বুধবার, ০৮ জুলাই, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ০৮ জুলাই ২০২৬, ০৯:২৪

একজন সংস্কৃতিবান জেলা প্রশাসক আহমেদ জিয়াউর রহমান

রফিক আহমেদ মিন্টু
একজন সংস্কৃতিবান জেলা প্রশাসক আহমেদ জিয়াউর রহমান

পঁচিশে বৈশাখের আট-দশ দিন পূর্বে আমরা শিল্পকলা একাডেমি চঁাদপুরে একত্র হয়েছি রবীন্দ্রজয়ন্তীর মহড়ার জন্যে। সব প্রতিষ্ঠান মিলে পঞ্চাশ-ষাট ছেলেমেয়ে উপস্থিত। গান শেখানোর দায়িত্ব পড়েছে রূপালী চম্পক এবং আমার ওপর।

আয়োজন-সহযোগিতায় আছেন লিটন ভূঁইয়া, ফারুক, শরীফ ও মোবারকরা। রবীন্দ্রসঙ্গীত বিধায় রূপালী দি আমার দিকেই গান শেখানোর দায়িত্বটি ঠেলে দিলেন, নিজে থাকলেন হারমোনিয়াম সহযোগিতায়। গান শুরু হলো, ‘হে নতুন দেখা দিক আরবার’ দিয়ে। মাঝখানের চা বিরতির সময় ফারুক ভাই বললেন, মিন্টু ভাই, ডিসি স্যার অনুষ্ঠানে ‘কৃষ্ণ কলি আমি তারেই বলি’ গানটি করবেন, সাথে একটু আবৃত্তি সহযোগ আছে, সেটুকু আপনি করবেন। ডিসি সাহেব বলেছেন অনুষ্ঠানটি যাতে ভাল হয়। রূপালীদিও বললেন, ডিসি স্যার ভাল গান করেন। ডিসি স্যার মানে আহমেদ জিয়াউর রহমান। অনেক পদস্থ কর্মকর্তারাই কর্মক্ষেত্রে এসে হালকা-পাতলা অনুষ্ঠানে গান করে থাকেন সখের বশে। তা যতো না গান অর্থে, তারও বেশি খানিক বিনোদন করে কাটানোর অর্থে, আর অধঃস্তনরা তার ঐটুকুর প্রশংসা করতেই খেই হারান। আমিও তেমনই কিছু ভেবেছিলাম।

হয়ে গেলো রবীন্দ্রজয়ন্তী। অনুষ্ঠানে ডিসি মহোদয়ের রুচির কিছু ছাপ পেলাম, যা আমাদের চাওয়ার সাথে মিলে গেলো। কিন্তু ডিসি মহোদয়ের আসল পরিচয় পেলাম সপ্তাহখানেক পরে, যখন তিনি একটি

মূল্যায়ন-সভা করলেন রবীন্দ্রজয়ন্তী নিয়ে। এমন কিছু সূক্ষ্ম বিচার-বিশ্লেষণ তিনি করলেন অনুষ্ঠান নিয়ে, যা থেকে তঁার সম্পর্কে আমাদের ধারণা পাল্টে গেলো। বুঝলাম, বেহুদা প্রশস্তি নেয়ার পাত্র নন তিনি। তঁার গানও হালকা বিনোদনের নয়। সঙ্গীতের একজন গোড়ার মানুষ তিনি।

শুরু হলো আসন্ন নজরুলজয়ন্তীর মহড়া। এবারে নজরুলসঙ্গীত মহড়ার দায়িত্ব জেলা প্রশাসক মহোদয় নিজেই নিলেন। ছয়-সাতদিনের মহড়া হবে স্থির হলো। ডিসি মহোদয় শিল্পকলার নিজস্ব সাউন্ড সিস্টেমের ব্যবস্থা করলেন এমপি মহোদয়কে ধরে, মঞ্চে নতুন ডায়াস নির্মাণ করতে দিলেন। মঞ্চের অন্যান্য সরঞ্জামের বিষয়ও ভাবা হচ্ছে। এমপি মহোদয় বললেন, শিল্পকলায় আধুনিক সব ব্যবস্থা করা হবে।

