প্রকাশ : ১৮ আগস্ট ২০২৪, ০০:০০
ইলিশের প্রতি লোভ সংবরণ করুন এবং প্রতারণা থেকে বাঁচুন

গতকাল চাঁদপুর কণ্ঠে ‘চাঁদপুরে ইলিশের দাম চড়া ॥ অনলাইনে ইলিশ বিক্রিতে প্রতারণা’ শিরোনামের সংবাদে পূর্বে প্রকাশিত সংবাদগুলোর ন্যায় লিখা হয়েছে, এবার চলতি মৌসুমে চাঁদপুরে ইলিশের দাম এতোটা চড়া যে, সেটি দরিদ্র ও মধ্যবিত্তদের কেনার সামর্থ্যে নেই। কিন্তু তারপরও কিছু অনলাইন ইলিশ বিক্রেতাদের ফাঁদে পড়ে কিছু লোভী ক্রেতা প্রতারিত হচ্ছেন।
সংবাদটির সারাংশ উপরে উল্লেখ করলেও একটু বিবরণী তুলে ধরতে চাই। সেটি হচ্ছে : চাঁদপুরে ইলিশ অবতারণ কেন্দ্র বড়ো স্টেশন মাছঘাটে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সাগর ও নদ-নদীর মাছ আসে। এরপর এই মাছ বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়। চাঁদপুর ঘাটে অন্য মাছের তুলনায় ইলিশ মাছের পরিমাণই বেশি। এসব ইলিশ দক্ষিণাঞ্চলের সাগর, ভোলা, বরিশাল, নোয়াখালী ও সন্দ্বীপ থেকে আসলেও তুলনামূলক কম। শুধু তা-ই নয়, এবারও ভরা মৌসুমে ঘাটে পদ্মা-মেঘনার ইলিশের দেখা নেই বললেই চলে। অল্প সংখ্যক নদীর ইলিশ এলেও দাম চড়া। ফলে আসল রূপালি ইলিশের স্বাদ পাচ্ছেন না ক্রেতারা। গত শুক্রবার প্রায় শতাধিক মণ মাছ আমদানি হয়েছে। এই ঘাটে ৩০০-৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ প্রতি মণ ৩৬-৩৮ হাজার টাকা, ৫০০ গ্রামের ওপর থেকে ৮০০ গ্রাম পর্যন্ত ওজনের ইলিশ প্রতি মণ ৬০ হাজার টাকা, এক কেজি ওজনের ইলিশ প্রতি মণ প্রায় ৭৫ হাজার টাকা ও ১২০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ প্রতি মণ ৮০ হাজার থেকে লাখ টাকায় পাইকারি বিক্রি করা হচ্ছে। তবে গত সপ্তাহে এই ইলিশের দাম কিছুটা কম ছিল। অর্থাৎ প্রতি কেজিতে ৫০ থেকে ১০০ টাকা কম ছিল বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
চাঁদপুর জেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, গত ২০২২-২০২৩ অর্থ বছরে জেলায় মাছের চাহিদা ছিল ৬৮ হাজার ৪৬৬ টন। উৎপাদন হয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার টন। একই অর্থ বছরে শুধুমাত্র ইলিশ উৎপাদন হয়েছে ৩৪ হাজার ৩২৬ টন। দূরদূরান্ত থেকে আসা ক্রেতারা বলেন, চাঁদপুর মাছ ঘাটে ইলিশ অনেক কম, দামও বেশি। ফেসবুকে ইলিশ বিক্রির পেজের মাধ্যমে দেশি-বিদেশি ইলিশ ক্রেতাদের মিথ্যা তথ্য, তাজা ইলিশের ছবি দেওয়া, বিভিন্ন লোভনীয় অফার দিয়ে ইলিশ ও ইলিশের ডিম বিক্রি করার অভিযোগ উঠেছে। অনেকে হয়রানিও হচ্ছেন। এসব পেইজে ইলিশের দাম কম বলে প্রচারণার কারণে মাছঘাটে এসে মাছ না ক্রয় করে অনেকে খালি হাতে ফিরে যাচ্ছে বলে দেখা গেছে।
ঢাকা থেকে আগত ক্রেতা সাইফুল ইসলাম বলেন, অনলাইনে লোভনীয় অফার দেখলাম। চাঁদপুরের ইলিশের দাম কম। এ জন্যে তাদের দেয়া নাম্বারে ফোন করলাম, কিন্তু তারা ফোন রিসিভ করে নি। তাই চাঁদপুর মাছ ঘাটে আসলাম। কিন্তু এসে দেখি মাছের দাম অনেক বেশি। আরেক ক্রেতা জাহান পপি বলেন, আমি ঢাকা থেকে এসেছি ইলিশ ক্রয় করতে। কিন্তু এখানে আমাদের স্থানীয় বাজারের চাইতে ইলিশের দাম অনেক বেশি। কুমিল্লা থেকে আগত ক্রেতা মোঃ শেখ সাদী বলেন, শুনেছি এখানে মাছের দাম অনেক কম। তাই মাছ ক্রয় করতে এসেছি। কিন্তু এখানে এসে দেখি, মাছের দাম অনেক বেশি। এজন্যে খালি হাতে চলে যাচ্ছি।
