শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৫৬

এমন সংবর্ধনা গতানুগতিক, ব্যতিক্রম কিছু নয়

অনলাইন ডেস্ক
এমন সংবর্ধনা গতানুগতিক, ব্যতিক্রম কিছু নয়

মেধাবীদের সম্মাননা জানানো নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় উদ্যোগ। শিক্ষার্থীদের ভালো ফলাফলের স্বীকৃতি দেওয়া, তাদের উৎসাহিত করা এবং ভবিষ্যতে আরও ভালো করার অনুপ্রেরণা জোগানো—এসবের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বৃহস্পতিবার ফরিদগঞ্জে এসএসসি ২০০১ ব্যাচের উদ্যোগে ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা প্রদানও এমন একটি উদ্যোগ। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, এ ধরনের আয়োজন এখন কতোটা ব্যতিক্রমী কিংবা কতোটা কার্যকর ভূমিকা রাখছে শিক্ষাক্ষেত্রে?

বাস্তবতা হলো, এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা প্রদান এখন অনেকটাই গতানুগতিক হয়ে গেছে। সংসদ সদস্য থেকে শুরু করে বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠন, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, এমনকি শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমও প্রতিবছর ব্যাপক আয়োজনে এমন সংবর্ধনার আয়োজন করছে। ফলে জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের সম্মাননা জানানোর বিষয়টি আর নতুন কোনো উদ্যোগ বা ব্যতিক্রমী আয়োজন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে না। অনেকেই যেন একই ধারায় গা ভাসিয়ে বাহবা কুড়ানোর প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। অথচ শিক্ষাক্ষেত্রে প্রকৃত প্রয়োজন শুধু ভালো ফলাফল করা শিক্ষার্থীদের সম্মাননা জানানো নয়; বরং যেসব দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থী আর্থিক সংকটের কারণে উচ্চশিক্ষার পথে বাধার মুখে পড়ে, তাদের পাশে দাঁড়ানো। অদম্য মেধাবীদের খুঁজে বের করে তাদের জন্য বৃত্তি, আর্থিক প্রণোদনা কিংবা শিক্ষা উপকরণের ব্যবস্থা করা। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এসব উদ্যোগ তুলনামূলকভাবে অনেক কম দেখা যায়। কদাচিৎ দু-একটি উদ্যোগ চোখে পড়ে। অথচ একজন অসচ্ছল মেধাবী শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন সচল রাখতে সামান্য আর্থিক সহযোগিতাও তার জীবনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে বিবেচনার দাবি রাখে। এসএসসি পরীক্ষার তুলনায় এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন অনেক ক্ষেত্রেই অধিক কঠিন ও প্রতিযোগিতাপূর্ণ। শিক্ষার্থীদের সামনে তখন উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের চ্যালেঞ্জ, ভর্তি প্রতিযোগিতা এবং ভবিষ্যৎ গড়ার কঠিন বাস্তবতা অপেক্ষা করে। অথচ এসএসসিতে জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের জন্য যতটা আয়োজন ও প্রচার-প্রচারণা দেখা যায়, এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় কৃতিত্ব অর্জনকারীদের ক্ষেত্রে তেমন উদ্যোগ সচরাচর চোখে পড়ে না। এই বৈষম্যপূর্ণ প্রবণতা নিয়েও ভাবার সময় এসেছে।

আমরা এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা দেওয়ার বিরোধী নই। বরং এমন আয়োজন আরও অর্থবহ ও মানবিক হোক, সেটিই প্রত্যাশা। যারা সংবর্ধনার আয়োজন করছেন, তাদের প্রতি আহ্বান—শুধু ভালো ফলাফল করা শিক্ষার্থীদের মঞ্চে তুলে সম্মাননা স্মারক দেওয়ার মধ্যেই উদ্যোগ সীমাবদ্ধ রাখবেন না। পাশাপাশি সমাজের দরিদ্র অথচ মেধাবী শিক্ষার্থীদের খুঁজে বের করুন। অদম্য মেধাবীদের বিশেষভাবে মূল্যায়ন করুন। যাদের সামর্থ্য আছে, কিন্তু সুযোগ নেই, তাদের এগিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি করে দিন।

এ ক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের দরিদ্র তহবিল বা ‘পুওর ফান্ড’ যথাযথভাবে ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। প্রকৃত অসচ্ছল ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের তালিকা তৈরি করে তাদের নিয়মিত সহায়তার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, এই তহবিলের অর্থ যেন সত্যিকার অর্থেই সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের কাজে আসে, তা নিশ্চিত করা জরুরি।

মনে রাখতে হবে, একটি সম্মাননা স্মারক একজন শিক্ষার্থীকে সাময়িক আনন্দ ও অনুপ্রেরণা দিতে পারে, কিন্তু একজন অসচ্ছল মেধাবী শিক্ষার্থীর পাশে দাঁড়ানো তার পুরো ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে। তাই গতানুগতিক সংবর্ধনার বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বাহবা কুড়ানোর আয়োজন নয়, বরং মেধা ও মানবিকতার সমন্বয়ে শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগই হোক আমাদের লক্ষ্য। তাহলেই সংবর্ধনা হবে সত্যিকার অর্থে ব্যতিক্রমী, অর্থবহ ও সমাজের জন্য কল্যাণকর।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়