শনিবার, ০৭ নভেম্বর, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ১৫:১৯

বন্ধু সালমার মৃত্যু

মো. জাহাঙ্গীর আলম হৃদয়
বন্ধু সালমার মৃত্যু

যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে,

আমি বাইব না, বাইব না মোর খেয়াতরী এই ঘাটে।

চুকিয়ে দেব বেচাকেনা, মিটিয়ে দেব গো, মিটিয়ে দেব লেনাদেনা,

বন্ধ হবে আনাগোনা এই হাটে।

তখন আমায় নাইবা মনে রাখলে,

তারার পানে চেয়ে চেয়ে নাইবা আমায় ডাকলে।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ও শিল্পীর কণ্ঠে গাওয়া এই গানটির প্রতিটি শব্দ বাস্তব জীবনের কথা মনে করিয়ে দেয়। বিশেষ করে বন্ধুর বিদায়ের মধ্য দিয়ে এর মর্ম উপলব্ধি করা যায়।

প্রিয় পাঠক, আমি কোনো কবি কিংবা লেখক নই। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে দূরপ্রবাসে থেকেও মাঝে মাঝে কাজের ফঁাকে একটু লেখার চেষ্টা করি।

আজ কোনো সুখের গল্প নয়, আজ কোনো ইতিহাস নয়। আজ যে বিষয়টি নিয়ে আপনাদের সামনে লিখছি, তা হলো স্কুলজীবনের সহপাঠী বন্ধু সালমা আক্তার রত্নার মৃত্যুর সংবাদ। তঁার মৃত্যুর খবর শুনে নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না। কিছু না লিখেও পারছি না।

আমার শিক্ষাজীবন শুরু হয়েছিল চট্টগ্রামে। বাবার সরকারি চাকরির কারণে সেখানে পড়াশোনা শুরু করি। এরপর বাবার অবসর গ্রহণের কারণে মাধ্যমিক পর্যায়ে কিছুদিন শহরে এবং শহরের পাশাপাশি গ্রামেও পড়াশোনা করেছি। নিজ জেলা চঁাদপুরের শাহরাস্তি উপজেলায় কিছুদিন মেহের উচ্চবিদ্যালয়ে শিক্ষা গ্রহণ করেছি। এরপর শেষ পর্যন্ত টামটা আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলাম।

এই বিদ্যালয়ে এসে পেয়েছি একঝঁাক বন্ধু। তাদের সঙ্গে এতটাই গভীর সম্পর্ক ছিল, এতটাই মনের মিল ছিল, যা লিখে শেষ করা যাবে না।

সম্প্রতি সহপাঠী বন্ধু সালমা আক্তার রত্নার মৃত্যুর সংবাদ শুনে দূরপ্রবাসে বসে অতীতের স্কুলজীবনের নানা স্মৃতি মনে পড়ে গেল। চোখের পানি ধরে রাখতে পারলাম না। তঁার মৃত্যুর পাশাপাশি নিজেও কতক্ষণে চলে যাব, সেই কথাই বারবার মনে করিয়ে দেয়।

২০২৬ সালে যখন দেশে গিয়েছিলাম, কাকতালীয়ভাবে তঁার সঙ্গে দেখা হয়েছিল তঁাদের বাড়িতেই। শাহরাস্তি উপজেলার টামটা দক্ষিণ ইউনিয়নের সিংগার বাড়ি (মজুমদার বাড়ি)। তঁার বাবা জহিরুল ইসলাম প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন।

তঁার অসুস্থতার কথা শুনে দেখতে গিয়েছিলাম। তখন সালমার সঙ্গে দেখা হয়। আমার স্ত্রী ও সন্তানদের সম্পর্কে খেঁাজখবর নিল। আমিও তার খেঁাজখবর নিলাম। সে সব বন্ধুদের কথা জানতে চাইল। সেই দেখাটাই ছিল শেষ দেখা।

সালমা দুনিয়ার মায়া ছেড়ে চলে যাবে, এটা কখনো ভাবিনি। যদিও মৃত্যু আল্লাহর বিধান। একে একে সবাইকে চলে যেতে হবে। তারপরও কিছু মৃত্যু মেনে নিতে পারি না। অনেকেই মেনে নিতে পারছে না।

ফেলে আসা স্মৃতিকথা

আমাদের মধ্যে কেউ একজন স্কুলে না এলে আমরা তার বাড়িতে খবর নিতে যেতাম, কেন সে স্কুলে আসেনি। কোনো সমস্যা হলে সমাধান করার চেষ্টা করতাম। কেউ অসুস্থ হলে তার সুস্থতার জন্য যা করণীয়, সে উদ্যোগ নিতাম।

