শুক্রবার, ১০ এপ্রিল, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ১০ এপ্রিল ২০২৬, ১০:০৭

অস্তিত্বের সংকটে হানাদার বাহিনীর অস্ত্রবাহী জাহাজের সমাধিস্থল ডাকাতিয়া নদী

মোহাম্মদ সানাউল হক
অস্তিত্বের সংকটে হানাদার বাহিনীর অস্ত্রবাহী জাহাজের সমাধিস্থল ডাকাতিয়া নদী

একসময়ের খরস্রোতা ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা ডাকাতিয়া নদী আজ সংকটগ্রস্ত। যা মূলত ভারতের ত্রিপুরা পাহাড় থেকে উৎপন্ন হয়ে কুমিল্লার বাগমারা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এরপর এটি চঁাদপুর ও লক্ষ্মীপুর জেলার মধ্য দিয়ে বয়ে চলে এবং কুমিল্লা-লাকসাম চঁাদপুর হয়ে মেঘনা নদীতে মিলিত হয়। নদীর দক্ষিণ অংশ নোয়াখালী খাল হিসেবে প্রবাহিত হয়ে চঁাদপুর থেকে কুমিল্লার গোমতীর সঙ্গে মিলিত হয়ে একাকার।

ডাকাতিয়া নদী প্রায় ২৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ, যা নোয়াখালীর হাজিমারা পর্যন্ত বিস্তৃত। নদীটি বামদিকে দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে ফেনী জেলায় প্রবেশ করেছে এবং শেষমেষ ফেনী নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। একসময়ের উজ্জ্বল গর্জন ও জীবনের প্রাণকেন্দ্র আজ পানির সংকট, কচুরিপানার বিস্তার, স্থানীয়দের দখলদারিত্ব এবং পরিবেশগত চাপে ভুগছে। এই পরিস্থিতি নদীর আশেপাশের মানুষের জীবিকা, কোন কোন স্থানে নৌযাতায়াত ও ঐতিহ্যের ওপর বিরাট প্রভাব ফেলছে।

ডাকাতিয়া নদী একসময় হানাদার বাহিনীর গোলাবারুদভর্তি জাহাজের সমাধিস্থল হয়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে গৌরবময় অধ্যায় রচনা করেছিল। সেই নদী আজ নিজেই অস্তিত্বের সংকটে হাহাকার করছে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর অস্ত্রবোঝাই জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার ঘটনাটি এই নদীকে করে তুলেছিল প্রতিরোধের প্রতীক, সাহসিকতার স্মারক। অথচ আজ দখল, দূষণ, নাব্যতা হ্রাস এবং অব্যবস্থাপনার কারণে সেই গৌরবের নদী ধীরে ধীরে বিলীন হওয়ার পথে।

সূত্রে জানা যায়, ১৯৭১ সালের ৩০ অক্টোবর রাতে চঁাদপুর লঞ্চঘাটের কাছে ডাকাতিয়া নদীতে নোঙর করা ছিলো পাকিস্তানি বাহিনীর একটি অস্ত্রবোঝাই জাহাজ। সাবমেরিনার শেখ আমানউল্লা বীর বিক্রমের নেতৃত্বে নৌ-কমান্ডোরা লিমপেট মাইনের সাহায্যে জাহাজটি বিধ্বস্ত করে। এরপর ২৪ নভেম্বর চঁাদপুর সদর থানার পশ্চিম সকদী গ্রামের সাহেব বাজার সংলগ্ন ডাকাতিয়া নদীপথে মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি সৈন্যদের রসদ ও অস্ত্রবোঝাই একটি মালবাহী জাহাজে আক্রমণ চালান, যা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং কারো মতে বীর মুক্তিযোদ্ধারা জাহাজটি ডুবিয়ে দেন। চঁাদপুর মুক্তির প্রাক্কালে ৮ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী শহর ছাড়ার সময় অনেক সৈন্য এই নদীতেই নিহত হন এবং তাদের সলিল সমাধি হয়।