ছেলেমেয়েদের উৎসাহ গেলো বেড়ে। প্রতিদিন বিকেলে নজরুলের গানের মহড়া, তার সাথে নৃত্যের ঝঙ্কার, আবৃত্তিকারদের পদচারণা, ডিসি মহোদয়ের উপস্থিতি--সব মিলে শিল্পকলায় জমজমাট একটি অবস্থা। সবাই বুঝতে পারলেন আর দুদিন পরেই জমকালো একটি নজরুলজয়ন্তী অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে চঁাদপুর শিল্পকলায়। শেষে অনুষ্ঠানের দিন তিনটা থেকে দর্শক সমাবেশ হতে লাগলো। গানের মেয়েরা লাল শাড়ি পরে বিদ্রোহী রঙে গোটা মঞ্চ আলোকিত করলো। মিউজিকের লোকরা বসলো দু পাশে, নতুন ডায়াসে ছেলেমেয়েরা যৌক্তিক উচ্চতায়

হলভর্তি দর্শকের সামনে নিজেদের মেলে ধরতে পেরে উল্লসিত। উৎফুল্লভাব তাদের চোখে মুখে। ৭টি নাচের দলের ছেলেমেয়েরাও প্রস্তুত। হঠাৎ মঞ্চের আলো জ্বলে উঠলো, বেজে উঠলো মোস্তফা কামালের বঁাশির আলাপ, হল কঁাপিয়ে উদ্বোধনী গান শুরু হলো ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু দুস্তর পারাবার’। এরপরই চয়ন সাহা গাইলো নজরুলের কাওয়ালী ঢংয়ের ইসলামী গান ‘এ কোন মধুর শরাব দিলে আল আরাবী সাকি’। রিয়া গাইলো, ‘তুমি যতই দহনা দুখের দহনে’ রাগাশ্রয়ী গান। ডিসি মহোদয় নিজে গাইলেন ‘সৃজন ছন্দে আনন্দে নাচে নটরাজ’। অপেক্ষাকৃত তরুণী চৈতী-কাবিসা-মধুরিমারা পরিচ্ছন্ন কণ্ঠে নজরুলের গানের সুরে মাতিয়ে তুললো। এক সময় অনুষ্ঠান শেষ হলেও শেষ হয়নি অনুষ্ঠানের ভালো লাগা। দর্শক-শিল্পী কেউই যেনো হল ছেড়ে যেতে চাচ্ছে না, ভাবখানা--যদি আরো কিছুক্ষণ থাকতো অনুষ্ঠান।

এভাবে রবীন্দ্র এবং নজরুল জন্মজয়ন্তীর দুটি অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে চঁাদপুরে সংস্কৃতির একটি পরিবেশনশৈলী শুরু হয়ে গেলো। নজরুলজয়ন্তী অনুষ্ঠনের পর এবারও একটি মূল্যায়ন সভা করা হলো। সভায় অনুষ্ঠানের ত্রুটি-বিচ্যুতি নিয়ে কথা হলো, শিল্পকলার নতুন শব্দযন্ত্রের প্রশংসা হলো, কিছু অপূর্ণতার কথা উঠলো। হয় তো এগুলো জাতীয় কোনো অনুষ্ঠান নয়, কিন্তু তবু মূল্যায়ন সভার কারণে গানের ছেলেমেয়ে ও কুশলীরা বুঝলো, যে কোনো অনুষ্ঠানই হালকা কোনো বিষয় নয়, অনুষ্ঠানে অবহেলার কোনো সুযোগ নেই, সব কিছুই হবে নিখুঁত। দর্শকদের আমন্ত্রণ দিয়ে এনে যেনতেন ধরনের একটি পরিবেশনা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। রসবোধের শীর্ষে পেঁৗছানো না গেলে শিল্পবোধ তৈরি হয় না। এজন্যে চাই পরিবেশকের সাধনা, কঠোর অধ্যবসায়, সঙ্গীত শিল্পীর জন্যে চাই প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা সুর সাধনা, প্রত্যুষের কঠিন স্বর-সাধন। আরাম-নিদ্রা পরিহার করে অনুরূপ বছরের পর বছর লেগে থাকার মানসিক দৃঢ়তা থাকলেই, তোমার জন্য সঙ্গীত, নচেৎ নহে।

