প্রকাশ : ০৮ জুলাই ২০২৬, ০২:০৫
চাঁদপুরের ইলিশ জৌলুস হারাতে বসেছে!

চাঁদপুরের ইলিশ জৌলুস হারাতে বসেছে!
|আরো খবর
সরবরাহ কম, দাম আকাশচুম্বী—‘ইলিশের বাড়ি’ চাঁদপুরে এখন ইলিশের চেয়ে বেশি ক্রেতার ভিড়
মো. মিজানুর রহমান।।
চাঁদপুর শহরের পদ্মা, মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদীর মিলনস্থলের কাছাকাছি অবস্থিত দেশের অন্যতম বৃহৎ প্রধান মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র ‘বড়স্টেশন মাছঘাট’। পদ্মা-মেঘনার মিঠা পানিতে বিচরণকারী মা ইলিশ ডিম ছাড়ার মৌসুমে এই অঞ্চলে আসে। ডিম ছাড়ার পর এখানেই জাটকা বেড়ে পূর্ণাঙ্গ ইলিশে পরিণত হয়। এ কারণেই চাঁদপুর ‘ইলিশের বাড়ি’ ও ‘ইলিশের রাজধানী’ হিসেবে পরিচিত। বিশাল পরিমাণ সুস্বাদু রূপালি ইলিশের উৎপাদন, আমদানি ও সরবরাহের কারণে জেলার এই পরিচিতি গড়ে উঠেছে। তবে এখন সেই জৌলুস অনেকটাই ফিকে হয়ে এসেছে।
বর্তমানে ইলিশের সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাজারে ‘হোয়াইট গোল্ড’ খ্যাত মাছটির দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। মৌসুম চললেও চাঁদপুর মাছঘাটে আর আগের মতো ইলিশের প্রাচুর্য নেই। সমুদ্র থেকে আসা একের পর এক ফিশিং বোটের ব্যস্ত দৃশ্যও এখন অতীতের স্মৃতি হয়ে যাচ্ছে।
মৎস্য ব্যবসায়ীদের তথ্যমতে, স্থানীয় জেলেদের ধরা এক কেজি ওজনের ইলিশ প্রতি কেজি ২ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ফলে অনেক ক্রেতাই দরদাম করেও ইলিশ না কিনে ফিরে যাচ্ছেন। অন্যদিকে দক্ষিণাঞ্চল থেকে চাঁদপুরের মোকামে ইলিশের আমদানি প্রায় বন্ধ রয়েছে। ব্যবসায়ীদের মতে, আমদানি বাড়লে দামও কমে আসবে। তবে মৎস্য বিভাগের দাবি, ইলিশের সংখ্যা নয়, বরং গড় আকার ছোট হওয়ায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
মঙ্গলবার (৭ জুলাই ২০২৬) দুপুরে চাঁদপুর বড়স্টেশন মাছঘাট ঘুরে দেখা যায়, এখন আর আগের মতো হাতিয়া, লক্ষ্মীপুরসহ দক্ষিণাঞ্চল থেকে নৌ ও সড়কপথে ইলিশ আসছে না। স্থানীয় পদ্মা-মেঘনা থেকে ধরা অল্প কিছু ছোট-বড় ইলিশই আড়তে উঠছে। নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুরের ব্যবসায়ীরা ঝুড়িভর্তি ইলিশ নিয়ে এলে মুহূর্তেই পাইকারদের ভিড় জমে যায়। সেখানে মাছের চেয়ে পাইকারের সংখ্যাই বেশি দেখা যায়।
চাঁদপুর সদর উপজেলার আখনের হাট এলাকার জেলে মজনু সরকার বলেন, এখন ইলিশের মৌসুম হলেও নদীতে পর্যাপ্ত পানি ও স্রোত নেই। সারাদিন জাল ফেলেও জ্বালানির খরচ ওঠে না। মাছও খুব কম পাওয়া যাচ্ছে। হরিণা রাঢ়ি বাড়ি এলাকার জেলে ছলেমান বলেন, অন্য বছরের তুলনায় এবার বড় সাইজের ইলিশ কম, বরং ছোট আকারের ‘টেম্পু ইলিশ’ বেশি ধরা পড়ছে।