একসময় গর্জন করা খরস্রোতা ডাকাতিয়া নদী আজ ধীরে ধীরে মৃত্যুপথযাত্রী এক জলধারায় পরিণত হচ্ছে। নদীর দু তীর দখল ও ভরাটের ফলে স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। কোথাও ব্যক্তি উদ্যোগে মাটি ফেলে নদী সংকুচিত করা হচ্ছে, আবার কোথাও বাজারসংলগ্ন এলাকায় অবাধে ফেলা হচ্ছে ময়লা-আবর্জনা, যা নদীর বুকে স্তূপ হয়ে জমে আছে, এছাড়াও কোনো কোনো স্থানে এখনো নদীর পাশে খোলা টয়লেট রাখা হয়েছে, ফলে পানি দূষণ এবং স্বাভাবিক চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়ে নদীটি অনেক স্থানে মরা খালে রূপ নিচ্ছে।

যে নদী ছিল প্রাণচঞ্চল, আজ তা ধীরে ধীরে হারাচ্ছে নিজের অস্তিত্ব, আর এর সঙ্গে সঙ্গে বিলীন হয়ে যাচ্ছে ঐতিহাসিক গুরুত্বও। ডাকাতিয়া নদীর এই করুণ অবস্থার পেছনে রয়েছে একাধিক মানবসৃষ্ট কারণ। অপরিকল্পিত দখল, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ, নদীর তীর ভরাট করে বসতি বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলাÑএসব কার্যক্রম নদীর প্রাকৃতিক গতিপথকে সংকুচিত করেছে। পাশাপাশি পানি প্রবাহের উৎসস্থলগুলো নষ্ট হয়ে যাওয়ায় পানির স্বাভাবিক সরবরাহও কমে গেছে। নদীতে নিয়মিত খনন বা রক্ষণাবেক্ষণের অভাবও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এসব কারণে নদীর গভীরতা কমে গিয়ে নাব্যতা হারাচ্ছে, যা একে ধীরে ধীরে মৃতপ্রায় করে তুলছে।

অতীতে ডাকাতিয়া নদী ছিলো এই অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার অন্যতম প্রধান উৎস। স্থানীয় জেলেরা এই নদী থেকেই মাছ আহরণ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন, আর নদীপথ ছিলো ব্যবসায়ীদের জন্য সহজ ও সাশ্রয়ী পরিবহন মাধ্যম। কৃষকরাও এই নদীর পানির ওপর নির্ভর করে সেচ কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। নদীর তীরে গড়ে উঠেছিল বহু হাট-বাজার, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে সচল রাখতো। কিন্তু বর্তমানে নদীর এই দুরবস্থার কারণে জেলেরা হারাচ্ছেন তাদের পেশা, ব্যবসায়ীরা হারাচ্ছেন সহজ যোগাযোগের পথ, আর কৃষকরাও পড়ছেন সেচ সংকটে।

একসময় এই নদী অত্যন্ত খরস্রোতা ছিলো এবং মেঘনার মতোই উত্তাল স্বভাবের হওয়ায় এর করাল গ্রাসে দু পাড়ের মানুষ সর্বস্ব হারাতো। অনেকে মনে করতেন, নদীটির তীব্রতা ও ভাঙনের কারণে এটি ‘ডাকাতের মতো’ আচরণ করতো বলে এর নাম ডাকাতিয়া হয়েছে। ব্রিটিশ শাসনামল থেকে কুমিল্লা-চঁাদপুর ও নোয়াখালী এলাকায় যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনের প্রধান মাধ্যম ছিলো এই নদী। নদীটিকে কেন্দ্র করে চঁাদপুরে মৎস্য ব্যবসা ও বিভিন্ন ব্যবসা-বাণিজ্য গড়ে উঠেছিলো। এছাড়া, এই নদীর অববাহিকায় এশিয়ার বৃহত্তম রায়পুর মৎস্য প্রজনন ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপিত হয়েছিলো।

স্থানীয়দের মতে, কুমিল্লা, চঁাদপুর ও লক্ষ্মীপুর জেলার সংসদ সদস্যদের সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগে ডাকাতিয়া নদী আবার তার হারানো স্বকীয়তা ফিরে পেতে পারে। দীর্ঘদিনের অবহেলা, দখল ও দূষণের কারণে সংকুচিত হয়ে পড়া এই নদীকে পুনরুদ্ধারে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও আইনি পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই তিন জেলার জনপ্রতিনিধিরা যদি বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেন, তবে নদী পুনরুজ্জীবনের একটি বাস্তবসম্মত পথ তৈরি হতে পারে।

