রবিবার, ০৮ নভেম্বর, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:২৬

বিনামূল্যে চক্ষু চিকিৎসা মানবকল্যাণে রোটারী ক্লাবের অনন্য উদাহরণ

অনলাইন ডেস্ক
বিনামূল্যে চক্ষু চিকিৎসা মানবকল্যাণে রোটারী ক্লাবের অনন্য উদাহরণ

মানবিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে চাঁদপুরের হাইমচর উপজেলার নদীভাঙনকবলিত চরভৈরবী ইউনিয়নে। চাঁদপুর রোটারী ক্লাব ও চাঁদপুর মাজহারুল হক বিএনএসবি চক্ষু হাসপাতালের যৌথ উদ্যোগে এবং ডাচ্-বাংলা ব্যাংক ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় আয়োজিত বিনামূল্যের চক্ষু চিকিৎসা ও ছানি অপারেশন ক্যাম্প প্রমাণ করেছে, আন্তরিক উদ্যোগ ও সম্মিলিত প্রচেষ্টা থাকলে প্রত্যন্ত জনপদেও মানুষের দোরগোড়ায় উন্নত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। গত ৩ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে চরভৈরবী ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্সে প্রাঙ্গণে আয়োজিত এই ক্যাম্পে চার শতাধিক চক্ষু রোগীকে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়। রোগীদের প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চশমা বিতরণের পাশাপাশি ৮৩ জন ছানি রোগীকে অস্ত্রোপচারের জন্য নির্বাচিত করা হয়। তাদের যাতায়াত, অপারেশন ও আনুষঙ্গিক ব্যয় বহনের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন আয়োজকেরা। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে যারা দীর্ঘদিন চোখের চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত ছিলেন, তাদের জন্য এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে আশার নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে।

ক্যাম্পের উদ্বোধন করতে চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক আহমেদ জিয়াউর রহমান এক ঘণ্টারও বেশি পথ পাড়ি দিয়ে প্রত্যন্ত চরভৈরবীতে উপস্থিত হন। তাঁর এই অংশগ্রহণ উদ্যোক্তা ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে উৎসাহ সৃষ্টি করেছে। উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি এ ধরনের উদ্যোগকে সময়োপযোগী ও মহতী আখ্যায়িত করে বলেন, দরিদ্র ও অসহায় মানুষের জন্য বিনামূল্যে চক্ষু চিকিৎসার ব্যবস্থা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বয়স্ক নারী-পুরুষের ছানি অপারেশনের মাধ্যমে দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা মানবকল্যাণের এক অনন্য উদাহরণ।

চাঁদপুর রোটারী ক্লাবের সেবামূলক কর্মকাণ্ডের ইতিহাসও এ উদ্যোগের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশক থেকে স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক উন্নয়নে সংগঠনটি ধারাবাহিক ভূমিকা রেখে আসছে। মরহুম ডা. নুরুর রহমান ও ডা. এমএ গফুরের মতো দূরদর্শী প্রতিষ্ঠাতাদের হাত ধরে যে সেবার ঐতিহ্য সূচিত হয়েছিল, তা আজও অব্যাহত রয়েছে। আলহাজ্ব মাজহারুল হক ভূঁইয়ার অর্থায়ন এবং তৎকালীন জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠিত চাঁদপুর মাজহারুল হক বিএনএসবি চক্ষু হাসপাতাল আজ চাঁদপুরসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষের চোখের চিকিৎসার অন্যতম নির্ভরস্থল।

চরভৈরবীর এই আয়োজন সফল করতে স্থানীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন রোটারিয়ান অ্যাডভোকেট মাসুদ রানা, পিএইচএফ এবং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইউসুফ জোবায়ের শিমুলসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ। এমনকি ক্ষমতাসীন দলের একটি গুরুত্বপূর্ণ সভা স্থগিত রেখে ক্যাম্পের কার্যক্রমে সহযোগিতা করার বিষয়টিও তাদের আন্তরিকতার পরিচয় বহন করে। চাঁদপুর রোটারী ক্লাবের বর্তমান সভাপতি অ্যাডভোকেট পলাশ মজুমদারের নিরলস শ্রম, সময়, মেধা ও আন্তরিক আতিথেয়তা ক্যাম্পটিকে সুশৃঙ্খল ও সফলভাবে সম্পন্ন করতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। পাশাপাশি রোটারী ক্লাবের নবীন-প্রবীণ সদস্য, স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের চিকিৎসক ও কর্মীদের অবদানও প্রশংসার দাবি রাখে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক ফাউন্ডেশনের আর্থিক সহযোগিতা এবং রোটারী ক্লাবের সাংগঠনিক ব্যবস্থাপনার সমন্বয় প্রমাণ করে, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও স্থানীয় জনগণ একযোগে কাজ করলে প্রান্তিক মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর পরিবর্তন আনা সম্ভব।

আমাদের দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অসংখ্য মানুষ এখনও অর্থাভাবে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত। বিশেষ করে চোখের চিকিৎসার ক্ষেত্রে অবহেলা ও অসচেতনতার কারণে অনেকের সামান্য দৃষ্টিসমস্যাও একসময় স্থায়ী অন্ধত্বের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই চরভৈরবীর মতো বিনামূল্যের চক্ষু চিকিৎসা ক্যাম্প শুধু একটি দিনের সেবামূলক আয়োজন হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; এ ধরনের উদ্যোগকে নিয়মিত ও দেশব্যাপী বিস্তৃত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ, চিকিৎসা-পরামর্শ এবং পরবর্তী চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করাও জরুরি।

আমরা আশা করি, চাঁদপুর রোটারী ক্লাব, মাজহারুল হক বিএনএসবি চক্ষু হাসপাতাল ও ডাচ্-বাংলা ব্যাংক ফাউন্ডেশন ভবিষ্যতেও এ ধরনের মানবিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখবে ও সম্প্রসারিত করবে। সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোও নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী এমন উদ্যোগে এগিয়ে আসবে।

পরিশেষে বলা যায়, চরভৈরবীর এই চক্ষু শিবির কেবল একটি চিকিৎসা ক্যাম্প নয়; এটি মানুষের প্রতি মানুষের দায়বদ্ধতা, সহমর্মিতা ও সম্মিলিত সামাজিক শক্তির এক অনন্য প্রকাশ। চার শতাধিক মানুষের চিকিৎসাসেবা এবং ৮৩ জন ছানি রোগীর অপারেশনের ব্যবস্থা করার মধ্য দিয়ে যে আশার আলো জ্বালানো হয়েছে, তা আরও বিস্তৃত হোক। কারণ মানুষের চোখে দৃষ্টি ফিরিয়ে দেওয়ার চেয়ে মহৎ মানবিক কাজ আর কী হতে পারে!

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়