প্রকাশ : ০৯ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৫২
বাবুরহাটে একের পর এক চুরি, আতঙ্কে ব্যবসায়ীরা
তালা ভেঙে চুরি, নতুন তালা লাগালো চোর! নগদ ৫ লাখ টাকাসহ মালামাল লুট, পুলিশ ক্যাম্প স্থাপনের দাবি

প্রায় দুশ বছরের পুরানো চাঁদপুর বাবুরহাট বাজারে একের পর এক চুরির ঘটনায় ব্যবসায়ী ও দোকান মালিকদের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। প্রায় পাঁচ হাজারেরও বেশি দোকানপাটের এই বৃহৎ বাণিজ্যিক কেন্দ্রে বড়ো বড়ো চুরির ঘটনা ঘটলেও অনেক ঘটনার দৃশ্যমান সুরাহা না হওয়ায় চোরচক্র আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে বলে অভিযোগ ব্যবসায়ীদের। সর্বশেষ শুক্রবার (৭ আগস্ট ২০২৬) রাত আনুমানিক সাড়ে ১২টা থেকে ভোর ৪টার মধ্যে বাবুরহাট মডেল টাউন রোডের মজুমদার মার্কেটে বিসমিল্লাহ মেডিসিন কর্নার নামে একটি দোকানে চুরির ঘটনা ঘটে। দোকান মালিকের থানায় দেয়া লিখিত অভিযোগ অনুযায়ী, চোরেরা দোকানের পুরানো তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। চুরিশেষে তারা নিজেদের সঙ্গে আনা নতুন তালা দিয়ে দোকানটি আবার তালাবদ্ধ করে চলে যায়।
দোকান মালিক মো. সোলায়মানের অভিযোগ, তার দোকানে বিকাশ, নগদ ও রকেটসহ বিভিন্ন মোবাইল ব্যাংকিংয়ের লেনদেন হয়। বাবুরহাট বিসিক শিল্পনগরীর বিভিন্ন গার্মেন্টসে কর্মরত শ্রমিক-কর্মচারীরা এ দোকান থেকে নিয়মিত বেতন উত্তোলন করেন। চুরির সময় ক্যাশের ড্রয়ারে থাকা প্রায় নগদ ৫ লাখ টাকা, ২০-২৫টি নতুন সিম, রিচার্জ কার্ড, মিনিট কার্ডসহ বিভিন্ন মালামাল নিয়ে যায় চোরেরা। এছাড়া তার পরিচিত হাজী সিরাজুল ইসলামের দোকানে রাখা ১৫ হাজার টাকাও চুরি হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে দোকান মালিক আরও উল্লেখ করেন, ঘটনার পর সকালে দোকানে এসে তিনি দেখতে পান আগে লাগানো তালার পরিবর্তে নতুন তালা ঝুলছে। পরে সাক্ষীদের উপস্থিতিতে তালা ভেঙে দোকানে প্রবেশ করে ক্যাশের ড্রয়ারসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র এলোমেলো অবস্থায় দেখতে পান। বিষয়টি স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে তিনি থানায় লিখিত অভিযোগ করেন।
আগেও ১০ লাখ ও ৫ লাখ ২০ হাজার টাকার চুরি : বাবুরহাটে এটাই প্রথম চুরির ঘটনা নয়। এর আগে ২ এপ্রিল বাবুরহাট মধ্যবাজারের সিটি ট্রেডার্সে প্রায় ১০ লাখ টাকার মালামাল চুরি হওয়ার অভিযোগ ওঠে। ব্যবসায়ীদের দাবি, ওই ঘটনারও এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান সুরাহা হয়নি।
এছাড়া ১৭ জুন বাবুরহাট কুমিল্লা রোড এলাকার বিসমিল্লাহ এন্টারপ্রাইজে প্রায় ৫ লাখ ২০ হাজার টাকার মালামাল চুরি হয়। এসব ঘটনার বিষয়ে পুলিশকে অবহিত করা হলেও দ্রুত অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় না আনায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ ও হতাশা বাড়ছে।
পেছনের দিকের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ : বাবুরহাট বাজার কমিটির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাসুদ পালোয়ান বলেন, চুরির প্রতিটি ঘটনার বিষয়ে পুলিশকে অবহিত করা হয়েছে। বাজারের পাহারাদাররা সামনের দিক থেকে পাহারা দিলেও দোকানগুলোর পেছনের অংশে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন। অনেক দোকানের পেছনের অংশ অন্ধকার ও দুর্বল থাকায় সেসব স্থান দিয়ে চোরেরা প্রবেশের সুযোগ পেতে পারে।
তিনি ব্যবসায়ীদের দোকানের পেছনের অংশে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা, সিসি ক্যামেরা স্থাপন এবং দুর্বল স্থানগুলো শক্তিশালী করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে বাজারের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করতে পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করেন।
জরুরি পদক্ষেপের আশ্বাস থানার ওসির : এ বিষয়ে চাঁদপুর সদর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ ফয়েজ আহমেদের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, বাবুরহাটের চুরির বিষয়টি তিনি অবগত আছেন। এ ব্যাপারে জরুরি পদক্ষেপ নেয়া হবে। তিনি ব্যবসায়ীদের নিজেদের দোকানের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার অনুরোধ জানান। পাশাপাশি বাজার কমিটির প্রতি পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও প্রয়োজনীয় সংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী রাখার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
ওসি ফয়েজ আহমেদ বলেন, পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা হবে। চুরির ঘটনা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাসও দেন তিনি।
পুলিশ সুপারও দিলেন টহল বাড়ানোর আশ্বাস : এ বিষয়ে চাঁদপুরের পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমানের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি বলেন, বাবুরহাটের চুরির ঘটনাগুলো পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। এসব ঘটনা সমাধানে পুলিশ কাজ করছে এবং ব্যবসায়ীদের আশ্বস্ত করে তিনি বাবুরহাট এলাকায় পুলিশি টহল বাড়ানোর ব্যাপারেও আশ্বাস দেন।
চুরি-মাদকে দুর্বল হচ্ছে সামাজিক নিরাপত্তা : ব্যবসায়ী ও স্থানীয়দের অভিযোগ, চুরি ও মাদক—দুই সমস্যাই বাবুরহাট এলাকার সামাজিক ও ব্যবসায়িক পরিবেশকে দুর্বল করে দিচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ এই বাণিজ্যিক এলাকায় বাবুরহাট মডেল টাউন, বিসিক শিল্পনগরী, স্কুল-কলেজসহ অসংখ্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রতিদিন হাজারো মানুষের সমাগম হওয়া এই এলাকায় রাতের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ব্যবসায়ী ও এলাকাবাসী।
তাদের দাবি, বাজারের অন্ধকার ও নির্জন পেছনের অংশগুলোতে নিয়মিত পুলিশি টহল, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা, সিসি ক্যামেরা স্থাপন এবং বাজারের নিরাপত্তাকর্মী বাড়ানোর পাশাপাশি বাবুরহাটে একটি স্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করা জরুরি। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সাম্প্রতিক চুরির ঘটনাগুলোর দ্রুত তদন্ত করে জড়িতদের শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি বাবুরহাটের ব্যবসা-বাণিজ্য ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।