আগে হাইস্কুলের মেয়েদের সরকারিভাবে স্টাফিন দেওয়া হতো। আমাদের যেসব মেয়ে বন্ধু ছিল, তারা স্টাফিন পেয়ে প্রয়াত সালমা আক্তার রত্না ও প্রয়াত উর্মি আক্তার বুলুর নেতৃত্বে সোজা আমার হাতে এনে দিত। বলত, আমরা সবাই মিলে পিকনিক করব। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সদ্যপ্রয়াত সালমা আক্তার রত্না। প্রয়াত উর্মি আক্তার বুলুও তঁাদের সঙ্গে ছিল। তঁাদের নেতৃত্বে শিক্ষাজীবনে ভাইবোনের মতোই আমরা সবাই পড়াশোনার পাশাপাশি সামাজিক কাজ করার চেষ্টা করতাম।

হেসে-খেলে কাটিয়েছি স্কুলজীবন। কলেজজীবনে একেকজন একেক জায়গায়, একেক কলেজে চলে গেল। এরপর কলেজজীবন শেষ করে কেউ চলে গেল দেশের বাইরে। কেউবা দেশের মধ্যেই বিভিন্ন কর্মস্থলে রয়েছে। কারও সঙ্গে কখনো দেখা হয়, আবার কারও সঙ্গে হয় না। এভাবেই জীবনের নিয়মে কাটছে জীবন।

বিশেষ করে আমরা যেসব বন্ধু শিক্ষার মান উন্নয়নে একে অন্যকে সহযোগিতা করতাম, কারও কোনো সমস্যা হলে সবাই মিলে তা সমাধান করার চেষ্টা করতাম, তাদের মধ্যে রয়েছে আনিসুর রহমান টিটু, সাইফুল ইসলাম মানিক, কামাল হোসেন, আলমগীর হোসেন, তোফাজ্জল হোসেন, মাহবুব আলম, তকদির হোসেন, আসাদুজ্জামান ভূঁইয়া সুমন, ফয়েজ উদ্দিন লাভলু, ইউনুস, আব্দুল আউয়াল, ফেরদৌসী আক্তার, রেহানা আক্তার, রেজিনা আক্তার, হাসিনা আক্তার, রেখা, লুৎফুন নাহার, উম্মে হাবিবা, কামরুন নাহারসহ আরও অনেকেই।

অন্যান্য বন্ধুদের মধ্যে রয়েছে ইমাম হোসেন পাটোয়ারী, আতিকুর রহমান, মিজানুর রহমান, শফিকুল ইসলাম, রিয়াদ, সোহেল, বিকাশ পাল, মাইনুল, শামসুল হক, বদিউজ্জামান, আনোয়ার হোসেন লিংকন, আজাদ, মশিউর, তৌফিক, এহতেশাম, সাইফুলসহ অসংখ্য বন্ধু। যঁাদের কথা এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না, তঁারা কেউ দয়া করে রাগ করবেন না।

১৯৯৭ সালের এসএসসি বিদায়ী অনুষ্ঠানে আমরা যারা সহপাঠী ছিলাম, তারা স্কুলের জন্য একটি স্টিলের আলমারিসহ যাবতীয় আসবাবপত্র যৌথভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে কিনে দিয়েছিলাম।

আমাদের টামটা আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাওলানা মোজাফফর হোসেন স্যার (প্রয়াত), মোহাম্মদ উল্লাহ স্যার, গোলাম রহমান স্যার, আবু সাঈদ স্যার, মোবারক হোসেন স্যার (প্রয়াত), ওয়াহিদ স্যার, আতিক স্যার, খোকন স্যার, হুজুর স্যারÑসকল শিক্ষক আমাদের শিক্ষার্থীদের সব কাজে সহযোগিতা করেছেন। আমরাও চেষ্টা করেছি ভালো কাজের মাধ্যমে, ভালো শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে এগিয়ে যাওয়ার।

আজ অনেক শিক্ষক নেই দুনিয়াতে, অনেক সহপাঠীও নেই। শিক্ষার্থী বন্ধুরা বিদায় নিয়েছে। তঁাদের সকলের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। মহান আল্লাহ যঁারা দুনিয়াতে নেই, তঁাদের জান্নাতবাসী করুন। আমিন। আর যঁারা দুনিয়ায় বেঁচে আছেন, তঁাদের সুস্থতা ও নেক হায়াত দান করুন। আমিন।

আমি কতটা গুছিয়ে লিখতে পেরেছি, জানি না। ভুল হলে ক্ষমা করবেন।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়