চাঁদপুর মাছঘাটের ইলিশ বিক্রেতা নূরে আলম বলেন, এটা ইলিশের বাজার। এখানে প্রতিদিনই মাছের দাম ওঠানামা করে। একটা প্রতারক চক্র আছে, অনলাইনে তারা দেখায় মাছের দাম অনেক কমে গেছে। তারা মানুষ থেকে মাছের টাকা নেয়। কিন্তু মাছ দেয় না। চাহিদা অনুযায়ী কেজি প্রতি মাছের দাম কমে, আবার বাড়ে। আরেক আড়তদার নজরুল ইসলাম বলেন, চাঁদপুরের লোকাল ইলিশ মাছ নেই বললেই চলে। এর কারণ হচ্ছে, নদীতে পানি কম থাকায় চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনার নদীতে ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে না। তাই মাছের রেট অনেক বেশি, ক্রেতা অনেক বেশি। চাঁদপুর মৎস্য বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শবে বরাত সরকার বলেন, গত এক সপ্তাহের তুলনায় ইলিশের সরবরাহ কম। সাগর ও নদী থেকে মাছ কম আসছে। প্রতি কেজিতে ১-২শ’ টাকা বেড়েছে। চাঁদপুর সদর মৎস্য কর্মকর্তা তানজিমুল ইসলাম বলেন, চাঁদপুরে অন্যান্য বছরের তুলানায় এবার ইলিশ একটু কম। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুদীপ্ত রায় বলেন, সতর্কতা হিসেবে অনলাইনে যেসব ফেসবুক পেজ জেলা মৎস্য বণিক সমিতির সদস্যদের, সেগুলো তালিকা করে নাম প্রকাশ করা হয়েছে। তালিকা বহির্ভূত অন্যান্য অনলাইন পেজ থেকে সংশ্লিষ্টদের ইলিশ ক্রয়ের বিষয়ে প্রতারক হতে সতর্ক থাকতে হবে। এ নিয়ে জেলা প্রশাসনের ও পুলিশের আইনশৃঙ্খলা সভায় উপস্থাপন করা হয়েছে। কেউ প্রতারিত হলে থানার অভিযোগ করতে হবে।
আমাদের পুরো বাংলাদেশ ও পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের অধিকাংশ স্থান এবং সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বাংলাদেশি ও ভারতীয়দের কাছে ইলিশ অনেক বেশি প্রিয় মাছ। ইলিশের জন্যে রসনা বিলাসীদের দুর্দমনীয় লোভ। এই লোভের কারণে ইলিশ নিয়ে চলে বহুবিধ কারসাজি। ইলিশের দাম নিয়ন্ত্রণে প্রকাশ্য/অপ্রকাশ্য সিন্ডিকেটের তৎপরতার পাশাপাশি অনলাইনে ইলিশ বিক্রেতাদের বিস্তৃত জালে আটকা পড়ে হয়রানি ও প্রতারণার ঘটনাও বেড়েই চলছে। অগ্রিম মূল্য পরিশোধে খুব কম সংখ্যক অনলাইন ব্যবসায়ীই সততার পরিচয় দেয়, যেটি পুলিশ সহ পর্যবেক্ষকদের চোখে ধরা পড়েছে। সেজন্যে বিক্রেতা কর্তৃক ইলিশের সরবরাহ নিশ্চিত করার পর ক্রেতাকে মূল্য পরিশোধের অর্থাৎ ক্যাশ অন ডেলিভারির তাগিদ ও পরামর্শ পুলিশ, ভুক্তভোগী ও সচেতন মানুষ বারবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও গণমাধ্যম সহ বিভিন্নভাবে দিলেও এক শ্রেণীর ইলিশলোভী ক্রেতা সেটা গ্রহণ করছে না, সেজন্যে অনিবার্য পরিণতিস্বরূপ প্রতারিত হচ্ছে। এমতাবস্থায় এ জাতীয় ক্রেতাদের ইলিশের প্রতি লোভ সংবরণ করেই প্রতারণার হাত থেকে বাঁচতে হবে এবং সর্বোচ্চ সচেতন হতে হবে, যার বিকল্প নেই বলেই আমরা মনে করছি।