শুক্রবার, ০৫ জুন, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ০৫ জুন ২০২৬, ১১:০৪

প্রস্তুতিহীন বার্ধক্য মানে অন্ধকারে যাত্রার সামিল

হাসান আলী
প্রস্তুতিহীন বার্ধক্য মানে অন্ধকারে যাত্রার সামিল

মানুষের জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ের জন্যে আমরা কম-বেশি প্রস্তুতি গ্রহণ করি। শিশুর জন্মের আগে পরিবার প্রস্তুতি নেয়, শিক্ষাজীবনের জন্যে পরিকল্পনা করা হয়, কর্মজীবনের জন্যে প্রশিক্ষণ নেওয়া হয়, এমনকি অবসর জীবনের আর্থিক নিরাপত্তার জন্যেও অনেকে সঞ্চয় করেন। কিন্তু জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ ও চ্যালেঞ্জপূর্ণ অধ্যায়Ñবার্ধক্যের জন্যে আমাদের প্রস্তুতি খুবই সীমিত। ফলে অনেকের কাছে বার্ধক্য যেন অন্ধকারে যাত্রার সামিল হয়ে দাঁড়ায়।

আমাদের দেশে অধিকাংশ মানুষ বার্ধক্যকে নিয়তির ওপর ছেড়ে দেন। কেউ মনে করেন, পর্যাপ্ত অর্থ-সম্পদ থাকলেই বার্ধক্যের সব সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে। আবার কেউ সন্তানদের সামর্থ্য ও দায়িত্ববোধের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করে থাকেন। বাস্তবতা হলো, অর্থ কিংবা পারিবারিক সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ হলেও এগুলো বার্ধক্যের সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার নিশ্চয়তা নয়। সুস্থ ও মর্যাদাপূর্ণ বার্ধক্যের জন্যে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী প্রস্তুতি এবং সক্রিয় জীবনযাপনের মানসিকতা।

সক্রিয় বার্ধক্যের অন্যতম শর্ত হলো শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা। আমরা শারীরিক অসুস্থতার জন্যে চিকিৎসকের কাছে যেতে যতোটা আগ্রহী, মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে ততেটাই উদাসীন। অথচ বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে একাকিত্ব, অবসাদ, উদ্বেগ, প্রিয়জন হারানোর বেদনা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং আত্মসম্মানবোধের সংকট অনেক প্রবীণের জীবনে বড়ো সমস্যা হয়ে দেখা দেয়। এসব বিষয়ে সচেতনতা ও প্রস্তুতির অভাব তাদের জীবনকে আরও কঠিন করে তোলে।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, একটি শিশুকে আমরা ছোটবেলা থেকেই নানা শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ভবিষ্যতের জন্যে প্রস্তুত করি। তাকে একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সমাজ একযোগে কাজ করে। কিন্তু একজন মানুষ যখন বার্ধক্যে প্রবেশ করেন, তখন তার জন্যে কোনো নিয়মিত প্রশিক্ষণ, কাউন্সেলিং বা প্রস্তুতিমূলক কর্মসূচি প্রায় নেই বললেই চলে। কীভাবে বয়সজনিত পরিবর্তন মেনে নিতে হবে, কীভাবে সামাজিক যোগাযোগ বজায় রাখতে হবে, কীভাবে স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলা করতে হবে কিংবা কীভাবে একাকীত্বের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবেÑএসব বিষয়ে খুব কম মানুষই কোনো দিকনির্দেশনা পান।

আমাদের মনে রাখতে হবে, বার্ধক্য একটি ব্যক্তিগত যাত্রা। পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে, কিন্তু বার্ধক্যের অনেক বাস্তবতা একজন মানুষকে নিজেরই মোকাবিলা করতে হয়। তাই বার্ধক্যের জন্যে প্রস্তুতি নেওয়া বিলাসিতা নয়, বরং জীবনের অপরিহার্য দায়িত্ব।

সম্প্রতি মিরপুরে ৭৫ বছর বয়সী নুরজাহান বেগমের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই তার সন্তানদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এবং শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। প্রবীণদের প্রতি অবহেলা বা নির্যাতনের ঘটনা অবশ্যই উদ্বেগজনক এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ হওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশে পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন-২০১৩ বিদ্যমান রয়েছে। আইন অনুযায়ী কেউ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে তার বিচার হওয়া উচিত। তবে কোনো ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও সব পক্ষের বক্তব্য শোনার আগেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাওয়া সমাজের জন্যে ইতিবাচক নয়। যদি প্রতিটি পারিবারিক সংকটকে আমরা কেবল সন্দেহ ও অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে দেখি, তাহলে পরিবার নামক প্রতিষ্ঠানের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হলে তার প্রভাব সমাজের ওপরও পড়ে, যা দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক অস্থিরতার কারণ হতে পারে।

বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় দুই কোটি প্রবীণ মানুষ পরিবারে বসবাস করেন। অন্যদিকে বৃদ্ধাশ্রম ও প্রবীণ নিবাসে বসবাসকারী প্রবীণের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে খুবই কম। এই বাস্তবতা প্রমাণ করে যে, আমাদের সমাজে পরিবার এখনও প্রবীণদের প্রধান আশ্রয়স্থল। তাই বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার কারণে পারিবারিক সম্পর্ককে সার্বিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ না করে, পরিবারকে আরও সহানুভূতিশীল ও দায়িত্বশীল করে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে।

সময়ের দাবি হলো, বার্ধক্যকে শুধুমাত্র বয়সের বিষয় হিসেবে না দেখে জীবনব্যাপী প্রস্তুতির একটি অংশ হিসেবে বিবেচনা করা। আর্থিক সঞ্চয়ের পাশাপাশি প্রয়োজন স্বাস্থ্য সচেতনতা, মানসিক প্রস্তুতি, সামাজিক সম্পৃক্ততা এবং পারিবারিক সম্পর্কের যত্ন। আজকের প্রস্তুতিই আগামী দিনের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ বার্ধক্যের ভিত্তি। কারণ প্রস্তুতিহীন বার্ধক্য সত্যিই অন্ধকারে যাত্রার সামিল।

লেখক : প্রবীণ বিষয়ে লেখক ও সংগঠক।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়