মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৩০

অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে আলাদা করা সম্ভব যমজ বোন ওহি-মাহিকে

সহযোগিতার আকুতি পরিবারের

শামীম হাসান
সহযোগিতার আকুতি পরিবারের

ফরিদগঞ্জে জন্ম নেওয়া জোড়ালাগা যমজ কন্যাশিশু ওহি আক্তার ও মাহি আক্তারের নতুন জীবনের স্বপ্ন এখন চরম দারিদ্র্যের কাছে আটকে আছে। পা থেকে পেট পর্যন্ত একসঙ্গে যুক্ত এই দুই শিশুকে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে আলাদা করার সম্ভাবনা দেখছেন চিকিৎসকেরা। তবে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ব্যয়বহুল চিকিৎসার সামর্থ্য না থাকায় নির্ধারিত সময়েও তাদের ঢাকায় নেওয়া সম্ভব হয়নি। নিরূপায় অসচ্ছল পরিবারটি এখন সরকারি সহায়তার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী ও সমাজের বিত্তবানদের দৃষ্টি কামনা করছে।

দূর থেকে দেখলে মনে হয় সাধারণ দুই কন্যাশিশু। কিন্তু কাছে গেলেই চোখ আটকে যায় পা থেকে পেট পর্যন্ত একসঙ্গে জোড়া লাগানো ৮ মাস বয়সী যমজ বোন ওহি আক্তার ও মাহি আক্তারের দিকে। জন্মের পর থেকেই তাদের প্রতিটি নিঃশ্বাস, প্রতিটি নড়াচড়া যেন একে অপরের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে। একজন কাঁদলে অন্যজনও কেঁদে ওঠে, আবার একজন নড়লে অন্যজনও ব্যথায় কুঁকড়ে যায়।

ফরিদগঞ্জ পৌর এলাকার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব বড়ালী গ্রামের বাসিন্দা দিনমজুর মাসুদ ও সুমি দম্পতির ঘরে গত ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে চাঁদপুরের একটি প্রাইভেট হাসপাতালে জন্ম হয় এই বিরল যমজ শিশুর। পরবর্তীতে তাদেরকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হলেও অর্থাভাবে তখন অস্ত্রোপচার করা সম্ভব হয়নি।

পরিবারের সদস্যরা জানান, চিকিৎসকেরা আশা দিয়েছেন অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে শিশু দুটিকে আলাদা করা সম্ভব। তবে তার আগে প্রয়োজন একাধিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও নিয়মিত চিকিৎসা। জন্মের তিন মাস পর তাদের ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হলেও চরম আর্থিক সংকটের কারণে এখনো সেখানে যেতে পারেনি পরিবারটি।

শিশুদের বাবা মাসুদ বলেন, “আমি কৃষি জমিতে দিনমজুরের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করি। মাসে মাত্র ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা আয়ে কোনোমতে সংসার চালাতে হয়। এরই মধ্যে শিশুদের দুধ, ওষুধ ও চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে ঋণের বোঝাও অনেক বেড়ে গেছে।”

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি আরও বলেন, “চিকিৎসকরা আশা দিয়েছেন আমার মেয়েদের আলাদা করা সম্ভব, কিন্তু সেই চিকিৎসার খরচ বহন করার সামর্থ্য আমার নেই। আমার এই অবুঝ শিশুদের চিকিৎসার জন্য সরকারের সহযোগিতা কামনা করছি।”

মা সুমি আক্তার বলেন, “ওদের আলাদাভাবে কোলে নেওয়া যায় না। একজন একটু নড়লেই অন্যজন কষ্ট পায়। চিকিৎসার জন্য নিয়মিত ঢাকায় যেতে হবে, কিন্তু যাতায়াত ও পরীক্ষার খরচ জোগানোর সামর্থ্য আমাদের নেই। এখন তাদের সাধারণ দুধ কেনার টাকাই জোগাড় করতে হিমশিম খাচ্ছি। সরকার তো কত মানুষকে কত কিছু দেয়, আমার সন্তানদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দেওয়ার আকুতি জানাচ্ছি।”

প্রতিবেশী আলী হোসেন মিজি বলেন, “এই দুই শিশুকে বাঁচাতে হলে সরকার, সমাজের বিত্তবান মানুষ এবং মানবিক সংগঠনগুলোর এগিয়ে আসা জরুরি। সবার সহযোগিতা পেলে হয়তো ওরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে।”

ফরিদ পৌরসভার সাবেক মেয়র মঞ্জিল হোসেন বলেন, “পরিবারটি অত্যন্ত অসচ্ছল। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে এনে শিশু দুটির সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা অত্যন্ত প্রয়োজন।”

উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান বলেন, “শিশুদের পরিবারটি একেবারে দরিদ্র। আমাদের পক্ষ থেকে তাদেরকে দুধ কেনার জন্য সামান্য অনুদান প্রদান ও সুবর্ণ নাগরিক কার্ড করে দেওয়া হয়েছে। তবে তাদের উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন।”

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আসাদুজ্জামান জুয়েল বলেন, “জোড়ালোগা যমজ শিশু জন্ম নেওয়া অত্যন্ত বিরল একটি জন্মগত অবস্থা। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী দ্রুত পরবর্তী চিকিৎসা শুরু করা জরুরি। যথাসময়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে থাকলে শিশু দুটির সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা আরও উজ্জ্বল হবে।”

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মেহেদী হাসান মানিক এ বিষয়ে বলেন, “আমি এই উপজেলায় সদ্য যোগদান করেছি। আপনার মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পারলাম। তাদের খোঁজখবর নিয়ে দ্রুত সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হবে এবং প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতেও কাজ করবো।”

দারিদ্র্যের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করা এই পরিবারের এখন একটাই স্বপ্ন—ওহি আক্তার ও মাহি আক্তার একদিন আলাদা দুটি স্বাভাবিক জীবন পাবে। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে সরকারি সহায়তার পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান ও মানবিক মানুষের সহযোগিতাই হতে পারে তাদের নতুন জীবনের সবচেয়ে বড় আশার আলো।

ডিসিকে /এমজেডএইচ

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়