বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:২২

হাওয়াইয়ান গিটারে তিন যুগ ধরে মুগ্ধতা ছড়াচ্ছেন গিটারশিল্পী দিলীপ কুমার ঘোষ

কবির হোসেন মিজি
হাওয়াইয়ান গিটারে তিন যুগ ধরে মুগ্ধতা ছড়াচ্ছেন গিটারশিল্পী দিলীপ কুমার ঘোষ

চাঁদপুরের সংস্কৃতি অঙ্গনে এক পরিচিত নাম হাওয়াইয়ান গিটারশিল্পী দিলীপ কুমার ঘোষ। তিনি যখন গিটার হাতে মঞ্চে ওঠেন, তখন যেন তারের ঝংকারে বদলে যায় চারপাশের পরিবেশ। পরিচিত কোনো গানের সুর হাওয়াইয়ান গিটারের মূর্ছনায় নতুন আবহ তৈরি করে। আর সেই সুরের জাদুতেই মুগ্ধ হয়ে ওঠেন উপস্থিত দর্শক-শ্রোতারা। কখনো করতালি, কখনো উল্লাস, আবার কখনো নিঃশব্দে সুরের আবেশে ডুবে থাকা—এভাবেই দীর্ঘদিন ধরে শ্রোতাদের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন চাঁদপুরের গুণী গিটারশিল্পী দিলীপ কুমার ঘোষ।

তিন যুগেরও বেশি সময় ধরে তিনি হাওয়াইয়ান গিটারচর্চার সঙ্গে যুক্ত। তবে প্রচারের আলো কিংবা ব্যক্তিগত প্রচারণার প্রতি তার কখনোই বিশেষ আগ্রহ ছিল না। অনেকটা নীরবে, নিজের ভালোবাসা ও একাগ্রতা নিয়ে তিনি এগিয়ে গেছেন সুরের পথে। কিন্তু শিল্পীকে কত দিন আড়ালে রাখা যায়! নিজের প্রতিভা আর অসাধারণ পরিবেশনার শক্তিতেই বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তিনি উঠে এসেছেন আলোচনায়, পেয়েছেন শ্রোতাদের অকৃত্রিম ভালোবাসা ও বোদ্ধামহলের প্রশংসা।

সদা হাসোজ্জ্বল, প্রাণবন্ত ও সংস্কৃতিমনা এই মানুষটির জন্ম ১৯৬০ সালের ৩১ জানুয়ারি চাঁদপুর শহরের পুরাণবাজারস্থ ঘোষপাড়ায়। কর্মজীবনে তিনি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা। চাকরির ব্যস্ততা, সংসার ও পারিবারিক দায়িত্ব সামলেও শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি তার ভালোবাসায় কখনো ভাটা পড়েনি। সুযোগ পেলেই তিনি ছুটে গেছেন সংস্কৃতি অঙ্গনে, হাতে তুলে নিয়েছেন প্রিয় হাওয়াইয়ান গিটার। সুরের সঙ্গে তার এই দীর্ঘ সম্পর্ক আজ তাকে চাঁদপুরের সংস্কৃতি অঙ্গনের অন্যতম পরিচিত ও শ্রদ্ধেয় মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

দিলীপ কুমার ঘোষের গিটারজীবনের শুরুটা ছিল এক আবেগঘন সাংস্কৃতিক আয়োজনকে কেন্দ্র করে। ১৯৮৭ সালের দিকে চাঁদপুর শহরের জোড়পুকুরপাড়ে একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেই অনুষ্ঠানে তৎকালীন কয়েকজন হাওয়াইয়ান গিটারশিল্পী দর্শকদের উদ্দেশ্যে পরিবেশন করেন বাঙালির আবেগের গান—‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’।

হাওয়াইয়ান গিটারের তারে ভেসে আসা সেই সুর গভীরভাবে নাড়া দেয় তরুণ দিলীপ ঘোষকে। সেদিনের সেই মুগ্ধতা থেকেই জন্ম নেয় নতুন এক স্বপ্ন। গিটারকে জীবনের অংশ করে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। এরপর থেকে শুরু হয় হাওয়াইয়ান গিটার নিয়ে তার নিয়মিত অনুশীলন ও নিরলস সাধনা।

চাকরির পাশাপাশি সময় বের করে চলতে থাকে গিটারচর্চা। দিনের পর দিন অনুশীলন, সুরের প্রতি গভীর মনোযোগ এবং শেখার আগ্রহ ধীরে ধীরে তাকে করে তোলে দক্ষ একজন হাওয়াইয়ান গিটারশিল্পী। আজ তিন যুগেরও বেশি সময় ধরে সেই সুরসাধনা অব্যাহত রেখেছেন তিনি।

