প্রকাশ : ১০ জুলাই ২০২৪, ০০:০০
ভবন মালিককে নিতে হবে এই হতাহতের দায়

সিঙ্গাপুরে যে কোনো কাজে ‘সেফটি ফার্স্ট’ কথাটিকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে প্রতিদিন কাজ শুরুর আগে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তাব্যক্তি নিযুক্ত শ্রমিক-কর্মচারীদের কমপক্ষে আধা ঘণ্টা ব্রিফিং করেন। এটা রুটিন ওয়ার্ক, যার ব্যত্যয় হয় না বললেই চলে। ফলে কাজ যতোই ঝুঁকিপূর্ণ হোক না কেনো, দুর্ঘটনা সাধারণত হয় না। তারপরও দুর্ঘটনা হলে, কাজের উদ্যোক্তা/ঠিকাদার কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সকল দায় গ্রহণ করে। এটি আমাদের মতো দেশে দেখা যায় না বললেই চলে। কারণ, অদক্ষ শ্রমিক, অসতর্ক ঠিকাদার/মালিক/কর্তৃপক্ষ কাউকে কোথাও জবাবদিহি করতে হয় না। যার ফলে যা ঘটার সেটা ঘটেই থাকে। যেমনটি ৮ জুলাই ঘটলো কচুয়ায়।
চাঁদপুর কণ্ঠে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, কচুয়া পৌর এলাকায় নির্মাণাধীন ভবনে কাজ করতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ইসমাইল হোসেন সুজন (২৩) নামে এক নির্মাণ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। সোমবার বিকেলে চাঁদপুর পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটের সম্মুখে কেমিকেল ব্যবসায়ী মাসুদ আলমের বিল্ডিংয়ে এই দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত ইসমাইল হোসেন শ্রীরামপুর গ্রামের পশ্চিমপাড়ার গাজী বাড়ির ঈমান হোসেনের ছেলে। বিল্ডিংয়ের ঠিকাদার শেহের আলী জানান, বিল্ডিংয়ের ৪র্থ তলার ছাদে রড উঠানোর সময় ওপরে থাকা উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বৈদ্যুতিক তারের সাথে রড লেগে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ছাদ থেকে মাটিতে পড়ে ঘটনাস্থলেই ইসমাইল হোসেন সুজন মারা যান। এ সময় তার সাথে থাকা একই গ্রামের নির্মাণ শ্রমিক শাকিল (২৪) ও সেঙ্গুয়া গ্রামের আব্দুর রশিদ (৪০) গুরুতর আহত হন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সোমবার বিকেলে পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটের সম্মুখে চারতলা ভবনের কাজ করার সময় বৈদ্যুতিক তারের সাথে রড লেগে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ইসমাইল হোসেন ছিটকে নিচে পড়ে যান এবং তার সাথে থাকা আরো ২ শ্রমিক গুরুতর আহত হন। তাদেরকে দ্রুত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্মরত চিকিৎসক ইসমাইল হোসেন সুজনকে মৃত ঘোষণা করেন। আর উন্নত চিকিৎসার জন্যে সংজ্ঞাহীন বাকি ২ শ্রমিককে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঘটনাস্থলে থাকা ক’জন জানান, বিল্ডিংয়ের মালিকের গাফলতি, অপরিকল্পিতভাবে ভবন নির্মাণ ও উপরে নেট না দিয়ে কাজ করায় এমন দুর্ঘটনায় একজন শ্রমিকের মৃত্যু হলো। কোনোভাবে এই শ্রমিকের মৃত্যুর দায় ভবনের মালিক মাসুদ আলম এড়াতে পারেন না। আমরা এর সুষ্ঠু বিচার চাই। নিহত পরিবারের সদস্যরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে ইসমাইল হোসেন সুজন বিল্ডিং নির্মাণের কাজ করে আসছেন। প্রতিদিনের ন্যায় আজও ইসমাইল কাজে যান। বিকেল বেলা শুনি বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে তিনি মারা গেছেন। বছরখানেক আগে তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন।
আমাদের কথা হলো, বিদ্যুতের সঞ্চালন লাইনের নিচে যে কোনো স্থাপনা নির্মাণ খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন ছাড়া এমন স্থাপনা নির্মাণ করতে যাওয়া মানেই নিশ্চিত দুর্ঘটনার মুখোমুখি হওয়া। কচুয়ার কোনো প্রত্যন্ত গ্রামে নয়, খোদ কচুয়া পৌর এলাকা তথা শহরে বিদ্যুতের সঞ্চালন লাইনের নিচে বহুতল ভবন নির্মাণ কাজ চলছে মাসের পর মাস, বিদ্যুৎ বিভাগ কি এই ভবন মালিককে কোনোরূপ সতর্ক করেছিল? মনে হয় না। এটা সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গাফলতি। কিন্তু এটাকে পুঁজি করে তো ভবন মালিক তার পূর্ব পরিকল্পনার ত্রুটি, চরম উদাসীনতা, স্বেচ্ছাচারিতা ও অসতর্কতা হেতু সৃষ্ট হতাহতের ঘটনার দায় এড়াতে পারবেন না। তিনি আইনের চোখে অবশ্যই অপরাধী। এজন্যে তাকে বিচার ও জবাবদিহিতার মুখোমুখি হতেই হবে। কিন্তু এটি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিরা এবং হতাহতের পরিবারের লোকজন/আত্মীয়স্বজন বললেই হবে না। আমাদের দেশের প্রথা অনুযায়ী কাউকে না কাউকে বিচার বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন কিংবা পুলিশের কাছে লিখিতভাবে দিতে হয়। কিন্তু সেটা সাধারণত বিরলভাবেই দেয়া হয়। আবার দেয়া হলেও ২০-৩০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে স্বল্প খরচে আপস-মীমাংসা করা হয়। এতে জীবনের মূল্য যে কতোটা কম সেটা সালিস ও দালালদের দাপটে টের পাওয়া যায়। আমরা চাই, আমাদের দেশে প্রচলিত প্রথা ভাঙ্গা হোক। যে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনায় সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে (সো-মোটো) ব্যবস্থাগ্রহণে এগিয়ে আসুক এবং নিরাপস থাকুক। তাহলে দুর্ঘটনাজনিত দায় এড়াতে পারবে না সংশ্লিষ্টরা। এতে সতর্কতা সঞ্চারিত হবে এবং অনেক দুর্ঘটনা এড়ানো যাবে।