এই তিন জেলার সংসদ সদস্যদের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী কর্মকর্তাদের সমন্বিত উদ্যোগ এ ক্ষেত্রে বড়ো ভূমিকা রাখতে পারে। পরিকল্পিত খনন, দখলমুক্তকরণ এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নদীর প্রবাহ স্বাভাবিক করা সম্ভব। বিশেষ করে যেখানে নদী ভরাট হয়ে গেছে বা সংকুচিত হয়েছে, সেখানে প্রয়োজনীয় প্রশস্ততা ফিরিয়ে আনলে নদী তার প্রাণ ফিরে পাবে। একই সঙ্গে নদীপথ সচল হলে এটি স্থানীয় যোগাযোগ ব্যবস্থায় একটি বিকল্প ও সহজ মাধ্যম হিসেবে গড়ে উঠতে পারে, যা সড়কপথের ওপর চাপও কমাবে বলে অনেকেই মনে করেন।

সংসদে এই বিষয়ে জোরালো দাবি উত্থাপন করে প্রয়োজনীয় আইন বা বিল পাসের মাধ্যমে পুরো প্রায় ২৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ নদীটিকে দখল ও দূষণমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া সময়ের দাবি। একটি সমন্বিত জাতীয় পরিকল্পনার আওতায় এনে নদীটির টেকসই পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করা জরুরি।

নদী শুধু যাতায়াতের মাধ্যম নয়, এটি প্রকৃতি ও মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ডাকাতিয়া নদীকে বঁাচানো মানে শুধু একটি নদীকে রক্ষা করা নয়, বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা হাজারো মানুষের জীবন-জীবিকা, সংস্কৃতি ও পরিবেশকে টিকিয়ে রাখা। তাই এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি জীবন্ত নদীকে ফিরে পায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চঁাদপুর থেকে লক্ষ্মীপুর পর্যন্ত প্রায় ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ডাকাতিয়া নদী পুনঃখনন এবং এর দু তীরে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে খুব বেশি অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজন নেই। প্রতি বছর নদীপথ উন্নয়নের জন্য যে বাজেট বরাদ্দ করা হয়, তার সামান্য অংশ সঠিকভাবে ব্যবহার করা গেলেই এই নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও নাব্যতা অনেকাংশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। পরিকল্পিত উদ্যোগ ও কার্যকর বাস্তবায়নই এখানে মূল বিষয়। তবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট জেলার দায়িত্বশীল নেতৃত্ব এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাদের সমন্বিত ও আন্তরিক প্রচেষ্টা থাকলে ডাকাতিয়া নদী আবারও তার হারানো প্রাণ ফিরে পেতে পারে।

একসময় খরস্রোতা এই নদীটি বর্তমানে নাব্যতা হারিয়ে বহু স্থানে মরা খালে পরিণত হয়েছে, ফলে এর স্বাভাবিক প্রবাহ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যে নদীতে একসময় জেলেরা সকাল-সন্ধ্যা মাছ শিকার করতো এবং দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির মাছের প্রাচুর্য ছিল, সেই নদীর অস্তিত্ব আজ হুমকির মুখে। যেসব স্থানে নদীটি মরা খালে রূপান্তরিত হয়েছে, সেখানে পুনঃখনন কার্যক্রম জোরদার করা, অবৈধ দখল ও বঁাধ অপসারণ, নিয়মিত পানি প্রবাহ নিশ্চিত করা এবং নদীর তীরবর্তী দূষণ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নদীটি তার স্বকীয়তা ফিরে পেতে পারে। পাশাপাশি স্থানীয় জনগণ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগই পারে এই নদীকে আবারও জীবন্ত করে তুলতে।

চঁাদপুর রোটারী ক্লাবের সাবেক সভাপতি কাজী শাহাদাত বলেন, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য স্থানীয় জনগণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি। নদী দখল ও ভরাট বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ, নিয়মিত খননের মাধ্যমে নাব্যতা ফিরিয়ে আনা এবং নদীর তীরে ময়লা-আবর্জনা ফেলা বন্ধ করতে সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। স্থানীয়দেরও উচিত নদী রক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা রাখা, যাতে তারা নিজেরাই তাদের জীবন-জীবিকার এই গুরুত্বপূর্ণ উৎসকে বঁাচিয়ে রাখতে পারে। ডাকাতিয়া নদীকে পুনরুজ্জীবিত করা না হলে ইতিহাসের এই নদী কেবল স্মৃতিতেই সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে।

মোহাম্মদ সানাউল হক : ফিচার সাংবাদিক।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়