নিজে গিটার বাজিয়ে শ্রোতাদের মুগ্ধ করাই তার কাজের শেষ নয়; দীর্ঘদিন ধরে তিনি নতুন প্রজন্মের মাঝেও ছড়িয়ে দিচ্ছেন হাওয়াইয়ান গিটারের শিক্ষা। অসংখ্য শিক্ষার্থী তার কাছ থেকে গিটারের তালিম নিয়েছেন। তাদের মধ্যে অনেকেই সংস্কৃতি অঙ্গনে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছেন। তার শিক্ষার্থীদের মধ্যে ঐশী ঘোষ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দিলীপ কুমার ঘোষের কাছে দীক্ষা নিয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই ঐশী বোদ্ধামহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছেন।

একজন প্রকৃত শিল্পীর সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়তো এখানেই—তিনি শুধু নিজের প্রতিভাকে বিকশিত করেন না, নতুন প্রজন্মের মাঝেও সেই শিল্পের আলো ছড়িয়ে দেন। দিলীপ কুমার ঘোষও দীর্ঘদিন ধরে সেই দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। হাওয়াইয়ান গিটারের মতো একটি বিশেষ বাদ্যযন্ত্রকে নতুন প্রজন্মের কাছে পরিচিত করে তোলা এবং তাদের আগ্রহী করে তোলার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা চাঁদপুরের সংস্কৃতি অঙ্গনে বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো।

দিলীপ কুমার ঘোষ শুধু চাঁদপুর কিংবা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে হাওয়াইয়ান গিটার পরিবেশনের পাশাপাশি ভারতের বিভিন্ন জায়গাতেও তিনি নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। তার গিটারের সুর ও পরিবেশনা তাকে এনে দিয়েছে সুখ্যাতি। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজন ও প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে তিনি অর্জন করেছেন সম্মাননা ও স্বীকৃতি।

ভারতে আয়োজিত রবীন্দ্রসংগীত গিটার প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ ও ভারতের প্রতিযোগীদের মধ্য থেকে সেরা ৩০ জনের মধ্যে বিজয়ী হওয়ার গৌরব অর্জন করেন তিনি। ২০২২ সালে ভারতের ‘অকটিভেন্ট’ নামের একটি সংস্থা থেকে তিনি বেস্ট এক্সেলেন্স পদক লাভ করেন। এসব অর্জন চাঁদপুরের সংস্কৃতি অঙ্গনের জন্য গর্বের।

তিনি সরকারি চাকরির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি তার ভালোবাসা কখনো কমেনি। কর্মজীবনের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি নিয়মিত সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছেন। সরকারি চাকরিতে দায়িত্বশীলতার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি রাষ্ট্র কর্তৃক প্রদত্ত মর্যাদাপূর্ণ জনপ্রশাসন পদক (পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অ্যাওয়ার্ড) ২০১৯ লাভ করেন।

তার জীবনের অর্জনের তালিকায় রয়েছে জেলা পর্যায়ের বিভিন্ন সম্মাননা ও পুরস্কারও। ২০১৫ সালে তিনি বাংলাদেশ গিটার শিল্পী সংস্থা কর্তৃক পদক লাভ করেন। ২০১৮ সালে বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস উপলক্ষে জেলা প্রশাসন কর্তৃক সম্মাননা লাভ করেন তিনি। একই বছর উপজেলা প্রশাসন কর্তৃক বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসের সম্মাননা অর্জন করেন। ২০১৮-২০১৯ সালে রোটারী ইন্টারন্যাশনাল ক্লাব কর্তৃক ভোকেশনাল এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন দিলীপ কুমার ঘোষ। ২০২১ সালে তিনি চর্যাপদ সাহিত্য একাডেমির শুভেচ্ছা স্মারক সম্মানে ভূষিত হন। জনপ্রশাসন পদকসহ জেলা শিল্পকলা একাডেমির পদক ও বিভিন্ন সম্মাননা তার দীর্ঘ কর্মময় ও বর্ণাঢ্য জীবনের স্বীকৃতি বহন করে। বর্তমানে তিনি চর্যাপদ সাহিত্য একাডেমির পর্যবেক্ষক ও ন্যায়পাল হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

শুধু সংগীত নয়, গণিতেও রয়েছে দিলীপ কুমার ঘোষের অসাধারণ দক্ষতা। সরকারি চাকরি ও গিটারচর্চার পাশাপাশি দীর্ঘ ৪৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি চাঁদপুর শহরের বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের গণিত বিষয়ে পাঠদান করে আসছেন। আজও সেই কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। একদিকে গিটারের তারে সুর সৃষ্টি, অন্যদিকে সংখ্যার জটিল হিসাব সহজ করে শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরা—জীবনের এই দুই ভিন্ন জগৎকে সমান দক্ষতায় সামলে চলেছেন তিনি। শিক্ষার্থীদের কাছে তিনি যেমন একজন গণিত শিক্ষক, সংস্কৃতি অঙ্গনে তেমনি একজন নিবেদিতপ্রাণ গিটারশিল্পী।

