্রতিযোগিতা নিয়মিত আয়োজন করতে হবে। অ্যাথলেটিকস, সাঁতার, ফুটবল, ভলিবল, ক্রিকেট ও ব্যাডমিন্টনসহ বিভিন্ন খেলাধুলা যেন সারা বছর চলমান থাকে, সে ব্যবস্থা করতে হবে।

এসব প্রতিযোগিতা পরিচালনার জন্য জেলা, বিভাগ ও উপজেলা পর্যায়ের ক্রীড়া সংস্থাগুলোকে আর্থিক অনুদান দেওয়ার ব্যবস্থা করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। বিশেষ করে আর্থিক অনটনের কারণে যারা খেলাধুলায় অংশ নিতে পারে না, তাদের উৎসাহিত করতে সরকারি সহযোগিতা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

বর্তমান সরকার প্রতিটি উপজেলায় স্টেডিয়াম নির্মাণের যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেটিকে একটি মহৎ উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন তিনি। তাঁর প্রত্যাশা, এই উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়িত হবে এবং প্রতিটি উপজেলায় ভালো মানের স্টেডিয়াম গড়ে উঠবে। এর মাধ্যমে খেলাধুলার মান আরও উন্নত হবে এবং নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়দের অনুশীলন ও প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়বে।

চাঁদপুরের সংসদ সদস্যের উদ্যোগে আশাবাদী

চাঁদপুর জেলার সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহম্মেদ মানিকের প্রসঙ্গ তুলে কাজী মাইনুল হক জীবন বলেন, তিনি মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতিতে বিশ্বাসী। মাদক, কিশোর গ্যাং ও ইভটিজিং থেকে শিক্ষার্থীদের দূরে রাখতে তিনি বিভিন্ন স্থানে গিয়ে খেলাধুলার প্রতি উৎসাহিত করছেন এবং খেলাধুলার সামগ্রী বিতরণ করছেন। চাঁদপুর ও হাইমচরসহ বিভিন্ন স্থানে তাঁর এসব উদ্যোগ রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

কাজী মাইনুল হক জীবনের প্রত্যাশা, সংসদ সদস্যের আন্তরিক প্রচেষ্টা, আহ্বান ও পরামর্শে চাঁদপুরের ক্রীড়াপ্রেমী মানুষ ও সংগঠকরা সারা বছর খেলাধুলার আয়োজন করে যাবেন। একটি ইভেন্ট শেষ হওয়ার পরপরই যেন আরেকটি ইভেন্ট শুরু হয়, সে ধরনের ধারাবাহিক ক্রীড়া কার্যক্রম গড়ে তুলতে চান তাঁরা। এতে তরুণ সমাজ ও শিক্ষার্থীরা মাঠমুখী হবে এবং মাদক, ইভটিজিংসহ সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী নানা সমস্যা কমিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।

খেলাধুলার পাশাপাশি ব্যবসা, ধর্মচর্চা ও পারিবারিক জীবন

ব্যক্তিগত জীবনে ব্যবসার সঙ্গে জড়িত কাজী মাইনুল হক জীবন। অবসর সময়ে নামাজ ও ধর্মচর্চার পাশাপাশি খেলাধুলার সঙ্গে সমানতালে সম্পৃক্ত থাকার চেষ্টা করেন তিনি। দু পুত্রসন্তানের জনক তিনি। নিজে খেলাধুলার প্রতি গভীরভাবে অনুরাগী হলেও তাঁর দুই ছেলে খেলাধুলায় তেমন আগ্রহী নয়। তারা পড়াশোনার প্রতি বেশি মনোযোগী। তার এক ছেলে কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং অন্য ছেলে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন।

সামাজিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড

খেলাধুলার পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত রয়েছেন কাজী মাইনুল হক জীবন। তিনি চাঁদপুর জেলা বিএনপির ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক, পৌর বিএনপির সহ-সভাপতি, জেলা জাসাসের আহ্বায়ক এবং চাঁদপুর রোটারী ক্লাবের ইন্টারন্যাশনাল সার্ভিস ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া ডায়াবেটিস হাসপাতালের আজীবন সদস্য, নাজিরপাড়া ক্রীড়া চক্রের সভাপতি ও সোনালী অতীত ক্লাবের কোষাধ্যক্ষ হিসেবে যুক্ত আছেন। বিভিন্ন নাট্য সংগঠনের সঙ্গেও তাঁর সম্পৃক্ততা রয়েছে। ফুটবলের মাঠ থেকে শুরু করে সামাজিক ও সাংগঠনিক পরিসরেও তিনি নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন।

অসুস্থতার মধ্যেও অটুট খেলাধুলা ও ধর্মচর্চা

গত এপ্রিল মাসে তাঁর ওপেন হার্ট সার্জারি হয়েছে। পরবর্তী সময়ে কিডনিতেও সার্জারি করার পর বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিয়েছে। শারীরিক অসুস্থতার মধ্যেও তিনি খেলাধুলার চর্চা, ধর্মচর্চা এবং নিজের সামাজিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকার চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

দীর্ঘ ফুটবলজীবনে যাঁদের সঙ্গে মাঠে খেলেছেন, যাঁদের সহযোগিতা পেয়েছেন এবং যাঁরা তাঁর পথচলায় অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন, তাঁদের অনেকের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। ফুটবলের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অসংখ্য স্মৃতি আজও তাঁকে আলোড়িত করে।

ফুটবলের প্রতি আজীবন ভালোবাসা

কাজী মাইনুল হক জীবনের কাছে ফুটবল কেবল একটি খেলা নয়, এটি তাঁর জীবনের দীর্ঘ পথচলার অবিচ্ছেদ্য অংশ। খেলোয়াড় হিসেবে জাতীয় দলে খেলার সুযোগ না পেলেও ফুটবলের প্রতি তাঁর ভালোবাসা কখনো কমেনি। বরং এখন তাঁর প্রত্যাশা, একজন সংগঠক হিসেবে চাঁদপুরের ফুটবলের পুরোনো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে ভূমিকা রাখতে পারবেন।

তিনি চান, চাঁদপুরের মাঠগুলো আবারও দর্শকের উপস্থিতিতে মুখর হয়ে উঠুক, নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়রা নিয়মিত অনুশীলন ও প্রতিযোগিতার সুযোগ পাক এবং এখান থেকে জাতীয় মানের ফুটবলার তৈরি হোক। এ জন্য সরকার, জেলা প্রশাসন, ক্রীড়া সংস্থা, সংগঠক ও ক্রীড়াপ্রেমী মানুষকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

জীবনের দীর্ঘ সময় ফুটবলের সঙ্গে কাটানো এই ক্রীড়াপ্রেমী মানুষটি শারীরিক অসুস্থতার মধ্যেও চাঁদপুরের ক্রীড়াঙ্গনের উন্নয়ন ও ফুটবলের ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের স্বপ্ন দেখেন। চাঁদপুর কণ্ঠের মাধ্যমে তিনি তাঁর শুভাকাঙ্ক্ষী, সহযোদ্ধা, সহকর্মী এবং পরিচিত সবার কাছে দোয়া কামনা করেছেন, যেন সুস্থ হয়ে আবারও সমাজ ও ক্রীড়াঙ্গনের জন্য কাজ করে যেতে পারেন।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়