জেলা প্রশাসক মহোদয় আহমেদ জিয়াউর রহমান এসব বিষয় ধারণ করেন--এটি ভেবেই আমার আনন্দ। যে কোনো বিষয়েরই ভেতর দিয়ে না গেলে সেটি ধারণ করা যায় না। আর ধারণ না করলে শুধু দূর থেকে উৎসাহদান সঠিকভাবে নাড়া দিতে পারে না।

আমার নিজের গানটি শেখা হয়ে উঠেনি কোনোদিন, কিন্তু ইচ্ছা ছিলো প্রবল। হলে কি হবে, সুর তেমন গলায়ও ছিলো না, কানেও ছিলো না, তবে হাল ছাড়িনি কোনোভাবে। ঢাকায় কলেজ জীবনে দশ বছর গানের এ প্রতিষ্ঠান সে প্রতিষ্ঠান ঘুরে বেড়িয়েছি। কথাকলি, আলতাফ মাহমুদ, সঙ্গীত ভবন ঘুরে শেষে ছায়ানটে সবে দু বছর। হিসেব করে দেখি শেখা হয়নি কিছুই, শুধু ছায়ানটের দু বছর ওয়াহিদুল হক নামের একটি মানুষকে চিনে আসা, আর তঁারই লেখা তিনটি বই ‘গানের ভিতর দিয়ে’, ‘চেতনা ধারায় এসো’, ‘সংস্কৃতির ভূবন’ সাথে নিয়ে নব্বই দশকে জনতা ব্যাংকে চঁাদপুরে যোগদান করা। তবে একটি কাজ হয়েছে। চঁাদপুর রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ গঠিত হলে ওয়াহিদুল ভাই প্রায়ই আসতেন ছেলেমেয়েদের প্রশিক্ষণ দিতে, আর আমি তার পেছন পেছন থাকতাম, ব্যাংকের ব্যস্ত চাকুরি আমাকে বঁাধতে পারেনি, ফলে ব্যাংকার হওয়ার কাজটিও হয়ে উঠেনি কখনও। গান শেখাতে বসলে ওয়াহিদ ভাই গানের চেয়ে কথা বেশি বলতেন, সবই প্রাসঙ্গিক, আর এটুকুই আমার সঙ্গীত জীবনের, মানুষ জীবনের পুঁজি। বস্তুত ওয়াহিদুল ভাইয়ের জীবনবোধ আমাকে কিছুটা হলেও নাড়া দেওয়ার কারণে অনেক গতানুগতিক বিষয় মেনে নিত কষ্ট হয়, এ হলো সমস্যা। ফলে জেলা শিল্পকলায় আমাদের খুব বেশি যাওয়া হয়ে উঠেনি কখনও। আমরা আমাদের নিজস্ব প্রতিষ্ঠানে নিজস্ব চিন্তা ভাবনায় ব্যস্ত থাকতাম। আমাদের দেশ-ভাবনা, সমাজ-ভাবনার প্রতিফলন সেখানে রাখার চেষ্টা করতাম। এক সময় প্রায় চল্লিশ বছর উদয়ন সঙ্গীত বিদ্যালয়টি দঁাড় করাতে কাজ করেছি। কিন্তু একই সমস্যা সেখানেও দঁাড়িয়েছে। তারপর আনন্দধ্বনি শুরু করলাম কিছু পুরানো ছাত্র-ছাত্রীর সহযোগিতায়। এখন আনন্দধ্বনি চঁাদপুরের সবচেয়ে বেশি ছাত্র-ছাত্রীর প্রতিষ্ঠান।

কথা হচ্ছিলো জেলা প্রশাসক মহোদয়ের বিষয়ে। জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে আমাদের যাতায়াত কম ছিলো। কারণ আমরা যে বৈঠকী গানের পরিবেশনা করি তার সাথে শিল্পকলার একটু দূরত্ব থাকে। এটা শুধু চঁাদপুর নয়, বেশিরভাগ শিল্পকলায়ই এরকমটা হয়। কিন্তু শিল্পকলার অনুষ্ঠানেও যথেষ্ট দর্শক সমাগম ঘটে থাকে, কারণ আধুনিক ইন্সস্ট্রুমেন্টযোগে আধুনিক সঙ্গীতের নিবেদন সেখানে বেশি হওয়ায় অনেকেই তাতে অংশ নেন। আমি শুধু বলছি আমাদের

