প্রকাশ : ২৯ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৯:১৮
এমন ইমামের পাশে পুলিশেরও দাঁড়ানো উচিত

শুক্রবার চাঁদপুর কণ্ঠের যে সংবাদটি অনেক বেশি আলোচিত ছিলো, সেটির শিরোনাম ‘সুদ-ঘুষের বিরুদ্ধে বয়ান করায় ইমামকে চাকরি ছাড়ার নির্দেশ!’ এ সংবাদটিতে লিখা হয়েছে, জুমার নামাজের খুতবার আলোচনায় সুদ-ঘুষ ও বেপর্দার বিরুদ্ধে বয়ান করায় মসজিদের খতিব মাওলানা আব্দুল আউয়ালকে চাকরি ছাড়তে বলা হয়েছে। এমন অভিযোগ উঠেছে ওই মসজিদ কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি পুলিশ কর্মকর্তাসহ কমিটির অপর সদস্যদের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী ইমাম ফরিদগঞ্জ উপজেলার চরদুঃখিয়া পূর্ব ইউনিয়নের আলোনিয়া গ্রামের বাইতুল মামুর জামে মসজিদে ইমাম ও খতিব হিসেবে কর্মরত। অভিযুক্তদের মধ্যে কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি পুলিশ কর্মকর্তা (এএসআই) ইমরান শাহীন চৌধুরী, যিনি ওই গ্রামের বাসিন্দা ও চট্টগ্রাম জেলা পুলিশে কর্মরত, আর অন্যরা স্থানীয়। এ ঘটনায় ফরিদগঞ্জ থানায় সোমবার (২৩ ডিসেম্বর ২০২৪) ইমামের পক্ষে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন শানে সাহাবা জাতীয় খতিব ফাউন্ডেশন নামে সংগঠনের চাঁদপুর জেলা শাখার সভাপতি আনাছ আমিনী।
মসজিদের জনপ্রিয় একজন ইমামকে চাকরি ছাড়ার এমন হুমকি দেয়ায় স্থানীয় ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের মাঝে ক্ষোভ ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। এদিকে মসজিদ কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি পুলিশ কর্মকর্তা ইমরান শাহীন চৌধুরী তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন। লিখিত অভিযোগ ও স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, গত আড়াই বছর ওই মসজিদে খতিব ও পেশ ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন মাওলানা আব্দুল আউয়াল। সম্প্রতি মসজিদ কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি পুলিশ কর্মকর্তা ইমরান শাহীন চৌধুরী ও সদস্য ফিরোজ গং ইমামকে মসজিদ থেকে চলে গিয়ে অন্যত্র চাকরি খোঁজার কথা বলেন। পরবর্তীতে বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। ভুক্তভোগী ইমাম বিষয়টি শানে সাহাবা জাতীয় খতিব ফাউন্ডেশনকে জানালে সংগঠনের পক্ষ থেকে ওই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিচার প্রার্থনা করে থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়। অভিযোগ দায়েরকারী শানে সাহাবা জাতীয় খতিব ফাউন্ডেশন চাঁদপুর জেলা শাখার সভাপতি মাওলানা আনাছ আমিনী জানান, ইমামের বিষয়ে আমাদের জানানোর পর আমরা বিষয়টি তদন্ত করেছি। আমাদের কাছে তদন্তকালে মনে হয়েছে ইমামের কোনো দোষ নেই। তিনি শুক্রবার জুমার নামাজের খুতবার পূর্বে বয়ানে সুদ-ঘুষ, বেপর্দা ও হারাম উপার্জনের বিরুদ্ধে আলোচনা করার পর থেকেই তার বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন মসজিদ কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতিসহ কমিটির অন্যরা। এ বিষয়ে অভিযুক্তদের সাথে কথা বললে তারাও ইমামের কোনো দোষ-ত্রুটি দেখাতে পারেন নি। অভিযোগ রয়েছে, এই মসিজদ থেকে ইতিপূর্বে আরো কয়েকজন ইমামকে চাকুরি ছেড়ে যেতে হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে ওই মসজিদের মুসল্লি মো. নিশান, রিপন চোধুরীসহ আরো অনেকেই বলেন, হুজুরের প্রকৃতপক্ষে কোনো দোষ নেই। হুজুর সুদ-ঘুষ ও হারামের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন, এটাই হুজুরের দোষ। নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক ওই মসজিদের আরো কয়েকজন মুসল্লি বলেন, মসজিদ কমিটির সদস্য ফিরোজ গং ইতিপূর্বে আরো কয়েকজন ইমামকে অন্যায়ভাবে মসজিদ থেকে চাকরিচ্যুত করেছে। তাদের মতের বিরুদ্ধে গেলেই হুজুরদের বিদায় করে দেয়া হয়।
এদিকে ওই মসজিদ থেকে চাকুরিচ্যুত হওয়া সাবেক ইমাম হাফেজ মাওলানা মো. মনিরুল ইসলাম, মো. আইয়ুব আলী ও মো. আব্দুস সাত্তার বলেন, আমরা যখন ওই মসজিদে তাদের অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছি, তখনই আমাদের চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। মসজদি কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও পুলিশ কর্মকর্তা ইমরান শাহীন চৌধুরী বলেন, আমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ইমাম আব্দুল আউয়ালের কোনো দোষ নেই। তবে আমি উনাকে চলে যেতে বলেছি। কারণ, আমরা মসজিদে দুজন নতুন হুজুর নিয়োগ দিবো। সেজন্যে হুজুরকে চলে যেতে বলেছি। থানায় লিখিত অভিযোগ দায়েরের সত্যতা নিশ্চিত করে ফরিদগঞ্জ থানার উপ-পুলিশ পরিদর্শক (এসআই) জাহাঙ্গীর আলম বলেন, অভিযোগকারী এবং অভিযুক্ত পক্ষকে থানায় আসতে বলা হয়েছে।
ইমাম আব্দুল আউয়ালের কোনো দোষ নেই, যেটি মসজিদ কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি স্বীকার করেছেন। তারপরেও তাঁকে চাকুরি ছেড়ে দিতে বলাটা রহস্যঘেরা ও অযৌক্তিক। তিনি নূতন করে দুজন হুজুর নিয়োগ দিবেন কেন? তিনি নির্দোষ মাওলানা আব্দুল আউয়ালকে রেখে নূতন আরেকজনকে নিয়োগ দেয়াটাই যৌক্তিক। এর বাইরে তিনি কিছু করার ইচ্ছা প্রকাশ করতে গিয়ে যেভাবে গণমাধ্যমের সংবাদের উপজীব্য হয়েছেন, আর সে ইচ্ছার বাস্তবায়ন পুরোপুরি করলে তো পরিস্থিতি অন্যদিকে মোড় নেবে। কেননা ইমাম-খতিবদের জাতীয় সংগঠন মাওলানা আব্দুল আউয়ালের পাশে দাঁড়িয়েছেন। এই সংগঠন কর্তৃক ফরিদগঞ্জ থানায় দায়েরকৃত অভিযোগের আলোকে যদি পুলিশ ইমামের পাশে দাঁড়ায়, তাহলে পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে না, বরং বৃদ্ধি পাবে। তবে এক্ষেত্রে পুলিশকে সম্মানজনক সমঝোতার পক্ষে এগুতে হবে। আমরা এ বিষয়টিতে চাঁদপুরের পুলিশ সুপার মহোদয়ের দিকনির্দেশনা প্রত্যাশা করছি।