বড়স্টেশন মাছঘাটের ইলিশ বিক্রেতা ইমরান জানান, আড়তে ইলিশের সরবরাহ কম থাকায় টানা দুই দিন ধরে ঠিকমতো মাছ কিনে বিক্রি করতে পারছেন না। গত বছরের তুলনায় প্রতি কেজিতে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা দাম বেড়েছে। দাম শুনেই অনেক ক্রেতা ফিরে যাচ্ছেন।
চাঁদপুর মৎস্য বণিক সমিতির নেতা সুমন খান বলেন, সাগর ও উপকূলীয় অঞ্চলের ইলিশের ওপরই চাঁদপুর মাছঘাট অনেকাংশে নির্ভরশীল। এবার সাগরের ইলিশ কম আসায় ঘাটেও প্রাচুর্য নেই। সামনের জোয়ারে পরিস্থিতি কিছুটা পরিবর্তন হতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
চাঁদপুর শহরের অদূরের মহামায়া এলাকার ক্রেতা মহসিন বলেন, আত্মীয়ের বাড়িতে পাঠানোর জন্য ইলিশ কিনতে এসে দাম শুনে ফিরে যেতে হয়েছে। এক কেজি ইলিশের দামে তিন কেজির বেশি গরুর মাংস কেনা যায়। চাঁদপুরে থেকেও ইলিশের স্বাদ নেওয়া কঠিন হয়ে গেছে।
চাঁদপুর মৎস্য বণিক সমবায় সমিতি লিমিটেডের সাধারণ সম্পাদক শবে বরাত সরকার জানান, জ্যৈষ্ঠ মাসে প্রতিদিন ১ থেকে দেড়শ’ মণ ইলিশ এলেও বর্তমানে গড়ে মাত্র ১০ থেকে ২০ মণ ইলিশের কেনাবেচা হচ্ছে। তিনি বলেন, এক কেজির ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ টাকা, ৭০০ থেকে ৯০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা এবং ৪০০ থেকে ৬০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
চাঁদপুর সদরের জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা মির্জা ওমর ফারুক বলেন, ইলিশের সংখ্যা নয়, গড় আকার ছোট হয়েছে। জাটকা ও মা ইলিশ সংরক্ষণের ফলে উৎপাদন গত কয়েক বছরে বেড়েছে। তবে নদীর প্রবাহ কমে যাওয়া, ডুবোচর, খাদ্য সংকট ও প্রাকৃতিক পরিবর্তনের কারণে পদ্মা-মেঘনায় ইলিশের বিচরণ কমে গেছে।
ইলিশ গবেষক ড. আনিছুর রহমান বলেন, প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট নানা কারণেই ইলিশের সংকট তৈরি হয়েছে। নদীর পানিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, জেলের সংখ্যা বৃদ্ধি, কারেন্ট জাল ও চায়না দুয়ারি জালের মতো অবৈধ জালের ব্যবহার, নদীর গভীরতা কমে যাওয়া, দূষণ এবং অনিয়ন্ত্রিত বালু উত্তোলন ইলিশের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত করছে। ফলে এখন চাঁদপুরের ইলিশ অবতরণ কেন্দ্রে মাছের চেয়ে ক্রেতা ও দর্শনার্থীর ভিড়ই বেশি দেখা যায়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ইলিশের প্রজনন ক্ষেত্র সংরক্ষণ, নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা, অবৈধ জাল বন্ধ এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করা না গেলে ‘ইলিশের বাড়ি’ হিসেবে চাঁদপুরের ঐতিহ্য আরও সংকটে পড়তে পারে। একই সঙ্গে সরবরাহ সংকট অব্যাহত থাকলে সাধারণ মানুষের জন্য ইলিশ আরও দুর্লভ হয়ে উঠবে।
ডিসিকে / এমজেডএইচ