একজন শিল্পীর পথচলায় পরিবারের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দিলীপ কুমার ঘোষের দীর্ঘ সাংস্কৃতিক জীবনের পেছনেও রয়েছে তার পরিবারের সহযোগিতা। বিশেষ করে তার সহধর্মিণী ঝর্ণা ঘোষ সব সময় তাকে উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা দিয়ে পাশে থেকেছেন। এত দূর আসার পেছনে কার ভূমিকা সবচেয়ে বেশি—এমন প্রশ্নের উত্তরে দিলীপ কুমার ঘোষ অনায়াসেই নিজের স্ত্রীর কথা বলেন। তার ভাষায়, “আমার স্ত্রীর অনুপ্রেরণাই আমার গিটারচর্চাকে আরও শাণিত করেছে।”

ব্যক্তিগত জীবনে তিনি দু ছেলের জনক। তার স্ত্রী গৃহবধূ। পারিবারিক জীবনের দায়িত্ব ও কর্মজীবনের ব্যস্ততার মধ্যেও শিল্পচর্চাকে ধরে রাখার ক্ষেত্রে পরিবারের এই সহযোগিতা তাকে শক্তি জুগিয়েছে।

জীবনের এত অর্জন, সম্মাননা ও স্বীকৃতির পরও দিলীপ কুমার ঘোষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি নিজেই খুঁজে পান একজন সংগীতশিল্পী হিসেবে। নিজের অনুভূতির কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, “সবসময় একজন মিউজিশিয়ানই হতে চেয়েছি আমি। নিজের প্রিয় কাজটি করতে পারছি, শ্রোতার ভালোবাসা পাচ্ছি—এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আমার জীবনে আর হতে পারে না।”

তার এই কথার মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে দীর্ঘ তিন যুগের সুরসাধনার গল্প। পুরস্কার, পদক কিংবা সম্মাননা একজন শিল্পীকে আনন্দ দেয়, কিন্তু একজন শিল্পীর কাছে শ্রোতার ভালোবাসাই সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি। দিলীপ কুমার ঘোষের ক্ষেত্রেও সেটিই সত্য। মঞ্চে তার গিটারের সুরে যখন দর্শক মুগ্ধ হন, করতালিতে মুখর হয়ে ওঠে অনুষ্ঠানস্থল, তখনই হয়তো তার দীর্ঘ সাধনা পূর্ণতা পায়।

দীর্ঘদিনের এই পথচলায় থেমে যেতে চান না দিলীপ কুমার ঘোষ। এখনো তার চোখে রয়েছে নতুন স্বপ্ন। চাঁদপুরের সংস্কৃতি অঙ্গনে হাওয়াইয়ান গিটারকে আরও জনপ্রিয় ও সমৃদ্ধ করতে চান তিনি। নতুন প্রজন্মকে এই বাদ্যযন্ত্রের প্রতি আগ্রহী করে তুলতে চান, গড়ে তুলতে চান আরও দক্ষ গিটারশিল্পী। তার বিশ্বাস, সঠিক চর্চা ও পরিচর্যা পেলে হাওয়াইয়ান গিটার নতুন প্রজন্মের মাঝে আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়বে।

তিন যুগেরও বেশি সময় ধরে নীরবে সুরের সাধনা করে যাওয়া এই মানুষটি প্রমাণ করেছেন, সত্যিকারের শিল্পচর্চার জন্য প্রচারের আলো সব সময় প্রয়োজন হয় না। নিষ্ঠা, ভালোবাসা ও নিরবচ্ছিন্ন সাধনাই একজন শিল্পীকে মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে দিতে পারে।

চাঁদপুর শহরের পুরাণবাজারের ঘোষপাড়া থেকে শুরু হওয়া দিলীপ কুমার ঘোষের সেই পথচলা আজ বাংলাদেশ ও ভারতের সংস্কৃতি অঙ্গন পর্যন্ত বিস্তৃত। সরকারি কর্মকর্তা, গণিত শিক্ষক, সংগঠক, সংস্কৃতিপ্রেমী এবং সর্বোপরি একজন নিবেদিতপ্রাণ হাওয়াইয়ান গিটারশিল্পী—জীবনের নানা পরিচয়ের মধ্যেও দিলীপ কুমার ঘোষের সবচেয়ে আপন পরিচয় হয়তো একটাই, তিনি সুরের মানুষ। আর তার হাতে যখন হাওয়াইয়ান গিটার ওঠে, তখন তিন যুগের সাধনা যেন তারের পরতে পরতে কথা বলে ওঠে।

চাঁদপুরের সংস্কৃতি অঙ্গনে এই গুণী শিল্পীর সুরসাধনা আগামী প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে—এমনটাই প্রত্যাশা সংস্কৃতিপ্রেমীদের।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়