প্রকাশ : ২৬ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৪২
পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.) পালনে যুগশ্রেষ্ঠ ইমামদের সিদ্ধান্ত ও রচনাসমগ্র

‘ত্রিভুবনের প্রিয় মোহাম্মদ এলোরে দুনিয়ায়, আয়রে সাগর, আকাশ, বাতাস-দেখবি যদি আয়।’ মহান আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-“আপনি বলুন, আল্লাহরই ফজল ও তঁারই রহমত-এরই ওপর তাদের আনন্দ করা উচিত। এটি তাদের সমস্ত ধন-সম্পদের চেয়েও উত্তম।” রাসূলুল্লাহ (দ.) হলেন মহান আল্লাহ তায়ালার ফজল ও রহমতের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রকাশ। তাই তঁার শুভাগমনে আনন্দ প্রকাশ করা প্রতিটি মুমিনের ঈমানি দায়িত্ব এবং রব্বুল আলামিনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম। স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (দ.) প্রতি সোমবার রোজা রাখার মাধ্যমে তঁার জন্মের শুকরিয়া আদায় করতেন। সাহাবায়ে কেরামও নবী করিম (দ.)-এর প্রতি ভালোবাসা ও আনন্দ প্রকাশ করতেন তঁার শানে কবিতা পাঠের মাধ্যমে। এর অন্যতম শ্রেষ্ঠ উদাহরণ হযরত আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুর কবিতা। তিনি বলেন-“তুমি যখন জন্মগ্রহণ করলে, পৃথিবী আলোকিত হলো, তোমার নূরে দিগন্ত উদ্ভাসিত হলো।
আমরা সেই আলোতেই আছি, সেই নূরের মাঝেই আছি, আর হেদায়েতের পথ ধরে এগিয়ে চলছি।”এভাবেই যুগে যুগে সালাফ ও উম্মতের বিশিষ্ট ইমামগণ রাসূলুল্লাহ (দ.)-এর মহব্বত, সম্মান ও মর্যাদা নিয়ে অসংখ্য কিতাব রচনা করেছেন। তঁাদের এসব রচনায় রাসূলুল্লাহ (দ.)-এঁর জন্ম, জীবন, মর্যাদা ও তঁার প্রতি ভালোবাসার বিভিন্ন দিক অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে আলোচিত হয়েছে। ফলে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবীর আলোচনা যুগে যুগে আরও সমৃদ্ধ হয়েছে।
বিশেষভাবে ইমাম ইবনে দিহইয়া, ইমাম জাহাবি, ইমাম নাসিরি, ইমাম ইবনে কাসির, ইমাম হাফিজ ইরাকি, ইমাম ইবনে হাজার আসকালানি, ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ূতি, ইমাম ইবনুল জাযারি, ইমাম নাসিরুদ্দিন দামেস্কি, ইমাম ইবনুল জাওযি, ইমাম ইবনে হাজার হাইতামি, ইমাম হালাবি, ইমাম সাখাভি, ইমাম আহমদ তিলমিসানি, ইমাম শিহাবুদ্দিন কাস্তাল্লানি, ইমাম ইবনে আবেদিন হানাফি এবং ইমাম আবু শামা-প্রমুখ যুগশ্রেষ্ঠ আলেম ও ইমামগণ মিলাদুন্নবী উপলক্ষে আনন্দ প্রকাশকে মুস্তাহাব আমল হিসেবে বৈধতার ওপর মতামত ব্যক্ত করেছেন। এক কথায়, উম্মতের বহু ইমামের কাছে রাসূলুল্লাহ (দ.)-এঁর জন্ম ও শুভাগমন স্মরণ করা এবং তঁার প্রতি ভালোবাসা ও আনন্দ প্রকাশ করা ছিল একটি বরকতময় আমল।
এছাড়া অসংখ্য ইমাম পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.)-এর ওপর স্বতন্ত্র কিতাব রচনা করেছেন। এসব কিতাব যুগ যুগ ধরে মিলাদুন্নবীর আলোচনা ও গবেষণাকে সমৃদ্ধ করেছে। তঁাদের রচিত উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গ্রন্থ হলো-ইমাম ইবনুল জাওযি-মাওলিদুল আরুস, ইমাম ইবনে দিহইয়া-আত-তানভীর, ইমাম ইবনে কাসির-মাওলিদ ইবনে কাসির, ইমাম হাফিজ ইরাকি-মাওরিদুল হানি, ইমাম ইবনে নাসিরুদ্দিন দামেস্কি-মাওরিদুস সভী, ইমাম ইবনুল জাযারি-আররিফুত তা’রিফ, ইমাম সামহুদি-আল-মাওয়ারিদুল হানিয়্যা, ইমাম সাখাভি-আল-ফখরুল আলাভি, ইমাম ইবনে হাজার হাইতামি-ইতমামুন নি‘মাহ, ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ূতি-হুসনুল মাকসাদ, ইমাম খতিব শারবিনি-মাওলিদুর রভী, ইমাম বারযানজি-আকদুল জাওহার, ইমাম মোল্লা আলী কারি হানাফি-আল-মাওলিদুর রভী।
এছাড়াও যুগের পর যুগ অসংখ্য আলেম ও গবেষক পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.) এর ওপর বহু গ্রন্থ রচনা করেছেন। এসব গ্রন্থ একত্র করলে নিঃসন্দেহে কয়েকটি বৃহৎ খণ্ডে পরিণত হবে। ইলমের কাবা হিসেবে খ্যাত আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত প্রবীণ আলেমগণও পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.) বিষয়ে প্রায় ৬৫টিরও বেশি গ্রন্থ রচনা করেছেন বলে জানা যায়। নিঃসন্দেহে এসব গ্রন্থ রাসূলুল্লাহ (দ.)-এঁর মিলাদ ও তঁার প্রতি ভালোবাসা নিয়ে রচিত এক বিশাল জ্ঞানভান্ডার। এমনকি যারা পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.) কে অপছন্দ করেছেন, তঁাদের মধ্যেও ইবনে তাইমিয়ার নাম উল্লেখ করা হয়। তিনি তঁার ইকতিদাউস সিরাতিল মুস্তাকিম গ্রন্থে মিলাদ প্রসঙ্গে উল্লেখ করেন-কেউ যদি পবিত্র মিলাদুন্নবী (দ.)কে সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা পালন করে, তাহলে তার জন্য উত্তম প্রতিদান রয়েছে। এ থেকে বোঝা যায়, ইবনে তাইমিয়া মিলাদ পালনের বিষয়ে আপত্তি করলেও তঁার বক্তব্যে এ বিষয়ে এমন কঠোরতা ছিল না, অথচ যা পরবর্তী সময়ে কিছু মহলের মধ্যে দেখা যায়। অতএব, পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.) কেবল একটি আনুষ্ঠানিক আয়োজন নয়; বরং এটি মহান আল্লাহর দেয়া সর্বশ্রেষ্ঠ রহমতের প্রকাশ-হাবিবে খোদা (দ.)-এঁর শুভাগমন স্মরণ করে তঁার প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি মাধ্যম। আল্লাহ তায়ালা সমগ্র উম্মতকে প্রিয় নবী (দ.) এঁর মহব্বত হৃদয়ে ধারণ করার এবং তঁার পবিত্র মিলাদের আনন্দ যথাযথভাবে প্রকাশ করার তাওফিক দান করুন। আমিন। কাজী মোহাম্মদ শামছুদ্দিন। শিক্ষার্থী, আল আযহার ইউনিভার্সিটি, মিশর।