গায়নশৈলীটা কিছুটা ভিন্ন। রবীন্দ্র-নজরুল এবং রাগভিত্তিক গানের প্রণোদনায় আমরা থাকি। এর একটি কারণও আছে। তা হলো বিশুদ্ধ ধারা থেকে বাংলা সঙ্গীত যেন হারিয়ে না যায় তা নজরে রাখা। আর সঙ্গীত বিদ্যালয় বা একাডেমি চালাতে গেলে তা আমাদের করাই কর্তব্য। গায়ক কী গান গাবে সেটি তার রুচি, কিন্তু উচ্চাঙ্গ ধারার সাথে কালাকারকে পরিচয় করিয়ে দেয়া সঙ্গীতগুরুর দায়িত্ব, তাতে আমাদের দেশাত্মবোধও জড়িত। জেলা প্রশাসক আহমেদ জিয়াউর রহমান বাংলা সঙ্গীতের শুদ্ধ ধারাটি আত্মস্থ করা একজন মানুষ। তিনি ঢাকায় সঙ্গীত ভুবনে সঙ্গীত শিখেছেন এবং কলিম শরাফীর সংস্পর্শ পেয়েছেন। কলিম শরাফী প্রথম জীবনে কলকাতায় সঙ্গীত চর্চা করেছেন। তখন কোলকাতায় গণনাট্য সংস্থার যুগ। সে সময় কলিম শরাফী, আব্দুল আহাদ প্রমুখরা হেমন্ত মুখোপাধ্যায়দের সাথেও গানের আড্ডায় থাকতেন এবং কলিম শরাফীর গানের একটি পরিচিতি সেখানে তৈরি হয়েছিলো। পরে কলিম শরাফীরা ঢাকায় চলে আসেন। এরপর বাংলাদেশের বর্তমান নজরুল সঙ্গীতের অগ্রণী গায়ক খায়রুল আনাম শাকিলের কাছেও আহমেদ জিয়াউর রহমান গান শিখেছেন। খায়রুল আনাম শাকিলের রয়েছে সঙ্গীতের একটি পারিবারিক ভিত্তি। তঁার চাচা মাহমুদুর রহমান বেনু মুক্তির গানের অন্যতম পরিচালক ও কণ্ঠশিল্পী ছিলেন। আসল বিষয়টি হলো, জেলা প্রশাসক আহমেদ জিয়াউর রহমান সঙ্গীত চিন্তার শুদ্ধতা ধারণ করেন, যা তঁার সঙ্গীত ভাবনা, রুচি,

পরিবেশনশৈলীতে প্রকাশ পায়, পরিশুদ্ধতায় তঁাকে বেঁধে রাখে,

অন্ধকারে সঁাতরানো আমাদের কাছে তঁার সকল সঙ্গীতাচার গ্রহণযোগ্য মনে হয়েছে। মফস্বলে থাকা শিল্পসংস্কৃতির লোকেরা অনেক সময়ই মফস্বল মানের ঊর্ধ্বে উঠতে চান না বা পারেন না। আমরা অনেক সময় তা বোঝাতেও ব্যর্থ হই। কিন্তু আজ যখন সে আলো সামনে দেখতে পাচ্ছি তখন সে সুযোগ আমরা হারাতে চাই না। আহমেদ জিয়াউর রহমানের হাত ধরে চঁাদপুরের সংস্কৃতির পুনর্জাগরণ হোক। চঁাদপুর থেকেই শুরু হোক ঢাকার বাইরের জেলা শহরগুলোতে

মানসম্পন্ন সঙ্গীত, নাটক, আবৃত্তি, চিত্রকলার অনুগমনীয় যাত্রা। বৈঠকী সঙ্গীতের সুবোধ শ্রোতাদের আবার আগমন ঘটুক সুরের আসরগুলোতে।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়