শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:০০

সেই মাস্টার মশাই

সামিরা মেহনাজ নুসরাত
সেই মাস্টার মশাই

অনেক দিন আগের কথা। কোন এক গ্রামের সিংহভাগ মানুষই ছিল নিরক্ষর ও অত্যন্ত দরিদ্র। শিক্ষার আলো না থাকায় গ্রামের মানুষের জীবনমানও ছিল অত্যন্ত নিম্ন। কাজকর্ম তেমন ছিলনা। দুই-চারজন সচ্ছল কৃষক ব্যতীত প্রায় সব মানুষই ছিল দিনমজুর। কিছু সংখ্যক ভিখারীও ছিল। যেহেতু শিক্ষা বঞ্চিত মানুষ, তাই চাকুরিজীবির সংখ্যাও ছিল নগণ্য। দুই-চারজন সচ্ছল কৃষক থাকলেও বছরের অধিকাংশ সময় কোন কাজকর্মই থাকতো না। গ্রামে দরিদ্র দিন মজুরদের সংখ্যা এতই বেশি ছিল যে দুই-চারজন সচ্ছল কৃষকের পক্ষে সবাইকে সারা বছর কাজের ব্যবস্থা করা ছিল একেবারেই অসম্ভব। এতে দরিদ্র মানুষগুলোর জীবন জীবিকা নির্বাহ করা ছিল অনেক কষ্টের। হাত-পা বেঁধে নির্যাতন করলে সহ্য হয়, মৃত্যুকে বরণ করতেও তখন আপত্তি থাকে না। কিন্তু উপোস থাকার যন্ত্রণা সহ্য করা খুবই কঠিন। ক্ষুধার যন্ত্রণায় কখনো কখনো মানুষের হিতাহিত জ্ঞানও লোপ পেয়ে যায়। নিজে সহ্য করলেও চোখের সামনে সন্তান ও পরিবারের সদস্যদের ক্ষুধার যন্ত্রণা সহ্য করা কয়জনের পক্ষে সম্ভব? এই যন্ত্রণা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার দুটি উপায়ই তাদের বেছে নেওয়ার সুযোগ ছিল। এক- আত্মহত্যা করা, দুই- চুরি করা। দু’টি কাজই মানুষের জন্য কঠিন। তাছাড়া আত্মহত্যা মহাপাপ, কে না জানে? আত্মহত্যাকারীর পরিবার পরিজনকে হতে হয় সমাজচ্যুত। এই সমাজের খাবার দেওয়ার মুরোদ না থাকলেও কিল মারার গোঁসাই হতে বাধা নেই। তারপরও বাধ্য হয়ে কিছু মানুষ নৈতিকতাকে বিসর্জন দিয়ে চুরি করতে শুরু করলো।

এক সময় চোরদের অত্যাচারে গ্রামের মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠল। মাঝে মাঝে মালামাল সহ চোর ধরাও পড়ে এবং সালিশ বিচারও বসত। কিন্তু চুরি বন্ধ হচ্ছে না। এমনকি পাহারা বসিয়েও কাজ হচ্ছিল না।

সেই গ্রামেই ছিলেন একজন মাস্টার মশাই। তিনি পার্শ্ববর্তী একটি থানার হাই স্কুলে মাস্টারী করতেন। একদিন সেই গ্রামেরই কতিপয় সচেতন যুবক তাঁর কাছে গেলো এবং গ্রামের এই অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি সম্পর্কে যুবকরা তাকে জানালো। কিভাবে এই বাজে পরিস্থিতি থেকে রেহাই পাওয়া যায় সেই পরামর্শ জানতে চাইলো। মাস্টার মশাই গ্রামের পরিস্থিতি সম্পর্কে আগেই অবগত ছিলেন। কারণ চোরদের সালিশ বিচারে তিনিও মাঝে মাঝে থাকতেন। চুরির ধরন দেখে কখনও কখনও চোরদের কান ধরে উঠবস করানো হতো, চুরির মাল ফেরত দিলে শাস্তি মওকুফ করা হতো, আবার কখনো কখনো বেত্রাঘাত, জুতাপেটা করাসহ পুলিশেও ধরিয়ে দেওয়া হতো।

ঐ অশিক্ষিত চোরগুলোর মধ্যে আত্মমর্যাদা ছিল। দেখতাম তারা লজ্জায় মাথা নত করে থাকতো। মর্যাদাবোধের কারণে চোরদের কয়েকজন কর্মসংস্থানের খোঁজে শেষ পর্যন্ত গ্রাম ছেড়ে শহরেও পাড়ি জমিয়েছে। ঐ চোর মানুষগুলো ছিল আমাদেরই প্রতিবেশী আত্মীয়-স্বজন যারা ক্ষুধার যন্ত্রণায় চুরি করতো।

যুবকদের কথা মন দিয়ে শুনে মাস্টার মশাই বললেন, “দেখ, বিচার করে শাস্তি দিয়ে চুরি বন্ধ করা যাবে না। চুরি বন্ধ করতে হলে গ্রামে একটা স্কুল প্রতিষ্ঠা করা দরকার। শিক্ষিত হলে মানুষের মর্যাদাবোধ বাড়বে, এতে চুরি ছেড়ে দিবে।”

মাস্টার মশাইয়ের উপদেশ মত গ্রামের যুবকদের উদ্যোগে একটি নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলো। যদিও স্কুলটি না হওয়ার জন্য অনেকে চেষ্টাও করেছে; বিশেষ করে যারা চোরের চুরি করা জিনিসপত্র নিজেদের জিম্মায় রাখতেন। পরে জানতে পারলাম চোররাও তাদের অন্তর দিয়ে ভাল জানতো না। কারণ চুরির মালপত্র ঐসব মাতব্বর গোছের লোকেরা আত্মসাৎ করতো। একবার শুনেছি রাতে ১২ মন ধান চুরি করে এক মাতব্বরের বাসায় রেখে সকালে ২০ কেজি পেয়েছেন এক চোর। রাগে ক্ষোভে সেই চোর পরিবার নিয়ে গ্রাম ছেড়ে চলে গেছে, আর ফেরেনি।

কয়েক বছরের মধ্যে গ্রামে চুরি কমে গেল এবং এক সময় তা বন্ধও হয়ে গেল। স্বাধীনতার বছর বিদ্যালয়টি হাই স্কুলে উন্নীত হলো। গ্রামের প্রতি ঘরে ঘরে শিক্ষার আলো পৌঁছাল। ধীরে ধীরে উচ্চ শিক্ষিতের সংখ্যাও বাড়তে লাগলো। খেলাধুলা, নাটকসহ নানা সাংস্কৃতিক আয়োজন চলতে লাগলো। গ্রামের মানুষের উদ্যোগে সমাজসেবামূলক বিভিন্ন সংগঠন গড়ে উঠলো। মানুষে মানুষে বন্ধুত্ব ও সৌহার্দ্যের সম্পর্ক বাড়তেই লাগলো। সেই বিদ্যালয়টি আজও আছে। আশে-পাশের গ্রামেও আরো বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ছেলে-মেয়েরা পড়ালেখাও করছে। কিন্তু কেমন যেন মনে হচ্ছে গ্রামে চোর-ডাকাতের সংখ্যাও বেড়ে যাচ্ছে। সেই দিনের সেই মানুষ চোরগুলোর সাথে আজকের দিনের চোর-ডাকাতদের পার্থক্যও অনেক।

এখন সেই মাস্টার মশাইয়ের উপদেশ কেউ শুনে না। সমাজে তাঁর গুরুত্বও নেই।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়