প্রকাশ : ১২ মার্চ ২০২৬, ১১:০২
ঈদের বাজারে মূল্যবৃদ্ধির নৈরাজ্য-কঠোর নজরদারিই হতে পারে সমাধান

ঈদ মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। বাংলাদেশে ঈদ মানেই আনন্দ, উৎসব এবং পরিবারের সবার জন্যে নতুন পোশাক কেনার প্রস্তুতি। শিশু-কিশোরদের কাছে ঈদের প্রধান আনন্দই নতুন জামা পাওয়া। তাই ঈদকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন বিপণী বিতান, শপিং মল এবং স্থানীয় মার্কেটগুলোতে ক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড় দেখা যায়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এই আনন্দঘন মুহূর্তকে কেন্দ্র করে প্রতি বছরই কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অতিরিক্ত মুনাফার আশায় বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে ভোক্তাদের প্রতারিত করে থাকেন।
|আরো খবর
সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে, ঈদ উপলক্ষে অনেক পোশাকের দোকানে পণ্যের প্রকৃত মূল্যের চেয়ে দুগুণ কিংবা তিনগুণ দাম লিখে বিক্রি করা হচ্ছে। দামের ট্যাগে অতিরিক্ত মূল্য উল্লেখ করে পরে দরদামের মাধ্যমে কিছুটা কমিয়ে বিক্রি করা এই কৌশল বহুদিন ধরেই চলে আসছে। ফলে সাধারণ ক্রেতারা প্রকৃত মূল্যের তুলনায় অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করতে বাধ্য হচ্ছেন। বাজারের এই অস্বচ্ছ ও অনৈতিক প্রবণতা শুধু ভোক্তাদের ক্ষতিগ্রস্তই করছে না, বরং সামগ্রিক বাজার ব্যবস্থার ওপর আস্থা নষ্ট করছে।
এই পরিস্থিতিতে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক অভিযান কিছুটা আশার আলো দেখিয়েছে। বিভিন্ন বিপণী বিতান ও মার্কেটে অভিযান চালিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং কয়েকটি দোকানকে নগদ অর্থ জরিমানা করা হয়েছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে এমন অনিয়ম করলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে প্রশ্ন থেকে যায়Ñএ ধরনের অভিযান কি শুধু মৌসুমি পদক্ষেপ হয়ে থাকবে, নাকি বাজারে স্থায়ী শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য দীর্ঘমেয়াদী উদ্যোগ নেওয়া হবে?
ঈদের বাজারে অতিরিক্ত মূল্য আদায়ের প্রবণতা নতুন নয়। প্রতি বছরই এই সময়ে বাজারে চাহিদা বেড়ে যাওয়ার সুযোগ নিয়ে কিছু ব্যবসায়ী পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেন। বিশেষ করে পোশাকের দোকানগুলোতে এই প্রবণতা বেশি দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে একটি পণ্যের প্রকৃত দাম যদি দু হাজার টাকা হয়, তাহলে সেটির ট্যাগে পাঁচ বা ছয় হাজার টাকা লেখা থাকে। পরে ক্রেতা দরদাম করলে দোকানদার সেটি তিন হাজার বা আড়াই হাজার টাকায় দিতে রাজি হন। ক্রেতা তখন মনে করেন তিনি অনেক কম দামে পণ্যটি কিনেছেন। কিন্তু বাস্তবে সেই পণ্যের দাম শুরু থেকেই অযৌক্তিকভাবে বেশি নির্ধারণ করা হয়েছিল।
এ ধরনের প্রতারণামূলক কৌশল বাজারে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। এর পেছনে একদিকে যেমন ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত মুনাফার মানসিকতা কাজ করে, অন্যদিকে ক্রেতাদের সচেতনতার অভাবও একটি বড়ো কারণ। অনেক ক্রেতা বাজারে যাওয়ার আগে পণ্যের প্রকৃত মূল্য সম্পর্কে ধারণা রাখেন না। আবার অনেকেই তাড়াহুড়োর কারণে বিভিন্ন দোকানে ঘুরে দাম যাচাই করেন না। ফলে তারা সহজেই প্রতারণার শিকার হন। তবে এখানে শুধু ক্রেতাদের দোষারোপ করলে চলবে না। বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং তদারকির ঘাটতিও এই সমস্যাকে দীর্ঘদিন ধরে টিকিয়ে রেখেছে। যদি নিয়মিতভাবে বাজার মনিটরিং করা হতো এবং অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হতো, তাহলে হয়তো এই প্রবণতা এতোটা বিস্তার লাভ করতো না।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক অভিযান প্রমাণ করেছে, প্রশাসন চাইলে বাজারে অনিয়ম অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। কয়েকটি দোকানে জরিমানা করার খবর ছড়িয়ে পড়তেই অনেক ব্যবসায়ী সতর্ক হয়ে গেছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলোÑকয়েকটি অভিযানে পুরো বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এজন্যে প্রয়োজন নিয়মিত ও ধারাবাহিক তদারকি।
এক্ষেত্রে জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ। বাজার ব্যবস্থাপনা কমিটিগুলোকেও আরও সক্রিয় হতে হবে। অনেক মার্কেটে ব্যবসায়ীদের সংগঠন রয়েছে, যারা চাইলে নিজেদের মধ্যেই একটি ন্যায্যমূল্যের নীতি অনুসরণ করতে পারে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে অনেক ক্ষেত্রেই সেই উদ্যোগ দেখা যায় না।
ব্যবসা শুধু লাভের বিষয় নয়, এর সঙ্গে নৈতিকতা ও সামাজিক দায়িত্বও জড়িত। একজন সৎ ব্যবসায়ীর কাছে ক্রেতার আস্থা সবচেয়ে বড়ো সম্পদ। অল্প সময়ে বেশি লাভের আশায় ক্রেতাদের প্রতারিত করলে সাময়িকভাবে কিছু লাভ হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসার সুনাম নষ্ট হয়। তাই ব্যবসায়ীদের উচিত স্বচ্ছ মূল্য নির্ধারণ করা এবং পণ্যের সঠিক মূল্য তালিকা প্রদর্শন করা।
অন্যদিকে ক্রেতাদেরও সচেতন হতে হবে। কোনো পণ্য কেনার আগে একাধিক দোকানে দাম যাচাই করা, পণ্যের মান পরীক্ষা করা এবং ক্রয় রসিদ সংগ্রহ করাÑএই বিষয়গুলো মেনে চললে অনেক ক্ষেত্রে প্রতারণা এড়ানো সম্ভব। একই সঙ্গে অনিয়ম দেখলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানোও গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও ভোক্তা সচেতনতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অনেক সময় দেখা যায়, কোনো দোকানের অনিয়ম সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ পেলে দ্রুত প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ হয় এবং ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়। তাই সচেতন নাগরিক সমাজও বাজারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখতে পারে।
ঈদকে কেন্দ্র করে দেশের অর্থনীতিতেও একটি বড়ো ধরনের আর্থিক লেনদেন হয়। বিশেষ করে পোশাক খাতের অনেক ব্যবসা এই সময়ের ওপর নির্ভরশীল। তাই বাজারে স্বচ্ছতা ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা শুধু ভোক্তাদের স্বার্থেই নয়, সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যেও গুরুত্বপূর্ণ।
সরকার ইতোমধ্যে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন প্রণয়ন করেছে এবং সেই আইনের আওতায় অনিয়ম অবলম্বনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু আইন থাকলেই হবে না, তার কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। নিয়মিত বাজার তদারকি, দ্রুত বিচার এবং দৃশ্যমান শাস্তি এই তিনটি বিষয় নিশ্চিত করা গেলে বাজারে অনিয়ম অনেকাংশে কমে আসবে।
বিশেষ করে ঈদের মতো বড়ো উৎসবের আগে বাজার মনিটরিং জোরদার করা উচিত। প্রশাসনের পক্ষ থেকে যদি আগেই কঠোর বার্তা দেওয়া হয় এবং নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হয়, তাহলে অসাধু ব্যবসায়ীরা অনিয়ম করার সাহস পাবে না।
পরিশেষে বলা যায়, ঈদ আনন্দের উৎসব। এই আনন্দ যেন কোনোভাবেই অতিরিক্ত মূল্য আদায় বা প্রতারণার কারণে ম্লান না হয়। এজন্যে ব্যবসায়ী, প্রশাসন এবং ক্রেতাÑসব পক্ষকেই নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে হবে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক অভিযান একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে এই উদ্যোগকে আরও বিস্তৃত ও ধারাবাহিক করতে হবে।
বাজারে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে ক্রেতারা স্বস্তিতে কেনাকাটা করতে পারবেন এবং ব্যবসায়ীরাও সুষ্ঠু প্রতিযোগিতার মাধ্যমে তাদের ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবেন। আর তখনই ঈদের বাজার সত্যিকার অর্থেই হয়ে উঠবে আনন্দমুখর, স্বচ্ছ।








